Marginalized Lives: The Struggle for Survival। Robbar
Robbar
  • ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবন যন্ত্রণা

প্রমদাদিকে মায়ের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল দিদির পড়ার আগ্রহ। আমরা যখন বসে পড়তাম কিংবা মা-কে দেখত গল্পের বই হাতে, ও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। মা দু’-একবার বলেছে, ‘সন্ধ্যার পরে যদি আমার কাছে আসিস প্রমদা, আমি পড়া শিখায়ে দিব। তোর এত পড়ার ইচ্ছা।’ ভারি করুণ করে হাসত প্রমদাদি, ‘ই বারে আর হইল নাই মা, ফিরে বারে শিখে লিব।’

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ১৭:৪৬   
Facebook WhatsApp Messenger

১৯.

আমাদের ছোটবেলায় বাড়িতে পুজোর সময় নতুন জামাকাপড় বিশেষ কেনা হত না। মামাবাড়ি বা ঠাকুমার কাছ থেকে যে দুটো-একটা আসত, তাই সব। তাতে দুঃখের প্রশ্নই ছিল না, বন্ধুদের বেশিরভাগেরই ছিল ওইরকমই। মা পুজোর আগে দোকানে গিয়ে নতুন কাপড় কিনতেন কেবল কয়েকজনের জন্য। তাদের একজন যদি হয় রোজ মা-কে রিকশা করে বাসট্যান্ডে পৌঁছতে আসা বরুণভাই আর তাঁর ছেলেমেয়েরা; অন্যরা ছিলেন প্রমদাদি, তাঁর বর মধুদাদা আর ওদের মেয়ে।

সেই ৫০ বছর আগে পুরুলিয়ার সব বাড়িতে স্যানিটারি পায়খানা ছিল না। সেরকম অনেকগুলো বাড়িতে মিউনিসিপালিটির নিযুক্ত সাফাইকর্মী ছিল প্রমদাদি। ওর ছোটছেলের খুব অসুখের সময় যখন ডাক্তারদের অনেকে সেই বাচ্চাকে দেখেননি, মা তখন নিজে সঙ্গে করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে বকাবকি করে চেনা ডাক্তারের কাছে তাকে ভর্তি করে এসেছিল। বাঁচেনি অবশ্য বাচ্চাটা। পাড়ায় মাকে কিছু কথাও শুনতে হয়েছিল, কিন্তু মা ওরকমই। সেই থেকে মা-কে ‘মা’ বলত প্রমদাদিও।

প্রমদাদি যখন বিকেলে বা সন্ধ্যায় আমাদের বাড়ি আসত, পরিষ্কার হাতে কাচা শাড়ি, তেল দিয়ে আঁচড়ানো চুলের মাঝখানে সিঁদুর পরা। সঙ্গে মধুদাদা। মধুদাদাকে মা ‘জামাই’ বলত। খুব সুন্দর বাঁশি বাজাত মধুদাদা। ওরা আসত সন্ধের পর। সব কাজপাট শেষ করে। যেদিন আসত, রাতের খাবার খেয়ে যেত। খুব সাধারণ বাড়িতে রোজ যেমন রান্নাবাড়ি হয় তাই-ই। তার আগে অবধি উঠোনে বসে বাঁশি বাজাত। প্রমদাদি একেকদিন মায়ের পায়ে তেল দিয়ে দিত। বারণ করলে শুনত না।

zoom
শিল্পী: শান্তনু দে

আমরা ওপাড়ায় যাওয়ার পর প্রথমদিকে পাড়ার কয়েকজন উঁচুজাতের মহিলা এসেছিলেন মায়ের সঙ্গে আলাপ করতে। সেই ১৯৬৫ সালে যে শাঁখাসিঁদুর পরা মহিলা ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাড়িভাড়া করে একলা থাকে, হিন্দিভাষী স্কুলে পড়ায় এবং যার নামে অন্যান্য সব ভয়াবহ কথা শোনা যায়, কিছুটা তাকে দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করতে। এসে সেই কথারই অবতারণা করেন তাঁরা–

‘তুমি না কি বাউরির হাতের জল খাও? ওদের ঘরে উঠতে দাও?’ মা বেশ স্বাভাবিক শান্তভাবেই বলেছিল, ‘হ্যাঁ। আমার কাছে যে মেয়ে কাজ করে, সে খুব ভালো মেয়ে। বুদ্ধি আছে, কাজ শেখার আগ্রহ আছে। স্বভাবে ভালো আর পরিষ্কার হলে আমি সকলের হাতের জল ভাত-সব খাই। নোংরা ব্রাহ্মণের হাতে খাই না।’

সেই প্রথমদিন আমাদের বিজলাদিকে নিরীক্ষণ করে, চা-জল কিছুই না-খেয়ে গম্ভীরমুখে চলে গিয়েছিলেন তাঁরা। পরে কালে কালে অবশ্য সবই সহজ হয়ে গিয়েছিল। চা-কফি কেন মায়ের লক্ষ্মীপুজোর প্রসাদও খেয়েছেন সবাই। মা-ও কোনও কাজেকর্মে গিয়েছেন তাঁদের বাড়ি। কাজেই প্রমদাদিদের আমাদের বাড়িতে আসা, খাওয়া, গল্প করা নিয়ে প্রকাশ্যে আর কথা হয়নি বোধহয়।

প্রমদাদিকে মায়ের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল দিদির পড়ার আগ্রহ। আমরা যখন বসে পড়তাম কিংবা মা-কে দেখত গল্পের বই হাতে, ও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। মা দু’-একবার বলেছে, ‘সন্ধ্যার পরে যদি আমার কাছে আসিস প্রমদা, আমি পড়া শিখায়ে দিব। তোর এত পড়ার ইচ্ছা।’ ভারি করুণ করে হাসত প্রমদাদি, ‘ই বারে আর হইল নাই মা, ফিরে বারে শিখে লিব।’ নিজেদের একমাত্র মেয়েকে কিন্তু ইশকুলে দিয়েছিল। ততদিনে সেটা সম্ভব হয়েছে। শহরের মিউনিসিপালিটির স্কুলে তখন মায়ের ছাত্র টিচার। ওদের দু’জনের কাছে যেন সেই মেয়েই ছিল সারাদিনের চিন্তাভাবনা। শহরে পুরোপুরি স্যানিটারি ব্যবস্থা হয়েছে। ওরা দু’টি শান্ত মানুষ ঝাঁট দেওয়ার কাজ করে। পথঘাট পরিষ্কার রাখে নিজেদের হাত-পায়ের মতো। মায়ের কাছ থেকে ছবির বই নিয়ে যাওয়া ছেড়ে নিয়ে যায় ছোট ছোট গল্পের বই। ওদের মেয়ে সুমঙ্গলা স্কুলের বই থেকে গল্প বলে নিজের মা-বাবাকে।

zoom
শিল্পী: শান্তনু দে

বুকের অসুখ ধরা পড়ে বাঁশি বাজানো বন্ধ হয়ে গিয়েছে মধুদাদার! প্রমদাদি মাঝেমধ্যে আসে আমাদের বাড়ি। পুজোর আগে ঠিক মধুদাদাকেও নিয়ে আসে সঙ্গে করে। রিকশায় বসিয়ে। নতুন কাপড় পরে দেখাতে আসে দু’জনে। সুমঙ্গলা উঠেছে ক্লাস টেনে। ফাইনাল পরীক্ষা। আনন্দে উত্তেজনায় সরস্বতীর প্রসাদী ফুল নিয়ে গেল প্রমদাদি, ওর কপালে ঠেকিয়ে দেবে। সুমঙ্গলা লেখাপড়ায় ভালো মেয়ে। খুব মনোযোগী। পরীক্ষা দিয়ে কোশ্চেন পেপার নিয়ে দেখাতে এল। ওর কথা শুনে মনে হল ভালোই দিয়েছে। আমি ফিরে গিয়েছি হোস্টেলে। দু’সপ্তাহ পর শুনি– বিষ খেয়েছে সুমঙ্গলা! রেজাল্ট বেরনোর আগের সপ্তাহে ওর বন্ধুর কাকা, তিনি ডিআই অফিসের পিওন, এসে বলেছেন তিনি লিস্ট দেখে এসেছেন সুমঙ্গলার নাম নেই। রাত্রে ঘরে থাকা পরিষ্কার করার অ্যাসিড খেয়ে নিয়েছে মেয়ে। বড্ড বেশি স্বপ্ন দেখেছিল পাশ করে আরও পড়াশুনো করে বাবা-মাকে কত যত্ন করে রাখবে, কী সুন্দর করে দিন কাটাবে। লিস্টে নাম না-থাকার কথা শুনে ধাক্কাটা এত বেশি লেগেছে যে, একটুও আর ধৈর্য ধরতে পারেনি। লিস্ট বেরলে দেখা গেল সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করেছে সুমঙ্গলা, কিন্তু সে তখন সদর হাসপাতালে ভর্তি। প্রাণে বেঁচেছিল কিন্তু খাদ্যনালীটা বাঁচল না!

ঝকঝকে মেয়েটা শুয়ে রইল বিছানায়। নুন-ঝাল-তেল ছাড়া শুধু লিকুইড ফিডের ব্যবস্থা করত প্রমদাদি। মধুদাদা রিটায়ার করল। লাল কিংবা সবুজ চওড়া পাড়ের মলিন শাড়ি পরা প্রমদাদি এক একদিন মায়ের কাছে এসে বসে থাকত কাঁদতে।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ-এর অন্যান্য লেখা

……………………

Equality Human Rights Human Struggle Marginalized People Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar School Final Society and Culture struggle of women Survival Struggle

Share this article on