Robbar

শিল্পের কোনও এক্স রেটিং নেই

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 19, 2026 9:10 pm
  • Updated:August 19, 2026 9:15 pm  

ইরোটিক ছবি যাঁরা বানাতেন এবং যেখানে বানানো হত– সেই স্টুডিওগুলো অনেক সস্তার কাজ করত।  ‘ফুজি’ কোম্পানি তখন একটা স্টক বের করেছিল। সিনেমার লোকজন তা খুব একটা ব্যবহার করতে চাইতেন না। কারণ সস্তা হলেও পুরোটায় ফিল্ম জুড়ে একটা ব্লু টিন্ট ছিল। উপায়ান্তর না দেখে, ফুজি কোম্পানি এই ইরোটিক ছবির স্টুডিওগুলোর কাছে স্টকগুলো আরও সস্তায় বিক্রি করে দিতে শুরু করল। তার ফলেই অধিকাংশ ইরোটিক ছবিতে একটা নীলচে আভা আসতে লাগল। সেই থেকেই ‘ব্লু ফিল্ম’। রোববার.ইন-এর তৃতীয় জন্মদিনে ‘থ্রি এক্স’ নিয়ে লেখা।

কিউ

‘ট্রিপল-এক্স’ বা ‘থ্রি-এক্স’। সোজা কথায় ‘পর্ন’– ব্লু ফিল্ম। কিন্তু কেন আমরা পর্নকে এভাবে কোয়ালিফাই করি?

‘ব্লু ফিল্ম’ ব্যাপারটা একটা অন্য গল্প থেকে এসেছে। উনিশ শতকের প্রথম ভাগে ইরোটিক ছবি যাঁরা বানাতেন এবং যেখানে বানানো হত– সেই স্টুডিওগুলো অনেক সস্তার কাজ করত। এবং ‘পানু’ ছবি বানানোর ক্ষেত্রে পুরো প্রোডাকশনটাই খুব ‘চিপ’ রাখা হত। ‘ফুজি’ কোম্পানি তখন একটা স্টক বের করেছিল। সিনেমার লোকজন তা খুব একটা ব্যবহার করতে চাইতেন না। কারণ সস্তা হলেও পুরোটায় ফিল্ম জুড়ে একটা ব্লু টিন্ট ছিল। উপায়ান্তর না দেখে, ফুজি কোম্পানি এই ইরোটিক ছবির স্টুডিওগুলোর কাছে স্টকগুলো আরও সস্তায় বিক্রি করে দিতে শুরু করল। তার ফলেই অধিকাংশ ইরোটিক ছবিতে একটা নীলচে আভা আসতে লাগল। সেই থেকেই ‘ব্লু ফিল্ম’। জাপানি পরিচালক ওশিমা আমার খুবই প্রিয়। তিনি এই বিষয়টা নিয়ে চমৎকার কাজ করেছেন।

জাপানি চিত্র-পরিচালক নাগিসা ওশিমা

এক্স-রেটিংটা আসলে একটা আমেরিকান পদ্ধতি। এখনও আছে। কেউ খুব একটা মানে-টানে না যদিও। শুরুতে যে রেটিং পদ্ধতি ছিল, আজ আর বিষয়টা একরকম নেইও। সিনেমাটোগ্রাফি অ্যাক্ট বদলেছে।

ছয়-সাতের দশকে আমেরিকায় একটা অভ্যন্তরীণ বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল। দেশটা দুটো ভাগ হয়ে গেল। দু’-ধরনের মানুষ। একদল একেবারেই নীতিপরায়ণ নয়, আরেকদল অতি নীতিনিষ্ঠ। এই বিপ্লবের পর একটা ঘোরতর পরিবর্তন ঘটল। ছয়ের দশকের শেষ থেকে আমেরিকায় অনেক কিছুই আইনসম্মত হয়ে গেল– পর্নের দোকান, পর্ন কেনা-বেচা, প্রোডিউস করা, বানানো ও দেখানো। কেবলমাত্র পর্ন দেখানো হয়, এরকম থিয়েটারও খুলে গেল সেদেশে। সরকার আসলে ভেবেচিন্তে ঠিক করল যে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিষয়টা করা যাবে না। নগ্নতা, ঘনিষ্ঠতা এবং কতটা যৌনাঙ্গ দেখানো হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করে ‘মোশন পিকচার্স’ থেকে একটা রেটিং দেওয়া শুরু হল। 

কিন্তু বারবারই এই নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়েছে। কারণ সিনেমার মতো একটা আর্ট ফর্মে এই ধরনের রেগুলেশন সম্ভব নয়। সিনেমায় যৌনতা নিয়ে সব দেশেই দুটো ভাগ তৈরি হয়ে গিয়েছে সমস্ত সময়েই। একদল বলেছেন, যৌনতা সিনেমার খুব অন্তরঙ্গ একটা বিষয়। কারণ মানুষে মানুষে সম্পর্ক দেখাতে গেলে শরীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাজপোশাক পরালে তো সব কিছুই দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু নগ্নভাবে দেখানো– যাকে বলে, পোশাকের মিথ্যেটাকে সরিয়ে দেখানো, সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। আরেকদল যথারীতি রক্ষণশীল। সিনেমায় যৌনতা বা নগ্নতা দেখানোর বিরোধী।

আসলে এরও একটা অর্থনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। যখন থেকে সিনেমার শুরু, তখন থেকেই নগ্নতা নিয়ে কাজ হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সামাজিক মূল্যবোধ যত দৃঢ় হতে শুরু করল, এবং যত সিনেমা মাধ্যমটা বিক্রি হতে শুরু করল, টাকা করতে শুরু করল– তত ‘মেইনস্ট্রিম’ হতে থাকল; এবং যেই মেইনস্ট্রিমে এসে পড়ল, তখন সিনেমা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকল। সেনসরশিপ এল। এর বিরুদ্ধে শুরু থেকেই একদল মানুষ লড়ে এসেছেন। এবং বারবার সেনসরশিপের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাঁরা সত্যিটা দেখিয়েছেন। ছবিতে। উন্মুক্ত করে।

পিয়ের পাওলো পাসোলিনি

সিনেমার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ছয়ের দশকের শুরু থেকে এই বিরুদ্ধতার ইতিহাস শুরু। এর মধ্যে অন্যতম পাসোলিনি। ইতালিতে বসে চার্চকে এতটাই ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছিলেন, ধর্মের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যৌনতাকে অস্ত্র করে তুলেছিলেন। শেষ অবধি পাসোলিনিকে খুন করা হয়। যদিও তার অন্য একটা কারণও ছিল। সেই সময়ের নিরিখে ওঁর সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। কিন্তু পাসোলিনিই সিনেমায় প্রথম চূড়ান্ত ইরোটিকা নিয়ে এলেন! দর্শকদের মূল্যবোধ বা অনীহাকে অগ্রাহ্য করেই নিয়ে এলেন। অর্থাৎ ‘আমি দেখব না’ বা ‘দেখা উচিত নয়’ গোছের সুলভ নেকুপুষুপনার মুখে পাসোলিনি গ্রেনেডের মতো করে যৌনতাকে ছুড়ে মারলেন।

পাসোলিনি-পরবর্তী পরিচালকরা অনেকেই কিন্তু সেই ধারাটাকেই অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন। তার মধ্যে আমিও পড়ি। হিউম্যান বডি এবং মরালিটি বা সত্যি বনাম মেকির এই যে লড়াইটা– এটা তখন থেকেই চলছে। এই সত্যিটা কিন্তু ‘মিষ্টি সুন্দর’ নয়, তার মধ্যে একটা ডার্কনেস লুকিয়ে রয়েছে। সেটা সেক্সুয়াল ডার্কনেস হতে পারে। পেট্রিয়ার্কাল ডার্কনেস হতে পারে। ভায়োলেন্ট সেক্সুয়ালিটিও হতে পারে। কিন্তু যা-ই হোক, সেই সত্যিটা কেন ছবিতে দেখানো যাবে না? 

পাসোলিনির পরে ওশিমা। এবং আমার খুব প্রিয় টাকাসি মিকে। দু’জনেই জাপানি। মিকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত একটা যোগসূত্র রয়েছে। আমার শিল্পীসত্তার জন্ম প্রায় ওঁর ছবি দেখার পরেই। ওঁর ‘ভিজিটর কিউ’ সিনেমা থেকেই আমার নাম ‘কিউ’। এবং আমার মনে হয় ‘ভিজিটর কিউ’ অন্যতম র‍্যাডিকাল, ভায়োলেন্টলি সেক্সুয়াল, সংস্কারমুক্ত একটা ছবি। মজার বিষয় হল, একটা গ্রিক উপকথার গল্পকে কেন্দ্র করে পাসোলিনি একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন। ‘ভিজিটর কিউ’-ও সেই গল্পটার আধারেই নির্মিত। অর্থাৎ, পাসোলিনি আর মিকে-কে একটা সরাসরি রেখা টেনে ধরে ফেলা যায়। 

‘ভিজিটর কিউ’ ছবির পোস্টার

ইরোটিকা বা পর্ন– যা-ই বলি না কেন, মেইনস্ট্রিমের সঙ্গে তার ভেদাভেদ মুছে দিয়েছেন যাঁরা– তাঁদের মধ্যে অন্যতম স্টিভেন সডারবার্গ। ‘গার্লফ্রেন্ড এক্সপিরিয়েন্স’ নামে একটা ছবি করেছিলেন সডারবার্গ। এই ছবির যে প্রধান অভিনেত্রী, সাসা গ্রে, তিনি এই শতাব্দীর শুরুর দিকের একজন নামকরা পর্নস্টার ছিলেন। আর সডারবার্গ এই ছবিটা করছেন ঠিক সেই সময়ে দাঁড়িয়ে– ২০০৯-এ।

‘গার্লফ্রেন্ড এক্সপিরিয়েন্স’ অভিনেত্রী সাসা গ্রে

আরেকজনের নাম এই প্রসঙ্গে করা উচিত। টিন্টো ব্রাস। অনেকরকম সিনেমা করেছেন। তবে যেটার কথা আমি বলতে চাই, যেটা নিয়ে অনেক মিথ ইত্যাদি রয়েছে সেটা হল ওঁর ‘ক্যালিগুলা’। ছবিটা নিয়ে প্রচুর ঝামেলা হয়েছিল। শেষ অবধি ছবিটা উনি ছেড়ে দেন। এবং ছবির প্রযোজক ছবিটা বের করেন। অদ্ভুতভাবে এই ছবিটা একটা কস্টিউম অস্কারও জিতেছিল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এই ছবিটা পৃথিবী জুড়ে ‘পানু’ ছবি হিসেবেই পরিচিত। ডার্ক মরালিটি, ডার্ক সেক্সুয়ালিটি ছড়িয়ে রয়েছে ছবি জুড়ে। এবং এমনভাবে যৌনতাকে দেখানো হচ্ছে যে, সেটা যৌনতা নয়, আসলে দেশের পায়ুমৈথুন করা হচ্ছে। প্রকাশ্য সভায় সেটা চলছে। করছে কারা? শাসক। এবং একটা শ্রেণির মানুষ। যৌনতা এখানে আসলে একটা সত্যের রূপক। একটা বিচ্ছিরি তেতো সত্যের জান্তব যৌন রূপক।  

টিন্টো ব্রাসের ‘ক্যালিগুলা’ ছবির একটি দৃশ্য

কিংবা ধরা যাক– ফাতি আকিন। তুরস্কের পরিচালক। ‘হেড অন’। ওঁর ছবি। খুবই পাওয়ারফুল একটা ছবি। ২০০৪ সালে বেরিয়েছিল। সিবেল কেকিলি। একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্নস্টার। তিনি এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, পর্নস্টার বলে কিন্তু সিবেল এই ছবিতে কাস্ট হননি, হয়েছিলেন এই চরিত্রের জন্য তাঁকে পরিচালকের মানানসই মনে হয়েছিল, তাই। সিবেলের প্রথম ছবি। এবং তিনি চমৎকার অভিনয় করেছিলেন। তুরস্কের লোকজন খানিকটা বাঙালিদের মতোই– ওপর-ওপর খুব আধুনিক, ইউরোপিয়ান একটা হাবভাব রয়েছে, কিন্তু ভিতর ভিতর প্রবল রক্ষণশীল। ফলে এই ছবিটা নিয়ে খুবই সমালোচনা হয়েছিল।

‘হেড অন’ ছবির পোস্টারে সিবেল কেকিলি

সিবেল যেভাবে এই ছবিতে চরিত্রাভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন, বলিউড কি সানি লিওনকে সেভাবে চরিত্র দিতে পেরেছে? সানি যখন প্রথম এলেন এ দেশে, মেইনস্ট্রিমে কাজ করবেন বলে– বলিউড যেটা করতে পারে ঠিক সেটাই করল। সানিকে ‘আইটেম গার্ল’ হিসেবে নাচিয়ে দিল। কিন্তু সানিকে কি অন্যভাবে ব্যবহার করা যেত না? বছর চারেক আগে অবশ্য অনুরাগ কাশ্যপ সানিকে ‘কেনেডি’ ছবিতে কাস্ট করেছে। ছবিটা আমার যদিও দেখা হয়নি। ফলে জানি না কীভাবে অনুরাগ সানিকে ব্যবহার করেছেন। সানি এবং রাখি সাওয়ান্ত– দু’জনকে নিয়েই চমৎকার কাজ করা যেতে পারত। কিন্তু কেউ তো করেননি। করার মুরদও হয়নি। 

অথচ সাত-আটের দশকে ভারতে কিন্তু এ জাতীয় কাজ হয়েছে। জগমোহন মুন্দ্রা করেছেন। জগ মুন্দ্রা একসময় বেশ কিছু সফট-পর্ন জাতীয় ছবি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেছিলেন। এমনকী, দেবানন্দও শেষের দিকে এরকম কিছু ছবি বানিয়েছিলেন। সেই সময়ে এই ধরনের ছবির একটা বিশ্বব্যাপী ক্রেতা এবং ডিস্ট্রিবিউশন সার্কল ছিল। ফলে ভারতে একটা ছোট ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছিল। তামিল বা মাল্লু সফট-পর্ন এই সময়ে সারা পৃথিবীর চাহিদা পূরণ করে গিয়েছে। এবং এই ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় উৎপাদন হল সিল্ক স্মিতা।

Vogue ম্যাগাজিনের পোস্টারে সিল্ক স্মিতা

আসলে মেইনস্ট্রিম যত ব্যবসার দিকে ঝুঁকে গিয়েছে, ততই তাকে রেটিং বানাতে হয়েছে। সত্যিটাকে সুদৃশ্য ঝরোখায় আড়াল করে রূপকথা নির্মাণ করতে হয়েছে। কিন্তু ছবির জায়গা থেকে, শিল্পের জায়গা থেকে– আমাদের কোনও এক্স রেটিং নেই। ছিল না। শিল্প আসলে X-istence।