Robbar

তিন ডাইনির কাছে মানবিকতার পাঠ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 18, 2026 8:51 pm
  • Updated:August 18, 2026 9:13 pm  

দীর্ঘ সময় ধরে ডাইনিদের বিভিন্ন সাহিত্যে এবং লোককথায় এভাবেই দেখানো হয়েছে যে, তারা পাপী, দুরাত্মা, ভীতি উদ্রেককারী অলৌকিক নারী। ম্যাকবেথের তিন ডাইনির ক্ষেত্রেও পাঠকদের সেরকমটাই মনে করা স্বাভাবিক। কিন্তু এই নাটকটিতে তিন ডাইনির সংলাপের ধরন, তাদের পরিকল্পনা, কার্যকলাপ বারবারই প্রমাণ করে যে, তারা প্রকৃতপক্ষে পাঠকের দৃষ্টি ফেরাতে চেয়েছে সেইসব চিন্তার দিকে যা মানুষকে করে তুলবে সংবেদনশীল, স্বার্থহীন এবং আত্মসমালোচনায় সক্ষম। 

রবীনা মিত্র

First Witch: “Thrice the brinded cat hath mew’d”
Second Witch: “Thrice and once the hedge-pig whined.”
Third Witch: “Harpier cries ’Tis time, ’tis time.”

[Macbeth, Act 4, Scene 1]

সময় হল। সময় হল। সময় হল। 

কালি-কাগজ-কলম। এই পুজোয় উপকরণ লাগে সামান্যই। জোগাড়যন্ত্র শেষ। এবার শুরু হোক ডাকিনীসাধনা।

এই লেখার বরাত যে আমি পেলাম, তার মধ্যেও নিশ্চয়ই কোনও যন্তর-মন্তর আছে। নিশ্চয়ই তিনবার কালো বেড়াল মিউমিউ করেছে কোথাও, হয়তো অমাবস্যার রাতে দাঁড়কাক ডেকে উঠেছে তিনবার, তিনবার শোনা গিয়েছে কালো কুকুরের করুণ কান্না! আর তখনই নড়েচড়ে বসেছেন গ্রিক পুরাণের তিন ‘মোইরাই’! ‘থ্রি ফেটস’!– তিন নারীশক্তি, যারা মানবভাগ্যের অমোঘ নিয়ন্ত্রক। আমার আপনার সকলের ভাগ্যই না কি তাদের হাতে। হয়তো তেনাদের মনে হয়েছে অনেকদিন নতুন করে কোথাও প্রকট হওয়ার অবকাশ হয়নি (ডাইনি বলে কী ফোমো হবে না?) তাই এইবেলা একটু নিজেদের পাবলিসিটি যদি করে নেওয়া যায়? তাই কাক-কুকুরের ডাক সহযোগে নিজেদের আগমন তারা নিশ্চিত করলেন এই লেখায়। আর একথা বলতে কুণ্ঠা নেই যে এই ডাইনিদের কার্যকলাপের প্রতি আমার মুগ্ধতা অপার। যাকে বলে আমি হলাম গিয়ে ডাইনিদের ডাইহার্ড ফ্যান। সকলেই আর যাই হোক নিজের নিজের ফ্যানেদের খবর রাখে। কখন কী দরকার পড়ে! নিয়তি মানুষদের পছন্দ করে না একেবারেই, কিন্তু কী আর করা, মানুষ নিয়েই তো যত কারবার! তদুপরি এখনকার এই দুনিয়ায় রেলেভেন্ট থাকাটাও খুব জরুরি। ১০০ বছরে একবার দেখা দিলে আর চলছে না, তাই বিবিধ ছলাকলার আশ্রয় নিয়ে, সম্পাদকের মাথার ভিতর নৃত্য করে, ‘থ্রি ফেটস’ এলেন এই লেখায়। এবার তাহলে পাবলিসিটির কাজ শুরু করা যাক। ভালো করে লিখে দিলে যদি প্রসন্ন হয়ে আমার ফেটকে একটু ফেড হওয়া থেকে তাঁরা রক্ষা করেন, এটুকুই চাওয়া। 

থ্রি উইচেস ফ্রম ম্যাকবেথ, ড্যানিয়েল গার্ডনার, ১৭৭৫

এই তিন মোইরাই বা ‘থ্রি ফেটস’-এর একজন হলেন ‘ক্লোথো’। এই দেবী জীবনের সুতো ছাড়েন, সুতোয় পাক দেন। দ্বিতীয় জন ল্যাকেসিস, তিনি সেই সুতো মাপেন। তৃতীয় মোইরাই অ্যাট্রোপস– তিনি জীবনের সুতো কাটেন। এদের বিচিত্র রূপে, বিভিন্ন বেশে, নানা সময়ে দেখা গিয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। কখনও তারা গ্রিক পুরাণের মোইরাই, কখনও দিনো-এনিয়ো-পেমফ্রেডো– তিন গ্রেই বোন, কখনও নর্স পুরাণের উরোর-ভেরোয়ান্ডি-স্কাল্ড– তিন অতিপ্রাকৃত নারীসত্তা, যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেন অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, আবার কখনও তাঁরা ইউরোপীয় লোককথার ‘উইয়ার্ড সিস্টার্স’! এশীয় তান্ত্রিক দর্শনশাস্ত্রে এই তিন শক্তিকে আবার পাওয়া যায় ভিন্নরূপে। ইচ্ছাশক্তি জ্ঞানশক্তি এবং ক্রিয়াশক্তি। আন্দ্রেজ সাপকোস্কি লিখিত ‘দ্য উইচার’-এ এই ‘থ্রি ফেটস’-এর দেখা মেলে দ্য ব্রিউয়েস, দ্য হুইসপেস এবং দ্য উইভেস রূপে। নীল গেইম্যানের, ‘দ্য স্যান্ডম্যান’ সিরিজে তারা এসেছে মেইডেন-মাদার-ক্রোন বেশে। টেরি প্র‍্যাচেট তাঁর ডিস্কওয়ার্ল্ড সিরিজের একটি বই ‘উইয়ার্ড সিস্টার্স’-এ এই ত্রয়ী নারীশক্তির দুর্দান্ত বিনির্মাণ ঘটিয়েছেন। গ্র‍্যানি ওয়েদারওয়াক্স-ন্যানি ওগ-ম্যাগরাট এই তিন জাদুকরীর মধ্যে তিনি এনেছেন মানবচরিত্রের সমস্ত স্বাভাবিকতা এবং সাধারণত্ব। ঘটিয়েছেন প্রজ্ঞা- অভিজ্ঞতা-ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কিন্তু আজ যাদের ডাকে আমার এই ডাকিনীপূজার আয়োজন, স্বীকার করতেই হয় প্রথম দর্শন পাওয়ার পর থেকে তাদের মনে মনে কিছু কম স্মরণ করিনি। আর সে-কারণেই বোধহয় এই লেখার ফোনাদেশ! 

আজ থেকে ২০ বছর আগে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির এক রাতে, কোনও ধূ-ধূ ঊষর প্রান্তরে প্রথম দেখা পাই তিন ডাইনি– ‘উইয়ার্ড সিস্টার্স’-এর। তখনও বুঝিনি এদের মতলব ঠিক কী! ভেবেছিলাম, ছড়ার ছন্দে ছন্দে এরা হয়তো আমায় একটা রোমহষর্ক গল্পই শোনাচ্ছে। তাই শুনিয়েছেও বটে। ম্যাকবেথের গল্প। এই গল্প তারা রাতদুপুরে ঝড়বৃষ্টির মধ্যে পাকড়াও করে কম লোককে শোনায়নি, কিন্তু গল্প শেষ হওয়ার পর বুঝলাম এই তিন ডাইনির প্রকট হওয়ার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র ম্যাকবেথের মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী, হৃদয়হীন, স্বার্থপর এক রাজার বিনাশ ঘটানো মোটেই ছিল না। এই তিন বোন গল্পটা বলেছে মানবচরিত্রের ত্রুটি দেখাতে শুধু নয়, বরং মানুষকে একরকম মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের পাঠ দিতে। এই তিন ডাইনি আসলে ম্যাকবেথের জীবনকে এমনভাবে চালনা করেছে, যাতে এই গল্পের শ্রোতারা বুঝতে পারেন– নিয়তি বা ভাগ্য মানুষকে সবসময়ই তার নিজস্ব পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়। কোন পথ সে বেছে নিচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে নিয়তির পরবর্তী পদক্ষেপ। গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিতাস (৫৪০-৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) মানুষের নিয়তি বিষয়ে মনে করতেন– 

‘Character is fate’ (fragment B119)

ম্যাকবেথ (১৯১৬) ছবিতে ম্যাকবেথ চরিত্রে হারবার্ট বিয়ারবম ট্রি

মানুষ নিজেদের চারিত্রিক ত্রুটিগুলি বিষয়ে অন্ধ হয়ে পড়েন জীবনের নানা পর্যায়ে। ম্যাকবেথের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় যে তিন ডাইনির তারা ম্যাকবেথের চোখের সামনে ধরতে চেয়েছিল একটি আয়না– যে আয়নায় তারা চেয়েছিল ম্যাকবেথ দেখতে পাক, চিনতে পারুক তার মনের চেপে রাখা লোভ এবং আকাঙ্ক্ষার কদর্য চেহারা। তারা চেয়েছিল ম্যাকবেথ সংশোধন করুক নিজেকে। ডাইনিরা তাকে দিয়েছিল সঠিক রাস্তা নির্বাচন করার পূর্ণ সুযোগ এবং স্বাধীনতা। কিন্তু ম্যাকবেথ তাদের হতাশ করে। সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার প্রতি মোহ তার শুভবুদ্ধির আলোকে আড়াল করে রাখে। তাই একসময় অন্ধকারই হয়ে ওঠে ম্যাকবেথের আশ্রয়। আমরা ম্যাকবেথের মুখে শুনি সেই স্বীকারোক্তি– 

‘Stars, hide your fires,
Let not light see my black and deep desires’
(Act 1, Scene 4)

কিন্তু এই তিন ডাইনি সেই অন্ধকারের বিস্তার ঘটায়নি ম্যাকবেথের মনে।

তাদের যতই পাতালবাসী, অশুভ ইঙ্গিতবাহী, কিম্ভূতকিমাকার জীব বলে মনে হোক না কেন, শেক্সপিয়রের এই কালজয়ী সাহিত্যকীর্তি পড়তে পড়তে আমার কিন্তু বারবারই তাদের আলোর দিশারি বলেই মনে হয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, এমন মনে হওয়ার কারণ কী? হ্যাঁ, সেটাই তো আমার আ্যসাইনমেন্ট! তিন ডাইনির হয়ে প্রমোশন করাই তো এই লেখার উদ্দেশ্য। যদিও এ কোনও ফাঁপা, লোক-দেখানো প্রোমোশন নয়। অচিরেই আশা করছি আমার পক্ষে বোঝানো সম্ভব হবে যে, কেন এই তিন ডাইনি সত্যি সত্যিই প্রচার দাবি করে! 

দ্য থ্রি উইয়ার্ড সিস্টার্স অফ ম্যাকবেথ, হেনরি ফুসেলি, ১৭৭৫

‘ম্যাকবেথ’ নাটকটির প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যেই আমরা দেখতে পাই একটি ফাঁকা, বিস্তীর্ণ প্রান্তরে তিন ডাইনি মিলিত হয়েছে। অবাক কাণ্ড না? নাটকের নাম ‘ম্যাকবেথ’। গল্পটিও ম্যাকবেথেরই গল্প। কিন্তু প্রথম দৃশ্যে আসছে তিন ডাইনি। দৃশ্যে মাত্র একবার উচ্চারিত হচ্ছে ম্যাকবেথের নাম! নাটকটি শুরু হচ্ছে প্রথম ডাইনির একটি সাংকেতিক সংলাপ দিয়ে– 

‘When shall we three meet again?
In thunder, lightning or in rain?’ 

গোটা নাটকটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে বা দেখলে বোঝা যাবে এই তিন ডাইনিই আসলে রয়েছে এই বজ্র, বিদ্যুৎ এবং বৃষ্টির ভূমিকায়। তার থেকেও বড় কথা এখানে খেয়াল করতে হবে, প্রথম দৃশ্যের প্রথম সংলাপেই ডাইনিরা বলছে মিলনের কথা। একত্রিত, সংঘবদ্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু ম্যাকবেথকে কি আমরা এই ঐক্যের পথ নিতে দেখি? আমরা সকলেই জানি ম্যাকবেথ নেয় ঠিক উল্টো পথটা। বিচ্ছিন্নতার, বিচ্ছেদের পথ। 

এরপর দ্বিতীয় ডাইনির সংলাপ– 

“When the hurly-burly’s done.
When the battle’s lost and won” 

লেডি ম্যাকবেথ, চার্লস রলস-এর এনগ্রেভিং, ১৮২৫-৪০

ম্যাকবেথ ও ব্যাঙ্কো, ইংল্যান্ডের দুই বীর সেনানায়ক স্কটল্যান্ডের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হয়ে ফিরছেন। কিন্তু প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হলেও ম্যাকবেথের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে এক অন্য, কঠিনতর যুদ্ধ। সেই যুদ্ধেরই আগাম আভাস দিয়ে গেল না কি ডাইনিরা? যুদ্ধ অবশ্যই একরকমের অরাজকতা (হার্লি বার্লি), কিন্তু মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধে যে মানসিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় তা থেকে প্রস্তুত হতে পারে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক নৈরাজ্যের উর্বর ক্ষেত্র। ঠিক তেমনটাই হয়েছে এই গল্পে। সুতরাং এই তিন ডাইনি আসলে ম্যাকবেথকে, না শুধুমাত্র ম্যাকবেথকে নয়, সমস্ত দর্শক-পাঠককে সাবধান করতে এসেছে। কিন্তু মানুষ তো অহংকারী, স্বার্থান্বেষী, লোভে সম্পৃক্ত, তাই এই ডাইনিদের তারা মানুষের চেয়ে জ্ঞান এবং বুদ্ধির নিরিখে নিতান্তই খাটো বলে মনে করে। যেহেতু এই ডাইনিদের চেহারায় রয়েছে চরম বৈসাদৃশ্য, মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা, হাটাচলার ভঙ্গির সঙ্গে এদের আদবকায়দার রয়েছে বিস্তর ফারাক, তাই প্রথম দর্শনে ব্যাঙ্কো তাদের পরিচয় নিয়ে ধন্দে পড়ে প্রশ্ন করেন– 

“What are these? So withered and so wild in their attire, that look not like th’ inhabitants o’th’ Earth and yet are on ‘t?” 

অর্থাৎ ব্যাঙ্কো এবং ম্যাকবেথ এই ডাইনিদের মানুষ বলে মনেই করছেন না। তাই ‘these’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে কোনও উদ্ভট, কদাকার জীব বোঝাতে। এখানে আর একটি লক্ষ করার মতন ব্যাপার হল, এই ডাইনিদের বর্ণনা করতে গিয়ে ব্যাঙ্কো বলছেন–

‘You should be women and yet your beards forbid me to interpret
That you are so.’

ম্যাকবেথ অ্যান্ড দ্য উইচেস, ব্রিটিশ এনগ্রেভিং, ১৭৭০

বোঝা যাচ্ছে এই ডাইনিদের চেহারা এমন যে তাদের লিঙ্গপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। তারা একত্রিত হয়েছে একটি ঊষর অনুর্বর প্রান্তরে, তাদের চেহারার বর্ণনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে তারা কোনও নির্দিষ্ট লিঙ্গচিহ্ন ধারণ করে না। অর্থাৎ তাদের শরীরও ওই বন্ধ্যা জমির মতই অনুর্বর, তারা প্রজননে অক্ষম। কিন্তু সেই অপারগতাকে তারা পরিণত করেছে ঐক্যবদ্ধতায়। গোটা নাটকে তিন ডাইনির মধ্যে কেউই কখনও কোনও দৃশ্যে আলাদাভাবে প্রবেশ করে না। যখনই তাদের দেখা যায়, দেখা যায় দলবদ্ধভাবে। একসঙ্গে। এই ডাইনিরা সবসময়ই কথা বলে ছন্দে। ছন্দ মানেই মিলন। শব্দের মিলন, ভাবের মিলন, ধ্বনির মিলন। এরা একে অপরকে ‘বোন’ বলে সম্বোধন করে। তাহলে দাঁড়াচ্ছে, যাদের আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে অশুভ শক্তির বাহক, যাদের ম্যাকবেথ বলছে– ‘secret, black and midnight hags’, তারাই আসলে পাঠক-দর্শকদের দিচ্ছে শুভচিন্তার পাঠ। শেখাচ্ছে যূথবদ্ধতা, মৈত্রী, আত্মার আত্মীয়তা। এই তিন ডাইনিকে ‘সিস্টার্স’ বলা হচ্ছে অর্থাৎ তারা একে অন্যের সঙ্গে বজায় রেখেছে এক নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক। ঠিক তার উল্টোদিকে ম্যাকবেথ হত্যা করছে পিতৃসম রাজা ডানকানকে, ভ্রাতৃসম বন্ধু ব্যাঙ্কোকে, দূরে সরে যাচ্ছেন লেডি ম্যাকবেথের কাছ থেকে। হ্যাঁ, এই তিন ডাইনি ম্যাকবেথকে অর্ধসত্য বলেছে, তাকে এক বিয়োগান্তক পরিণতির দিকে চালনা করেছে ঠিকই, কিন্তু তারা ম্যাকবেথকে সমস্ত প্রলোভন কাটিয়ে সঠিক পথ বেছে নেওয়ার সুযোগও যথেষ্টই দিয়েছে। ম্যাকবেথ নিজের ক্ষমতার লোভ এবং সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হয়নি! নিয়তিকে মানুষ নিজের চরিত্র এবং কাজ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। গবেষক এ.সি. ব্র‍্যাডলে এ বিষয়ে লিখেছেন– 

“’The influence of the Witches’ prophecies on Macbeth is very great, it is quite clearly shown to be an influence and nothing more … There is no sign whatever in the play that Shakespeare meant the actions of Macbeth to be forced on him by an external power … The prophecies of the Witches are presented simply as dangerous circumstances with which Macbeth has to deal … Macbeth is, in the ordinary sense, perfectly free in regard to them.”

দ্য ট্র্যাজেডি অফ ম্যাকবেথ, ময়ের স্মিথ, ১৮৮৯

আমরা এই তিন ডাইনির আবির্ভাব ঘটতে দেখি নাটকটির তিনটি অঙ্কে। প্রথম অঙ্কের প্রথম ও তৃতীয় দৃশ্যে, তৃতীয় অঙ্কের পঞ্চম দৃশ্যে এবং চতুর্থ অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে। ম্যাকবেথ এবং ব্যাঙ্কো– দু’জনের জন্যই তারা তিনটি করে ভবিষ্যদ্বাণী করে। ম্যাকবেথ যখন দ্বিতীয়বার ওই ডাইনিদের খুঁজতে যায়, তখনও তারা ম্যাকবেথকে তিনটি অলৌকিক দৃশ্য দেখায় যা তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। চতুর্থ অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে আমরা তিন ডাইনির নেত্রী গ্রিক পুরাণের দেবী হেকাটিকে আবির্ভূত হতে দেখি। হেকাটি হলেন জাদুবিদ্যা, প্রেত-অস্তিত্ব এবং দ্ব্যর্থতার দেবী। এই দেবীকে অনেক সময় ‘ট্রিপল গডেস’ বা ‘থ্রি ফর্মড গডেস’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। মেইডেন-মাদার-ক্রোন এই তিন রূপের সমন্বয়ে বিভিন্ন জায়গায় চিত্রায়িত করা হয়েছে হেকাটিকে। দেখা যাচ্ছে, এই ডাইনিদের চলাফেরা, কথা বলার মধ্যে বারবারই তিন সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নাটকটিতে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগবে যে, ডাইনিদের কার্যকলাপ এবং সংলাপের ক্ষেত্রে বারবার এই তিনের আধিক্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে শেক্সপিয়রের বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য ছিল কি না! আমার বিশ্বাস অবশ্যই তা ছিল। তিন সংখ্যাটি, যে কোনও বাইনারিকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। যে কোনও দ্বিমাত্রিকতার রুদ্ধ ছক ভেঙে এই সংখ্যা জন্ম দিতে পারে এক নতুন সম্ভাবনার। তাই আমরা ডাইনিদের সংলাপের মধ্যেও জোড়কে ভেঙে বিজোড় সংখ্যার দিকে যাত্রার একরকম প্রবণতা বুঝতে পারি। যেমন– 

‘Fair is foul and foul is fair’

এখানে ‘ফেয়ার’ এবং ‘ফাউল’ একটিই শব্দ এবং তার অন্তর্নিহিত অর্থ অন্যটিকে বাতিল করে দিচ্ছে। বাইনারি চূর্ণ হচ্ছে। আবার ধরা যাক– 

‘Double, double, toil and trouble’ 

ম্যাকবেথের অলংকরণ, শিল্পী: জন গিলবার্ট

বাক্যটি আপাতভাবে পড়লে মনে হয় অশান্তি দ্বিগুণ করার কথা বলা হচ্ছে; কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে, দুই দিয়ে যা-ই গুণ করা হবে তা-ই সৃষ্টি করবে আরও গুরুতর অশান্তি; এবং এই বাক্য আসলে কোনও নির্দেশ নয়, বরং একটি সাবধানবাণী? অর্থাৎ ম্যাকবেথ যত নিজের আগ্রাসন, অত্যাচার, অসংবেদনশীল আচরণকে দ্বিগুণ করতে থাকবে ততই তার ধ্বংসের পথ আরও সুপ্রশস্ত হয়ে উঠবে। এবং হয়ও তাই। আসলে তিন ডাইনি একেবারে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গিয়েছে যাতে ম্যাকবেথ নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং কল্যাণ ও শান্তির পথ বেছে নেয়। 

‘ডাইনি’ শব্দটির সঙ্গে আসলে একরকম অশুভ, অনিষ্টকারী এবং অকল্যাণকর শক্তির দীর্ঘ সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। একটি মধ্যযুগীয় সাহিত্য ‘ক্যানন এপিস্কপি’তে ডাইনিদের বিষয়ে বলা হয়– 

‘Certain wicked women, perverted by the Devil, seduced by illusions and phantoms of demons, believe and profess that in the hours of the night they ride upon certain beasts.’

দীর্ঘ সময় ধরে ডাইনিদের বিভিন্ন সাহিত্যে এবং লোককথায় এভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে যে তারা পাপী, দুরাত্মা, ভীতি উদ্রেককারী অলৌকিক নারী। ম্যাকবেথের তিন ডাইনির ক্ষেত্রেও পাঠকদের সেরকমটাই মনে করা স্বাভাবিক। কিন্তু এই নাটকটিতে তিন ডাইনির সংলাপের ধরন, তাদের পরিকল্পনা, কার্যকলাপ বারবারই প্রমাণ করে যে, তারা প্রকৃতপক্ষে পাঠকের দৃষ্টি ফেরাতে চেয়েছে সেইসব চিন্তার দিকে যা মানুষকে করে তুলবে সংবেদনশীল, স্বার্থহীন এবং আত্মসমালোচনায় সক্ষম। 

ম্যাকবেথের অলংকরণ, শিল্পী: এইচ সি সেইলস

যথেষ্ট হল ডাইনি-স্তুতি। যদিও উইয়ার্ড সিস্টার্সকে প্রোমোট করতে গিয়ে কোথাও কোনও অত্যুক্তি অথবা অসত্যকথন করেছি বলে মনে করছি না। আর একটা কথা এইমাত্র মনে হল। ‘উইয়ার্ড সিস্টার্স’ কথাটাই কিন্তু শুরু হচ্ছে ‘উই’ উচ্চারণ দিয়ে। উই অর্থাৎ আমরা! মানে যোগাযোগ, সমন্বয়, মিলন! 

আশা করছি আমার অ্যাসাইনমেন্ট উতরে গেছে। এবার থ্রি ফেটসের তরফ থেকে একটি থ্রিফোল্ড আশীর্বাদ জুটলেই কেল্লা ফতেহ!