


এসব যা লিখছি, তা অনেক আগের অভিজ্ঞতা, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার অনেক অনুপুঙ্খই আমার স্মৃতিপথ থেকে হারিয়ে গিয়েছে! অতএব, এখন যা লিখব, তা বস্তুসত্য ও কল্পনার মিশ্রণ, আলো ও ছায়ার সন্নিপাত। এই আধা-সত্যি, আধা-কল্পনা পড়তে যদি ইচ্ছে হয়, তাহলেই আপনি পাঠক। ইচ্ছে না হলে আপনি পাঠক নন, নিছক সংবাদ-সংগ্রাহক মাত্র।
২০.
সেই রাত্রিটি ওসমান ফারাবি সাহেবের বাড়িতেই কাটল। পরের দিন ভোরবেলা তাঁরই নির্দেশমতো বেরিয়ে পড়লাম। ওসমান ফারাবি একজোড়া গামবুট আর কার্বলিক অ্যাসিডের বোতল দিয়েছেন। গামবুট পরেছি পায়ে আর কার্বলিক অ্যাসিডের বোতলটা বেঁধে নিয়েছি সাইকেলের ক্যারিয়ারের সঙ্গে। ফারাবি আবার চিঁড়ে, মুড়ি, গুড় প্রভৃতি শুকনো খাবার দিয়ে একটা বড়সড়ো কাপড়ের বোঁচকাও বেঁধে দিয়েছেন। বোঁচকাটি আপাতত ঝুলিয়েছি সাইকেলের হ্যান্ডেল থেকে। আশা করছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই বোঁচকাটির আয়তন ও ওজন কমে আসবে, যাতে ‘বোঁচকা’ ধীরে ধীরে ‘বুঁচকি’ ও অন্তিমে ‘ন্যাকড়া’-য় পরিণত হয়।

দীর্ঘ পথ। সে-পথের শুরুর দিকটায় পূর্বদৃষ্ট গ্রামটির মতোই ছোট ছোট অনেক গ্রাম চোখে পড়ছিল। একটি দীর্ঘ ও জটিল বাক্যের মধ্যে ছোট ছোট কমা, সেমিকোলন, ড্যাশ ও অপরাপর বিরাম-চিহ্নের মতো এই সুদীর্ঘ রাস্তার পাশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গ্রামগুলি অবস্থিত। ওসমান ফারাবি-র সঙ্গে দেখা হয়েছিল যে-গ্রামটিতে, তাকে নিভু নিভু চোখের পাতার সঙ্গে তুলনা করেছিলাম আমি। সেদিক দিয়ে দেখলে পরবর্তী গ্রামগুলোর কোনও কোনওটা কানের লতির মতো মৃদুল, কোনওটা বা আবার অধরকলিকার মতো আর্দ্র। চিবুকের মতো তীক্ষ্ণ ও সংক্ষিপ্তও ছিল কয়েকটি গ্রাম; এই শুরু হল তো এই শেষ হয়ে গেল– তবে মুখমণ্ডলের নানা প্রত্যঙ্গের সঙ্গে পথপ্রান্তের সেই সব গ্রামগুলির বেশি বেশি তুলনা করাটা হয়তো কথাকারের পক্ষে খানিকটা ফাঁকিবাজিই হয়ে দাঁড়াবে।
আসলে এসব যা লিখছি, তা অনেক আগের অভিজ্ঞতা, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার অনেক অনুপুঙ্খই আমার স্মৃতিপথ থেকে হারিয়ে গিয়েছে! অতএব, এখন যা লিখব, তা বস্তুসত্য ও কল্পনার মিশ্রণ, আলো ও ছায়ার সন্নিপাত। এই আধা-সত্যি, আধা-কল্পনা পড়তে যদি ইচ্ছে হয়, তাহলেই আপনি পাঠক। ইচ্ছে না হলে আপনি পাঠক নন, নিছক সংবাদ-সংগ্রাহক মাত্র। আর হ্যাঁ, আমিও যদি সাহিত্যের নামে নিখুঁত তথ্য পরিবেশনের জন্যই আদাজল খেয়ে লেগে পড়ি, তাহলে আমিও কিন্তু লেখক নই, তাহলে আমি তখন তৃতীয় শ্রেণির একজন সাংবাদিক মাত্র, খবরকাগজে পেটভাতার বিনিময়ে চাকরি করি। তা এই সব তত্ত্বকথা আপনারা বিলক্ষণ জানেন, এসব আপাতত নিয়ারেস্ট ডাস্টবিনে চলে যাক, চলুন, সেই আলোছায়ামাখা পথ ধরে ‘জাগরতন্দ্রার সীমালগ্ন দেশ’-এর দিকে বেরিয়ে পড়ি।
ছবি। ছোট ছোট ছবি। স্যমন্তক যেমন আঁকেন এই ধারাবাহিক রচনাটির সঙ্গে; অনেকটা ওরকমই। গ্রামের ধারে মজা একটা পুকুর। পুকুরের জলে লাল সর পড়েছে। তার বাঁধানো ঘাটের থেকে বারো-চোদ্দ হাত পর্যন্ত জলতল বড় বড় তিনটে বাঁশ দিয়ে ঘেরা। অর্থাৎ একটা আয়তাকার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে জলতলে; তিনটে বাঁশ আয়তক্ষেত্রের তিন বাহু আর পুকুরের ঘাট বা পাড়টি হচ্ছে আয়তক্ষেত্রটির চতুর্থ বাহু বা ভূমি। জলের ওপর বাঁশ দিয়ে এমন আয়তক্ষেত্র নির্মাণের কারণ হচ্ছে, পুকুরের লাল সর ওই আয়তক্ষেত্রটার মধ্যে ঢুকতে পারবে না, আর আয়তক্ষেত্রের মধ্যেকার জল স্বচ্ছ থাকবে, স্নানোপযোগী থাকবে। পুকুরের ধারে ধারে বৈঁচির ঝোপ, আকন্দের মায়াবিতান, ঝোপের মাথায় মাথায় পুটুস ফুলের পুটপুটপুট, কোমর-কাঁকাল-ভাঙা বুড়ি ঠাকুমার মতো খেজুরগাছের কাস্তেকাটা মাজা, সিম আর বরবটির খেত পেরিয়ে ‘সন্ধে হোল গো সন্ধে হল গো’-বাগান; নন্দলাল বসুর আঁকা ক্ষীণস্রোতা নদীটির পাশে সদ্যোযৌবনা মধুষোড়শী আম গাছেদের ‘ও সখী শোন শোন, একটি গোপন কথা’ বলে এ ওর গায়ে ঢলে পড়া, এসব দূর থেকে লক্ষ করে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসি লুকিয়ে রেখে জীবনানন্দসুলভ কে যেন হিজলের অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, মধ্যে মধ্যে উন্নাসিক তাল-সুধীন্দ্র, হাটখোলার ধারে সন্ধ্যার অন্ধকারে ঝুপসি হয়ে বসে বড় গভীর সব ঝুরি নামিয়ে দিয়ে তন্দ্রাতুর স্বরে গল্প বলে চলা বটবিভূতি, নদীপারে ওই দূর পশ্চিমাকাশের কাছে অস্তরবির বিলীয়মান আভা, তারপর রাত্রি হলে নিশীথ আকাশ পরিপূর্ণ করে কলঙ্ককে অলঙ্কার জ্ঞানে গর্বিত উদিত শরৎচন্দ্র, অন্ধকার নদীর সেই চলোচ্ছলোচ্ছলো-শব্দায়মান ধারা গ্রাম-বসতির পাশ দিয়ে তীক্ষ্ণ ছুরিকার মতো বাঁক নিয়ে মিলিয়ে গেল যেখানে, সেখানে ওই কালো জলের অতলেই কি লুকিয়ে আছে কোনও অভিমানী কালোমানিক?…
এসব জিজ্ঞাসা, বিস্ময়, স্তব্ধতা, রহস্য, কৌতুক ও মায়ার ঐশ্বর্যের ভিতর দিয়ে আমি ও আমার লজ্ঝড়ন্ত সাইকেল হেলেদুলে বোঁচকাকে ক্রমশ বুঁচকিতে রূপান্তরিত করতে করতে দিনতিনেকে অনেকটা পথ এগিয়ে চলেছিলাম।
তিনদিন পরে ধীরে ধীরে এই সব ঘরবাড়ি, মানুষের বসবাসের চিহ্ন মিলিয়ে এল, সামনে এসে পড়ল বিস্তৃত এক মহাশ্মশান। এই এতক্ষণে আমি যেন পূর্বজ কথাকারদের সৃষ্টিবিতান পেরিয়ে আমার স্বকীয় ক্ষেত্রে প্রবেশ করলাম। এতক্ষণ অবধি পরকীয়াই চলছিল যেন। দেখুন না কেমন এত বছর পরেও সেই ভস্মবিমণ্ডিত শ্মশানভূমির প্রতিটি অনুপুঙ্খই আমার মনে আছে!
একসময় এখানেও, এই নদীপ্রান্তিক ভূমিতেও, মানুষ বসবাস করত বলেই মনে হল আমার। কিন্তু কী জানি, কোন অজ্ঞাত কারণে উজাড় হয়ে গিয়েছিল সেই গ্রাম, সেই জনবসতি। হয়তো মহামারীতে অথবা বৈদেশিক দস্যুর আক্রমণে উৎসন্ন হয়ে গিয়েছে সে-জনপদ। কত আগে, কে জানে! হয়তো অনেক শতাব্দী চলে গিয়েছে তারপর, চারিদিকে আমলকি, বট, অশ্বত্থ, শিমূল, পাকুড়, বিল্ব, অর্জুন প্রভৃতি গাছ ঘন হয়ে জন্মেছে পাশাপাশি, কোনও কোনও জায়গায় দিনের বেলাতেও অন্ধকার জমে আছে, ঝিঁঝি ডাকছে তন্দ্রাহীন। অথচ এমন নিবিড় বনানীর মধ্যেও বারবার চোখে পড়তে লাগল জঙ্গলাবৃত ইঁটের গাঁথনি, অতীত যুগের কারুকার্য করা ভাঙা খিলান, পরাভূত দাম্ভিকতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জীর্ণ দেউড়ি আলোকলতার মরণ-আলিঙ্গন সহ্য করে, অর্ধবিভগ্ন মন্দিরের ভিতর জমে আছে ঘোর অন্ধকার; তার একটির ভিতরে ঢুকতে চেয়েও থমকে গেলাম ‘হিস্ হিস্’ শব্দে। শুকিয়ে যাওয়া বড় পুকুর একটি চোখে পড়ল, শ্যাওলাধরা ঘাটের ফাটলে দুপুরের রোদ আর শুকনো পাতার রাশি গড়াচ্ছে ইতস্তত। এখানে এই ঘাটে একটু বসবেন?

বসা যাক। খিদেয় নাড়িভুঁড়ি যেন চাগাড় দিয়ে উঠেছে, মাথার ওপর রোদ অতি তীক্ষ্ণ প্রদাহময়, আমার চোখদুটো বুভুক্ষু পিশাচের মতো দপদপ করে জ্বলছে তখন, পায়ের গামবুট পাথরের মতো ভারী লাগছে। সাইকেলটাকে গাছের গায়ে ঠেসিয়ে রাখলাম, তার আগে হ্যান্ডেল থেকে নামিয়ে এনেছি খাবারের পুঁটুলি। মরে যাওয়া বউ-ঝির ঘোমটা দেওয়া প্রেতিনীর মতো দাঁড়িয়ে আছে কলাগাছ কতগুলো পুকুরের পাড়ে। কলাপাতা কেটে এনে তার ওপর চিঁড়ে, গুড় ঢেলে মাখলাম খানিকটা জল দিয়ে। সেই পিণ্ড গ্রাস করতে অল্পই সময় লাগল। খেতে খেতে ভাবছিলাম, কারা এই পুকুরে চান করত একদিন? হয়তো নবপত্রিকা স্নান করাতে আসত তারা এই পুকুরঘাটে, বিয়ের সময় বরবধূ এই ঘাট দিয়ে নেমে পুকুরের জল ছুঁয়ে যেত, এই ঘাটে বসে মেয়েদের কত আড্ডা, কত অজ্ঞাত যুগের কথোপকথন…
‘ও ঠাকুরঝি, অনঙ্গকে দেখে নায়িকার আমাদের মুক দে তো কতাই সরে না…’
‘তা হবেনে গো? কচি বয়েসের কাঁচা পিরিত, তাকে কি ভোলা যায়?… তা পোড়া কপাল নে জম্মেছে বটে শতখোয়ারি… বে হল তো হল, দোজবরে… বে-র বছর ঘুত্তে না ঘুত্তে সিঁদুর মুচে বাপের ঘরে ফিরে এলো…’
‘সে যাই বলিস, ঠাকুরঝি, সে কম বয়েসে যা ছেলো তো ছেলো… এখন ও মাগী ধুমসি হয়েচে… কতায় বলে কড়ে রাঁড়ি… এমন একেনে ওকেনে নুকিয়ে নুকিয়ে দ্যাকাসোনা… গাঁয়েঘরে কত কতাই যে হচ্চে, ছি ছি ছি!… আর লোককেই বা দোষ দি কী প্রকারে… তোমার রসের ঠিকানা অন্যে জানবেই বা ক্যানো, বলো!’
‘তাইলে জানলেই দোষ? না জানলে ক্ষেতি নেই বোলচ? ক্যানে গো বউদিদি, দাদাকে নুকিয়ে নুকিয়ে তুমিও কি তবে…’
‘চুপ কর, চুপ কর, মুকপুড়ি! যা নয় তাই বলতে নেগেচিস, মুকের আগলবাগল নাই যে! আমার সঙ্গে ও শতখোয়ারির কীসের তুলনা রে? আমারও বুড়ো দোজবরেই বে হোয়েচে… তোর দাদা, তাই বোলে রাগ করিসনি… বুড়ো তো বুড়োই… অ্যাদ্দিন সংসার কচ্চি… কই বলুক তো কেউ মুক নেড়ে আমার মদ্দে কোনওদিন কোনও অশৈরণ দেকেচে? নুড়ো জ্বেলে দোবো না মুকে অমন!’
‘তা সত্যি! কপাল কত্তে হয় গো বউদিদি তোমার মতো… সে আর সবার হয় কোতায়? কী আর বলি! আমাদের ও নায়িকার যা বরাত… বলে, দিন-দুপুরে ভাতার মোলো, কাঁদব কত রাত… তা নয় অনঙ্গর সঙ্গেই সাধ-আহ্লাদ যা পারে, মিটিয়ে নিক…’
‘দুদ্দুর, তোদের আজকাল আর কোনও হায়াপিত্তি বোলে কিচু নাই। ভাতার মরেচে বোলে নাঙের সঙ্গে আশ মিটাবে?… কী যে বোলিস… ওসব কতা বাদ দে দিকিন অ্যাকোন… পিচোন ফিরে ঘুরে বোস… পিঠটার যা দশা করিচিস তুই, ঠাকুরঝি… ময়লা কালো যেন ঝামা… পোরোল-জালি দিয়ে উবটন ঘষে দি ভালো করে…’

এসব কাদের কথা? ঘাটে তো আমি ছাড়া কেউ বসে নেই, তাহলে এসব শুনতে পাচ্ছি কেমন করে? একথা ঠিক যে, একশো বছরেরও আগে হয়তো এই ঘাটে কোনও এক পড়ন্ত দ্বিপ্রহরে এই কথাগুলিই উচ্চারিত হয়েছিল স্নানরতা দুই গ্রাম্য রমণীর মুখে, কিন্তু সেসব কথারা এখন কোথায়? হারিয়ে গিয়েছে! কিন্তু একেবারেই হারিয়ে গিয়েছে কি তারা? সে-সব শব্দের স্পন্দন এখনও কি সূক্ষ্মভাবে রয়ে যায়নি এই পরিত্যক্ত ঘাটলায়? কোনও এক অনির্বচনীয় মুহূর্তে আমার মতন পথভ্রান্ত কোনো পথিকের কানে ফুটে উঠতে পারে না কি মিলিয়ে যাওয়া সেই সব শব্দকম্পন? আয়নার ওধারে তো শুধু অদেখা দৃশ্যের জগতই নেই, শ্রুতিপারের শব্দজগতও তো লুকিয়ে থাকে সেখানেই।
সমস্তই গ্রাস করেন রুদ্র, সময়ের দেবতা। যথা সময়ে পুনরায় তিনিই সমস্ত উদ্গীরণ করেন। কালের দেবতা সেই রুদ্ররূপী মহাকাল, সেই পরমপ্রিয় তরুণেন্দুশেখরকে প্রীতিনমস্কার!
প্রথমে লিখেছিলাম ‘শ্মশান’, অথচ এতক্ষণ ধরে শুধু অযত্নবর্ধিত বনভূমির কথাই বলে চলেছি। এ নিয়ে আপনার অস্বস্তি হওয়াটা কি খুব অস্বাভাবিক? আসলে ঘুমন্ত স্ত্রী-র একখানি বিবশ হাত যেমন আলগোছে স্বামীর বুকের ওপরে এসে পড়ে কখনও কখনও, ঠিক তেমনই এই একদা-জনবহুল, অধুনা-জনশূন্য বনভূভাগেরও একটি প্রান্ত পূর্ববর্ণিত গ্রামগুলিকে নিঃসাড়ে স্পর্শ করে আছে। দুই ভূমির সেই মধ্যবর্তী পরিসরে মানুষের অন্তিম যাত্রার চিহ্নাদি– পোড়া কাঠ, ভাঙা কলসি, নদীর বাতাস লেগে থরথর করে কাঁপা মৃতের শিয়রে রাখা গীতার পৃষ্ঠা, বায়ুবাহিত সাদা ছাই ও অতীতের সেই সব ছিন্নভিন্ন দৃশ্য ও শ্রাব্যের রেণুকণা এখনও আমার স্মৃতির আকাশকে শিববিভোর করে রেখেছে।
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন আয়নার ওধারে-র অন্যান্য পর্ব
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved