২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, তাঁর জন্মশতবর্ষে যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার নন্দন, রবীন্দ্রসদন থেকে শিশির মঞ্চে তাঁকে নিয়ে নানা আয়োজন করছে, তখন আমাদের কেবল তাঁর রুপোলি পর্দার রোমান্টিক রূপের কথাই ভাবলে চলবে না। আমাদের ফিরে তাকাতে হবে পোর্ট ট্রাস্টের সেই তরুণ কেরানির দিকে, যিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের জন্য মঞ্চে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি তুলেছিলেন।
ভবানীপুরের সাতকড়িবাবুর সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। সাতকড়িবাবুর দাদা আর-পাঁচটা বাঙালি বাড়ির দাদার মতোই ক্লাব-সমিতি নিয়ে বেঁচে থাকা লোক। ভাইপোকেও জুড়ে নিয়েছেন জ্যাঠামশাই ক্লাবের কাজেকর্মে। ক্লাবের নাম ‘সুহৃদ সমিতি’। সেই ক্লাবে নাটকের হাতেখড়ি হয় অরুণকুমার চাটুজ্জের! যাকে বলে বিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতার সাধারণ পাড়া-ভিত্তিক থিয়েটার চর্চার একটি আদর্শ উদাহরণ। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণের পর, অরুণকুমারের নাটকের ঝোঁক তো গেলই না, সঙ্গে জুড়লো স্বদেশি মনোভাব। সমমনা কয়েকজন বন্ধু ও থিয়েটার-অনুরাগীদের নিয়ে নিজেই প্রতিষ্ঠা করল ‘লুনার ক্লাব’। সময়টা ১৯৪০-এর দশকের উত্তাল কলকাতা, একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত, অন্যদিকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের দাবানল। ১৯৪২ সালের ঐতিহাসিক ‘ভারত ছাড়ো’ (Quit India) আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জুড়ে থাকছে লুনার ক্লাবের সেই থিয়েটার করা ছেলেটি, পথে নেমে প্রভাত ফেরিতেও অংশ নিচ্ছে। আজকে নেতাজী কতটা দেশপ্রেমিক, সেসব মাপার নিত্যনতুন বাটখারা বেরিয়েছে, কিন্তু সেই সময়টা ছিল আলাদা। সেই ১৯৪৫ সালে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা আজাদ হিন্দ ফৌজের সাহায্যার্থে সারা দেশ জুড়ে বিপুল আলোড়ন এবং তহবিল সংগ্রহের কাজ চলছিল। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে ‘আনন্দমঠ’ মঞ্চস্থ করা এবং ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি উচ্চারণ করা ছিল চরম রাজদ্রোহের শামিল। তা সত্ত্বেও অরুণকুমার তাঁর ‘লুনার ক্লাব’-এর বন্ধুদের নিয়ে ‘আনন্দমঠ’ নাটকের মঞ্চায়ন করলেন। সেই সময়ের নিরিখে বিপুল টাকা সংগৃহীত হয়েছিল– ১৭৫০ টাকা! এই সম্পূর্ণ অর্থ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সতীশচন্দ্র বসুর হাতে আইএনএ (INA) ফান্ডের জন্য তুলে দিল সেই লুনার ক্লাবের সভ্যবৃন্দ, অরুণকুমারের নেতৃত্বে। কিন্তু ক্লাব-নাটক করে তো সংসার চলে না। অগত্যা পোর্ট ট্রাস্টে ২৭৫ টাকার কেরানির চাকরি জুটিয়ে নিয়েছিল সেই অরুণকুমার, সালটা ১৯৪৬।

এরপর ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টের ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। এই সময়েও সেই থিয়েটার-কর্মী ছেলেটি নিজে সম্প্রীতির গান লিখে, সুর দিয়ে পথে পথে গেয়ে বেরিয়েছিল শান্তির বার্তা প্রচারের জন্য। এই সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধ পরবর্তীকালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘শিল্পী সংসদ’-এর রূপরেখা নির্মাণে অনুঘটকের কাজ করেছিল। এতক্ষণে সবাই বুঝে গিয়েছেন ছেলেটি বাংলার ম্যাটিনি আইডল। ‘ফ্লপমাস্টার জেনারেল’ থেকে ‘টু দ্য টপ, টু দ্য টপ, টু দ্য টপ’-এর এক স্বপ্নের উড়ানের সওয়ার উত্তমকুমার। যাঁর সিনেমা দেখেছি আমরা, কিন্তু তাঁর নাট্যকর্মী জীবন সম্পর্কে ততটা খোঁজ রাখি না।

বাংলা পেশাদার থিয়েটারের ইতিহাসে স্টার থিয়েটার এবং মিনার্ভা থিয়েটারের স্থান অবিসংবাদিত। ১৮৮৩ সালে হাতিবাগানে প্রতিষ্ঠিত স্টার থিয়েটার এবং ১৮৯৩ সালে বিডন স্ট্রিটে নির্মিত মিনার্ভা থিয়েটার ছিল গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অমৃতলাল বসু, শিশিরকুমার ভাদুড়ী এবং অহীন্দ্র চৌধুরীর মতো দিকপালদের বিচরণক্ষেত্র। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই উত্তমকুমারের পেশাদার থিয়েটারে আত্মপ্রকাশ এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা সমকালীন থিয়েটারের সমস্ত পূর্বনির্ধারিত সমীকরণকে বদলে দেয়। ১৯৫৩ সাল। চলচ্চিত্র জগতে তখন উত্তমকুমার ধীরে ধীরে তাঁর পায়ের তলার মাটি শক্ত করছেন। ‘বসু পরিবার’ (১৯৫২) এবং ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৩)-এর ব্যাপক সাফল্যের পর তিনি তখন একজন প্রতিশ্রুতিমান তারকা, বাংলা চলচ্চিত্রের নতুন রোমান্টিক আইকন। ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই স্টার থিয়েটারের ঐতিহাসিক মঞ্চে উপস্থাপিত হয় ‘শ্যামলী’ নাটক। প্রখ্যাত নাট্যকার ও নির্দেশক দেবনারায়ণ গুপ্তের রচনা ও নির্দেশনায় এই নাটকটি বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই নাটকে উত্তমকুমারের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন কাবেরী বসু, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, অনুপকুমার, অনুভা গুপ্ত এবং অহীন্দ্র চৌধুরীর মতো লব্ধপ্রতিষ্ঠ শিল্পীরা। নাটকের মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছিল একটি বোবা (বাক প্রতিবন্ধী) মেয়ের প্রতি নায়কের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সমাজের চরম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাদের যৌথ সংগ্রামের মর্মস্পর্শী আখ্যানকে কেন্দ্র করে। উত্তমকুমারের পরিমিতিবোধ ও সূক্ষ্ম আবেগ-প্রকাশ এবং কাবেরী বসুর নীরব অভিনয়ের রসায়ন দর্শকদের আক্ষরিক অর্থেই আবেগাপ্লুত করেছিল। ‘শ্যামলী’ নাটকের জনপ্রিয়তা সমকালীন বাংলা থিয়েটারের সমস্ত রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল। স্টার থিয়েটারের মঞ্চে এই নাটকটি টানা ৪৮৬ রজনী সগৌরবে এবং হাউসফুল হিসেবে অভিনীত হয়েছিল, যা সেই যুগের নিরিখে (এই যুগেও বটে!) একটি অবিশ্বাস্য মাইলফলক।

উত্তমকুমার তখন চলচ্চিত্রের একচ্ছত্র ‘ম্যাটিনি আইডল’। সেলুলয়েডের সেই অধরা স্বপ্নপুরুষকে রক্তমাংসের শরীরে মঞ্চের ওপর জীবন্ত দেখার জন্য স্টার থিয়েটারে প্রতিদিন অগণিত মানুষের ঢল নামত। এই উন্মাদনা এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, অভিনয়ের দিনগুলিতে উত্তর কলকাতার হাতিবাগান ও সংলগ্ন এলাকার বাস, ট্রাম এবং অন্যান্য যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যেত। ভিড় সামলাতে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কলকাতা পুলিশকে নিয়মিত হিমশিম খেতে হত এবং প্রায়শই লাঠিচার্জ করতে হত। উত্তমকুমারের কনিষ্ঠ ভ্রাতা, প্রখ্যাত অভিনেতা তরুণকুমার তাঁর রচিত ‘আমার দাদা’ গ্রন্থে এই অভূতপূর্ব উন্মাদনার কথা বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। দর্শকদের এই মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত উত্তমকুমারের পেশাদার থিয়েটার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। পরিস্থিতি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে এবং জনসাধারণের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন চাপে উত্তমকুমার পেশাদার মঞ্চাভিনয় থেকে অবসর নিতে বাধ্য হন। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এমন ঘটনা নিতান্তই বিরল, যেখানে কোনও অভিনেতার অসীম জনপ্রিয়তা ও স্টারডম তাঁর মঞ্চ-জীবনের অকাল সমাপ্তি ডেকে এনেছে। পরবর্তীকালে, থিয়েটারের এই বিপুল জনপ্রিয়তাকে মূলধন করে ১৯৫৬ সালে পরিচালক অজয় কর এই ‘শ্যামলী’ নাটকটিকেই সেলুলয়েডে চলচ্চিত্রের রূপ দেন, যেখানে উত্তমকুমার এবং কাবেরী বসু প্রধান চরিত্রে অবতীর্ণ হয়ে বক্স অফিসে পুনরায় বিপুল সাফল্য অর্জন করেন।

উত্তমকুমারের থিয়েটার চর্চা ও অভিনয়-দর্শনকে গভীরভাবে বুঝতে হলে, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ীর প্রবর্তিত নাট্য-রীতির একটি তুলনামূলক আলোচনা অপরিহার্য। কারণ শিশিরকুমার ভাদুড়ী মঞ্চে যে শরৎ-চরিত্রগুলিকে অমরত্ব দিয়েছিলেন, উত্তমকুমার পরবর্তীকালে সেই একই চরিত্রগুলিকে সেলুলয়েডের পর্দায় জীবন্ত করে তোলেন।

১৯২০-এর দশকে শিশিরকুমার ভাদুড়ী বাংলা থিয়েটারে যে আধুনিকতা ও চরিত্রায়ণে বাস্তবতার জন্ম দিয়েছিলেন, উত্তমকুমার তারই এক পরিমার্জিত রূপ প্রয়োগ করেছিলেন। শিশিরকুমার ভাদুড়ীর অভিনয় ছিল দরাজ কণ্ঠ এবং মঞ্চ-উপযোগী উচ্চকিত প্রক্ষেপণ নির্ভর। অন্যদিকে, উত্তমকুমার থিয়েটারে এবং চলচ্চিত্রে নিয়ে এসেছিলেন এক অভাবনীয় ‘সিনেমাটিক আন্ডারস্টেটমেন্ট’ বা পরিমিতিবোধ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, থিয়েটারের মঞ্চেও অতিরঞ্জিত অঙ্গভঙ্গি বা অতি-নাটকীয় সংলাপ প্রক্ষেপণ ছাড়াও শুধুমাত্র স্বাভাবিক কথোপকথন ও সূক্ষ্ম অভিব্যক্তির মাধ্যমে দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছনো সম্ভব। উত্তমকুমারের এই ‘স্বভাবজাত’ বা ‘ন্যাচারাল’ অভিনয়রীতি ছিল সমকালীন লাউড থিয়েট্রিক্যাল অভিনয়ের বিরুদ্ধে এক নীরব ও নান্দনিক বিদ্রোহ। ‘গৃহদাহ’ উপন্যাসের মহিম চরিত্র বা ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের (যাঁর মূল নাট্যরূপ দিয়েছিলেন শচীন সেনগুপ্ত এবং যা ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়েছিল) সব্যসাচী চরিত্র উত্তমকুমারের অভিনয়ের ছোঁয়ায় এক অনন্য রূপ পায়। শরৎচন্দ্রের ‘বিরাজ বৌ’ (প্রথম প্রকাশ ১৯১৪) উপন্যাসটি শিশিরকুমার ভাদুড়ীর মঞ্চে যেমন আলোড়ন তুলেছিল (যার প্রচলিত নাট্যরূপ তৈরি করেছিলেন কানাই বসু), ঠিক তেমনই ১৯৭২ সালে পরিচালক মনু সেনের নির্দেশনায় চলচ্চিত্রে রূপায়িত হলে তাতে ‘নীলাম্বর’-এর চরিত্রে উত্তমকুমারের অভিনয় এক নতুন মাত্রার জন্ম দেয়। নীলাম্বর চরিত্রটি একজন বুদ্ধিহীন অথচ পরোপকারী এবং গাঁজাখোর এক মানুষের চরিত্র, যে তার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করতে নারাজ। স্ত্রী বিরাজমোহিনী (মাধবী মুখোপাধ্যায়) এবং ভাই পীতাম্বর (অনুপ কুমার)-এর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, জমিদারের কুদৃষ্টি এবং পরিশেষে স্ত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নীলাম্বরের যে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটে, তা উত্তমকুমার অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

পেশাদার বাণিজ্যিক মঞ্চ থেকে বাধ্য হয়ে সরে দাঁড়ালেও, থিয়েটারের প্রতি উত্তমকুমারের নাড়ির টান কখনও ছিন্ন হয়নি। তাঁর এই অদম্য নাট্যপ্রেম এবং টালিগঞ্জ ও থিয়েটার পাড়ার দরিদ্র সহ-শিল্পীদের প্রতি তীব্র সহানুভূতি একীভূত হয়ে জন্ম দেয় ‘শিল্পী সংসদ’-এর। কেবল নিজের পকেটের টাকা দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি, তহবিল সংগ্রহের জন্য তিনি আবার ফিরে আসেন থিয়েটারের মঞ্চে। ‘শিল্পী সংসদ’-এর ব্যানারে নাটক প্রযোজনা, পরিচালনা ও অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি অবতীর্ণ হলেন এক নতুন পরিচয়ে– কণ্ঠশিল্পী। নচিকেতা ঘোষের সুরে, কোনও প্লে-ব্যাক গায়কের সাহায্য ছাড়াই, মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের কণ্ঠে তিনি গাইলেন বৈষ্ণব পদাবলি। এই ঘটনা প্রমাণ করে, একজন থিয়েটার কর্মী হিসেবে তিনি কতটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলেন। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, তাঁর জন্মশতবর্ষে যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার নন্দন, রবীন্দ্রসদন থেকে শিশির মঞ্চে তাঁকে নিয়ে নানা আয়োজন করছে, তখন আমাদের কেবল তাঁর রুপোলি পর্দার রোমান্টিক রূপের কথাই ভাবলে চলবে না। আমাদের ফিরে তাকাতে হবে পোর্ট ট্রাস্টের সেই তরুণ কেরানির দিকে, যিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের জন্য মঞ্চে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি তুলেছিলেন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved