John Locke, Liberalism and the Age of Knowledge | Robbar
Robbar
  • ১১ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ২৯ আগস্ট ২০২৬

মুক্তচিন্তার প্রবাদপুরুষ

একটি শিশু যখন জন্মায়, তখন তার মনটা থাকে একটি সাদা কাগজের মতো। ল্যাটিন ভাষায় তিনি একেই বলেছিলেন ‘ট্যাবুলা রাসা’ বা শূন্য স্লেট। এই সাদা কাগজে অভিজ্ঞতার কালিতেই ধীরে ধীরে লেখা হয় আমাদের সমস্ত জ্ঞানের অক্ষর। জন লক স্বপ্ন দেখতেন এমন এক সমাজের, যেখানে ধর্মের নামে মানুষ একে অপরের গলা কাটবে না, যেখানে শিশুরা ভয়ের বদলে আনন্দের সঙ্গে শিখবে, এবং যেখানে মানুষ ভাষার অস্পষ্টতা দূর করে একে অপরের সঙ্গে স্বচ্ছভাবে যোগাযোগ করতে পারবে।

শেষ আপডেট: আগস্ট ২৯, ২০২৬, ১৯:০৯   
Facebook WhatsApp Messenger

সেটা ছিল একটা অদ্ভুত সময়। সতেরো শতকের অশান্ত ইংল্যান্ডের মেঘলা আকাশে তখন উড়ে বেড়াচ্ছে পোড়া বারুদের গন্ধ। একদিকে মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে শেক্সপিয়রের কবিতা, অন্যদিকে বেজে উঠেছে গৃহযুদ্ধের দামামা। এমন এক জটিল সময়ের ক্যানভাসেই আঁকা হয়েছিল এক দার্শনিকের চিন্তার ছবি। ব্যক্তিগত জীবনে সেই দার্শনিক ছিলেন একজন চিকিৎসক, একজন ঝানু রাজনীতিবিদ আবার একজন পলাতক বিদ্রোহীও। দর্শনের জগৎ অবশ্য তাঁকে চেনে উদারতাবাদ বা ‘লিবারিজম’-এর জনক হিসেবে। সেই দার্শনিকের নাম জন লক। বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠা বাতাস আর গৃহযুদ্ধের দামামার মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি খুঁজেছিলেন একটি নতুন, যৌক্তিক ও মানবিক সমাজগঠনের পথ।

zoom
কিংবদন্তি জন লক

আসলে, ইংল্যান্ডের মানুষের কাছে রাজা তখনও ঈশ্বরের প্রতিভূ। ইংল্যান্ডবাসী বিশ্বাস করতেন তাদের রাজার শরীরের মধ্য দিয়ে বয়ে চলে ঈশ্বরের রক্ত। প্রজাদের জন্মই হয়েছে সেই রাজার আদেশ পালন ও প্রশ্নবিহীন আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য। এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে জন লক বলেছিলেন, কেউ জন্মগতভাবে প্রভু নয়, আবার কেউ দাসও নয়।’ ১৬৮৯ সালে ইংল্যান্ডে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ টু ট্রিটিজেস অফ গভর্নমেন্ট। ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংকটের সময় প্রকাশিত এই বইটিতেই তিনি বলেছিলেন, প্রকৃতির রাজ্যে সব মানুষ জন্মগতভাবে সমান ও স্বাধীন। ঈশ্বর কাউকে অন্যের ওপর শাসন করার বা কাউকে দাস বানিয়ে রাখার জন্মগত অধিকার দিয়ে পাঠাননি। একটি শিশু যখন জন্মায়, তখন তার মনটা থাকে একটা সাদা কাগজের মতো, যাকে তিনি বললেন ট্যাবুলা রাসা(Tabula Rasa) বা শূন্য স্লেট। সেখানে আগে থেকে কিছুই লেখা থাকে না। না ঈশ্বর, না জ্যামিতি, না পাপ, না পুণ্য।

zoom
দার্শনিক রেনে দেকার্ত

প্রখ্যাত দার্শনিক রেনে দেকার্ত বা প্লেটোর জন্মগত ধারণা নিয়ে মানুষের পৃথিবীতে আসার প্রচলিত তত্ত্বকে নস্যাৎ করে দিয়ে তিনিই প্রথম বললেন, কোনও ধারণাই জন্মগত নয়, ধারণা আসলে তৈরি হয় জন্মের পরে, অভিজ্ঞতা থেকে। আমাদের চিন্তার জগৎকে তোলপাড় করে দিয়ে লক সেদিন বলেছিলেন, প্রশ্ন করা যেমন কোনও পাপ নয়, তেমনই অনুগত হয়ে থাকাও কোনও পুণ্যের কাজ নয়। শাসকের ইচ্ছাতেই শাসিত সবসময় চলবে এমনটা হতে পারে না, কখনও কখনও শাসিতের ইচ্ছাতেও শাসককেও চলতে হবে। তাঁর কথাগুলো ছিল মাটি থেকে উঠে আসা মানুষের জন্য, সাধারণ জীবনের সহজ অথচ গভীর প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্য। তাঁর দর্শন কোনও বিচ্ছিন্ন অ্যাকাডেমিক অনুশীলন বা বিলাসিতা ছিল না, এটি ছিল তাঁর সময়ের রাজনৈতিক রক্তপাত, সামাজিক অস্থিরতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রত্যক্ষ একটি প্রতিক্রিয়া। যদিও বইটিতে লেখক হিসেবে জন লক নিজের নামটি কোথাও লেখেননি। কিন্ত এই বইটির মাধ্যমেই সমাজকে তিনি উপহার দিয়েছিলেন বেঁচে থাকার এক নতুন দর্শন, যে দর্শন আবেগের চেয়ে যুক্তিকে বড় করে দেখে, এবং অন্ধকারের চেয়ে শিক্ষার আলোকে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে করে।

zoom
জন লকের হস্তাক্ষর

লক যখন এই বইটি লিখেছিলেন, তখন ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলার অর্থ ছিল সরাসরি দেশদ্রোহিতা এবং নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড। এই কারণেই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বইটিতে নিজের নাম প্রকাশ করতে পারেননি তিনি। প্রাণের ঝুঁকি ছিল এবং এই ঝুঁকির কারণেই দীর্ঘ সময় নিজের দেশ ছেড়ে নেদারল্যান্ডসে নির্বাসিতও থাকতে হয়েছিল তাঁকে। জন লক আসলে আমাদের পরিচিত এই পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখতে শিখিয়েছিলেন। জ্ঞান যে আকাশ থেকে পড়া কোনও দৈববাণী নয়, তাকে অভিজ্ঞতা ও যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে নিতে হয়, সেই কথাটা আমরা তাঁর কাছ থেকেই প্রথম শিখেছিলাম। তিনি আমাদের শুধু চিন্তাতেই স্বাধীন করেননি, তিনি আমাদের দায়িত্ববানও করে তুলেছিলেন। বাস্তবে, জন লকের জীবন কোনও ধুলোপড়া লাইব্রেরিতে বসে কাটানো পণ্ডিতের জীবন ছিল না। তাঁর দর্শন ছিল যতটা গভীর, তাঁর জীবনের গল্পও ছিল ঠিক ততটাই রোমাঞ্চকর।

বারুদের গন্ধে যাঁর শৈশব কেটেছে, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ভয়ে যাঁকে নাম ভাঁড়িয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে, এবং শেষ জীবনে যিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি সাম্রাজ্যের অর্থনীতির অন্যতম নীতি-নির্ধারক, সেই মানুষটির জীবন কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম ছিল না।

zoom
অ্যানিসেট চার্লস গ্যাব্রিয়েল লেমনিয়ারের আঁকা তৎকালীন বিদগ্ধ ইউরোপীয় সমাজ

জন লকের জন্ম হয়েছিল ১৬৩২ সালের ২৯ আগস্ট। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত সমারসেট জেলার রিংটননামের এক ছোট্ট গ্রামে। লকের বাবা, জন লক সিনিয়র, ছিলেন একজন গ্রাম্য আইনজীবী এবং কঠোর পিউরিটানমতাদর্শে বিশ্বাসী। তবে তিনি কিন্তু রাজার ঐশ্বরিক ক্ষমতায় অবিশ্বাসী ছিলেন এবং পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের পক্ষে। ১৬৪২ সালে যখন গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, লকের বয়স তখন মাত্র ১০। তাঁর বাবা পার্লামেন্টারি বাহিনীর একজন অশ্বারোহী ক্যাপ্টেন হিসেবে সেই যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। একদিকে রাজার প্রতি আনুগত্যের সনাতন শিক্ষা, অন্যদিকে নিজের বাবার বিদ্রোহী সত্তা। এই পারিবারিক আবহ লকের মনে শিশুকাল থেকেই রাজতন্ত্রবিরোধী এবং উদারনৈতিক চিন্তার বীজ বুনে দিয়েছিল। ১৬৪৯ সালে যখন রাজা প্রথম চার্লসের শিরশ্ছেদ করা হয়, তখন লকের বয়স ১৭। তিনি ওয়েস্টমিনিস্টার স্কুলে বসে সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটির কম্পন অনুভব করেছিলেন, যে কম্পনই তাঁকে শিখিয়েছিল যে, কোনও ক্ষমতাই প্রশ্নাতীত বা চিরস্থায়ী নয়।

zoom
তৎকালীন জার্মান রেখাচিত্রে রাজা প্রথম চার্লসের শিরশ্ছেদের দৃশ্য

লক দেখেছিলেন, ঈশ্বর রাজাকে বাঁচাতে পারেনি, অর্থাৎ ক্ষমতা জিনিসটা যে ঐশ্বরিক নয়, জাগতিক, সেটা তখনই লক অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। লকের শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েস্টমিনিস্টার স্কুলে, যেখানে তিনি অত্যন্ত কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে বড় হয়েছিলেন। সেখান থেকে ১৬৫২ সালে তিনি ভর্তি হলেন অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে। অক্সফোর্ড তখন বিদ্যার তীর্থস্থান, কিন্তু তরুণ লকের কাছে সেই তীর্থস্থান হয়ে উঠেছিল এক বন্দিশালার মতো। সেখানে তখনও মধ্যযুগীয় স্কলাস্টিসিজম(Scholasticism) এবং অ্যারিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যা ও বিতর্কের চর্চা হত। লকের কাছে এই শব্দাড়ম্বরপূর্ণ বিদ্যা মনে হতো অন্তঃসারশূন্য। তিনি ক্লাসের বাঁধাধরা পড়ার চেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন তৎকালীন ইউরোপে জন্ম নেওয়া ‘নতুন দর্শন’ বা নিউ ফিলোসফি-র প্রতি। বিশেষ করে ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্ত (René Descartes)-এর লেখা সেই সময় তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

zoom
আধুনিক রসায়নের জনক বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল

দেকার্ত তাঁকে শিখিয়েছিলেন যে, অন্ধ বিশ্বাসের চেয়ে স্বচ্ছ চিন্তার মূল্য অনেক বেশি। কিন্তু লক দেকার্তের বুদ্ধিবাদের পুরোপুরি ভক্ত হননি। অক্সফোর্ডে গিয়েই তিনি পরিচিত হয়েছিলেন আধুনিক রসায়নের জনক হিসেবে পরিচিত বিখ্যাত বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল-এর সঙ্গে। ১৬৫২ সালে যখন জন লক অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে পড়াশোনা করতে যান, তখনই তাঁর সঙ্গে বিখ্যাত বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েলের পরিচয় এবং গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েলের সঙ্গে এই পরিচয় জন লকের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে। বয়েলের পরীক্ষাগারে কাজ করতে গিয়েই লক হাতে-কলমে শিখেছিলেন পরীক্ষামূলক দর্শন। তিনি বুঝেছিলেন, সত্যকে জানতে হলে বইয়ের পাতার চেয়ে প্রকৃতির পর্যবেক্ষণ বা অভিজ্ঞতাই বেশি নির্ভরযোগ্য। অনেকেই মনে করেন অক্সফোর্ডে বয়েলের সঙ্গে লকের এই সাক্ষাৎ না হলে হয়তো আমরা লকের বিখ্যাত অভিজ্ঞতাবাদী দর্শন(Empirical Philosophy)-এর দেখা পেতাম না। এই সময়ে লক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিও ঝুঁকে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি প্রথাগত দার্শনিক বা ধর্মযাজক না হয়ে একজন চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৬৭৫ সালে তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি (MB) লাভ করেন।

zoom
লর্ড অ্যান্থনি অ্যাশলি কুপার

১৬৬৬ সাল। লকের জীবনে ঘটে গেল এক অভাবনীয় ঘটনা, যা তাঁকে অক্সফোর্ডের শান্ত জীবন থেকে টেনে নিয়ে গেল লন্ডনের উত্তাল রাজনীতির কেন্দ্রে। লর্ড অ্যান্থনি অ্যাশলি কুপার, যিনি পরে আর্ল অফ শ্যাফটসবারি’ (Earl of Shaftesbury) হয়েছিলেন, সেই সময়ে লিভারের এক জটিল অসুখে ভুগছিলেন। তিনি চিকিৎসার জন্য অক্সফোর্ডে এসেছিলেন। সেখানেই লকের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। লকের বুদ্ধিমত্তা, চিকিৎসাবিদ্যায় দক্ষতা এবং নম্র ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে শ্যাফটসবারি তাঁকে নিজের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে লন্ডনে নিয়ে আসেন। লন্ডনে ফিরে ‘এক্সেটার হাউস’-এ শুরু হয় লকের জীবনের এক নতুন অধ্যায়। লক সেখানে শ্যাফটসবারির চিকিৎসাই করেছিলেন তা নয়, তিনি একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনের মাধ্যমে তাঁর লিভার থেকে একটি সিস্ট অপসারণ করে তাঁর জীবনও বাঁচিয়েছিলেন। শ্যাফটসবারি বিশ্বাস করতেন, লকই তাঁর জীবনরক্ষা করেছেন। এর পরেই দু’জনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। শ্যাফটসবারি ছিলেন হুইগ পার্টি(Whig Party)-র প্রতিষ্ঠাতা এবং ইংল্যান্ডের অন্যতম প্রভাবশালী ও উগ্র রাজতন্ত্রবিরোধী রাজনীতিবিদ। লক ক্রমেই শ্যাফটসবারির রাজনৈতিক সচিব এবং পরামর্শদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। শ্যাফটসবারির বাড়ির বৈঠকখানায় বসেই লকের মনে প্রথম অ্যান এসে কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং(An Essay Concerning Human Understanding) লেখার ধারণা জন্মায়। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, মহাবিশ্বের জটিল সমস্যা সমাধানের আগে আমাদের বোঝা উচিত আমাদের নিজেদের মনের ক্ষমতা কতটুকু।

zoom
‘অ্যান এসে কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ এর আদি সংস্করণ

অন্যদিকে, শ্যাফটসবারির রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলোকে দার্শনিক ভিত্তি দেওয়ার জন্যই লক তাঁর বিখ্যাত টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্টরচনার কাজও শুরু করেন। অর্থাৎ, লকের দর্শন কোনও বিমূর্ত চিন্তা ছিল না, তা ছিল শ্যাফটসবারির রাজনৈতিক আন্দোলনের এক বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার। এই সময়েই লক ক্যারোলিনা উপনিবেশের সংবিধান রচনাতেও সহায়তা করেছিলেন। এটি লকের জীবনীতে একটি বিতর্কিত অধ্যায় যুক্ত করেছিল, কারণ এই সংবিধানে দাসপ্রথাকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। যিনি মানুষের স্বাধীনতার আজীবন প্রবক্তা, তিনি কীভাবে দাসপ্রথার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন– তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে আজও বিতর্ক রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিকের ধারণা, ক্যারোলিনার সংবিধানটি এককভাবে লকের লেখা ছিল না। তিনি মূলত তাঁর পৃষ্ঠপোষক লর্ড শ্যাফটসবারির সচিব বা কর্মচারী হিসেবে এটির খসড়া তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন।

zoom
জন লকের রচনাসমগ্র

কোনও কোনও গবেষক অবশ্য মনে করেন, ১৬৬৯ সালে ক্যারোলিনার সংবিধান লেখার সময় লকের রাজনৈতিক চিন্তাধারার পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি। লন্ডনের রাজনৈতিক চাপ এবং নিজের স্বাস্থ্যের কারণে ১৬৭৫ থেকে ১৬৭৯ সাল পর্যন্ত লক ফ্রান্সে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। এই সময়টাই ছিল তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক পাথেয় সংগ্রহের সময়। তিনি সেখানে ফরাসি চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং দর্শনের সংস্পর্শে আসেন। তিনি পিয়ের গাসেন্দি (Pierre Gassendi)-র দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেনন, যিনি দেকার্তের অন্যতম সমালোচক ছিলেন এবং বস্তুবাদ ও এপিকিউরিয়ানিজম-এর দিকে ঝুঁকেছিলেন। দেকার্ত যেখানে বিশ্বাস করতেন, মানুষ কিছু জন্মগত ধারণা নিয়ে জন্মায়, গাসেন্দি সেখানে বলেন, মানুষের সমস্ত জ্ঞান তাঁর ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা (Sensory Experience) থেকেই আসে। গাসেন্দি বিজ্ঞানের সঙ্গে দর্শনের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তিনি এপিকিউরাসের পরমাণুবাদ বা কণা তত্ত্বকে খ্রিস্টীয় দর্শনের উপযোগী করে পুনরুজ্জীবিত করেন। এর প্রভাবেই লক বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, বস্তুগত জগৎ মূলত অতি ক্ষুদ্র ও অদৃশ্য কণার গতিবিধির ফলেই সৃষ্টি হয় এবং একে ইন্দ্রিয় ও পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণ দিয়ে বোঝা সম্ভব।

zoom
পিয়ের গাসেন্দি

লক এই সময়ে ফ্রান্সের লিবার্তিন(Libertines) বা মুক্তচিন্তকদের সংস্পর্শেও আসেন, যাঁরা ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্টউভয়পক্ষের অন্ধ গোঁড়ামির তীব্র সমালোচনা করতেন। ফ্রান্সের মুক্তচিন্তার বাতাস লকের মনোজগৎকে আরও প্রসারিত করে এবং তাঁকে গোঁড়ামি থেকে মুক্তি দেয়। ১৬৮০-র দশকে ইংল্যান্ডে শুরু হয় ‘এক্সক্লুশন ক্রাইসিস’ (Exclusion Crisis)। শ্যাফটসবারি এবং তাঁর হুইগ দল চেয়েছিলেন রাজা দ্বিতীয় চার্লসের ভাই ক্যাথলিক মতাবলম্বী জেমসকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার থেকে সরিয়ে দিতে। রাজা এটা জানতে পেরে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। শ্যাফটসবারির বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ ওঠে এবং তিনি হল্যান্ডে পালিয়ে যান। লকও সন্দেহের তালিকায় ছিলেন। রাজার গুপ্তচরেরা তাঁর ওপর কড়া নজর রেখেছিল। ১৬৮৩ সালে রাই হাউস প্লট(Rye House Plot) নামে রাজা ও তাঁর ভাইকে হত্যার এক ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায়। যদিও এর সঙ্গে লকের সরাসরি জড়িত থাকার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন ইংল্যান্ডে থাকা আর নিরাপদ নয়। তিনি ছদ্মবেশে হল্যান্ডে (নেদারল্যান্ডস) পালিয়ে যান।

zoom
জন লকের অসংখ্য রচনা গ্রন্থবদ্ধ হয়েছে

হল্যান্ড তখন ছিল ইউরোপের মুক্তচিন্তার আশ্রয়স্থল। তবু লককে সেখানেও সাবধানে থাকতে হয়। তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘ডাক্তার ভ্যান ডার লিন্ডেন’ নাম নিয়ে আত্মগোপন করেন। কখনও কখনও তিনি ছদ্মবেশে চলাফেরা করতেন, যাতে গুপ্তচরেরা তাঁকে চিনতে না-পারে। এই দীর্ঘ পাঁচ বছরের নির্বাসিত জীবন ছিল লকের জন্য একাধারে ভয়ের এবং অসম্ভব সৃজনশীলতার। একাকিত্বের এই দিনগুলোতে তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি তাঁর মাস্টারপিস অ্যান এসে কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর পাণ্ডুলিপি ঘষামাজা করে চূড়ান্ত করেন। হল্যান্ডে থাকার সময়েই তিনি পরিচিত হন আর্মি‌নিয়ান ধর্মতত্ত্ববিদ ফিলিপাস ভ্যান লিমবর্চ (Philippus van Limborch)-এর সঙ্গে। লিমবর্চের সঙ্গে ধর্ম ও সহনশীলতা নিয়ে আলোচনার ফলস্বরূপ লক ল্যাটিন ভাষায় লেখেন তাঁর বিখ্যাত এ লেটার কনসার্নিং টলারেশন। এই বইয়ে তিনি ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পৃথক করার যে যুক্তি দেখিয়েছিলেন, তা ছিল সমসাময়িক চিন্তার জগতে এক বিস্ফোরণ। ১৬৮৮ সালে ইংল্যান্ডে ঘটে যায় ঐতিহাসিক গৌরবময় বিপ্লব (Glorious Revolution)। রক্তপাতহীন এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী রাজা দ্বিতীয় জেমসকে সরিয়ে উইলিয়াম এবং মেরি সিংহাসনে বসলেন।

zoom
জোহান হারমান আইসিংসের আঁকায় ‘গৌরবময় বিপ্লব’

১৬৮৯ সালে, রানি মেরির সঙ্গে একই জাহাজে চড়ে, ৫৭ বছর বয়সি জন লক ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন। এবার আর তিনি পলাতক আসামি নন, বরং বিপ্লবের দার্শনিক এক মহানায়ক। লন্ডনে ফিরে তিনি তাঁর লেখাগুলো একে একে প্রকাশ করতে শুরু করলেন। প্রায় রাতারাতি লক ইউরোপের অন্যতম প্রধান বুদ্ধিজীবী বা ‘ম্যান অফ লেটারস’-এ পরিণত হলেন। তাঁর দর্শনই হয়ে ওঠে নতুন সরকারের শাসনতান্ত্রিক ভিত্তি। লকের দর্শন আকাশ থেকে পড়াকোনও ঈশ্বরের বাণী ছিল না, কিংবা কোনও নির্জন দ্বীপে বসে লেখা ধ্যানমগ্ন সাধকের কথকতাও ছিল না। তাঁর প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি যুক্তি ছিল তাঁর সময়কার উত্তাল ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক সংঘাত আর তার আগের দার্শনিকদের সঙ্গে এক নিরন্তর বিতর্কের ফসল। লকের আগে দর্শনের জগতে একদল প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ছিলেন, যাঁদের বলা হয় বুদ্ধিবাদী। রেনে দেকার্ত (René Descartes), স্পিনোজা (Spinoza), লাইবনিৎস (Leibniz)। তাঁরা মনে করতেন, আমাদের কিছু মৌলিক ধারণা জন্ম থেকেই মনের মধ্যে দেওয়া থাকে। ঈশ্বর, আত্মা, গণিতের স্বতঃসিদ্ধ নৈতিকতার কিছু মৌলিক নীতি– এগুলো হলো সহজাত ধারণা। এগুলো অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখা নয়, বরং আমাদের আত্মার অংশ, যা যুক্তি দিয়ে আবিষ্কার করা যায়। লক এই ধারণাটিকে একেবারে গোড়া থেকে নাড়িয়ে দিলেন।

zoom
গটফ্রিড ভিলহেল্ম লাইবনিজ

তিনি বললেন, মানুষের মনে কোনও সহজাত ধারণা নেই। একটি শিশু যখন জন্মায়, তখন তার মনটা থাকে একটি সাদা কাগজের মতো। ল্যাটিন ভাষায় তিনি একেই বলেছিলেন ‘ট্যাবুলা রাসা’ বা শূন্য স্লেট। এই সাদা কাগজে অভিজ্ঞতার কালিতেই ধীরে ধীরে লেখা হয় আমাদের সমস্ত জ্ঞানের অক্ষর। এর মানে দাঁড়ায়, কোনও রাজপুত্র জন্মগতভাবে কোনও কৃষকের সন্তানের চেয়ে জ্ঞানী বা উন্নত নয়। জ্ঞান বা প্রতিভা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনও সম্পত্তি নয়, বরং সেটি অর্জন করতে হয়। আমাদের সবার শুরুটা একই– একটা শূন্য মন নিয়ে। এই তত্ত্ব আভিজাত্য এবং বংশগত ক্ষমতার ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করেছিল। যদি কোনও সহজাত ঐশ্বরিক বা নৈতিক ধারণা না থাকে, তাহলে কোনও রাজাই দাবি করতে পারেন না যে, তাঁর শাসন করার অধিকার জন্মগত। এভাবেই লকের জ্ঞানতত্ত্ব তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।

তবে ‘ট্যাবুলা রাসা’ তত্ত্বের একটি সাধারণ ভুল বোঝাবুঝি হল, এটি মানুষের সব ধরনের জন্মগত বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করে। কিন্ত লক সেটি করেননি। তিনি অস্বীকার করেছিলেন সহজাত ধারণাকে, জন্মগত প্রতিভা বা প্রবণতাকে নয়। একজন ব্যক্তির হয়তো স্বাভাবিকভাবেই সংগীত বা গণিতের প্রতি ঝোঁক থাকতে পারে, কিন্তু ‘ঈশ্বর’ বা ‘ন্যায়বিচার’ সম্পর্কে কোনও তৈরি ধারণা নিয়ে সে জন্মায় না। লকের রাজনৈতিক দর্শনের হৃৎপিণ্ড হল তাঁর প্রাকৃতিক অধিকারের ধারণা। তিনি বলেছিলেন, মানুষ রাষ্ট্র বা সমাজ তৈরি করার বহু আগেই, কেবল মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণের কারণেই কিছু মৌলিক অধিকার লাভ করে। এগুলো কোনও রাজা, সংসদ বা সংবিধানের দান নয়, এগুলো প্রাক্-রাজনৈতিক এবং ঈশ্বরপ্রদত্ত। যেহেতু এগুলো কেউ দেয় না, তাই কেউ এগুলো কেড়েও নিতে পারে না। অবিচ্ছেদ্য অধিকার।

zoom
জন লকের জন্মস্থানের রেখাচিত্র

জন লক কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা জ্ঞানতত্ত্বের জটিল সমীকরণ নিয়েই ভেবে ক্ষান্ত হননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি সুস্থ, স্থিতিশীল এবং প্রগতিশীল সমাজ গড়তে হলে কেবল ভালো সরকার থাকলেই চলবে না, সেই সমাজের নাগরিকদের মানসজগৎকেও আলোকিত হতে হবে। তাঁর দর্শনের পরিধি রাজনীতি ছাড়িয়ে প্রবেশ করেছিল ধর্ম, শিক্ষা, ভাষা এবং এমনকী মানুষের আত্মপরিচয়ের গভীরে। লক স্বপ্ন দেখতেন এমন এক সমাজের, যেখানে ধর্মের নামে মানুষ একে অপরের গলা কাটবে না, যেখানে শিশুরা ভয়ের বদলে আনন্দের সঙ্গে শিখবে এবং যেখানে মানুষ ভাষার অস্পষ্টতা দূর করে একে অপরের সঙ্গে স্বচ্ছভাবে যোগাযোগ করতে পারবে। এই স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের জন্য তিনি যে তত্ত্বগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো আজও আধুনিক সভ্যসমাজের অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

জন লকের মৃত্যুর পর ৩০০ বছরেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। কিন্তু আজও যখন আমরা চায়ের টেবিলে বসে বাক্-স্বাধীনতা নিয়ে তর্ক করি, কিংবা আদালতে দাঁড়িয়ে সম্পত্তির অধিকার দাবি করি, অথবা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট পেপারে সিল মারি আমরা আসলে অজান্তেই জন লকের আত্মাটিকে স্পর্শ করে যাই।

………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী-র অন্যান্য লেখা

………………..

Empirical Philosophy Exclusion Crisis history of europe Liberalism Libertines philosopher Plato René Descartes Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Scholasticism Seventeenth Century Tabula Rasa

Share this article on