উত্তমদার শাণিত-দৃষ্টি কেমন যেন ঘোলাটে মনে হল। হাত তুলে আমাকে থামিয়ে বললেন, ‘কেমন চাইছ বলো?’ আমি বললাম, ‘আপনার প্রাণপ্রিয় কাউকে হারালে কি এমন প্রতিক্রিয়া বেরিয়ে আসার কথা?’ উত্তেজিত হয়ে উত্তমদা বললেন, ‘দৌড়নোর আগে পিঠে নতুন জকি উঠলে রেসের ঘোড়া সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে। তারপর কী করে জানো? নতুন জকিকে পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তিনি মানুষ, বুদ্ধিজীবী, জনতার কাছে মহানায়ক উত্তমকুমার। সত্যিই তো, রেসে নামার আগে তিনি দেখে নেবেন না, তাঁর নতুন জকি, অর্থাৎ নতুন পরিচালক– কতটা দক্ষ, কতটা কাজ জানেন! আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
উত্তমকুমার চিরকালই আমার কাছে ‘উত্তমদা’। সশরীরে তিনি আজ থাকুন আর না থাকুন, তাঁর এই ১০০ বছরের বিশেষ মুহূর্তে সেই সম্পর্কের টান যে বিন্দুমাত্র আলগা হয়নি, তা অনুভব করতে পারি, প্রতি মুহূর্তে। উত্তমদাই একদিন আমায় বলেছিলেন, ‘তোমাদের সঙ্গে আমার আরও আগে কেন দেখা হয়নি!’
বেশ মনে পড়ে ‘জতুগৃহ’-র শুটিং। আমি তখন তপনদার (তপন সিন্হা) ইউনিটে সহকারী পরিচালক। আউটডোর চলছে তখন। জায়গাটা ছিল বিহারের (অধুনা ঝাড়খণ্ড) সাহেবগঞ্জে। স্থানীয়রা বলত ‘শকরিগলি ঘাট’। তখনও পর্যন্ত মনিহারি ঘাট (কাটিহার) থেকে সাহেবগঞ্জ পর্যন্ত ব্রিজ বলে কিছু ছিল না। বিহারের ভাগলপুরে তপনদার পৈতৃক বাড়ি, তবে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল জলের মধ্যে! হ্যাঁ, একেবারে গঙ্গার মধ্যিখানে নোঙর করা থাকত একটা মাঝারি মাপের জাহাজ! তাতেই উত্তমদা, তপনদা-সহ অন্যান্য কলাকুশলী এবং আমরা, অর্থাৎ টেকনিশিয়ানরাও থাকতাম। উদ্দেশ্য একটাই: শুটিংয়ের দল এসেছে শুনলে পাবলিকের মধ্যে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তার থেকে ক’টা দিন নিশ্চিত রেহাই। দিনের দিন লোকেশনে গিয়ে নির্বিঘ্নে শুটিং সেরে আবার জলযানে ফিরে আসা হত। যাই হোক, একদিন সকালে সেই নৌকাতেই দেখি এক আশ্চর্য দৃশ্য!

আমাদের ড্রেসারের সঙ্গে উত্তমদা বেশ জমিয়ে গল্প করছেন। শুধু তাই নয়, ওই মাপের একজন অভিনেতা, যিনি ৫৫৫ সিগারেট ছাড়া খান না, তিনি কেমন অক্লেশে ড্রেসারের থেকে বিড়ি নিয়ে দুটো সুখটান দিলেন! দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম!
তখনও পর্যন্ত আমাদের সম্পর্কটা ছিল ওই সাধারণ পরিচিতের মতো। দেখা হলেই কুশল বিনিময় করে একটা নির্দিষ্ট সুরে জিজ্ঞেস করতেন, ‘কেমন আছ, পলাশ?’ ইত্যাদি। ওঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় ‘ঝিন্দের বন্দী’-র শুটিংয়ের সময় থেকে হলেও, রসায়ন খানিক গাঢ় হল ‘জতুগৃহ’-র আউটডোরে গিয়ে। সে সংযোগ জমাট বাঁধল ১৯৬৬ নাগাদ। একটু সবিস্তারে বলি।

তপনদা তখন ‘হাটে বাজারে’-র স্ক্রিপ্ট লিখে ফেলেছেন। এরই মধ্যে জানতে পারলাম, ছবিতে অভিনয় করবেন অশোককুমার ও বৈজয়ন্তীমালা। বেজায় খুশির সঙ্গে উত্তেজনাও ছিল তুঙ্গে। একদিন তপনদা সবাইকে ডেকে বললেন, ‘ওরে, কাল দুপুরে মালাজি স্টুডিও-তে আসবেন। চিত্রনাট্য পড়া হবে। তোরা সবাই ঠিক সময়ে আসিস, পরিচয় করিয়ে দেব।’

পরদিন নির্দিষ্ট সময়ে বৈজয়ন্তীমালা এলেন ‘নিউ থিয়েটার্স’-এর দু’নম্বর স্টুডিওতে– সেখানেই ছিল তপনদার স্টুডিও অফিস। সেদিন স্ক্রিপ্ট রিডিং সেশন। তপনদা আর বৈজয়ন্তীমালা ছাড়া ঘরে তৃতীয় কারও-র প্রবেশাধিকার নেই। তপনদা চিত্রনাট্য পড়বেন, বৈজয়ন্তীমালা শুনবেন। প্রয়োজনে প্রশ্ন করবেন, পরিচালক উত্তর দেবেন। আমাদের সবার সঙ্গে বৈজয়ন্তীমালার পরিচয় করিয়ে দিলেন তপনদা। পরিচয়পর্ব শেষ হতেই আমরা সুবোধ বালকের মতো রুমের বাইরে বেরিয়ে এলাম।
বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে কাজ করব– এই খবরেই আমরা দারুণ উত্তেজিত। তার ওপর তাঁকে চাক্ষুষ দেখা, পরিচয় হওয়া– আনন্দ সীমাহীন! আমরা স্টুডিও-র লনে এসে হাজির হলাম। আপাতত স্ক্রিপ্ট রিডিং শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা। হঠাৎ একটা হইহই কানে আসায় তাকিয়ে দেখি– উত্তমদা আসছেন লনের ওপার থেকে। ওঁর সেই আশ্চর্য হাসিতে স্টুডিওর মাঠ মাতিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। হাতে ধরা ৫৫৫ সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে সক্কলের হাতে একটি করে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘খা।’ কী কারণে জানি না, আমাকে দিলেন না। বরং ডানহাতটা আমার কাঁধে রেখে মৃদু টানে কাছে এনে বললেন, ‘পলাশ, তোমার সঙ্গে কথা আছে– একটু এদিকে এসো।’ সবার থেকে একটু দূরে সরে এলেন আমায় নিয়ে। আমার মনের মধ্যে তখন উদ্বেগের বুদ্বুদ তৈরি হচ্ছে। আমি তপনদার থার্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট– আমার মতো একজন সাধারণ সহকারীর সঙ্গে মহানায়কের এমন কী কথা থাকতে পারে? রহস্য উধাও হল নিমেষে। কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে উত্তমদা বললেন, “বৈজয়ন্তীমালাজি এসেছেন। তপনদার কাছে ‘হাটে বাজারে’-র স্ক্রিপ্ট শুনছেন। কিন্তু মালাজির সঙ্গে আমার দেখা করা খুব দরকার। বলাইয়ের (বলাই সেন, তপনদার প্রধান সহকারী পরিচালক) থেকে শুনলাম, এখন তপনদার অফিসঘরে ‘প্রবেশ নিষেধ’। অথচ মালাজির সঙ্গে একবার দেখা না করলেই নয়…” বলা বাহুল্য, আমি বিস্মিত! মহানায়কের এমন প্রয়োজন, আর সেই প্রয়োজন মেটানোর দায় এসে পড়েছে আমার মতো এক সামান্য ছবি-করিয়ের ওপর! হঠাৎ উত্তমদা আমার দু’হাত চেপে ধরে বললেন, “তুমি একটু মালাজির সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দাও। তুমি ছাড়া ‘NO ENTRY’-তে কেউ ঢুকতে পারবে না। পলাশ, প্লিজ, না বোলো না।” গলায় অনুরোধের স্বর, যেন খানিকটা আকুতিও।

আজ ৯১ বছর বয়সে পৌঁছে সব কথা ঠিকঠাক মনে করতে পারি না। শুধু উত্তমদার সেই কণ্ঠস্বর– ‘পলাশ, প্লিজ, না বোলো না’– আজও কানে বাজে।
বোধহয় আমার বাহ্যজ্ঞান লোপ পেয়েছিল। এক দৌড়ে তপনদার অফিসঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে সটান ঢুকে পড়েছিলাম। অনুমতি নেওয়া তো দূরের কথা, দরজায় নক করে জানানও দিইনি। আমাকে এভাবে আচমকা ঢুকতে দেখে তপনদা কিন্তু বিরক্ত হলেন না। মিষ্টি হেসে সস্নেহে বললেন, ‘কী রে, কিছু বলবি?’
ভরে-পাওয়া মানুষের মতো কোনওমমে বললাম, ‘উত্তমদা এসেছেন। মালাজির সঙ্গে দেখা করতে চান।’
বৈজয়ন্তীমালা বাংলা জানতেন না, কিন্তু আমার কথা বুঝেছিলেন। তপনদাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আমাকে বললেন, ‘Please, ask him’।
সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, আমি যেন যুদ্ধজয় করেছি! তপনদার অফিস ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এসেই দেখি সামনেই উত্তমকুমার দাঁড়িয়ে। মুখে ঈষৎ উদ্বেগের ছাপ। আমি উত্তমদাকে বলেছিলাম– ‘যান, আপনি ভিতরে যান।’ উত্তমদা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তপনদার অফিস ঘরে ঢুকে যেতেই প্রোডাকশন অ্যাসিস্টেন্ট গৌরবদা দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি আমার সতীর্থ, যাঁরা স্টুডিওর লনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁদের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম। আমার সামনে তখন হাজারও প্রশ্ন। বলাইদাদের চোখমুখের অবস্থাও তথৈবচ। ব্যাপারখানা কী?

এর পরের ঘটনা আরও চমকপ্রদ! উত্তমদা তপনদার অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সটান আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘Thank you Palash, Thank you, তোমার আজকের উপকার কোনওদিন ভুলব না…’ তারপর দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে উঠে স্টুডিও ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের মধ্যে গবেষণা শুরু হয়েছিল– ‘কী ব্যাপার?’ বলা বাহুল্য, মেলেনি উত্তর।
পরের দিনই অবশ্য জেনেছিলাম তপনদার থেকেই। উত্তমকুমার প্রযোজক হিসেবে ‘ছোটি সি মুলাকাত’ ছবি করছেন হিন্দিতে, বৈজয়ন্তীমালা সে-ছবির হিরোইন। এদিকে বম্বে-লবির ঘাঁতঘোঁত বুঝতে না-পেরে বহু টাকা উত্তমদার লগ্নি হয়ে গিয়েছে, বাজারে প্রচুর ধারদেনা, নায়িকার তিন-তিনবার ডেট নিয়েও সামান্যতম শুটিংও করা যায়নি। ফলত, বৈজয়ন্তীমালা খানিক বিরক্ত হয়েই আর কোনও ডেট দিচ্ছিলেন না এ-ছবির জন্য। নতুন প্রযোজক হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই উত্তমদা প্রবল দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন। আর সে-কারণেই তপনদার স্ক্রিপ্ট রিডিং সেশনের মাঝে ওঁর হঠাৎ আগমন।

এরপর উত্তমদার প্রথম হিন্দি ছবির জট অনেকাংশেই কেটে যায়। কিন্তু যা সকলেই জানেন, শেষরক্ষা হয়নি। নানা আনুষঙ্গিক কারণে ছবিটা সর্বভারতীয় স্তরে ব্যর্থ হয়। উত্তমদা ঋণের দায়ে ডুবে যান। হার্ট অ্যাটাকের ধাক্কা সামলে উঠে ধীরে ধীরে আবার হারানো জমি পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করেন। সেকথা প্রায় সকলেই জানেন।

যাই হোক, সাতের দশকে ‘জবান’ নামে একটি ছবি করেছিলাম। ছবিটি ফ্লপ করে। তখন ভবিষ্যৎ অন্ধকার। স্ক্রিপ্ট বগলে তখন প্রোডিউসারদের দরজায় দরজায় ঘুরি। কাউকে রাজি করাতে পারি না। শেষপর্যন্ত পুরনো দিনের এক প্রোডিউসার রাখাল সাহা আমার স্ক্রিপ্ট শুনে রাজি হলেন, তবে শর্ত একটাই। নায়ক হিসেবে উত্তমকুমারকে চাই। প্রস্তাবটা আমারও পছন্দ হল। উত্তমদার সঙ্গে দেখা করে বললাম, ‘একটা দিন আমার স্ক্রিপ্টটা শুনুন। আপনার ময়রা স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে গিয়ে শুনিয়ে আসব।’
উত্তমদা খুবই উৎসাহ দেখালেন, মূল গল্পটা পড়তে চাইলেন। বই দিয়ে আসার দু’সপ্তাহ পর যেতে বললেন। কিন্তু তারপরই বাধল গোলমাল! ১৫ দিন পর গিয়ে শুনলাম, ‘সরি, পলাশ। বড্ড কাজের চাপ– সময় করতে পারিনি। ১৫ দিন পরে এসো।’ তারপর থেকে কেবলই সেই একই ব্যাপার। আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু। কোর্টের পরবর্তী শুনানির মতো প্রায় তিন মাস কেটে গেল।

এরই মধ্যে রাখালবাবুর ধর্মতলা স্ট্রিটের অফিসে গিয়ে যা শুনলাম, তাতে মাথা ঘুরে গেল! রাখালবাবু দৃশ্যতই লজ্জিত হয়ে দুঃখের সঙ্গে বললেন যে, উত্তমদা তাঁকে বলেছেন– আমার মতো মামুলি ছেলেকে দিয়ে ছবি না করিয়ে দিলীপ মুখোপাধ্যায়কে পরিচালক হিসেবে নিতে। একটি হোটেল ও ক্যাবারে নিয়ে সংগীতবহুল ছবি। উত্তমকুমারের ভরসায় রাখালবাবু সে-ছবি করতে রাজিও হয়ে গিয়েছেন।

নিঃশব্দে সেদিন প্রোডিউসারের অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। অপমানটা বুকে বেজেছিল খুবই। হয়তো চোখের কোণে জলও এসেছিল। আজ আর মনে নেই।
আরও কয়েক বছর পর, সম্ভবত ১৯৭৬ সালে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রতিমা’ নিয়ে ছবি করলাম। ১৯৭৭-এর ২ ডিসেম্বর সম্ভবত উত্তরা, পূরবী ও উজ্জ্বলা চেইনে সে-ছবি মুক্তি পেল। ছিলেন সৌমিত্রদা, অনিলদা, নতুন ছেলে সন্তু মুখার্জি এবং প্রায় নতুন মুখ সুমিত্রা মুখার্জি। আমজনতার বদান্যতায় ছবিটি সুপারহিট হয়েছিল। আর আমি ফিরে পেয়েছিলাম হারানো প্রত্যয়।

এরপরের ঘটনাটি সন-তারিখহীন, কিন্তু আজও স্পষ্ট মনে আছে। এক দুপুরে টেকনিশিয়ান স্টুডিও-তে গিয়ে শুনলাম দু’নম্বর ফ্লোরে পরিচালক দিলীপ রায় ‘দেবদাস’ করছেন। ফ্লোরে ঢুকে দেখি মেসবাড়ির সেট। ক্যামেরাম্যান আলো ঠিক করছেন। দিলীপদা আমাকে দেখে হইহই করে উঠলেন। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলাম– ‘দেবদাস’-বেশে সৌমিত্রদা আর ‘চুনীলাল’-বেশে উত্তমদা। উত্তমদার পুরনো ব্যবহারটা বোধহয় তখনও ভুলিনি। তাই তাঁকে না-দেখার ভান করে সটান গিয়ে সৌমিত্রদার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। হঠাৎ পিছন থেকে উত্তমদার কণ্ঠস্বর– ‘পলাশ, আমিও এখানে আছি। আমি উত্তমকুমার…’।
প্রণাম করেছিলাম। কোনও মিথ্যা অজুহাত দিইনি। উত্তমদা সস্নেহে বলেছিলেন, ‘একদিন ময়রা স্ট্রিটে এসো না। গল্প শোনা যাবে।’ আমি সেদিন ওঁকে হ্যাঁ-না কিছু বলতে পারিনি।

১৯৭৮-এর ১১ আগস্ট আমার দাদা, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় ছেলে সনৎ বন্দ্যোপাধ্যায় আকস্মিকভাবে মারা গেলেন। পিতৃহারা ভাইপোদের দেখে মনটা বড় বিচলিত হয়েছিল। দাদার শেষকাজ সেরে ভারাক্রান্ত মন। মাথায় এমন ঘোর চাপল যে পাইকপাড়া থেকে সটান ২ নম্বর ডবল ডেকারে উঠে বসলাম। উদ্দেশ্যহীনভাবে বালিগঞ্জের যাচ্ছিলাম। একবার ভাবলাম, ‘প্রতিমা’র নায়িকা হাসি-র (সুমিত্রা মুখার্জি) বাড়িতে যাই। কিন্তু গিয়ে দেখি ফ্ল্যাটে তালা। কী করি ভাবতে ভাবতে একসময় পায়ে পায়ে এসে হাজির হলাম ময়রা স্ট্রিটে। একেই বোধহয় বলে ভবিতব্য। উত্তমদার ফ্ল্যাটে বেল বাজাতেই তাঁর দেখা মিলল। সাদরে বসিয়ে বললেন, ‘কাগজে দেখেছি, সনৎবাবু চলে গেলেন। বড্ড ভালোমানুষ ছিলেন, সত্যিকারের সজ্জন।’ কথায় কথায় আমায় বললেন, ‘কোনও নতুন গল্প ভাবছ না কি?’ আমার কী মনে হয়েছিল জানি না, তারাশঙ্করের ‘নবদিগন্ত’র গল্প শোনালাম। এককথায় রাজি হয়ে বললেন, ‘আমি হ্যারি ব্যান্ডোর রোল করব! স্ক্রিপ্ট শোনার দরকার নেই। কথা দিলাম।’

‘প্রতিমা’র সাফল্য পরিচালক হিসেবে আমায় খানিক পরিচিতি দিয়েছিল। উত্তমদা আমার ছবিতে অভিনয় করবেন শুনেই প্রযোজকও পাওয়া গেল। ময়রা স্ট্রিটে বসে অল্প সময়েই পারিশ্রমিক ও অন্যান্য বিষয় মিটে গেল।
‘নবদিগন্ত’র আগে হাওড়ার জগৎবল্লভপুর ছাড়া অন্য গ্রামে শুটিং করতে উত্তমদা আদৌ স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। ভক্তদের ভিড়ের ভয় ছিল। জগৎবল্লভপুরে ‘চণ্ডীমাতা ফিল্মস’-এর মালিক ও স্থানীয় বিধায়ক সত্যনারায়ণ সাধুখাঁ-র প্রভাব তাঁকে নিরাপত্তা দিত। এদিকে আমার আউটডোর লোকেশন ছিল বীরভূমের লাভপুর। উত্তমদা গোড়ায় আপত্তি করলেও আমার জোরালো ভরসায় আশ্বস্ত হয়েছিলেন।
টেকনিশিয়ান স্টুডিও-তে ইনডোর শুটিং দিয়ে ‘নবদিগন্ত’ শুরু হল। মহানায়কের সঙ্গে প্রথম কাজ বলে নার্ভাস লাগলেও আত্মবিশ্বাস হারাইনি। প্রথম দিনের দৃশ্যও ছিল যথেষ্ট ওজনদার। গল্পের নায়ক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন দরিদ্র, গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের মেধাবী সন্তান। সংস্কৃত তাঁর কাছে দেবভাষা, ইংরেজি ম্লেচ্ছদের ভাষা। কিন্তু ইংরেজি না জানার মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছিল। বড় মেয়ের বিয়েতে পণের টাকা দিতে না পারায় পাত্রপক্ষ বরকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বিয়ের সাজে অষ্টাদশী মেয়েটি অপমান সহ্য করতে না পেরে লগ্নেই আত্মহত্যা করে।

ছোট মেয়েকে পাত্রস্থ করার জন্য অর্থের প্রয়োজনে হরিচরণ ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান হন, পুলিশের চাকরি নেন। হরিচরণ হয়ে ওঠেন ‘হ্যারি ব্যান্ডো’– রাগী, অত্যাচারী, মাতাল এক গ্রাম্য দারোগা।
প্রথম দিনের শুটিংয়েও উত্তমদার নিজস্ব ছাপ। আগের দিন ঠিক করা লং শটের জন্য ক্যামেরাম্যান অনেকক্ষণ ধরে আলো তৈরি করে অপেক্ষা করছিলেন। উত্তমদা বেশ খানিকটা দেরিতে এসে মেকআপ ছাড়াই সেটে ঢুকে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ক্যামেরাটা এখানে বসাও। চক মার্কগুলো এই এই জায়গায় করো…’ তারপর মেকআপ রুমে চলে গেলেন। ফলে ফের নতুন করে আলো করতে হল। তবুও নিজের ওপর আস্থা হারাইনি। সেদিনের টেক করার দৃশ্যটা ছিল এমন:
ছোটমেয়ে ও স্ত্রীর খবর নিয়মিত পেতে হ্যারি ব্যান্ডো একজন ইনফরমারকে গোপনে তাঁদের খোঁজ রাখার কাজে লাগিয়েছিল। একদিন সেই ইনফরমার এসে জানাল, ‘ওই মা-মেয়ের কোনও খোঁজ পাইনি। অনেক খুঁজেছি। কোথাও পাইনি– হয়তো খাতায় নাম লিখিয়েছে।’ বেচারা জানত না, যাঁদের খোঁজ সে করছে, তাঁরা আসলে হ্যারি ব্যান্ডোরই স্ত্রী ও মেয়ে।
স্বভাবতই এমন খবর শুনে হ্যারি ব্যান্ডোর বিস্ফোরিত হওয়ার কথা, হিংস্র হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু শট দেওয়ার সময় উত্তমকুমার যেন প্রায় ফিসফিস করে শুধু বললেন, ‘Stop it, stop it’। অভিনয়ের ভাষায় একে বলে নিখাদ ‘under-acting’। পরিচালক হিসেবে তা আমার একেবারেই পছন্দ হয়নি। রিফ্লেক্স অ্যাকশনে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলাম, ‘Cut!’, ক্যামেরা মুহূর্তে বন্ধ। স্টুডিওয় পিন-পতনের মতো স্তব্ধতা!
উত্তমদার শাণিত-দৃষ্টি কেমন যেন ঘোলাটে মনে হল। হাত তুলে আমাকে থামিয়ে বললেন, ‘কেমন চাইছ বলো?’ আমি বললাম, ‘আপনার প্রাণপ্রিয় কাউকে হারালে কি এমন প্রতিক্রিয়া বেরিয়ে আসার কথা?’

উত্তমদার মুখ থমথমে, খানিকক্ষণ চুপ থেকে তারপর কঠিন স্বরে বলে উঠলেন, ‘তবে দেখিয়ে দাও কেমন রিয়্যাকশন চাইছ!’ আমি তখন একেবারে বাঘের মুখোমুখি। একচুল ঢিল দিলেই সর্বনাশ! নিজেকে সংযত রেখে ঈষৎ কঠিন গলায় বললাম:
–আপনি তো মহানায়ক?
–সন্দেহ আছে না কি?
–নাহ্। এবং ঠিক সেই কারণেই আপনাকে অভিনয় আমি দেখিয়ে দেব না। কারণ আপনি দক্ষ পেশাদার অভিনেতা বলেই ন্যায্য পারিশ্রমিক দিয়ে আপনাকে এ ছবিতে নেওয়া হয়েছে। শিখিয়ে পড়িয়ে আরেকজন উত্তমকুমার তৈরি করার দায় আমার নয়।
–তাহলে পরিচালক আর অভিনয় দেখাবে না বলছ?
–পরিচালক তো অভিনয় দেখান না, দেখান পরিবেশ, বোঝান পরিস্থিতি। সেটা ডায়লগ পড়ার সময়ই আমি করেছি। বাকি দায়িত্ব আপনার।
এরপরেই ভুরু কুঁচকে আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে উত্তমদা ক্যামেরার সামনে থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলেন। বুঝলাম, নিজেকে তৈরি করছেন। দু’-তিন মিনিট পর ফিরে এসে শুধু বললেন, ‘Let us try’।
প্রচলিত নিয়মে আমি চিৎকার করে বললাম, ‘Light!’ মুহূর্তে সেটের সব আলো জ্বলে উঠল। ‘Start, sound’ রেকর্ডিস্টের উত্তর এল, ‘Running’ তারপর, ক্যামেরা চলতে শুরু করল। ‘Action’ বলতেই আমি ক্যামেরার পাশ থেকে ইনফরমারের সংলাপগুলো বলতে শুরু করলাম– ‘হয়তো খাতায় নাম লিখিয়েছে…’ ইত্যাদি।
হঠাৎ যেন সিংহের গর্জন– ‘Stop it, stop it!’ হ্যাঁ, সেই আশ্চর্য অভিব্যক্তি! সেই উত্তম!
কোটি টাকার শট! মুহূর্তের জন্য ‘Cut’ বলতেও ভুলে গিয়েছিলাম। প্রতিবাদ, অভিব্যক্তি, সংযম– সব মিলিয়ে উত্তমদা যে অভিনয়টি সেদিন করলেন, তা ছিল আমার প্রত্যাশার বহু ঊর্ধ্বে। শেষপর্যন্ত ‘Cut’ বলে এগিয়ে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে মহানায়ককে প্রণাম করেছিলাম। উত্তমদার ব্যবহারে অবশ্য কোনও উচ্ছ্বাস ছিল না। পেশাদারের মতো নিস্পৃহ গলায় শুধু বললেন, ‘পরের শট বলো।’
সেদিনের বাকি শুটিংটা বেশ অন্যমনস্ক হয়েই শেষ করেছিলাম। একসময় উত্তমদার কাজ শেষ হয়ে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘পলাশ, তোমার আজ প্যাকআপ কখন?’ আধ ঘণ্টার মধ্যে হবে শুনে বললেন, ‘ঠিক আছে। তুমি প্যাকআপ করে আমার সঙ্গে দেখা করো। কথা আছে। আমি মেকআপ রুমে তোমার জন্য অপেক্ষা করব।’

চোখের সামনে যেন দপ করে সব আলো নিভে গেল। বুঝলাম সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। উত্তমদা কি আর কাজ করবেন না? মনে মনে চরম বিপর্যয়ের জন্য একরকম মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম।
যথাসময়ে দুরুদুরু বুকে মহানায়কের মেকআপ-রুমের বন্ধ দরজায় টোকা দিতেই ভিতর থেকে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনলাম, ‘এসো পলাশ, দরজা খোলা আছে।’
দরজা ঠেলে ঢুকে অবাক হয়ে গেলাম। সুপুরুষ উত্তমকুমার সাদা পাজামা ও কালচে রঙা পাঞ্জাবি পরে, মেকআপ টেবিলের সামনে হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসে আছেন, বড় একটি আয়নার দিকে মুখ করে। হাতে কাচের গ্লাসে ভর্তি চা। সেদিন উত্তমদার মুখের হাসি আর তৃপ্তির আলো তাঁকে আরও সুন্দর, যেন কিছুটা স্বর্গীয় করে তুলেছিল। সেই রূপ দেখে মানসিক অস্থিরতার মধ্যেও মনে হয়েছিল– মানুষ এত সুন্দরও হয়!

মেকআপ রুমে ছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট মেকআপ-ম্যান শম্ভুদা। উত্তমদা তাঁকে বললেন, ‘শম্ভু, বাইরে যা। দেখিস কেউ যেন না ঢোকে। আমার পলাশের সঙ্গে কথা আছে।’ শম্ভুদা বেরিয়ে গেলেন। আমার মনে তখন প্রবল ভয়! কপালে মারধোর জুটবে কি না, কে জানে! কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামির মতো অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার দিকে পিছন ফিরে বসে থাকা উত্তমদার কথাতেই যেন আবার বাস্তবে ফিরলাম। আয়নায় দেখছি উত্তমকুমারের প্রতিবিম্বের ঠোঁট নড়ে উঠল:
–পলাশ।
–বলুন।
–তুমি আজ আমার ওপর খুব অসন্তুষ্ট হয়েছ, না?
খানিক আমতা আমতা করে বললাম, ‘না, মানে…’
উত্তমদা আয়নার মধ্য দিয়ে আবার বললেন, ‘আচ্ছা পলাশ, তুমি কোনওদিন রেসের মাঠে গিয়েছ?’
আমি থতমত, প্রশ্নের পিঠে ধেয়ে এল আরেক প্রশ্ন, ‘রেসের মাঠে ঘোড়দৌড় দেখেছ?’
ঘাড় নেড়ে বললাম, ‘না।’
খানিকটা উত্তেজিত হয়ে উত্তমদাই বললেন, “দৌড়নোর আগে পিঠে নতুন জকি উঠলে রেসের ঘোড়া সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে। তারপর কী করে জানো? নতুন জকিকে পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সে যদি বুঝতে পারে নতুন জকি কড়া ধাতের, দক্ষ– দু’হাতে ঘোড়ার ঘাড়ের লোম চেপে ধরে, দু’পা দিয়ে পেটে আঘাত করছে– তখন সেই ঘোড়া নিশ্চিন্ত মনে ডবল স্পিডে দৌড়োয়, মনের আনন্দে।”
বসা অবস্থাতেই দু’হাতে কাঠের চেয়ারটি ঘুরিয়ে আমার চোখে চোখ রেখে কথাগুলো ছুড়ে দিচ্ছিলেন। তিনি মানুষ, বুদ্ধিজীবী, জনতার কাছে মহানায়ক উত্তমকুমার। সত্যিই তো, রেসে নামার আগে তিনি দেখে নেবেন না, তাঁর নতুন জকি, অর্থাৎ নতুন পরিচালক– কতটা দক্ষ, কতটা কাজ জানেন! আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। অপার্থিব সেই রূপের দিকে বোবা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই পারিনি।
উত্তমদা আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আমি খুব খুশি হয়েছি পলাশ, খুব খুশি হয়েছি। এবার বলো, কাল কখন আসব?’
কোনও রকমে বললাম, ‘বলুন, কখন আসবেন?’
বড়ভাই ও অভিভাবকের মতো ধমক দিয়ে বললেন, ‘বোকার মতো কথা বলো না। পরিচালক পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কথা বলো। তুমি আমাকে ভালো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছ, অভিনয় করতে সাহায্য করছ, ভালো পারিশ্রমিক দিচ্ছ– তুমি হুকুম করবে, কেমন?’

‘নব দিগন্ত’-এরই আরেক দিনের ঘটনা। ‘হ্যারি ব্যান্ডো’ জীবনযুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন। বাঁচার কোনও আশা নেই। আত্মহননের চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। আত্মহত্যা শুধু পাপ নয়, অপরাধও। সেই অপরাধে হ্যারি ব্যান্ডোর নয়, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিচার হচ্ছে। মলিন ধুতি-পাঞ্জাবি, গালভর্তি কাঁচা-পাকা দাড়ি, চোখের তলায় কালি, বিভ্রান্ত দৃষ্টি– কোর্টে নিজেই সওয়াল করবেন তিনি।
লাঞ্চের ব্রেক হয়েছে। সবাই ফ্লোর ছেড়ে স্টুডিও-র ক্যান্টিনে যাচ্ছে। স্বাভাবিক নিয়মে উত্তমদাও মেকআপ রুমে গিয়ে খাবেন। হঠাৎ বললেন, ‘পলাশ, আমাকে এখানে একটা চেয়ার দিতে বলো।’
ভাবলাম, ফ্লোরেই বসে লাঞ্চ করবেন। ব্যবস্থা করতে এগতেই বাধা দিয়ে বললেন, ‘ব্যস্ত হোয়ও না। আজ আর লাঞ্চ করব না। এই ফ্লোরেই থাকব। আর ফ্লোরের গেটে কাউকে দাঁড় করিয়ে দাও, কেউ যেন আমায় বিরক্ত না করে।’
আমি প্রতিবাদ করে বললাম, ‘আমরা সবাই খাব, আর আপনি খাবেন না! না খেয়ে কাজ করবেন? তা কী করে…’
কথা শেষ করার আগেই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তোমার সম্বন্ধে আমার ধারণা বদলে যাচ্ছে পলাশ। তুমি তো সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো। তোমার মূল্যবোধ সম্বন্ধে আমার ধারণা বদলাতে বোলো না।’

অর্থ বুঝতে না পেরে বোবা বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম। আমার চোখের ভাষা বুঝেই বোধহয় সহজ গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা পলাশ, তুমি তো স্কুল ফাইনাল তোমার গ্রামের স্কুল থেকে পাশ করেছ? কতদিন আগে?’
–বছর কুড়ি আগে।
–ফাইনাল পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়তে না?
–পড়তাম।
–রাত্রে কী খেতে?
–মুড়ি।
–সারা বছর কি রাতে মুড়ি খেতে?
হেসে বললাম, ‘আসলে ভাত খেলে রাত জেগে পড়তে পারতাম না। ঘুম আসত।’
আমার কথা কেড়ে নিয়ে উত্তমদা বললেন, ‘তাহলেই বোঝো! এরকম মানসিক পরিস্থিতিতে থাকা একটা চরিত্রে অভিনয় করার আগে ভরপেট খেলে কোনওদিন সঠিক অভিব্যক্তি ফোটানো সম্ভব? তুমিই বলো!’

সত্যিই কিছু বলতে পারিনি সেদিন। হিমালয় বোধহয় ফাঁকতালে হওয়া যায় না। পরিশ্রম এবং আন্তরিক একাগ্রতা দুই-ই ওঁর মধ্যে ছিল পুরোমাত্রায়। উত্তমদার থেকে প্রতিনিয়ত সে-শিক্ষা পেয়েছি। এরপর রাজাসাহেব (১৯৮০) ছবি করতে গিয়েও দেখেছি, রাঢ় বাংলার একজন নারীলোলুপ গ্রাম্য-জমিদার হয়ে ওঠার জন্য, কথ্যভাষার লব্জ আয়ত্ত করতে কী নিবিড় পরিশ্রম করতেন! পোশাক এবং মেকআপের ব্যাপারেও ছিলেন ভীষণরকম খুঁতখুঁতে।

একটা ঘটনা মনে পড়ছে। রাজাসাহেবের লুক টেস্টের দিন উইগ বা পরচুলা কিছুতেই আর পছন্দ হয় না উত্তমদার। শেষমেশ একটা বড় চুলের উইগ খোঁপা বেঁধে পরাতে বললেন, ‘এতক্ষণে ঠিক হল। সাপ খেলাতে ওস্তাদ একজন জমিদারের কী আর সাধারণ হলে চলে?’ উত্তমদার থেকেই জেনেছিলাম যে, ‘সন্ন্যাসী রাজা’ (১৯৭৫) ছবির জন্য ছায়া দেবীর উইগ ব্যবহার করেছিলেন উত্তমকুমার! যাই হোক, উত্তমদার সঙ্গে শেষ দেখা “টেকনিশিয়ান’স স্টুডিও”তে। তখন ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ (১৯৮১)-র শুটিং চলছে, ফ্লোরের বাইরে উত্তমদা আর মৌসুমী বসে রয়েছেন, আমি সন্তর্পণে ওঁদের বিরক্ত না-করে চলে যাচ্ছি, এমন সময় উত্তমদার হাঁক, ‘কী পলাশ। একবার এদিকেও তাকিয়ে দেখো। ছবিতে চান্স না-দিলে কি কথাও বলতে নেই!’ আমি লজ্জিত হয়ে বললাম, ‘না না, তেমন ব্যাপার নয় উত্তমদা।’ মৌসুমীও রসিকতা করে বলে উঠলেন, ‘পলাশদা তোমায় ছবি থেকে বাদ দিচ্ছে বুঝি?’ উত্তমদা আমায় বলার সুযোগ না-দিয়েই বলে উঠলেন, ‘ওর সাধ্য কি আমায় বাদ দেয়? মনে আছে তো পলাশ?’

আমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো মনে পড়ল– ‘নবদিগন্ত’-এর আউটডোর সেরে ফেরার সময় গাড়িতে আচমকা আমার হাতের করকোষ্ঠী মিলিয়ে দেখেছিলেন উত্তমদা। ওঁর জ্যোতিষে অগাধ আস্থা ছিল। শনি, শুক্র, বুধ– কোন গোচর, কোন নক্ষত্র– এইসব মিলিয়ে বলেছিলেন, ওঁর সঙ্গে আমার পার্টনারশিপ না কি অবিচ্ছেদ্য। অন্তত যতদিন উনি বেঁচে থাকবেন। হঠাৎ-ই বলে উঠেছিলেন সেই কথা, যা দিয়ে শুরু করেছিলাম এই আলোচনা– ‘তোমাদের সঙ্গে আমার আগে কেন দেখা হয়নি!’

‘রাজাসাহেব’ মুক্তি পায় উত্তমদার মৃত্যুর পরেপরেই। ‘পূর্ণ’ সিনেমাহলে বসে নিজের ছবি দেখতে দেখতেই টের পেয়েছিলাম যে এ ছবি হিট করবে না! অডিয়েন্স রিয়্যাকশন একদম ভালো নয়। স্বপ্নের নায়ককে ভিলেনরূপে দেখতে চায় না পাবলিক।
আজ উত্তমদার শতবর্ষে তাঁকে নির্দেশনা দেওয়া একমাত্র জীবিত পরিচালক হিসেবে স্বীকার করি, উত্তমদার ভবিষ্যদ্বাণী কিন্তু কাকতালীয়-ভাবে মিলে গিয়েছিল। ‘সুচিত্রা-উত্তম-সৌমিত্র’– ত্রয়ীকে নিয়ে ‘বিজয়িনী’ (১৯৮২) ছবিটি করার চুক্তিও হয়ে গিয়েছিল। ছবিটি পরে তৈরি করলেও সেই পূর্ব-নির্ধারিত কাস্টিং রাখা সম্ভব হয়নি উত্তমদার অকালপ্রয়াণে। খাতায়-কলমে আমার সঙ্গে চুক্তি সই করেই উত্তমদা চলে গিয়েছিলেন ১৯৮০-র ২৪ জুলাই। তাঁর শতবর্ষে সে চুক্তিও যেন হয়ে রয়েছে অক্ষয়, পেয়েছে এক অলৌকক অমরত্ব।
অনুলিখন: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved