Robbar

যে জীবনের ফড়িংয়ের…

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 3, 2026 7:05 pm
  • Updated:August 3, 2026 7:17 pm  

‘গ্লোব স্কিমার’ ফড়িং আমাদের বাংলায় দেখা যায় যে-সময়, তখন হয় তারা আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ভারতে ভ্রমণে আসে অথবা একটি জীবনচক্র সম্পূর্ণ করে ফিরে যায় আফ্রিকায়। ভারত থেকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে পাড়ি দেওয়ার সময় এরা হিমালয়ের ওপর দিয়ে যায়। এদের এই ভ্রমণপথ প্রায় ১৮,০০০ কিলোমিটারের! এর মধ্যে পড়ে সুবিশাল সমুদ্রপথ। একটি ‘গ্লোব স্কিমার’ তার জীবনকালে একা ৬০০০ কিলোমিটার পথ পার হয়।

অমর কুমার নায়ক

মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে এক ঝাঁক ফড়িং উড়তে দেখলেই বৃষ্টি আসবে ঝেঁপে– এমনটা সেই ছেলেবেলা থেকে শুনে এসেছি বাড়ির বড়দের থেকে। তাই এখনও মাঠেঘাটে এমন দৃশ্য চোখে পড়লে সেই ছেলেবেলার স্মৃতি ভেসে ওঠে। এখন, যখন কিছু ফড়িং চিনতে শিখেছি, তখন বুঝেছি যারা বর্ষার সময় আকাশ ঘিরে মেঘ আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের তিরতিরে ডানায় ভর করে উড়ে বেড়ায় মনের আনন্দে, তাদের বেশির ভাগই ‘ওয়ান্ডারিং গ্লাইডার’ বা ‘গ্লোব স্কিমার’ ফড়িং। অবশ্য তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘রাডি মার্শ স্কিমার’ আর ‘কমন পিকচার উইং’ ফড়িং-ও উড়ে বেড়ায়। তাই বলাই যায় যে, এই ফড়িং-ওড়া দেখে বুঝে নেওয়া যায় বর্ষা সমাগত।

বর্ষাকালে ফড়িং সমাবেশ, গ্লোব স্কিমারদের এমন জমায়েত পরিচিত দৃশ্য

বাংলায় এই ‘গ্লোব স্কিমার’ ফড়িং-এর নাম হয়েছে ‘বর্ষাবরণ’। বর্ষাকালে অন্যান্য পোকামাকড়ের সঙ্গে যে ফড়িংদেরও বাড় বাড়ে, সে-কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে একথা বললে অনেকেই আশ্চর্য হবেন যে, ‘গ্লোব স্কিমার’ আমাদের বাংলায় দেখা যায় যে-সময়, তখন হয় তারা আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ভারতে ভ্রমণে আসে অথবা একটি জীবনচক্র সম্পূর্ণ করে ফিরে যায় আফ্রিকায়। ভারত থেকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে পাড়ি দেওয়ার সময় এরা হিমালয়ের ওপর দিয়ে যায়। এদের এই ভ্রমণপথ প্রায় ১৮,০০০ কিলোমিটারের! এর মধ্যে পড়ে সুবিশাল সমুদ্রপথ। একটি ‘গ্লোব স্কিমার’ তার জীবনকালে একা ৬০০০ কিলোমিটার পথ পার হয়। ‘গ্লোব স্কিমার’ তার ভ্রমণপথের যে পর্ব সমুদ্রের ওপর দিয়ে আসে, তা পুরোটাই একটানা পার হয়। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, বর্তমানে এটি বিজ্ঞানীমহলে প্রমাণিত সত্য!

শুধু যে গ্লোব স্কিমাররাই পরিযায়ী ফড়িং, তা নয়। অন্য কয়েকটি প্রজাতিও চিহ্নিত হয়েছে তাদের পরিযাণের জন্য, কিন্তু একমাত্র গ্লোব স্কিমার ফড়িং এতটা দূরত্ব সম্পূর্ণ করে এবং এক বৎসরব্যাপী এই চক্রে তাদের প্রজনন ও নতুন প্রজন্মও এই পরিযাণ-চক্রে অংশগ্রহণ করে।

পুরুষ গ্লোব স্কিমার ফড়িং

হলদে বা কমলা রঙের এই ফড়িংটির ইংরেজি নাম– ‘Wandering Glider’ বা ‘Globe Skimmer’। এবং বিজ্ঞানসম্মত নাম– ‘Pantala flavescens’। এরা ‘Libellulidae’ পরিবারের অন্তর্গত। আকারে মাঝারি এই ফড়িংটির পুরুষের উদরের দৈর্ঘ্য ২৯-৩৫ মিলিমিটার ও ডানার ব্যাপ্তি ৩৮-৪০ মিলিমিটার এবং স্ত্রী ফড়িংয়ের উদরের দৈর্ঘ্য ৩০-৩৩ মিলিমিটার ও ডানার ব্যাপ্তি ৩৯-৪১ মিলিমিটার।

পুরুষ ফড়িংদের উদর লালচে বাদামি রঙের এবং স্ত্রীদের হলদে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ের উদরে, পিঠ বরাবর একটি কালো রেখা দেখা যায় উদরের শেষ খণ্ড অবধি। এদের ডানা স্বচ্ছ এবং পিছনের ডানার গোড়ায় হলদে ছোপ থাকে। পুরুষের ডানার প্রান্তে অবস্থিত টেরোস্টিগ্মার রং বাদামি, স্ত্রীদের হলুদ। উভয়ের চোখের রঙ লালচে বাদামি এবং নিচের দিক নীলাভ। পুরুষদের স্বচ্ছ ডানায় হলুদ আভা থাকে। এদের ঝুলন্ত অবস্থায় বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। বর্ষাকালে এরা সংখ্যা সর্বাধিক হয়। গ্লোব স্কিমারদের চাষের মাঠ, ফাঁকা জমির ওপর উড়তে দেখা যায়, এমনকী মিলনরত অবস্থাতেও উড়তে দেখা যায়। এরা স্থির জলে ডিম পাড়ে। অন্যান্য ফড়িংয়ের নিম্ফ দশা কয়েক মাস থেকে বছর অবধি হলেও, গ্লোব স্কিমারদের পাঁচ থেকে সাত সপ্তাহ অবধি হয়। এই ফড়িংটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘IUCN’ এর লাল তালিকা অনুযায়ী, লিস্ট কনসার্ন তালিকাভুক্ত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এদের পরিযাণের সময় এদের সঙ্গী হয়ে আসে কিছু পরিযায়ী পাখি, যারা পথে এদের শিকার করে জীবন নির্বাহ করে। এই পাখিদের মধ্যে আমুর ফ্যালকন এবং জ্যাকোবিন কাক্কুর নাম উল্লেখ্যযোগ্য।

স্ত্রী গ্লোব স্কিমার ফড়িং

এ তো গেল গ্লোব স্কিমারের পরিচিতি। কিন্তু আমাদের যা অবাক করে, তা এর দীর্ঘপথের বিরামহীন পরিযাণ। যা হার মানায় উত্তর আমেরিকার বিশ্ববিখ্যাত মোনার্ক প্রজাপতির পরিযাণকে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় জানতে পেরেছেন যে, এরা মূলত মৌসুমি বায়ুর প্রভাবেই এই পরিযাণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এমনকী ভারত মহাসাগরের দীর্ঘ সমুদ্রপথের যে বিরামহীন যাত্রা, তা-ও মৌসুমি বায়ুতে ভর করেই সফলভাবে সম্পূর্ণ করে।

সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী চার্লস অ্যান্ডারসন দীর্ঘ সময় ধরে এদের এই পরিযাণের রহস্যভেদ করার চেষ্টায় নিয়োজিত। তার মতে, এটি শুধুমাত্র নিছক পরিযাণ নয়, বরং তা এই বিশেষ ফড়িং প্রজাতির যাত্রাপথের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। বিশ্বব্যাপী এই ফড়িংয়ের ব্যাপ্তি হলেও আন্টার্টিকা এবং ইউরোপের কিছু দেশে এদের দেখা পাওয়া যায় না। তবুও এই ফড়িংটির বর্ষব্যাপী পরিযাণ-চক্র সম্পর্কে সেভাবে কিছুই জানা নেই। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিভিন্ন দেশে এক পপুলেশনের ফড়িংয়ের সঙ্গে অন্য পপুলেশনের ফড়িংয়ের মধ্যে উচ্চ হারে জিন প্রবাহ। এই জেনেটিক উপাদানের স্থানান্তরের ফলে বিভিন্ন দেশের পপুলেশনের মধ্যে গুলিয়ে ফেলা, সঠিকভাবে এদের পরিযাণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানী অ্যান্ডারসনের মতে, বিশ্বে গ্লোব স্কিমারের একটি পপুলেশন থাকতে পারে, যার কোনও নিশ্চয়তা নেই। আর যদি তেমনটা হয়, তাহলে দু’টি পপুলেশন থাকবে, যার একটি আমেরিকার এবং অন্যটি বিশ্বের বাকি অংশের।

বিভিন্ন প্রাণীর আচরণগত বাস্তুতন্ত্র-বিদ্যা বিষয়ে গবেষণারত পরিবেশবিদ জোহানা হেডল্যান্ড, মোনার্ক প্রজাপতির সঙ্গে গ্লোব স্কিমারের পরিযাণের তুলনা করে বলেছেন– গ্লোব স্কিমার মাত্র ৩০০ মিলিগ্রাম ওজনের, যেখানে মোনার্ক প্রজাপতি দ্বিগুণ ওজনের। মোনার্ক প্রজাপতি সাধারণত স্থলভাগের ওপর দিয়েই পরিযাণ চালায়, যেখানে গ্লোব স্কিমার বিখ্যাত খোলা সমুদ্রে একবারের জন্যও না-থেমে পার হওয়ার জন্য। অ্যান্ডারসন আরও বলেছেন: ‘এটা প্রমাণিত যে, হিমালয়ের ওপর দিয়েও (এখনও অবধি ৬,৩০০ মিটার উচ্চতা অবধি উড়তে দেখা গিয়েছে) গ্লোব স্কিমারকে পর্বতারোহীরা উড়ে যেতে দেখেছেন। সুতরাং, বোঝাই যায় এরা কতটা উঁচুতে উড়তে সক্ষম।’

আফ্রো-এশিয়ান অঞ্চলে গ্লোব স্কিমার ফড়িংয়ের সম্ভাব্য পরিযাণের যাত্রাপথ

আজ থেকে ৩২৫ লক্ষ বছর আগে কার্বোনিফেরাস যুগে যে ডানাওয়ালা পতঙ্গের আবির্ভাব হয়েছিল, তার বিবর্তিত রূপটি আমরা আজকের ফড়িং হিসেবে দেখতে পাই। এরা মানুষের উপকারী পতঙ্গ হিসাবেই পরিচিত। এর মূল কারণ হল, এরা লার্ভা অবস্থায় জলের মধ্যে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ এবং মশার ডিম ও লার্ভা খেয়ে ফেলে এবং পূর্ণাঙ্গ দশায় মশা, মাছি ও অন্যান্য ক্ষতিকর পতঙ্গ খেয়ে আমাদের রক্ষা করে। এদের ডিম পাড়ার জন্য জলের প্রয়োজন। কিছু ফড়িং ধীরে প্রবাহিত জলধারায়, কিছু প্রজাতি পুকুরে ডোবায় বা নদীতে আবার কেউ জোরে প্রবাহিত স্রোতে ডিম পাড়ে। গ্লোব স্কিমার ফড়িং ডিম পাড়ে স্থির ও জমা জলে, যার তাপমাত্রা একটু বেশির দিকে। তাই এই জলের উৎসের খোঁজেই এদের এই পরিযাণ। আবহাওয়া বদলের সঙ্গে সঙ্গে স্থানবিশেষে তাপমাত্রা বদল হয় এবং তাই এই ফড়িংয়ের নতুন জায়গায় যেতে হয় বাতাসের প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে। এদের নিম্ফ দশা যেহেতু অল্প সময়ের (অন্যান্যদের তুলনায়), তাই এরা পূর্ণাঙ্গ দশায় আসতেই আবার বাতাসে ভর দিয়ে পাড়ি দেয় পরবর্তী প্রজন্মকে আনতে নতুন স্থানে, যেখানে ওই সময় প্রয়োজনীয় তাপমাত্রাযুক্ত বর্ষার জলে ভরা এমন জলাশয় পাওয়া যাবে। কারণ, পূর্ববর্তী স্থানে ততদিনে বর্ষাকাল পেরিয়ে গেছে এবং শীতের তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে।

জীববিজ্ঞানী অ্যান্ডারসনের মতে, সম্ভাব্য পরিসীমা এতটাই ব্যাপ্ত থাকে যে, বাতাসের প্রবাহে ঢুকে পড়তে পারলেই তা সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। বর্ষার সময় গ্লোব স্কিমার সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে আর বর্ষা পার হলেই তারা পূর্ব আফ্রিকায় ফিরে যায় আর পরের বসন্তের শুরুতে গ্লোব স্কিমারের অন্য আরেক ঝাঁক পূর্ব আফ্রিকা থেকে ভারতে আসার প্রস্তুতি নেয়।

দীর্ঘ এই যাত্রাপথ সম্পূর্ণ করার জন্য গ্লোব স্কিমারের দেহে বিভিন্ন ধরনের অভিযোজন ঘটেছে। শুধু শারীরিক গঠনে নয়, এদের আচরণের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে এদের ওড়ার জন্য যে দু’-জোড়া ডানা আছে, তার গঠন এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যে, এর আকৃতি এবং দৃঢ়তা এদের ডানাকে বাতাসের বাধাকে কাটিয়ে সহজে ওঠানামা করতে এবং বাতাসের টানকে কাটাতে সাহায্য করেছে। দেহের ‘জ্বালানি’ খরচ কমাতে এরা অনেক দূরত্ব পার করার ক্ষেত্রে হাওয়ায় ভর করে শুধু ভেসে যায় আর তার জন্য এদের ডানার ত্রিকোণাকার গঠন (প্রান্ত সরু) বিশেষভাবে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এরা ‘Inter-Tropical Convergence Zone’ (ITCZ) এর পথ ধরে এগতে থাকে, যাতে যাত্রাপথে বাতাসের প্রবাহকে কাজে লাগানো যায়। বিজ্ঞানীরা এ-ও মনে করেন যে, সমুদ্র যাত্রার সময় জলস্তরের ওপরে বাতাসে ভেসে থাকা বিভিন্ন ছোট ছোট প্রাণীকে গ্লোব স্কিমাররা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

আমুর ফ্যালকন, যাদের পরিযাণ জড়িয়ে রয়েছে গ্লোব স্কিমারদের সঙ্গে

ফড়িং একটি উপকারী পতঙ্গ শুধু নয়, বাস্তুতন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও বটে। তাই ফড়িংকে পরিবেশ-বিজ্ঞানীরা বাস্তুতন্ত্রের নিয়ামক হিসাবে ব্যবহার করেন। গ্লোব স্কিমার ফড়িং-এর পরিযাণ নির্ভর করে মৌসুমি বায়ু প্রবাহের ওপর আর তাই যদি কোনও ভাবে এই বায়ুপ্রবাহ ব্যাহত হয়, তাহলে তার প্রভাব পড়ে এদের পরিযাণেও। বিজ্ঞানী অ্যান্ডারসনের মতে, ‘ITCZ’-এর প্রবাহের গতি বাড়লে বা কমলে বা দিক পরিবর্তন করলে তার প্রভাব পড়বে গ্লোব স্কিমারের পরিযাণে। এর ফল হিসেবে এদের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটবে। যেসব ক্ষতিকর পতঙ্গ খেয়ে এরা আমাদের রক্ষা করত তাদের সংখ্যা বাড়বে। এমনকী গ্লোব স্কিমারের সঙ্গে ভ্রমণরত আমুর ফ্যালকনের যাত্রাপথে খাদ্যাভাব হওয়ায় এই শিকারি পাখিটিরও পরিযাণও প্রভাবিত হবে। তাই আবহাওয়ার পরিবর্তন এই ফড়িংয়ের পরিযাণ-চক্রের জন্য একটি অশনি সংকেত।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন অমর কুমার নায়ক-এর অন্যান্য লেখা

……………………