Bukowski’s Philosophy of Life Through Literature। Robbar
Robbar
  • ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৩১ আগস্ট ২০২৬

ভদ্র কবিতার শত্তুর!

একথা স্পষ্ট যে, ভাষার সৌন্দর্য, গ্রহণযোগ্যতা, রুচিশীলতার পূর্ব নির্ধারিত ছক ভেঙে বুকোওস্কির নির্ভীক এবং ছুৎমার্গবিহীন লিখনশৈলী তৈরি করেছে তাXর কবিতার স্বকীয় এবং স্বতন্ত্র এক স্বর। জীবনকে তিনি যেভাবে উপলব্ধি করেছেন ঠিক সেই ভাবেই– কোনওরকম মেকি বা ঠুনকো সভ্যতার প্রলেপ না দিয়ে, একেবারে সোজাসাপ্টা কথায় বুকোওস্কি যেমন দেখিয়েছেন জীবনের কুৎসিত দিক। আবার সেই একই ভাষার আশ্চর্য এবং অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে জীবনের সমস্ত জীর্ণতা, দৈন্য, অপরিচ্ছন্নতা, অশালীনতা, মালিন্য হয়ে উঠেছে অলৌকিক এবং কাব্যময়। বুকোওস্কির কবিতার স্বর রেহাই দেয়নি কোনও সত্যকে, এমনকী, ব্যক্তিগত সত্যকেও নয়।

শেষ আপডেট: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ১৮:১৯   
Facebook WhatsApp Messenger

১৯৭২, সেপ্টেম্বরের এক সন্ধে। সান ফ্রান্সিসকোর টেলিগ্রাফ হিলের একটি জিমনেসিয়াম। সেখানে ৮০০ জন শ্রোতার বসার আয়োজন। কোনওমতে। রিডিং দেবেন ইরেকশনস, ইজাকুলেশনস, এগজিবিশনস অ্যান্ড জেনারেল টেলস অফ ম্যাডনেস এবং লাইফ ইন আ টেক্সাস হোরহাউস বই দু’টির গল্পকার। এই দু’টি বই নিয়ে সেই সময় আমেরিকা জুড়ে আলোড়ন পড়ে গিয়েছে। ‘সিটি লাইট বুকস’-এর তরফে লেখককে এই অনুষ্ঠানে পাঠ করার জন্য বিমানভাড়া দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। পাঠ শুনতে এসেছেন অল্পবয়সি তরুণ-তরুণীরা। লেখক এসে বসলেন মঞ্চে। লম্বা গড়ন, প্রচুর বিয়ার সেবনের অভ্যাসের দরুন উদর সামান্য স্ফীত। মাথার আকার শরীরের তুলনায় বেশ বড়। চোখের কোটর গভীর। খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি। সারা মুখে ব্রণক্ষত। সারাদিন ধরে মদ্যপান করার ফলে নেশায় চুর! চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে পিছনে রাখা রেফ্রিজারেটর থেকে একটি বিয়ার নিয়ে, এক চুমুকে গোটা বোতল নিঃশেষ করার পর লেখক বললেন, ‘এটা কোনও প্রপ নয়, এটা আমার প্রয়োজন।’

zoom
চার্লস বুকোওস্কি

শ্রোতারা হাততালি দিয়ে উঠলেন। তাঁরা এই লেখককে চেনেন তাঁর ছোটগল্পের জন্য। কিন্তু লেখক মঞ্চে বসে শুরু করলেন কবিতা পাঠ করতে। যত সময় এগয়, লেখকের মদ্যপানের মাত্রাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। অনুরাগীরা বিশেষ কোনও কবিতা পড়ার অনুরোধ করলে বা মঞ্চে উঠে লেখকের সঙ্গে কথোপকথন করতে চাইলে লেখক শ্রোতাদের সঙ্গে শুরু করলেন চরম দুর্ব্যবহার। এক সময় কিছু শ্রোতা অসহিষ্ণু হয়ে পড়লেন, আর তা হওয়ারও কথা, কারণ তাঁরা টাকা দিয়ে টিকিট কেটে পাঠ শুনতে এসেছিলেন, লেখকের দুর্ব্যবহার সহ্য করবেন বলে নয়। এক সময় লেখক বলে উঠলেন, ‘ইউ ওয়ান্ট পোয়েমস? বেগ মি।’

zoom
১৯৭১ সালের ৩১ আগস্ট বুকোওস্কি লিখেছিলেন, ‘ওয়ার্ক-ফাক প্রবলেমস’ নামের কবিতা। তা প্রকাশ পেয়েছিল কাউন্টার কালচারের প্রতিভূ জন বেনেত-এর সম্পাদিত পত্রিকা ‘ভ্যাগাবন্ড থার্টিন’-এ

এমতাবস্থায় শ্রোতারা রেগে গিয়ে বোতল ছুড়ে মারতে শুরু করেন লেখকের দিকে তাক করে। অন্য একজন কবি লরেন্স ফার্লিংগেটি কোনওমতে তাঁকে বের করে নিয়ে যান। এরপর একটি পার্টিতে তিনি কয়েকজনের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। ফার্লিংগেটি পরের দিন সকালে দেখেন, ওই লেখক রক্তাক্ত অবস্থায় ব্রেকফাস্ট সারছেন একটি বিয়ার দিয়ে। ফার্লিংগেটি তাঁকে গতকালের পাঠের জন্য ৪০০ ডলার তাঁর হাতে দেন। ওই নোটগুলো হাতে পেয়ে সেগুলিকে চুম্বন করতে করতে লেখক বলতে থাকেন–

‘‘Poetry, I love poetry. It’s better than pussies… Almost.’’

zoom
মেজাজটাই আসল রাজা

এই উক্তি শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে, লেখকের কথা বলা হল, তিনি কবিতার ‘কবিতা’ হয়ে ওঠার সমস্তরকম প্রচলিত এবং সম্ভাব্য পথকে অস্বীকার করেছেন। তাঁর কাছে রুচিহীনতা, ইতরতা, যৌনতার সহজ এবং আব্রুহারা প্রকাশ, আশ্রাব্য গালিগালাজ, পরাজয়, প্রত্যাখ্যান, নেশায় সর্বস্বান্ত অবগাহন, আত্ম-অবমূল্যায়ন, আলস্য, উপার্জনহীনতা, নিঃসঙ্গতা, অন্তঃসারক্ষরণ– এইসব কিছুই হয়ে উঠেছে কবিতা। এই কবির প্রতি মুহূর্তের বাঁচাই তাঁর কাব্যসম্ভার। তিনি পরিত্যক্তের পূজারি। যা কিছু অশালীন, অশোভন, অভব্য তা-ই এই কবির সাহিত্যস্বর্গ। এই কবি ভিখিরিদের মহারাজ। তাঁর ভাষা পথের ভাষা, প্রান্তিক মানুষদের ভাষা। তাঁর কথা মদ্যপ, বহিষ্কৃত, সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের ভাষ্য। এই কবি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন–

‘‘Here’s a cock
And here’s a cunt
And here’s trouble.’’

বা কোনওরকম শালীনতা বা সভ্যতার বালাই না-রেখে এই কবিই লিখতে পারেন, ‘3 a.m. Games’-এর মতো কবিতা, যেখানে তিনি বলছেন–

‘drink without smoke is like cock without pussy’

‘দ্য লস এঞ্জেলস টাইমস’ দৈনিক সংবাদপত্রে এই কবিকে ‘poet Laureate of L.A lowlife’ এবং ‘the prophet of the underemployed’ বলে একাধিকবার সম্বোধন করা হয়েছে। ‘ডার্টি এইসথেটিক্স’-এর সম্রাট এই কবি, হেনরিখ কার্ল বুকোওস্কি ওরফে চার্লস বুকোওস্কি ছাড়া আর কে-ই বা হতে পারেন? তাঁর সম্পর্কে এতদূর জনশ্রুতি আছে যে, গাড়ি ছুটছে দুর্দান্ত বেগে এক সন্ধ্যা ভেদ করে। আরোহী ও চালক বুকোওস্কি একা, যথারীতি মাতাল, ফলে ঘটে গেল এক জোরালো দুর্ঘটনা। এমনই, যে, আহত বুকোওস্কি বুঝতে পারলেন দ্রুত লুপ্ত হয়ে আসছে তাঁর জ্ঞান। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর কী মনে হচ্ছে? তাঁর মনে হচ্ছে যে, নারীর সঙ্গে তিনি দেখা করতে মরিয়া হয়ে গাড়ি ছোটাচ্ছিলেন, তাঁর ভ্যাজাইনার মাদক ঘ্রাণ ওঁর নেওয়া হল না।

zoom
বুকোওস্কির সঙ্গে বুকোওস্কি। ভাস্কর্য: লিন্ডা কিং। ১৯৭৮

বুকোওস্কির জন্ম ১৯২০ সালের ১৬ আগস্ট জার্মানির আন্ডারনাখ শহরে। তাঁর বাবা হেনরিখ বুকোওস্কি পেশায় ছিলেন একজন মার্কিন সেনা। মা ক্যাথারিনাও ছিলেন জন্মসূত্রে জার্মান। ১৯২৩ সালে এই পরিবার আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে বসবাস করতে শুরু করে। লেখাপড়ার পাট চোকার পর যৌবনের অনেকটা সময় বুকোওস্কিকে জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন নামমাত্র বেতনের চাকরি করতে হয়। প্রতিদিনের জীবন সংগ্রাম এবং শ্রমিক জীবনের দৈনন্দিন কদর্যতা হয়ে ওঠে বুকোওস্কির সাহিত্য সৃষ্টির উপাদান। প্রাত্যহিক অপমান, ক্লান্তি, জীবনের অর্থহীনতা তাঁর ভাষাকে করে তোলে রুক্ষ, অনমনীয়, অশালীন কিন্তু স্পষ্ট এবং অনস্বীকার্য। ১৯৫৮ সালে ‘ইউনাইটেড স্টেটস পোস্টাল সার্ভিস’-এ তিনি চাকরিতে বহাল হন। কর্মজীবনের এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘পোস্ট অফিস’।

zoom
প্রথম বই

উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে। এই বইয়ের মূল চরিত্র হেনরি চিনাস্কিকে নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে বুকোওস্কির দ্বিতীয় সত্তা বা অল্টার ইগো। বুকোওস্কির মতোই তাঁর লেখাও অগোছালো, এলোমেলো, সাহিত্যের সমস্ত রকম নিয়ম ভেঙে বেরিয়ে আসা নিজের সঙ্গে নিজের সংলাপ। এই বইটির ভূমিকায় নাইয়াল গ্রিফফিথ লিখছেন–

‘Post Office, being his first, is no exception– are messy, ramshackle, rambling, structurally chaotic, held together, it seems, by bits of Sellotape and string. Even the punctuation defies basic grammatical rules. Yet to criticise it with the exegetical tools of formal literary appreciation is to entirely miss the point; the disorder of it, the near illiteracy of it, even, is of a piece with the explicit command it contains to construct a uniquely personal set of rules and beliefs as a way of resisting absorption and remaining, in a very real sense of the word, alive.’

কয়েক লাইন পর গ্রিফফিথ আবার বলছেন–

‘‘Bukowski’s work, with less mess, with less chaos, with more reins and restrictions, would lose most of its value and charm.’’

zoom
পাণ্ডুলিপি

অর্থাৎ একথা স্পষ্ট যে-ভাষার সৌন্দর্য, গ্রহণযোগ্যতা, রুচিশীলতার পূর্ব নির্ধারিত ছক ভেঙে বুকোওস্কির নির্ভীক এবং ছুৎমার্গবিহীন লিখনশৈলী তৈরি করেছে তাঁর কবিতার স্বকীয় এবং স্বতন্ত্র এক স্বর। জীবনকে তিনি যেভাবে উপলব্ধি করেছেন ঠিক সেইভাবেই– কোনওরকম মেকি বা ঠুনকো সভ্যতার প্রলেপ না দিয়ে, একেবারে সোজাসাপ্টা কথায় বুকোওস্কি যেমন দেখিয়েছেন জীবনের কুৎসিত দিক, আবার সেই একই ভাষার আশ্চর্য এবং অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে জীবনের সমস্ত জীর্ণতা, দৈন্য, অপরিচ্ছন্নতা, অশালীনতা, মালিন্য হয়ে উঠেছে অলৌকিক এবং কাব্যময়।

বুকোওস্কির কবিতার স্বর রেহাই দেয়নি কোনও সত্যকে, এমনকী, ব্যক্তিগত সত্যকেও নয়। সত্য অপ্রিয় হতে পারে, আশ্রাব্য মনে হতে পারে, কিন্তু তা অপরিবর্তনীয়। সত্যের সঙ্গে আপস করা যেতেই পারে, কিন্তু তাতে পরিস্থিতি বদলায় না। এই সহজ ব্যাপারটি কোনওরকম আত্মপ্রতারণা ছাড়াই উপলব্ধি করেছিলেন বুকোওস্কি। তাই তাঁর কলম সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার তোয়াক্কা না-করে অবিরাম লাভাবর্ষণ করে গিয়েছে। তাঁর কলম-নিঃসৃত প্রতিটি শব্দ জীবন্ত। হতে পারে তা কটূক্তি, গালিগালাজ, কিন্তু বুকোওস্কির কবিতায় সেগুলি হয়ে উঠেছে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড। জীবনের ঘৃণ্য, বীভৎস দিক, আশাভঙ্গ হওয়ার বিষণ্ণতা, পরিশীলিত আচরণ বর্জন, যৌনতার অবাধ উল্লাস, অশ্রাব্য ভাষাব্যবহার– এইসব কিছুর ভিতর থেকে বুকোওস্কি মন্থন করে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছেন এক গভীর এবং অপরিহার্য জীবনদর্শন। দর্শন থেকেই তো জন্ম হয় কবিতার! তাই যখন বুকোওস্কি লেখেন–

‘she reached over and grabbed him between the legs, bent over
And went down on him.
he pulled her under the covers and they played some more.
finally, he mounted her and it was great, it was a miracle, but soon it ended…’ (fooling Marie)

একথা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সত্যি সত্যি তিনি একেবারে আবরণহীন ভাষায় নারী-পুরুষের একটি যৌন মিলনের মুহূর্তকে তুলে ধরছেন।

‘somebody’ কবিতায় আমরা পাচ্ছি–

‘yes
her panties were on the
floor
and my cock went in
my cock my god my cock went in

I was Charles
Somebody.’

zoom
শিল্পী: চার্লস বুকোওস্কি

কবিতা পাঠ করার সময় পাঠক স্বাভাবিকভাবেই টেক্সটের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সাব টেক্সটের খোঁজ করেন। খোঁজেন কথার ভিতরের নৈঃশব্দ্যকে। কিন্তু এই কবি যেন ঠিক করেছেন পাঠককে সেই সুযোগই দেবেন না। এইভাবে পাঠকের স্বাভাবিক পাঠরীতির ক্ষেত্রেও তিনি তৈরি করেছেন একরকম প্রতিরোধ। কবিতা পড়ার সমস্ত নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে যেন তাঁর কবিতায় প্রবেশ করতে হয় পাঠককে সেই ব্যাপারটিই নিশ্চিত করতে চান বুকোওস্কি। এ কী তবে কবিতাপাঠের রীতিরও একরকম ‘বিনির্মাণ’ নয়?

খেয়াল করলে দেখা যায়, বুকোওস্কির অধিকাংশ কবিতাতেই যতিচিহ্ন ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত অনিয়ম একদম নিয়মমাফিক চালিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিরামচিহ্নের পর প্রতিটি লাইন শুরু হচ্ছে ছোট হাতের অক্ষর দিয়ে, যা ইংরেজি লেখার ক্ষেত্রে এক অমার্জনীয় ত্রুটি। কবিতাগুলির টেক্সট পড়তে পড়তে এজন্য বারবারই পাঠক ধাক্কা খান কারণ, সাধারণত কোনও কবি বা সাহিত্যিক ইংরেজি লেখার ক্ষেত্রে এই ভুল কখনও-ই করবেন না। এ যেন একরকম চিৎকার করে বলা– দেখো, আমি ভুল করছি এবং বেশ করছি। এ হল এক নির্ভীক কবির স্পর্ধা! ভাষার কোনও নিয়মের কাছেই তিনি মাথা নত করবেন না বলেই ঠিক করেছেন।

zoom
শিল্পী: বুকোওস্কি

একটি কবিতায় পুরুষদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বুকোওস্কি লিখছেন–

‘the days of the bosses, yellow men
with bad breath and big feet, men
who look like frogs, hyenas, men who walk
as if melody had never been invented, men
who think it is intelligent to hire and fire and
profit, men with expensive wives they possess
like 60 acres of ground to be drilled
or shown off…’            (something for the touts, the nuns, the grocery clerks and you…)

পুরুষদের বিষয়ে এবং পুরুষদের জীবনে মহিলাদের অর্থাৎ তাদের স্ত্রী-দের অবস্থান সম্পর্কে যে-কথাগুলো এই কবিতায় তিনি লিখেছেন, তার কোনওটাই পাঠকের অজানা নয়। এমন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই লেখার মধ্যে কাব্যসত্তা কোথায়? এই লেখা কবিতা হয়ে উঠেছে কারণ, এই লেখা ভানহীন। প্রতিটি বাক্যে সত্য প্রকট রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছে। তিনি নিজে একজন পুরুষ হয়ে এই কবিতায় পুরুষদের তিনি হিংস্র মাংসাশী হায়েনা এবং একইসঙ্গে কদাকার, উভচর প্রাণী ব্যাঙের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই বাক্যগুলি প্রকারান্তরে আত্ম-সমালোচনা একথা বুঝতে কোনওরকম কষ্টই করতে হয় না।

zoom
পরজন্মে বিড়াল হতে চাইতেন বুকোওস্কি

বুকোওস্কি নিজের কবিতায় কুৎসিত দৃশ্যকল্প তৈরি করার ক্ষেত্রে একেবারে সিদ্ধহস্ত। ‘it is not much’ কবিতাটি শেষ হচ্ছে এইভাবে–

‘and I died of pity
For Man, for myself,
on a cross without nails,
watching in fear as
the pig belches in his sty, farts,
blinks and eats.’

এই কবিতায় শূকরের ঢেকুর তোলা এবং বাতকর্মের কথা আনা হল মৃত্যুর পূর্ব-মুহূর্তকে বোঝাতে। কবি বলছেন মৃত্যু এতই করুণ এবং মৃত্যুর সামনে মানুষ এতটাই অসহায় যে, ক্রুশকাঠে তুলে তাঁকে আর পেরেকবিদ্ধ করারও দরকার পড়ে না, এক চূড়ান্ত নরকদর্শনের ভয় মৃত্যুর আগে মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে। সেই নরককে বোঝাতে বুকোওস্কি কোনও অতিপ্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করেননি। নরক বোঝাতে তিনি দেখালেন শূকরের ময়লা অপরিচ্ছন্ন খাঁচা, যেখানে সে একদিকে খাচ্ছে, আবার অন্যদিকে নিজেই নিজের বাসস্থান অপরিষ্কার করছে, ঠিক মানুষ যা করে থাকে। ‘the talkers’ কবিতায় আমরা বুকোওস্কির কথায় মুহূর্তের জন্য খুঁজে পাই অস্কার ওয়াইল্ডের স্বর! বুকোওস্কি বলছেন–

‘he about the Arts until
I hate the Arts,
And there is nothing cleaner
than getting back to a bar’

অস্কার ওয়াইল্ড তাঁর উপন্যাস ‘দ্য পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে’-তে লিখেছেন– ‘All art is quite useless.’ এখানে দুই শিল্পীর ক্ষেত্রেই নিজেদের সৃষ্টিকে ‘গুরুত্বহীন’ বা ‘অপ্রয়োজনীয়’ দেখানোর একরকম প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, যা আসলে প্রমাণ করে যে, শিল্পকে তাঁরা জীবনের থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোনও মহৎ কীর্তি হিসাবে দেখতে চাননি। ওয়াইল্ডের মতোই বুকোওস্কির ক্ষেত্রেও জীবন এবং সাহিত্য একাকার হয়ে একে অপরের মধ্যে মিশে গিয়েছিল।

‘sticks and stones’ কবিতায় বুকোওস্কির অস্থির, নালিশপ্রবণ কলম লিখছে–

‘‘show me more leg
Show me more ass–
That’s all you (or I) have
while
It lasts

and for this common and obvious truth
they screech at me:

MOTHERFUCKER SEXIST PIG!’’

আবার ‘sunny side down’ কবিতায় তিনি লিখেছেন–

‘‘let’s get more coffee from the
waitress.
that bitch! she knows we are trying to get her
attention.’’

দু’টি কবিতাতেই বুকোওস্কি কিছু অশালীন শব্দ (যেমন, ‘MOTHERFUCKER SEXIST PIG’, ‘bitch’) ব্যবহার করেছেন, যেগুলি সাধারণত কবিতায় ব্যবহার করা প্রথাবিরুদ্ধ এবং অপ্রত্যাশিত। কিন্তু এই শব্দগুলি কবির জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হওয়ায় তিনি যে ঘটনাগুলি বর্ণনা করেছেন, পাঠকের মনে যাতে তার উপযুক্ত এবং সঠিক অভিঘাত তৈরি হয়, তাই তিনি এই শ্রুতিকটু কথাগুলিকে কবিতার মধ্যে স্থান দিতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি। এর ফলে যা হয়েছে, তা হল কবির কাব্যদর্শনের এক স্বতঃস্ফূর্ত স্ফুরণ!

zoom
শিল্পী: চার্লস বুকোওস্কি

তবে বুকোওস্কির কবিতায় কী শুধুমাত্র অসুন্দর এবং অশ্লীলই স্থান পেয়েছে? না একথা কোনওমতেই বলা যাবে না। তিনি বাস্তব জীবনের রুক্ষতাকে মোলায়েম করেননি ঠিকই, কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই তাঁর প্রগাঢ় চিন্তাসিক্ত মন তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে এমন সব বাক্য, যা সমস্ত কদর্যতার বিপরীতে তুলে ধরেছে কোমল কাব্যময়তা। মেলে ধরেছে তাঁর কাব্যচেতনার বিস্তৃত উঠোন। যেমন কবিতা প্রসঙ্গে বুকোওস্কি লিখেছেন–

‘‘a poem is a city, a poem is a nation,
a poem is the world…’’

অর্থাৎ, জীবনের সমস্ত অসুন্দরের পাঠ নিতে নিতেও তাঁর কাছে কবিতাই হয়ে উঠেছে নিজের শহর, দেশ, নিজের পৃথিবী! ‘the girl outside the supermarket’ কবিতাটি শেষ হচ্ছে এক গভীর দার্শনিক চিন্তাস্রোতের তোড়ে ভাসতে ভাসতে–

‘‘it’s a lonely world
of frightened people,
just as it has always
been.’’

কী অমোঘ সত্য। এই পৃথিবীতে প্রকৃত অর্থে প্রতিটি মানুষই একাকী। সকলেই ভয়ার্ত। আরও বড় সত্য হল সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ ভীত এবং একাকিত্বে জর্জরিত। এতদিনেও এই অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি। এই পৃথিবী আতঙ্কিত মানুষে পরিপূর্ণ তাই এই গ্রহে কোটি কোটি নরনারী বসবাস করলেও জগৎটা আসলে মহাজাগতিক মহাসমুদ্রে একাকী ভাসমান একটি দ্বীপ। প্রতিটি মানুষ যেমন।

বুকোওস্কির কবিসত্তা মুখোশবিহীন, ক্ষমাহীন। তিনি খুব সহজভাবে জীবনের নেতিবাচক দিকগুলোকে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন এবং সেগুলিকে নিজের সৃষ্টির মধ্যেও দ্বিধাহীনভাবে স্থান দিয়েছেন। নিজের অস্তিত্বকে তিনি বিশেষভাবে কোনও গুরুত্ব দিতে রাজি ছিলেন না। তাঁর কাছে অশ্লীল শব্দ অশ্লীলতার চেতনা বহন করত না। শব্দগুলির ব্যবহার লোকমুখে যেভাবে হয়ে থাকে, ঠিক সেইভাবে বুকোওস্কি কবিতায় সেগুলি ব্যবহার করেছেন। ঠিক সেভাবেই যৌনতা ছিল তার কাছে একটি স্বাভাবিক, প্রয়োজনীয় শারীরিক ক্রিয়া এবং সে-ব্যাপারে প্রকাশ্যে কথা বলতে বা লিখতে তিনি কোনওরকম কুণ্ঠা বোধ করতেন না। বুকোওস্কি বুঝেছিলেন মানবজীবন আসলে অর্থহীন, এই বিরাট বিশ্বচরাচরে সামান্য ধূলিকণামাত্র।

তাই এই জীবনকে অর্থবহ এবং গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করার কোনও মানেই হয় না। সেই প্রচেষ্টা হবে সম্পূর্ণ বৃথা। তাই ‘হুজ হু ইন আমেরিকা’-র তরফ থেকে বুকোওস্কিকে তাঁর জীবনদর্শন কী, তা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি নির্দ্বিধায় বলেন– ‘‘Don’t try.’’

যিনি সারাজীবন ধরে কবিতা লিখে গেলেন জীবনের কঠোর সত্যকে শিল্পের ভাষায় প্রতিষ্ঠা করার স্বার্থে, তার সমাধিফলক যেন ব্যক্ত করছে কবিরই এক অত্যন্ত নিভৃত উপলব্ধি!

‘‘Don’t try!’’

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন রবীনা মিত্র-র অন্যান্য লেখা

……………………….

Beat generation Charles Bukowski Charles Bukowski Poetry Contemporary Poetry Dirty Aesthetics German-American novelist Literary Culture novelist Oscar Wilde Philosophy Post Office Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar The Picture of Dorian Gray women

Share this article on