memoir of dwijen bandyopadhyay by his co-actor | Robbar
Robbar
  • ৫ আশ্বিন ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দ্বিজেনদা একাই একশো

দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় ও দেবাশীষ মজুমদারের নেতৃত্বে ‘শূদ্রক’ নাট্যদলের মহলাকক্ষ ছিল বীরপাড়া লেনের এই বাড়িটি। বাড়িতে ছিল ডাক্তার-বাবার চেম্বার। সেখানে রোজ বিচিত্র মানসিকতার মানুষ চিকিৎসা করাতে আসত। সেইসব মানুষের কথা বলা, কার্যকলাপ, তাদের জটিল মনের কোণে যে চোরা আলোছায়া খেলে যায়, তার অভিব্যক্তি সব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন দ্বিজেনদা। এক একটি চরিত্র এসে ধরা দিত, অভিনয়ের অনেক জটিল চরিত্র-সৃষ্টিতে সহায়ক হত।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ২২:০৮   
Facebook WhatsApp Messenger

একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করে লেখাটা শুরু করি। মনে পড়ে, আমরা এসেছি শিলিগুড়ি নাট্য উৎসবে অভিনয় করতে। আমাদের প্রযোজনা ‘ছাড়িগঙ্গা’ নাটকের। আমরা পৌঁছে গিয়েছি দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে যথাসময়ে। শুধু নাটকের অন্যতম প্রধান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আসেননি। উনি আসবেন সকালের প্লেনে। ঘন ঘন বাইরের দিকে তাকাচ্ছি, এত কুয়াশা যে দু’ হাত দূরের জিনিস দেখা যায় না। মনে মনে দুশ্চিন্তা হচ্ছে যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্লেনে আসতে পারবেন তো?

আশঙ্কাই সত্যি হল, সকালের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফলে ঘন ঘন ফোন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় জানালেন উনি সকাল থেকে দমদম এয়ারপোর্টে বসে আছেন এবং সারাদিন বসে থাকবেন প্লেন ধরার জন্য। কিন্তু বিপর্যয় এল বিকেলে। আমরা জানলাম উনি বসে আছেন, কিন্তু শিলিগুড়িতে কুয়াশার জন্য প্লেন নামতে পারবে না বলে এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ বিকেলের প্লেন বাতিল করেছে।

zoom
‘ছাড়িগঙ্গা’ নাটকের একটি দৃশ্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়

অগত্যা উপায়? সমস্ত টিকিট বিক্রি হয়ে গিয়েছে, দর্শকরা আমাদের প্রযোজনা দেখবেন বলে অপেক্ষারত। নাট্য উৎসবের কর্মকর্তারা মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একজন কর্মকর্তা বিকেলে এসে কাঁচুমাচু মুখে বললেন, ‘দ্বিজেনবাবু, কিছু একটা করা যায় না! অন্য কোনও নাটক?’ চমকে উঠলাম! কারণ আমরা মাত্র পাঁচজন এসেছি। অন্য নাটক করব কী করে? আর তাছাড়া নাটকের সেট কী করে হবে?

হঠাৎ দ্বিজেনদা বলে উঠলেন, ‘হবে’। আমরা আমাদের প্রযোজনা ‘মনশ্চক্ষু’ মঞ্চস্থ করব। আবারও চমকের পালা। কারণ ‘মনশ্চক্ষু’ নাটকে ১৮টা চরিত্র আর আমরা পাঁচজন। দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন, “এটা ‘সংস্তব’-এর সম্মানের প্রশ্ন, আমাদের পারতেই হবে।”

‘নটরঙ্গ’ নাট্যদল ওই উৎসবে অভিনয় করতে এসেছিল। ওই দলের সেট দিয়ে দ্বিজেনদা সেট বানিয়ে ফেললেন। সেটাও একটা অভিজ্ঞতা। দ্বিজেনদা বললেন, ‘তোমরা প্রত্যেকে দুটো করে চরিত্র করবে, দ্রুত তৈরি হয়ে নাও। বাদবাকি আমি সামলে দেব। আর বাকি চরিত্র যা থাকবে আমি এমন করে উপস্থাপিত করব যে, সেই চরিত্রের হয়ে বলা কথা আমি বলে দেব।’ আমরাও মোটামুটি দুরুদুরু বক্ষে তৈরি হয়ে নিলাম।

zoom

হল-ভর্তি দর্শকের সামনে শুরু হল অভিনয়। ‘ছাড়িগঙ্গা’ নাটকের পরিবর্তে ‘মনশ্চক্ষু’। দেখলাম, দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ অভিনয়। এর আগে আমরা বহুবার এই নাটকের অভিনয় করেছি। কিন্তু এ এক অন্য দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়। পুরো নাটকে তাঁর সহস্রধারার মতো অবাধ গতি। অন্য চরিত্রগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপিত করছেন, দর্শকের মনে হচ্ছে চরিত্রগুলো তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। নিজে সেলফ-পোর্ট্রেট হয়ে সহস্র বাতির আলোর মতো ফুটে উঠছেন। আমার কোনও শব্দ জানা নেই– কীভাবে এই অবিশ্বাস্য অভিনয়ের বর্ণনা করব!

নাটকের শেষে উঠে দাঁড়িয়ে দর্শকের সমবেত হাততালি বলে দিল যে, আমরা ওঁদের মন জয় করতে পেরেছি। বহু দর্শক মুগ্ধ বিস্ময়ে দ্বিজেনদাকে প্রশ্ন করছেন, কীভাবে তিনি এটা পারলেন? অভিনয় ক্ষমতার কোন উচ্চতম শিখরে উঠলে এটা সম্ভব! অভিনয়ের শেষে আমি দ্বিজেনদাকে বললাম, এখন মনে হচ্ছে এই নাটকে এতগুলো চরিত্রের কোনও দরকার ছিল না। আপনি একাই একশো। দ্বিজেনদা মুচকি হাসলেন।

zoom
ছবি: অমিতাভ চ্যাটার্জি

এই হলেন দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়! অনেক অনেক দুর্দান্ত অভিনয় করেও নির্লিপ্ত, নিশ্চুপ। প্রচারের কোনও ঢক্কানিনাদ নেই, নীরবে নিজের কাজ করে যাওয়াতেই তাঁর আনন্দ। ভিন্ন ধারার থিয়েটারে তিনি বিশ্বাসী। দ্বিজেনদা বিশ্বাস করতেন, থিয়েটারে বাহ্যিক চমক ছাড়াও ভিতরের অন্তঃসলিলা ভাবনাকে তুলে আনা জরুরি। বারবার বলতেন– ‘ওপর ওপর চমক দেখানোর কারসাজিতে নাটকের মাঝে হাততালি পাওয়া যায়, কিন্তু দর্শকের মনে কোনও গভীর দাগ থাকে না। আমার কাজ সেই নাটক করা, যা দর্শককে চিন্তার খোরাক জোগাবে।’ এ হল পরম সত্যের উপলব্ধি। জাত-শিল্পীর চৈতন্যের প্রকাশ।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এক জায়গায় বলছেন, ‘দ্বিজেনকে যে চরিত্র করতে বলা হত, সেটা এমনভাবে উপস্থাপিত করত যেন চরিত্রটা দ্বিজেনের জন্যই লেখা হয়েছে। অন্য কারও জন্য কখনও-ই নয়। এখানেই দ্বিজেনের সার্থকতা। সে অনন্য।’

দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, শ্যামবাজারের কাছে পাল স্ট্রিট অঞ্চলে। বাবা সুধীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ডাক্তার। সুপ্রতিষ্ঠিত মনোশ্চিকিৎসক ও মা গৌরী দেবী। পরে পাল স্ট্রিটের বাড়ির পরিবর্তন করে পাইকপাড়ায় বীরপাড়া লেনে নিজস্ব বাড়িতে বসবাস। এই বীরপাড়া লেনের বাড়িতে নিয়মিত থিয়েটারের মহলা হত। থিয়েটার ফ্রন্ট-এর সুব্রত ঘোষ মহলা দিতেন। পরবর্তীকালে থিয়েটার ফ্রন্টের ‘বাঘবন্দি’ নাটকে দ্বিজেনদার আত্মপ্রকাশ। এই বাড়িতে ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’-এর মহলা হয়েছে নিয়মিত, বড়দা দিনেন্দ্রনাথ থিয়েটার ওয়ার্কশপের অন্যতম শুভার্থী সদস্য। এই থিয়েটারের পরিবেশ দ্বিজেনের কবিসত্তা থেকে অভিনয়-সত্তার প্রকাশ ঘটাল। যদিও স্কুলে থাকাকালীন অনেক নাটকেই দ্বিজেনদা অংশগ্রহণ করেছেন। দ্বিজেনদার কথায় আমি চুপ করে মহলা দেখতাম আর প্রতিটি মুহূর্তে অভিনয়ের মূল বিষয় জানার চেষ্টা করতাম।

zoom

পরবর্তীকালে ‘থিয়েটার কমিউন’ এবং দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় ও দেবাশীষ মজুমদারের নেতৃত্বে ‘শূদ্রক’ নাট্যদলের মহলাকক্ষ ছিল বীরপাড়া লেনের এই বাড়িটি। বাড়িতে ছিল ডাক্তার-বাবার চেম্বার। সেখানে রোজ বিচিত্র মানসিকতার মানুষ চিকিৎসা করাতে আসত। সেইসব মানুষের কথা বলা, কার্যকলাপ, তাদের জটিল মনের কোণে যে চোরা আলোছায়া খেলে যায়, তার অভিব্যক্তি সব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন দ্বিজেনদা। এক একটি চরিত্র এসে ধরা দিত, অভিনয়ের অনেক জটিল চরিত্র-সৃষ্টিতে সহায়ক হত।

দ্বিজেনদার কাছে শোনা সেই সময় শ্যামবাজার মোড়ে সমীর মোদকের চায়ের দোকানে বিখ্যাত নাট্য-ব্যক্তিত্বদের আড্ডাস্থল ছিল। সেখানে আসতেন শ্যামল ঘোষ, বিভাস চক্রবর্তী, মোহিত চট্টোপাধ্যায় আরও অনেক বিখ্যাত মানুষেরা। দ্বিজেনদা শুধু এঁদের আলোচনা শুনতেন, মাঝেমধ্যে মন্তব্য করতেন। কিছু বলার থেকে শোনাটা ছিল জরুরি। বাংলা নাটকের গতিপথ কী হবে বা কী হতে চলেছে– সেই সম্পর্কে আলোচনা দ্বিজেনদার অভিনয়-জীবনে বিশেষভাবে রেখাপাত করেছিল।

zoom
ফ্রিৎজ বেনেভিৎজ, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, অরুণ মুখোপাধ্যায়, শম্ভু মিত্র ও দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: কঙ্কাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়

অভিনয়-জীবনের প্রথমদিকে দ্বিজেনদার ওপর কিংবদন্তি অভিনেতা শম্ভু মিত্রের প্রভাব ছিল। ক্রমে দ্বিজেনদা সেই প্রভাব কাটিয়ে অভিনয়ের নিজস্ব ধারা আবিষ্কার করলেন এবং সেটা দ্বিজেনদার ধারা হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেল। ‘শূদ্রক’-এর পর যখন ‘সংস্তব’ নাট্যদলের প্রতিষ্ঠা হয়, তখন শম্ভু মিত্রের ‘ভালো নাটক ভালোভাবে করব’ এই বাক্যকে মূলমন্ত্র করেছিলেন।

আর একটি কথা না বললেই নয়, দ্বিজেনদার অভিনয়-জীবনকে সযত্নে লালন করেছেন এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার হাত থেকে রক্ষা করেছেন দ্বিজেনদার বড়দা দিনেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই লোকটির নিত্য সাহচর্য দ্বিজেনদাকে মহৎ অভিনেতা হতে সাহায্য করেছিল।

দ্বিজেনদাকে নিয়ে কথা বলতে গেলে আমি নিজে স্মৃতিভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি। অজস্র স্মৃতি মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়, তাই কোনটার পরে কোনটা বলব সেটা বুঝতে পারি না। সাতের দশকে ‘বাঘবন্দী’ ও ‘দানসাগর’ নাটক দিয়ে দ্বিজেনদার আত্মপ্রকাশ। দীর্ঘ ৪০ বছরের নাট্যজীবন অকালে শেষ হল ‘সংস্তব’ প্রযোজনার ‘আইনসিদ্ধ’ নাটকের অভিনয় ও নির্দেশনা দিয়ে। শেষ অভিনয় করলেন ১ জানুয়ারি, ২০১৬, গিরিশ মঞ্চে ‘ভূতনাথ’ নাটকে। এই শেষ অভিনয়ে অভিনেতা হিসেবে আমি তার সাক্ষী হয়ে রইলাম।

মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটক ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। তাই বোধহয় মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘ভূতনাথ’ নাটকের অভিনয়ের মধ্য দিয়েই তাঁর অভিনয়-জীবন শেষ হল। মোহিতীয় দর্শনের সঙ্গে দ্বিজেনদার নাট্যদর্শন মিলে যেত বলে, খুব সহজেই দ্বিজেনদা তাঁর নাট্য-বিষয়কে আত্মস্থ করতেন।

zoom
মোহিত চট্টোপাধ্যায় ও দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়

শিল্পী যেমন রঙের সঙ্গে রং মিলিয়ে আর একটি রং তৈরি করে এবং মাঝেমাঝে অপার বিস্ময়ে সে দেখে, এই রং মেশাতে মেশাতে সে একটি নতুন বর্ণের রং তৈরি করে ফেলেছে। তারপর সেই রঙের সঙ্গে কল্পনা মিশিয়ে ক্যানভাসে ছবি আঁকে। দ্বিজেনদাও মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটকে তাঁর নিজস্ব কল্পনার নতুন রং মিশিয়ে অসাধারণ নাটক তৈরি করতেন। এই ব্যাপারে তাঁর বিশিষ্টতা অনন্য। বিভাস চক্রবর্তী ‘সংস্তব’-এর ‘মুষ্ঠিযোগ’-এর ৫০-তম অভিনয় উপলক্ষে একটি লেখায় দ্বিজেনদা সম্পর্কে বলেছেন–

“স্বধর্মে স্থিত থাকলে নিধন অনিবার্য– এমন একটা ধারণাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বেঁচে থাকার এক ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন দ্বিজেন। যা লোকে সহজে গিলছে শুধুমাত্র তার রেসিপি অনুসরণ বা মান্য করে দ্বিজেনের মত নাট্যশেফ রন্ধন করনে না। যা জীবনে প্রায় নিত্যদিন ঘটছে তারই কোন একটা অংশ বেছে নেন দ্বিজেন। তারপর পাক্কা প্যাথলজিস্টের মত সেই স্পেসিমেনটিকে বীক্ষণযন্ত্রের নীচে ফেলে তিনি চালান তাঁর অনুসন্ধান। পরীক্ষানিরীক্ষার পর তাঁর ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে যে রিপোর্টটি বেরিয়ে আসে, এবং মঞ্চের ওপর যখন সেটি আমাদের সামনে তুলে ধরা হয় সে এক বিচিত্র সৃষ্টি হয়ে ওঠে। নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত এই সমাজের বাইরের চেহারা দেখে রোগ নির্ণয় করা বেশিরভাগ সময় সম্ভব হয় না, তাই এই প্রকার নানাবিধ টেস্টের প্রয়োজন ও আয়োজন। দ্বিজেনডাক্তার যে মেথডে সেই কাজটি করে থাকে তাকে ‘মোহিতীয় মেথড’ বলা যেতে পারে। দ্বিজেন সেই তত্ত্ব এবং পদ্ধতি পাঠ করে, তাকে আত্মস্থ করে কালক্রমে সেই রীতির এক শ্রেষ্ঠ প্রয়োগকর্তা হয়ে উঠলেন। হাঁকডাক নেই, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসাদের প্রয়োজন নেই। আর এটাই হল আমাদের নেই নেই এর থিয়েটারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”

zoom
খেয়ালী দস্তিদার ও দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়

দ্বিজেনদা আমার শিক্ষক, আমার বন্ধু। সম্পর্ক আমার সঙ্গে প্রায় ৩০ বছরের। ‘সংস্তব’ নাট্যদলের জন্মকালের কিছু বছর পর থেকেই। পরিচয়ের আগে দ্বিজেনদার বেশ কিছু নাটকের অসাধারণ অভিনয় আমার দেখা হয়ে গিয়েছে। ফলে প্রথমে পরিচয়ে একটু সংকোচের সঙ্গেই তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলাম। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘সংস্তব’ নাট্যদলে যোগদান করা ও নাট্যদলটিকে ঠিকঠাক গড়ে তোলা। খুব মনে আছে আমাদের আলোচনা হয়েছিল দু’ ঘণ্টার মতো। আলোচনার শেষে বলেছিলেন, “তুমি কোনওদিন ‘সংস্তব’ ছেড়ো না”।

আমি কথা রেখেছি। দ্বিজেনদাই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন অজানালোকে। এই দীর্ঘ ৩০ বছরে আমি কাছ থেকে লক্ষ করেছি ওঁর অসাধারণ অভিনয়-ম্যাজিক। হ্যাঁ, আমি ‘ম্যাজিক’ই বলব। যে অভিনয়ের কোনও দেখানেপনা নেই, অযথা অঙ্গ-সঞ্চালন নেই, নেই কোনও বাড়তি লম্ফঝম্প– তবুও মানুষ অপার বিস্ময়ে, মুগ্ধতায় তাঁর অভিনয় দেখে যাচ্ছে। অভিনয়-শেষেও সেই ঘোর কাটছে না। একটা অদ্ভুত আবেশ, যেটাকে বিশ্লেষণ করা যায় না। কোন মায়াজাদুতে তিনি আচ্ছন্ন করে রাখতেন দর্শকদের, আমি জানি না। অবশ্য আমার মতো দীন মানুষের পক্ষে সেটা জানা সম্ভবও না। দ্বিজেনদা নাটক নির্বাচনেও স্বতন্ত্র। একদম অন্য ধারার নাটক। কোনও সস্তা জনপ্রিয়তার দিকে তিনি হাঁটতেন না।

zoom
‘বলিদান’ নাটকের একটি দৃশ্যে দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়

দ্বিজেনদাকে ওপর ওপর একজন গুরুগম্ভীর মানুষ বলে মনে হত। কিন্তু দ্বিজেনদা মোটেও সেটা ছিলেন না। ভিতরে একটা কৌতুকপ্রিয় মানুষ বাস করত। আর সেই স্বভাবসিদ্ধ কৌতুক দিয়ে তিনি আমাদের নাট্যদলকে সবসময় মাত করে রাখতেন। রিহার্সালের সময় ভুলভ্রান্তি হলে কখনও-ই ‘slang’ ভাষায় গালাগালি করতে দেখিনি। এই ভদ্রতাবোধ আমাকে মুগ্ধ করত। আজকাল অনেক নির্দেশকই এই গালাগালি করে এক ধরনের তৃপ্তি পান, কিন্তু দ্বিজেনদা এর থেকে শতহস্ত দূরের মানুষ। দ্বিজেনদার রিহার্সালে দেখেছি অন্যের ভিতরে যে সম্ভাবনা আছে, তা উনি টেনে বের করতেন। অমুক অমুক জায়গায় বিভিন্ন রকমের প্যাঁচ করব– এমন কোনও জিনিসে উনি বিশ্বাস করতেন না। বরং দ্বিজেনদা স্বভাবকৌতুকে শ্লেষের চাবুক মারতেন। সেটাই আমাদের কাছে যথেষ্ট ছিল। 

দীর্ঘ সময় আমাদের পথ চলতে চলতে কখনও কখনও হয়তো মতান্তর হয়েছে, কিন্তু মনান্তর হয়নি। দ্বিজেনদার একটা কৌতুকবোধের পরিচয় দিই। দ্বিজেনদার ছিল দ্রুত অভিনয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ার অসাধারণ ক্ষমতা। আমাদের ‘এই ঘুম’ নাটকের অভিনয় চলছে। এই অধম একজন ম্যানেজিং ডিরেক্টরের অভিনয় করছে। মঞ্চে অভিনয় করার সময় অভিনয় করতে করতে আমাকে ফিসফিস করে বললেন, ‘জীবনেও ডিরেক্টর হতে পারবি না, আমার ডিরেক্টর সেজেছে দেখো!’ বলেই ফিরে গেলেন ওঁর অবিশ্বাস্য অভিনয়ে। কোন মন্ত্রবলে উনি সেটা করতেন আমি জানি না।

zoom
‘স্পর্ধাবর্ণ’ নাটকের একটি দৃশ্যে দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়

‘মুষ্ঠিযোগ’ নাটকে আমার চরিত্র ছিল বড়দার অর্থাৎ দ্বিজেনদার বড়দার। নাটক চলতে চলতে বলতেন, ‘তোর মতো আমার বড়দা থাকলে আমি আত্মহত্যা করতাম’ বলেই সেই অবিশ্বাস্য অভিনয়। পিছনে লাগাটা আমার ক্ষেত্রেই বেশি হত। বলাবাহুল্য আমিও সেটা উপভোগ করতাম। আমি যখনই এসে বলতাম, ‘দ্বিজেনদা থার্ড বেল দিতে যাচ্ছি’, সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠতেন, ‘থার্ড বেল দিতে হবেই এমন মাথার দিব্যি তোকে কে দিয়েছে? থার্ড বেল দেওয়াটা কোন মহৎ কার্য নয়। একটা পাঠও কিচ্ছু মনে নেই, ভালো লাগে না, কেন যে লোকে থিয়েটার করে কে জানে!’ বলেই সিগারেটে মস্ত টান দিয়ে বলতেন, ‘যাই স্টেজে গিয়ে কিছু একটা করে আসি।’

দ্বিজেনদা ছিলেন বামপন্থী রাজনীতিতে আজীবন আস্থাশীল এক শিল্পী। তাঁর প্রতিটি অভিনয় ও নির্দেশনা দেখলে বোঝা যায়– ভিতর থেকে জীবনকে দেখা, স্বকীয়তার প্রকাশ ঘটিয়ে জীবন সম্পর্কে মৌল প্রশ্ন তোলার দুরূহ পরিক্রমা করে গিয়েছেন সারাজীবন। রাজনীতির আবর্তে শত ঝড়ঝাপটাতেও তিনি শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস বিন্দুমাত্র টলে যায়নি। বিশ্বাসই ছিল বড় শক্তি। এই বিশ্বাসে ভেসে থাকার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর। একটা সময় যখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও ছিল চূড়ান্ত প্রতিকূল অবস্থা, তখনও তিনি বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে নুয়ে পড়েননি।

zoom

দ্বিজেনদা ভীষণ অন্তর্মুখী মানুষ ছিলেন। নিয়মিত ডায়েরি লেখা, কবিতা লেখা, প্রবন্ধ লেখা– সব করতেন। কিন্তু কোনওটাই প্রচারের আলোয় আসেনি। প্রচার-যন্ত্রটাকে বোধহয় এড়িয়ে চলতেন সংগোপনে। তাঁর মতো একজন মহৎ অভিনেতার যতটুকু সম্মান প্রাপ্য ছিল, তা কি উনি পেয়েছেন? ওঁর থেকে অনেক কম গুণী মানুষও যা পেয়েছেন, দ্বিজেনদা তার কিছুই পাননি। যদিও এসব নিয়ে কোনওদিন তাঁকে বিচলিত হতে দেখিনি, তবুও অত্যন্ত সাধারণ নাট্যকর্মী হিসেবে মনে হয় ওঁর প্রাপ্য তো ছিল, তবে কী এমন ঘটল– যা থেকে উনি বঞ্চিত রইলেন?

লেখা শেষ করি দ্বিজেনদার লেখা কবিতা দিয়ে। দ্বিজেনদার তখন ক্লাস ইলেভেন। স্কুলের হেডস্যর বললেন স্কুলের ম্যাগাজিনে লেখা দিতে। বাড়িতে এসেই লিখে ফেললেন কবিতা–

একদিন সব ছিল।
মনে পড়ে পুরাতন প্রান্তর,
বাল্যকালের পিয়ালী নদী,
অনেক দূরে ঢং ঢং ঘণ্টা বাজা,
সুখস্মৃতি, সুখস্মৃতি সবই।
কারা যেন জল দিয়ে যেত প্রভাতী রাস্তায়,
ভিজে পথটুকু বই হাতে সন্তর্পণে,
মাঠে সেই লাইনের গান,
অনুভবে মাঙ্গলিক, আজও মনে আসে।

Dwijen Bandyopadhyay Indian Theatre Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sangstab Soumitra Chatterjee Theatre Theatre acting

Share this article on