


তিনতাল কেন প্রাথমিক তাল? কেন চার মাত্রাকেই প্রাথমিক বা ভিত্তি হিসেবে ধরা হল? কেন তিন বা পাঁচ নয়? তিন কিংবা পাঁচ মাত্রার তাল কিন্তু রয়েছে। এবং পাঁচের বিভাজন হলে ঘড়ির সময়ের সঙ্গে একইরকম ছন্দে চলতে পারত। তবে কেন এই চার মাত্রাকেই প্রাথমিক বা ‘বেস’ হিসেবে ধরা হল? কারণ আমাদের যে দেহঘড়ি, তা চলে চারের ছন্দে। অর্থাৎ হৃদস্পন্দন। ‘লাব-ডুব লাব-ডুব’ ছন্দ। রোববার.ইন-এর তৃতীয় জন্মদিনে তিনতাল নিয়ে বিশেষ লেখা।
তিনতাল তিন নয়
আসলেতে চার সে।
বিষয়টা খুবই মজার। তিনতাল ১৬ মাত্রার। পশ্চিমের মতো করে বললে, ‘ফোর-ফোর’-এর কাছাকাছি। আমাদের দেশে বা প্রাচ্য সংগীতের ক্ষেত্রে যে তালের পদ্ধতিটা অনুসরণ করা হয়, সেটা ‘সাইক্লিক’। অর্থাৎ বৃত্তীয়। অন্যান্য প্রায় সমস্ত জায়গাতেই তালের পদ্ধতি ‘লিনিয়ার’ অর্থাৎ সরলরৈখিক। আমাদের তাল ঘড়ির কাঁটার মতো গোল হয়ে ঘোরে। অর্থাৎ, ১ থেকে শুরু হয়ে তাল শেষ করে আবার ১-এ এসে ফেরা। সেই অনুযায়ী তিনতালের ১৬ মাত্রার বিভাজন হচ্ছে এরকম– ১-৪ / ৫-৮ / ৯-১২ / ১৩-১৬। অর্থাৎ চার মাত্রার চারটি ভাগ। ৯ নম্বর মাত্রায় মধ্যবিন্দু। এবং ১৬টি মাত্রা শেষ করে, ১৭-তম মাত্রা অর্থাৎ আবার ১ থেকে শুরু।

এখানে একটা বিষয় মনে রাখার। মাত্রা কিন্তু বিন্দু নয়। মাত্রা হল মান বা ‘ভ্যালু’। অর্থাৎ ১ থেকে ২ অবধি যেতে যে সময়টুকু লাগছে, সেটাই এক মাত্রা। অর্থাৎ মাত্রা নির্ভর করে লয়ের ওপর। লয় যত দ্রুত হয়, তত মাত্রার মান কমতে থাকে। এভাবেই আমাদের তাল পদ্ধতি কাজ করে।
১৬ মাত্রার তিনতাল হল সবচেয়ে প্রাথমিক তাল। দক্ষিণ ভারতের কর্নাটকি সংগীতে যার সবচেয়ে কাছাকাছি তাল হল আদিতাল। আদিতাল আর তিনতাল যদিও এক নয়। তবু একটা সাদৃশ্য রয়েছে। অর্থাৎ, একটার ওপর আরেকটাকে বসানো যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হল, তিনতাল কেন প্রাথমিক তাল? কেন চার মাত্রাকেই প্রাথমিক বা ভিত্তি হিসেবে ধরা হল? কেন তিন বা পাঁচ কিংবা সাত নয়? তিন কিংবা পাঁচ কিংবা সাত ইত্যাদি বিভিন্ন মাত্রার তাল কিন্তু রয়েছে। এবং পাঁচের বিভাজন হলে ঘড়ির সময়ের সঙ্গে একইরকম ছন্দে চলতে পারত। তবে কেন এই চার মাত্রাকেই প্রাথমিক বা ‘বেস’ হিসেবে ধরা হল? কারণ আমাদের যে দেহঘড়ি, তা চলে চারের ছন্দে। অর্থাৎ হৃদস্পন্দন। ‘লাব-ডুব লাব-ডুব’ ছন্দ। সারাক্ষণ আমাদের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। মিনিটে ৭২ বার করে। এই যে চারের ছন্দ, এই ছন্দই ঢুকে পড়েছে আমাদের সংগীতে। জীবনের ছন্দ, শরীরের ছন্দই আসলে প্রাণের ছন্দ হয়ে তাল সৃষ্টি করেছে।

তিনতালের পরে সবচেয়ে যে বিভাজনটা সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়, তা হল– ৬-৮ বা ৩-৪। আমরা সেটাকে বলি ‘দাদরা’ বা ‘কাহারবা’। দাদরা তিনের ছন্দ, কাহারবা চারের। কাহারবা-কে অবশ্য ছোট ত্রিতাল কিংবা অর্ধ-ত্রিতাল হিসেবেও কেউ কেউ বলেন। কিন্তু মূলগত ফারাক রয়েছে। সে বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু এখানে একটা কথা বলার– পরবর্তী সমস্ত তালই আসলে অনেক বেশি করে মানুষের তৈরি, বুদ্ধিমত্তার তৈরি। তুলনায় তিনতাল অনেক বেশি প্রাকৃতিক। মানুষকে ভেবে বের করতে হয়নি, আপনিই তৈরি হয়েছে।
উত্তর ভারতীয় সংগীতে ‘জাতি’ বলে একটা ব্যাপার রয়েছে। দক্ষিণে, কর্নাটকি পদ্ধতি অনুযায়ী বলা হয় ‘নড়াই’। যদিও ‘নড়াই’ আর ‘জাতি’ এক নয়। ‘নড়াই’ আসলে খুব প্রাচীন একটা ধারণা। সেই ধারণাটা অনুযায়ীই আমাদের তালের ব্যবস্থাটা গড়ে উঠেছে। শ্রুতির মাধ্যমে সারা প্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। পারসি বা আরও অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে খানিক বদলেও গিয়েছে।

যাই হোক, ‘নড়াই’-এর বিশেষত্ব হল মাত্রার মধ্যে অণুমাত্রা; পাশ্চাত্যে যাকে বলে বিট-এর মধ্যে মাইক্রোবিট। অর্থাৎ একটা মাত্রাকে অনেকগুলো ছোট ছোট সমান মাপের খণ্ডে ভেঙে ফেলা। যদি প্রতি মাত্রাকে চার ভাগে ভাঙা হয়, তবে তাকে বলে ‘চতুস্র নড়াই’ বা ‘চতুস্র জাতি’। একইভাবে পাঁচ ভাগে ভাঙলে ‘খণ্ড নড়াই’, সাত ভাগে ভাঙলে ‘মিশ্র নড়াই’ এবং নয় ভাগে ভাঙলে ‘সংকীর্ণ নড়াই’। তবে সবচেয়ে প্রাথমিক যে ‘নড়াই’ তা হল ‘চতুস্র’। এবং তিনতাল সেই জাতির অন্তর্ভুক্ত। তাই যতটা তবলার সাহিত্য তিনতালে রয়েছে, ততটা আর কোনও তালে নেই। তাই শেখানোর ক্ষেত্রেও সমস্ত ঘরানাতেই প্রথমে তিনতাল দিয়েই শেখানো শুরু হয়।
কিন্তু চারের ছন্দ হওয়া সত্ত্বেও কেন কাহারবা আর তিনতাল এক নয়? তার মূল কারণ ভাবগত। ছন্দের ভাব যাকে বলা চলে। সেটা ‘রিদমিক রিপিটেশন’-এর ওপর নির্ভর করে। ঠুংরি বা আধুনিক কিন্তু কাহারবা তালে হতে পারে। কিন্তু বড় বন্দিশের যে মূল ভাব, তা অক্ষুণ্ণ রাখতে গেলে কাহারবা তালে গাওয়া সম্ভব নয়। সেজন্যেই তিনতাল ক্ল্যাসিক্যাল তাল, কাহারবা নয়।
‘রিদমিক রিপিটেশন’ বা তালের ভাব বিষয়টা একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। ধরা যাক, রূপক। রূপকের চার রকম প্রকার রয়েছে– চাঁচর, দীপচন্দি, রূপক এবং ধামার। অথবা আড়া চৌতাল। সাত মাত্রার তাল। ধামার এবং আড়া চৌতাল সাতের দ্বিগুণ– ১৪ মাত্রা। ফলে আধুনিক গানের ক্ষেত্রে ধামার কিংবা আড়া চৌতাল ব্যবহার করাই হয় না। বরং চাঁচর বা দীপচন্দি তার ভাবগত ব্যঞ্জনার জন্যই আধুনিক বা সেমিক্ল্যাসিকাল গানের ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত।

আরেকটা বিষয় এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হল তালের চরিত্র। একই মাত্রা এবং একই বিভাজন সত্ত্বেও অনেকসময় বাণী কিংবা টেম্পো-র তারতম্যে তালের চরিত্র বদলে যায়। ধামারকে বলা হয় ‘হাতি কি চাল’, হাতির চলনের মতো, ধীর, রাজকীয়। আবার চাঁচর বা রূপক অনেক দ্রুত, চঞ্চল, হরিণের গতি যেমন। চরিত্রগত জায়গা থেকে দেখলে, মানুষের দেহ বা আমাদের দৈনন্দিনের সঙ্গে যে তালটার সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য, সামঞ্জস্য– সেটা হল তিনতাল।
তিনতালের সঙ্গে আরেকটা চমৎকার যোগ রয়েছে কাব্যশাস্ত্রের ছন্দের। বিশেষত ইংরেজি রোম্যান্টিক যুগের বেশ কিছু কবিতার। ইংরেজি কাব্যশাস্ত্রে একটা পারিভাষিক কথা আছে– ‘ট্রকেইক টেট্রামিটার’। ঝিঁঝিঁর ডাকের মতো একটানা, ছন্দোময় এবং পুনরাবৃত্তিমূলক শব্দের ছন্দকে বলে ‘ক্রিকেট টেট্রামিটার’। টেট্রামিটার মূলত একটা পঙ্ক্তির চারটে ভাগকে বোঝায়। চার মাত্রার– একটি গুরু একটি লঘু– এই ঝোঁকে পড়া গেলে তা হয় ট্রকেইক। ধরা যাক, কিটস, তিনি লিখছেন– ‘Season of mists and mellow fruitfulness,/ Close bosom-friend of the maturing sun’: এটা কিন্তু তিনতাল। অর্থাৎ, চার-চার মাত্রায় বসানো। এবং প্রথম বিট-এ ঝোঁক। সঠিকভাবে উচ্চারণ করে পড়া গেলে মনে হবে তিনতাল বাজছে– ধা-ধিন-ধিন-ধা / ধা-ধিন-ধিন-ধা/ না-তিন-তিন-না/ তেটে-ধিন-ধিন-ধা। অর্থাৎ পাশ্চাত্য কাব্যশাস্ত্রের ছন্দের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাচ্ছে প্রাচ্যের তাল। কারণ আদপে এই তাল কোনও মানুষের তৈরি করা নয়, বরং একেবারে প্রকৃতি থেকে, শরীর থেকে উঠে আসা।

এবার সেই শুরুর প্রশ্নে ফিরে আসি। এত যে চারের ছড়াছড়ি, তবু তালের নাম ‘তিনতাল’ কেন? আসলে আমাদের তাল ভাবনায় ‘হস্তক’ অর্থাৎ ‘তালি’ আর ‘খালি’ নামে দুটো ধারণা রয়েছে। যেমন রয়েছে ‘সম’ আর ‘ফাঁক’। ‘সম’ বা প্রথম তালি থেকে তাল শুরু, আর ‘ফাঁক’ হল খালি। সেই নিয়মে তিনতালের ক্ষেত্রে প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ বিভাজনের শুরুতে অর্থাৎ ১, ৫ এবং ১৩ নং মাত্রায় তালি; এবং তৃতীয় বিভাজনের শুরুতে অর্থাৎ ৯ নং মাত্রায় খালি। তিনটি তালির জন্যেই ‘তিনতাল’ বা ‘ত্রিতাল’।
তাই নামে যতই ‘তিন’ থাক, আসলে তার সমস্তটা জুড়েই চারের বিস্তার, চারের সম্ভাবনা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved