

বজ্রসেনের ক্ষমা করতে না পারা আসলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং রক্তের দাগমাখা আনন্দের বিরুদ্ধে এক আদর্শবাদী মানুষের নৈতিক আপসহীনতা। শ্যামাকে দূর করেও মন থেকে মুছে ফেলতে না পারার যে চিরন্তন হাহাকার নিয়ে নাটকটি শেষ হয়, তা আসলে মানুষের শুদ্ধ বিবেক ও তীব্র ভালোবাসার চিরকালীন দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বা রাষ্ট্রশক্তি যেখানে মানুষকে কেবলই স্বার্থ ও ক্ষমতার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে, সেখানে ‘শ্যামা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং নৈতিকতার লড়াইটা যুগ যুগ ধরে একই রয়ে গেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনসায়াহ্নে রচিত ‘শ্যামা’ (১৯৩৯) কেবল একটি গীতিময় নৃত্যনাট্য বা প্রেমের উপাখ্যান নয়; এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব, সমাজকাঠামো এবং ক্ষমতার রাজনীতির এক জটিল ও নির্মম দলিল। বৌদ্ধ আখ্যান ‘অবদানশতক’-এর ‘পরিশোধ’ কবিতা অবলম্বনে রচিত হলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে কবি যখন এটি লিখছেন, তখন তাঁর কলমে উঠে এসেছে বিশ্ব-রাজনীতির ঔপনিবেশিক হিংস্রতা, রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্ধ বিচার এবং মানুষের নৈতিক অবক্ষয়ের রূপ। ১৯৩৯ সালের সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে কবি যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের কথা বলেছিলেন, একুশ শতকের আধুনিক ও জটিলতার যুগে দাঁড়িয়েও তার প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমেনি, বরং আরও অমোঘ হয়ে উঠেছে।

‘শ্যামা’ নাটকের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দিক হল রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্ধ ও একনায়কতান্ত্রিক চরিত্র। রাজমহিষীর মহামূল্যবান ‘ইন্দ্রমণির হার’ চুরি যাওয়ার পর, কোটাল বা প্রধান আরক্ষী প্রকৃত অপরাধীকে খোঁজার চেয়ে নিজেদের রাজদণ্ড থেকে বাঁচাতে এবং মহিষীকে সন্তুষ্ট করতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। কোনও প্রমাণ ছাড়াই বিদেশি বণিক বজ্রসেনকে তারা চোর সাব্যস্ত করে। কোটালের সংলাপে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ক্ষমতার দম্ভ ও ভীতি:
‘রক্ষা রবে না, রক্ষা রবে না–
এমন ক্ষতি রাজার সবে না, রক্ষা রবে না।’
পরবর্তীতে শ্যামার অনুরোধে নিরপরাধ তরুণ উত্তীয় যখন নিজের ঘাড়ে চুরির অপবাদ নেয়, রাষ্ট্রশক্তি সত্যতা যাচাইয়ের কোনও প্রয়োজনই বোধ করে না।
সমকালীন বৈশ্বিক রাজনীতিতেও আমরা এই ‘এনকাউন্টার কালচার’ বা ভুয়ো মামলার প্রবণতা দেখতে পাই। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা বা রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি ঢাকতে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায়শই কোনও দুর্বল বা নিরপরাধ মানুষকে ‘বলির পাঁঠা’ (Scapegoat) বানায়। ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুকে সুরক্ষিত রাখতে নিচুতলার মানুষকে উৎসর্গ করার এই ধারা আজও সমানভাবে সক্রিয়।

রবীন্দ্রনাথ এই নাটকে কেবল রাজদরবারের বিলাসিতা দেখাননি, দেখিয়েছেন ক্ষমতার চাকা কীভাবে ঘোরে এবং তার কোপ কীভাবে সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। রাজকোষে চুরি যাওয়ার পর, কোটাল বা প্রধান আরক্ষী প্রকৃত অপরাধীকে খোঁজার চেয়ে নিজেদের পদের মান বাঁচাতে এবং রাজশক্তিকে সন্তুষ্ট করতে অন্ধ হয়ে ওঠে। কোনও প্রমাণ ছাড়াই বিদেশি বণিক বজ্রসেনকে তারা চোর সাব্যস্ত করে বন্দি করে। কোটালের মুখে উচ্চারিত হয় ক্ষমতার সেই চরম চাটুকারিতা ও নিষ্ঠুর রূপ:
‘চুরি হয়ে গেছে রাজকোষে–
চোর চাই যে করেই হোক,
হোক-না সে যেই-কোনো লোক, চোর চাই।
নহিলে মোদের যাবে মান!’
এই সংলাপটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ক্ষমতার কাছে সত্যের কোনও মূল্য নেই, সেখানে ব্যবস্থার ‘মুখরক্ষা’ করাই শেষ কথা। পরবর্তীতে প্রহরীরা যখন কোনও বিচার ছাড়াই বজ্রসেনকে বধ্যভূমির দিকে নিয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের এই অন্ধ অত্যাচার দেখে ব্যথিত শ্যামার কণ্ঠে সমাজ ও ব্যবস্থার এই শ্রেণিভেদের বিরুদ্ধে এক তীব্র হাহাকার ধ্বনিত হয়:
“রাজার প্রহরী ওরা অন্যায় অপবাদে
নিরীহের প্রাণ বধিবে ব’লে কারাগারে বাঁধে।”
সাবঅল্টার্ন বা প্রান্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায়, আধুনিক সমাজেও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ঠিক এভাবেই কাজ করে। রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ঢাকতে আজও পুলিশ বা প্রশাসন প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করে কোনও সাধারণ, দুর্বল বা বিদেশি মানুষকে ফাঁদ পেতে বলির পাঁঠা বানায়। ‘হোক-না সে যেই-কোনো লোক, চোর চাই’– কোটালের এই স্বৈরাচারী মনোভাব আজকের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নগ্ন প্রতিফলন।

বজ্রসেন মূলত একজন বণিক। সুবর্ণদ্বীপ থেকে আনা তার মহামূল্যবান ‘ইন্দ্রমণির হার’ কেবল একটি অলংকার নয়, এটি আসলে মানুষের তীব্র লোভ ও বস্তুবাদের প্রতীক। এই হারটিকে কেন্দ্র করেই নাটকের সমস্ত ট্র্যাজেডি আবর্তিত হয়। বন্ধু যখন বজ্রসেনকে সাবধান করেছিল, তখন বজ্রসেনের উত্তর ছিল:
‘না না না বন্ধু, আমি অনেক করেছি বেচাকেনা,
অনেক হয়েছে লেনাদেনা–
না না না, এ তো হাটে বিকোবার নয় হার–’
আজকের চরম পুঁজিবাদী ও কর্পোরেট যুগে মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, শরীর, এমনকী নৈতিকতা– সবকিছুই ‘লেনাদেনা’ বা হাটে বিক্রি হওয়ার পণ্যে পরিণত হয়েছে। বস্তুগত লোভের কারণে মানুষ আজ নিজের আত্মাকে বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত, যার আধুনিক রূপ আমরা প্রতিনিয়ত কর্পোরেট লবিং এবং ক্ষমতার লোভের মধ্যে দেখতে পাই।
আজকের একুশ শতকের মনস্তত্ত্ব এবং ফ্রয়েডীয় চিন্তাভাবনার আলোকে যদি আমরা নাটকের প্রধান দু’টি পুরুষ চরিত্র– উত্তীয় ও বজ্রসেনকে বিশ্লেষণ করি, তবে তাদের মধ্যে আধুনিক মানুষের চরম মানসিক দ্বন্দ্ব, অবদমন এবং অস্তিত্বের সংকট দেখতে পাওয়া যায়।

প্রচলিত ধারায় উত্তীয়কে একজন ‘নিঃস্বার্থ প্রেমিক’ বা ‘মহৎ বীর’ হিসেবে দেখা হলেও, আধুনিক মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় তার এই আচরণকে ‘অবসেসিভ লাভ ডিসঅর্ডার’ এবং এক ধরনের মানসিক আত্মপীড়ন বা ‘ম্যাসোকিজম’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। অর্থাৎ অন্ধ আবেগ, অবদমন এবং টক্সিক আত্মত্যাগ। উত্তীয় জানত শ্যামা তাকে ভালোবাসে না। আধুনিক যুগে একে বলা হয় ‘Unrequited Love’। উত্তীয়ের কাছে নিজের জীবনের কোনও স্বাধীন মূল্য ছিল না, তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব বা ‘Identity’ গড়ে উঠেছিল শ্যামার আকর্ষণের ওপর ভিত্তি করে। নিজের জীবন শেষ করে অন্যের অপরাধ নিজের ঘাড়ে নেওয়াকে আধুনিক মনস্তত্ত্ব সবসময় সুস্থ লক্ষণ বলে না। এ এক আত্মবিধ্বংসী মানসিকতা। উত্তীয়ের এই আত্মত্যাগ আসলে এক ধরনের অবদমিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সে জানত, বেঁচে থেকে সে শ্যামাকে পাবে না; কিন্তু নিজের মৃত্যুর মাধ্যমে সে শ্যামার মনে চিরকালের জন্য এক গভীর অপরাধবোধ এবং ঋণ রেখে যেতে পারবে। তাই সে বলছে–
‘চাও কি প্রেমের চরম মূল্য– দেব আনি,
দেব আনি ওগো সুন্দরী।
প্রিয় যে তোমার, বাঁচাবে যারে,
নেবে মোর প্রাণঋণ–
তাহারি সঙ্গে তোমারি বক্ষে
বাঁধা রব চিরদিন
মরণডোরে।’
মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে সে যখন গায়– ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান’, তখন বোঝা যায় সে বাস্তব জীবনের ব্যর্থতা থেকে বাঁচতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে, যা আধুনিক বিষণ্ণতার চরম রূপ।
এবারে বলি বজ্রসেনের কথা। বজ্রসেন চরিত্রটি আধুনিক যুগের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক সংকটের এক অনন্য ও বাস্তবসম্মত প্রতিচ্ছবি। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার সময় বজ্রসেনের মনে কোনও অপরাধবোধ ছিল না। সে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাস করেছিল যে, তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেই সসম্মানে মুক্তি দিয়েছে। একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ট্র্যাজেডি ঘনিয়ে আসে তখন, যখন শ্যামা নিজেই তার কাছে সত্যটা স্বীকার করে। বজ্রসেন জানতে পারে, তাকে বাঁচানোর জন্য শ্যামা সুকৌশলে অন্য এক নিরপরাধ যুবকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এই সত্য জানার পর বজ্রসেন বিব্রত বোধ করে, বিচলিত হয়ে পড়ে। তার মধ্যে প্রেম ও বিবেকের এক অমীমাংসিত যুদ্ধ চলতে থাকে।

বজ্রসেনের সামনে তখন দু’টি পথ ছিল– হয় শ্যামার অন্ধ প্রেমকে মেনে নিয়ে এই রক্তের দাগমাখা জীবনকে আপন করে নেওয়া, নয়তো নিজের বিবেককে জাগ্রত রেখে শ্যামাকে ত্যাগ করা। একজন আদর্শবাদী মানুষ হিসেবে বজ্রসেন দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেয়। সে শ্যামাকে ত্যাগ করে। কিন্তু এই ত্যাগের পিছনে কোনও নিষ্ঠুরতা ছিল না, ছিল এক চরম মানসিক যন্ত্রণা। সে শ্যামাকে ভালোবাসে, অথচ তার অপরাধকে মেনে নিতে পারে না। নাটকের শেষে তার এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ছটফটানি প্রকাশ পায় এই অমোঘ আকুলতায়:
‘ক্ষমিতে পারিলাম না যে
ক্ষমো হে মম দীনতা,
পাপীজনশরণ প্রভু।
মরিছে তাপে মরিছে লাজে
প্রেমের বলহীনতা–
ক্ষমো হে মম দীনতা…’
বর্তমান সমাজেও মানুষ প্রায়শই বজ্রসেনের মতো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা ভালোবাসার সঙ্গে নৈতিক আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধের সংঘাত বাধে। আজকের যুগেও একজন সৎ মানুষের পক্ষে অন্যায় বা অপরাধের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের সুখের প্রাসাদ গড়া সম্ভব নয়। বজ্রসেনের এই ‘ক্ষমা করতে না পারা’ আসলে তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অনমনীয় আপসহীনতা। অন্যদিকে, শ্যামাকে দূর করেও মন থেকে মুছে ফেলতে না পারার যে যন্ত্রণা, তা আধুনিক মানুষের অবচেতন মনের গভীর ভালোবাসা ও আদর্শের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।
রবীন্দ্রনাথ ‘শ্যামা’ নাটকে দেখিয়েছেন কীভাবে সত্যের গভীরে না গিয়ে কেবল উপরিউক্ত তথ্য এবং প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র ও সমাজ একজন মানুষকে অপরাধী বানিয়ে দেয়। কোটাল যখন বজ্রসেনকে চোর সাব্যস্ত করে, তখন সমাজের সাধারণ মানুষ বা নগরবাসী তার সত্যতা যাচাই করার কোনও সুযোগ বা ইচ্ছে প্রকাশ করে না। রাষ্ট্র যাকে চোর বলে ঘোষণা করে, সমাজও হুজুগে মেতে তাকেই অপরাধী বলে মেনে নেয়।

পরবর্তীতে উত্তীয় যখন কেবল শ্যামার মুখের একটি অনুরোধে সাড়া দিয়ে বলে:
‘প্রহরী, ওগো প্রহরী,
লহো লহো মোরে বাঁধি।
বিদেশী নহে সে তব শাসনপাত্র,
আমি একা অপরাধী।’
তখন কোটাল বা রাষ্ট্রযন্ত্র কোনও রকম জেরা বা গভীর তদন্ত ছাড়াই চটজলদি তাকেই চোর হিসেবে ঘোষণা করে বধ্যভূমিতে নিয়ে যায়।
এই ঘটনাটি বর্তমান যুগের ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ এবং সোশাল মিডিয়ার ‘ক্যানসেল কালচার’-এর এক নিখুঁত সামাজিক পূর্বাভাস। আজ কোনও আদালত রায় দেওয়ার আগেই সমাজ এবং সংবাদমাধ্যমগুলো কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই স্রেফ হুজুগে মেতে বা কারও একতরফা বয়ান শুনেই একজনকে অপরাধী বানিয়ে দেয়। গভীর সত্যের সন্ধান না করে উপরিউক্ত চটকদার সত্য বা ‘ন্যারেটিভ’-এর পেছনে অন্ধের মতো ছুটে চলার এই সামাজিক ব্যাধি রবীন্দ্রনাটকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ধরা পড়েছিল, যেখানে উত্তীয়ের একটিমাত্র মিথ্যা স্বীকারোক্তিই তার মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

শ্যামা একজন রাজনটী। তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন রাজনটী ছিল মূলত ভোগ ও বিনোদনের সামগ্রী, তার মনের বা স্বাধীনতার কোনও মূল্য ছিল না। বজ্রসেনের প্রতি তার ভালোবাসা আসলে এই অন্ধকার জগৎ থেকে মুক্তি পাওয়ার এক আকুল চেষ্টা। কিন্তু সেই মুক্তির জন্য তাকে বেছে নিতে হয়েছিল অনৈতিক পথ। উত্তীয়কে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে শ্যামা যখন বজ্রসেনের সঙ্গে পালাচ্ছে, তখন তার সখীদের কণ্ঠে এক অমোঘ নৈতিক সত্য উচ্চারিত হয়:
‘নীরবে থাকিস সখী, ও তুই নীরবে থাকিস–
তোর প্রেমেতে আছে যে কাঁটা
তারে আপন বুকে বিঁধিয়ে রাখিস।
দয়িতেরে দিয়েছিলি সুধা,
আজিও তাহে মেটে নি ক্ষুধা–
এখনি তাহে মিশাবি কি বিষ।’
পিতৃতান্ত্রিক সমাজে আজও নারীর খোলস বদলালেও তার ভেতরের সংকট কমেনি। নিজের স্বাধীনতা বা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আজও অনেক নারীকে কঠিন সব আপস করতে হয়। অন্যদিকে, নিজের স্বার্থ বা ভালোবাসা চরিতার্থ করার জন্য অন্যকে ধ্বংস করার যে মানসিকতা শ্যামার মধ্যে দেখা গেছে, তা আধুনিক মনস্তত্ত্বে ‘ক্রাইম অফ প্যাশন’ বা অন্ধ অপরাধপ্রবণতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
নৃত্যনাট্যের পটভূমি বৌদ্ধধর্মের স্বর্ণযুগে, যেখানে ‘অহিংসা পরম ধর্ম’। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন যে, বড় বড় ধর্মীয় অনুশাসন মুখে থাকা সত্ত্বেও স্বয়ং রাজপুরীতে, কোটালের বিচারে এবং বধ্যভূমিতে কীভাবে চরম হিংসা ও অধর্ম অনায়াসে ঘটে চলেছে। ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা রাজশক্তি যেখানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, সেখানে রবীন্দ্রনাথ ‘মানুষের ধর্ম’ বা অন্তরের আধ্যাত্মিক সত্যকে বড় করে দেখিয়েছেন।

উত্তীয় যখন শ্যামার প্রেমের টানে বধ্যভূমির দিকে এগিয়ে যায়, তখন সে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের নিয়ম মানেনি, বরং সে তার অন্তরের ভালোবাসাকেই ঈশ্বরে উন্নীত করেছিল। বধ্যভূমির জল্লাদ ও রক্ষীদের নিষ্ঠুরতার মাঝে দাঁড়িয়েও মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে উত্তীয়ের অবিচল গান:
‘মরণরে, তুঁহু মম শ্যামসমান।…’
আজকের আধুনিক বিশ্বেও ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক রূপটির চরম অবক্ষয় আমরা দেখতে পাই। বড় বড় ধর্মীয় গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রগুলো মুখে শান্তির কথা বললেও ভেতরে ভেতরে ক্ষমতার দাপট ও অস্ত্রের রাজনীতি বজায় রাখছে। ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাহ্যিক ধর্মীয় আচার বা অনুশাসন নয়, বরং মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও ভালোবাসাই হল আসল ধর্ম। প্রাতিষ্ঠানিক ধার্মিকতার চেয়ে অন্তরের মানবিকতা যে অনেক বেশি পবিত্র– উত্তীয়ের ট্রাজিক আত্মদান আজও সেই শাশ্বত সত্যের পথ দেখায়।
পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শ্যামা’ কোনও সাধারণ ত্রিকোণ প্রেমের উপাখ্যান নয়, বরং তা মানবাত্মার আলো-অন্ধকারের দ্বন্দ্ব এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্মমতার এক শাশ্বত দলিল। ১৯৩৯ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর পটভূমিতে দাঁড়িয়ে কবি যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, একুশ শতকের আধুনিক সমাজেও তার প্রাসঙ্গিকতা এক বিন্দু কমেনি। কোটালের অন্ধ প্রশাসনিক তৎপরতার মাঝে আমরা আজকের বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দেখতে পাই; অন্যদিকে উত্তীয়ের অন্ধ আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আবেগতাড়িত মানুষের অস্তিত্বের সংকটকে।

তবে নাটকের চূড়ান্ত অভিঘাত লুকিয়ে আছে বজ্রসেন ও শ্যামার ট্র্যাজেডির মধ্যে। বজ্রসেনের ক্ষমা করতে না পারা আসলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং রক্তের দাগমাখা আনন্দের বিরুদ্ধে এক আদর্শবাদী মানুষের নৈতিক আপসহীনতা। শ্যামাকে দূর করেও মন থেকে মুছে ফেলতে না পারার যে চিরন্তন হাহাকার নিয়ে নাটকটি শেষ হয়, তা আসলে মানুষের শুদ্ধ বিবেক ও তীব্র ভালোবাসার চিরকালীন দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বা রাষ্ট্রশক্তি যেখানে মানুষকে কেবলই স্বার্থ ও ক্ষমতার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে, সেখানে ‘শ্যামা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং নৈতিকতার লড়াইটা যুগ যুগ ধরে একই রয়ে গেছে।
আমাদের ভেতরের আলো ও অন্ধকারের চিরন্তন লড়াইকে চিনিয়ে দিয়ে সমাজকে কলুষমুক্ত ও মানবিক করার আহ্বান জানায়। এখানেই রবীন্দ্রনাথের দূরদর্শিতা এবং বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যের অমোঘ ও শাশ্বত প্রাসঙ্গিকতা।
[নিবন্ধে ব্যবহৃত চিত্রগুলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অঙ্কিত]
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved