actor raj kiran & his tragic story from stardom to zero | Robbar
Robbar
  • ৫ আশ্বিন ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেষ দৃশ্যে নেই কোনও অভিনেতার মুখ

একজন নিখোঁজ মানুষকে ঘিরে শূন্যস্থান খুব দ্রুত গল্পে ভরে যায়। কিন্তু গল্প আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। ২০২৬ সালেও রাজ কিরণের সন্ধান নিয়ে নতুন উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। অভিনেত্রী সোমি আলি জানিয়েছেন, তিনি তাঁর খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবু নিশ্চিত কোনও সন্ধান মেলেনি। তাই রাজ কিরণের গল্পের শেষে কোনও নাটকীয় উত্তর বসানোর সুযোগ নেই। রাজ কিরণের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সবচেয়ে সৎ উত্তর একটাই– আমরা জানি না।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১৪:৩৭   
Facebook WhatsApp Messenger

ভোররাত থেকেই কী প্রবল বৃষ্টি! মনে হচ্ছিল, আকাশটা মাথার ওপরেই নেমে এসেছে। জল থামার নাম নেই। একটানা বৃষ্টির শব্দে চারপাশ ঢেকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, শিবঠাকুর বুঝি এবার সত্যিই শেষ ঘণ্টাটা বাজিয়ে দেবেন।

এই দুর্যোগের মধ্যেই কয়েক মিনিট আগে মুম্বইয়ের মাটিতে চাকা ছুঁয়েছে তুর্কি বিমান সংস্থার উড়ান টিকে-৭২০। হেলসিঙ্কি থেকে ইস্তাম্বুলের পথে শীত তখন নিঃশব্দে শরীরে ঢুকে পড়ছিল। বাল্টিক সাগরের তীরে শীত কেবল দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেখান থেকে ইস্তাম্বুল, তারপর মুম্বই– এশীয় চলচ্চিত্র উৎসবে আমার ছবির প্রদর্শনী। দু’-চার দিন পর আবার কলকাতা।

এক দেশ থেকে আর এক দেশ, এক আকাশ থেকে আর এক আকাশ– ডানায় ভর করে ঝটিকা সফর। অবশ্য এই বয়সে ঝটিকা সফরের শরীরী অর্থ একটু আলাদা। মাথা থাকে মুম্বইয়ে, মন কলকাতায়, আর কোমরটা হয়তো কোনও অচেনা বিমানবন্দরে পড়ে থাকে। দেশে ফেরার অজুহাত আমার কোনওদিনই কম থাকে না। কিন্তু পকেটকেও তো রাজি করাতে হয়। বিমানের ভাড়া যে সারা বছরই আগুন হয়ে থাকে, সেকথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।

ঝোড়ো হাওয়া আর ঘন অন্ধকারের ভিতর দিয়ে গাড়ি হোটেলের দিকে এগচ্ছিল। কাচে একের পর এক জলের ঝাপটা। বাইরে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। সেই জলভেজা কাচের ওপারেই হঠাৎ মনে পড়ল এই মায়ানগরীর এক পুরনো হাওয়া।

এই শহরের আলো যত উজ্জ্বল, তার আড়ালের অন্ধকারও কি তত গভীর?

কত প্রতিভা এখানে সময়ের আগেই ঝরে যায়। কেউ কাজ হারিয়ে সরে যায়, কেউ নিজেই জনজীবন থেকে দূরে চলে যায়। কেউ এমনভাবে হারিয়ে যায় যে বহু বছর পরেও তার শেষ ঠিকানাটুকু জানা যায় না।

মাথার ভিতর তখন একটিই প্রশ্ন– কেন?

সব প্রশ্নের উত্তর জীবনের কাছে থাকে না। কিছু প্রশ্নের সামনে জীবন নিজেই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

সেই মুহূর্তে হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল রাজ কিরণের মুখ। সঙ্গে কোথা থেকে যেন ভেসে এল সেই পুরনো সুর–

‘তুমি এতনা জো মুসকুরা রহে হো,
ক্যায়া গম হ্যায় জিসকো ছুপা রহে হো?’

zoom
রাজ কিরণ

বাইরে তখনও বৃষ্টি। মুম্বই অন্ধকারে ডুবে। গাড়ির কাচ বেয়ে জল নামছে। কিছু মুখ, কিছু প্রশ্ন আর কিছু গান সময় পেরিয়েও আমাদের ছেড়ে যায় না। কোনও এক অপ্রস্তুত মুহূর্তে তারা ফিরে আসে।

কিন্তু এমন রাতে, এমন বৃষ্টির মধ্যে, মুম্বইয়ে ঢোকার ঠিক এই মুহূর্তে রাজ কিরণের কথাই বা কেন মনে পড়ল?

‘অর্থ’-এ তাঁর অভিনয় এখনও মনে থাকে। কিন্তু শুধু সেই অভিনয়ের জন্য নয়। বহু বছর আগে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরে বসে ভারতীয় একটি সংবাদপত্রে তাঁকে নিয়ে ছাপা ছোট্ট একটি খবর পড়েছিলাম। একটি মানুষের এত বড় জীবনের পাশে সংবাদপত্রে জায়গা হয়েছিল কয়েকটি লাইনের। অথচ সেই কয়েকটি লাইন মনে থেকে গিয়েছিল।

মুম্বইয়ে এসে চলচ্চিত্র উৎসবের প্রদর্শনী হয়ে গেল। তারপর আলাপ, আড্ডা, সিনেমা দেখা। গোবিন্দ নিহালনি, সুধীর নন্দগাঁওকারদের সঙ্গে দীর্ঘ কথাবার্তা। গোবিন্দজির সঙ্গে ‘তমস’, ‘আক্রোশ’, ‘অর্ধ সত্য’, কুন্দন শাহের ছবি আর সেই সময়ের চলচ্চিত্র-জগৎ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। পরে সুধীরজির সঙ্গে কথা বলতে বলতে ‘শোলে’, ‘আরাধনা’, শর্মিলা ঠাকুর পেরিয়ে আবার এসে পড়লাম রাজ কিরণে।

সুধীরজি বলেছিলেন, বলিউড থেমে থাকা জল নয়, রাজা। এটা দ্রুত বয়ে যাওয়া নদী। কয়েক মুহূর্ত আগে নদী কোন পাড় ঘেঁষে গিয়েছিল, তার দিকে ফিরে তাকানোর সময় তার নেই।

একসময় কয়েকজন পরিচালকের রাজ কিরণকে প্রয়োজন হয়েছিল। তাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছিলেন। তারপর সময় বদলেছে। বড় ছবি, বড় বাজেট, নতুন মুখ– সব মিলিয়ে তাঁরা সামনে এগিয়ে গিয়েছেন। রাজ কিরণ পিছনে পড়ে গিয়েছেন।

zoom
রেখা ও রাজ কিরণ

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে সুধীরজি বলেছিলেন, ‘তোমরা বাঙালিরা এখনও কিছু বাসি-পচা আবেগ আঁকড়ে বসে আছ। তবে তোমার উদ্বেগটা মানবিক, সেটা ঠিক। চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। হঠাৎ করে তো একজন মানুষ গায়েব হয়ে যেতে পারে না।’

একটু থেমে আবার বলেছিলেন, ‘শোনো রাজা, এই শো-বিজনেসের দুনিয়ায় আমরা মুখের কথা বলতে খুব ভালোবাসি। রাজকে খুঁজে বের করা দরকার। ওকে আবার কাজ দেওয়া উচিত। ওকে সাহায্য করা উচিত। এইসব। ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের আলো নিভে গেলেই সেই কথাগুলোও কোথায় যেন থেমে যায়। তখন আর কাউকে তেমন কিছু বলতে শোনা যায় না।’

আমি চুপ করে গিয়েছিলাম।

সুধীরজি শেষে খুব সহজ গলায় বলেছিলেন–

‘ইয়ে হ্যায় মুম্বই, মেরি জান।’

রাত আরও গভীর হয়েছিল। জানলার বাইরে মুম্বই জেগে ছিল।

কিন্তু রাজ কিরণের জীবনের যে অধ্যায়টি আমাকে তাড়া করছিল, তার শুরু আরও কয়েক বছর আগে।

zoom

১৯৯৬ সালের ৫ জুন। মাঝরাত। অন্ধ্রপ্রদেশের পুট্টাপার্থি।

একটি ট্র্যাক্টর। একটি কাঠের মই। সাঁই বাবার আশ্রমের প্রাচীরের সামনে এক পরিচিত অভিনেতা– যাঁকে দর্শক তখন ‘কর্জ’, ‘অর্থ’, ‘বাসেরা’-র মতো ছবির সূত্রে চেনেন।

আশ্রমে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টার অভিযোগে রাজ কিরণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, ট্র্যাক্টর ও মই ব্যবহার করে তিনি ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। পরে বেঙ্গালুরুর কেন্দ্রীয় জেলে তাঁকে ৩৪ দিন থাকতে হয়।

কিন্তু সেই রাতের উদ্দেশ্য আজও স্পষ্ট নয়।

এক বছর পর সিনে ব্লিৎজ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজ নিজেই সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জেলে থাকার সময়টা ছিল ভয়াবহ ও অনিশ্চয়তায় ভরা। একই সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছিলেন, আশ্রমে প্রবেশের ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে অতিরঞ্জিত হয়েছিল। বহুল আলোচিত সেই ঘটনার ক্ষেত্রে তার নিজের বক্তব্যই তাই অন্যতম প্রত্যক্ষ বিবরণ।

এই সময় তাঁর পেশাগত জীবনও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। বড় ছবির নিয়মিত কাজ আগের মতো আসছিল না। টেলিভিশনেও কাজ করেন; বিনোদ পাণ্ডের ‘রিপোর্টার’-এ অভিনয় করেন। ১৯৯৭ সালের সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, কাজ করতে চান এবং অভিনয়ে ফিরতে আগ্রহী।

zoom
‘কর্জ’ ছবির পোস্টারে রাজ কিরণ

এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। কোনও অস্বাভাবিক আচরণ দেখেই একজন মানুষের মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। রাজ কিরণের ক্ষেত্রেও এমন কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত নথি বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে নেই, যার ভিত্তিতে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব।

পরবর্তী সময়ে তাঁর মানসিক অবস্থাকে ঘিরে যে বিবরণগুলি সামনে এসেছে, সেগুলির উৎস মূলত পরিবার, সহকর্মী এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য। প্রত্যক্ষ তথ্য, স্মৃতিচারণ এবং অনুমান– তিনটিকে আলাদা করেই দেখা দরকার।

মহেশ ভাট জানিয়েছিলেন, তিনি মুম্বইয়ের বাইকুল্লার মসিনা হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগে রাজ কিরণকে দেখতে গিয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে, ‘অর্থ’-এর সময়কার পরিচিত মানুষটির সঙ্গে তখনকার রাজ কিরণের অনেক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তাঁকে আবার কাজের জগতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও হয়েছিল বলে ভাট জানিয়েছেন। তবে এগুলি স্মৃতিচারণ, সম্পূর্ণ চিকিৎসাগত নথি নয়।

রাজ কিরণের কর্মজীবনের পরিবর্তন তাঁর ছবির তালিকাতেও দেখা যায়। ‘কর্জ’ তাঁকে বড় দর্শকের কাছে পরিচিত করে, ‘অর্থ’-এ তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। আটের দশকে নিয়মিত কাজ করেছেন। নয়ের দশকে সুযোগ কমেছে, অপেক্ষাকৃত ছোট চরিত্রে তাঁকে দেখা গিয়েছে। কিন্তু কাজ কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য– এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।

বরং ১৯৯৭ সালের সাক্ষাৎকারে রাজ নিজেই জানিয়েছিলেন, আমেরিকায় তিনি কাজ করেছিলেন এবং জীবনের একটি সময়ে নিজেকে সুখীও মনে হয়েছিল। তাঁর আমেরিকা-যাত্রাকে তাই শুধু হতাশা থেকে পালিয়ে যাওয়ার গল্প হিসেবে দেখার ভিত্তি নেই। তাঁর নিজের বক্তব্যে নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টার কথাই পাওয়া যায়।

zoom
‘অর্থ’ ছবির ক্যাসেট কভার

তারপর সময় এগিয়েছে।

১৯৯৭-এর পর রাজ কিরণের জীবন ধীরে ধীরে ক্যামেরার ফ্রেমের বাইরে সরে যেতে থাকে। কাজ কমেছে, অভিনয়ের সুযোগ বদলেছে, ব্যক্তিগত জীবনেও টানাপোড়েন এসেছে। কয়েক বছর পর, ২০০৩-এর মধ্যে, পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তারপর?

তথ্যের জায়গা নিতে শুরু করে খবর।

দীপ্তি নাভাল জানিয়েছিলেন, নিউ ইয়র্কে রাজ কিরণকে ট্যাক্সি চালাতে দেখা যাওয়ার কথা তিনি শুনেছিলেন এবং তাঁর সন্ধানের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই সূত্র নিশ্চিত হয়নি।

২০১১ সালে ঋষি কাপুর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে রাজের ভাই গোবিন্দের সঙ্গে যোগাযোগের পর জানান, তিনি জেনেছেন রাজ কিরণ আটলান্টার একটি মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে আছেন। খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর মনে হয়েছিল, দীর্ঘ অনুসন্ধানের হয়তো অবসান হয়েছে।

হয়নি।

রাজ কিরণের মেয়ে রিশিকা সেই দাবি খণ্ডন করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাজ আটলান্টায় নেই; পরিবার তাঁকে বহু বছর ধরে খুঁজছে। নিউ ইয়র্ক পুলিশ এবং বেসরকারি তদন্তকারীদের সাহায্য নেওয়ার কথাও তিনি জানান। বাবার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমস্যার উল্লেখ করলেও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনও তথ্য পরিবারের কাছে ছিল না।

ফলে রাজ কিরণের অন্তর্ধানের গল্পে আজও নিশ্চিত রহস্যোদ্ঘাটনের চেয়ে পরস্পরবিরোধী সূত্রই বেশি। নিউ ইয়র্কে তাঁর ট্যাক্সি চালানোর খবর নিশ্চিত নয়। আটলান্টার চিকিৎসালয়ে থাকার দাবিও প্রমাণিত হয়নি। ২০০৩-এর পর তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।

zoom
‘নাখুদা’ ছবির একটি দৃশ্যে রাজ কিরণ ও স্বরূপ সম্পত

এই জায়গাটিই সবচেয়ে কঠিন। একজন নিখোঁজ মানুষকে ঘিরে শূন্যস্থান খুব দ্রুত গল্পে ভরে যায়। কিন্তু গল্প আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।

২০২৬ সালেও রাজ কিরণের সন্ধান নিয়ে নতুন উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। অভিনেত্রী সোমি আলি জানিয়েছেন, তিনি তাঁর খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবু নিশ্চিত কোনও সন্ধান মেলেনি।

তাই রাজ কিরণের গল্পের শেষে কোনও নাটকীয় উত্তর বসানোর সুযোগ নেই।

রাজ কিরণের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সবচেয়ে সৎ উত্তর একটাই–

আমরা জানি না।

২০০৩-এর পর তাঁর জীবনে কী ঘটেছিল, তিনি নিজে সরে গিয়েছিলেন, না কি পরিস্থিতি তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিল– তার নির্ভরযোগ্য উত্তর নেই। এই অজানাকে গল্প দিয়ে পূরণ না করে সেখানেই থেমে যাওয়াই হয়তো তাঁর প্রতি শেষ সম্মান। মানুষের জীবন কখনও সরলরেখায় চলে না।

পরের দিন সকালে হোটেলে ঘুম ভাঙার পর হাতে কিছুটা সময় ছিল। প্রাতরাশ সেরে ঘরে রাখা প্যাড খুললাম। গত কয়েক বছরের নোট, তারিখ, সংবাদপত্র থেকে কেটে রাখা খবর, নিজের লেখা টুকরো স্মৃতি– সব একসঙ্গে পড়েছিল।

আবার চোখে পড়ল কয়েকটি তারিখ।

১৯৯৬– পুট্টাপার্থি।

১৯৯৭– জেলের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাজ কিরণের নিজের বক্তব্য।

তারপর– মসিনা হাসপাতাল, আমেরিকা, কাজের চেষ্টা।

২০০৩– পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

২০১১– আটলান্টার খবর, তারপর তার অস্বীকার।

zoom
‘বাসেরা’ ছবির একটি পোস্টারে রাজ কিরণ

একটি মানুষের জীবনকে কয়েকটি তারিখে বেঁধে ফেলা যায় না। তবু অনুসন্ধানের কাজে কখনও কখনও তারিখই শেষ অবলম্বন। তাদের পাশে পড়ে থাকা শূন্য জায়গাগুলিই তখন সবচেয়ে বেশি কথা বলে।

মুম্বইয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে পড়ল আর একটি গান–

‘দোস্তোঁ সে পেয়ার কিয়া,
দুশমনোঁ সে বদলা লিয়া,
জো ভি কিয়া, হামনে কিয়া, শান সে।’

রমেশ সিপ্পির ‘শান’। ১৯৮১ সালে গড়িয়ার মহুয়া সিনেমাহলে বাবা, মা আর দাদার সঙ্গে বসে ছবিটি দেখেছিলাম। সেই হল নেই। বাবা নেই। দাদাও নেই। মা আছেন, কিন্তু সময় তাঁকেও ধীরে ধীরে অন্য এক জীবনের দিকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

কিছু গান আসলে গান থাকে না। তারা দরজা হয়ে যায়। এক মুহূর্তে পর্দা সরে যায়, ফিরে আসে বহু বছর আগের একটি সন্ধ্যা– হলের অন্ধকার, মানুষের গন্ধ, পর্দার আলো, পাশের আসনে আপনজনের উপস্থিতি। তারপর আবার বর্তমান। খালি আসন। ভেজা রাস্তা। শহরের শব্দ।

‘শান’-এর সেই গানে পারভীন বাবির উপস্থিতিও মনে পড়ে।

সাতের দশকের ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে তিনি ছিলেন এক বিশেষ ধরনের আধুনিকতার মুখ। ‘দিওয়ার’, ‘অমর আকবর অ্যান্টনি’, ‘নমক হালাল’, ‘শান’, ‘কালা পাথর’– একসময় তাঁর মুখ ভারতীয় চলচ্চিত্রের নগর-স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। ১৯ জুলাই ১৯৭৬-এর ‘টাইম’-এর ইউরোপীয় সংস্করণের প্রচ্ছদেও জায়গা পেয়েছিলেন তিনি– প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী হিসেবে।

zoom
পারভিন বাবি

রাজ কিরণের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে গেলে তাঁর কথাও মনে পড়ে। তবে দু’জনের গল্প এক নয়।

বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে পারভীন বাবির প্যারানয়েড স্কিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা ও মানসিক অসুস্থতার কথা নথিবদ্ধ হয়েছে। সেই অসুস্থতার সঙ্গে যুক্ত ভয় ও সন্দেহ তাঁর কাছে নিছক কল্পনা ছিল না। তাঁর কাছে তা ছিল বাস্তব।

পারভীন প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন, অমিতাভ বচ্চন তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন এবং তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করছেন। বাইরের পৃথিবী সেই অভিযোগকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু মানসিক অসুস্থতার একটি নির্মম দিক এখানেই– যে ভয় বাইরে থেকে অবাস্তব মনে হয়, আক্রান্ত মানুষের কাছে সেটিই সম্পূর্ণ সত্যি হতে পারে। বিপদ হয়তো অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু আতঙ্কটি সত্যি।

শেখর সুমন পরবর্তী সময়ে একটি ঘটনার কথা বলেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, পারভীন একবার আতঙ্কিত হয়ে তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাঁর বাড়িতে বোমা রাখা হয়েছে। বিছানার নিচে, সোফার নিচে, ঘরের বিভিন্ন জায়গায় খুঁজতে বলেছিলেন। কোনও বোমা পাওয়া যায়নি। কিন্তু তাঁর ভয় ছিল সত্যিকারের।

সেই সময়ের বলিউড সেই পার্থক্য কতটা বুঝেছিল, প্রশ্নটা সেখানেই। সহানুভূতির চেয়ে কৌতূহল ছিল বেশি। চিকিৎসার চেয়ে গসিপ।

zoom
অমিতাভ বচ্চন ও পারভিন বাবি

পরে চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় গিয়েছিলেন পারভীন। ফিরে এসেছিলেন মুম্বইয়ে। ২০০৫ সালে নিজের ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। কয়েকদিন পর তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

রাজ কিরণ ও পারভীন বাবির জীবন, পারিবারিক পরিস্থিতি, কর্মজীবন কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যের ইতিহাস এক নয়। তাঁদের পাশাপাশি রাখা যায় শুধু একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে–

খ্যাতির কেন্দ্রে থাকা একজন মানুষ কীভাবে একসময় সেই কেন্দ্রের বাইরে চলে যায়?

দু’জনের জীবনেই একসময় বিপুল পরিচিতি ছিল। দু’জনেই এমন এক চলচ্চিত্র-জগতের অংশ ছিলেন, যেখানে তারকার ব্যক্তিগত জীবনও মানুষের বিনোদনের অংশ হয়ে উঠত। সেই সময় মানসিক স্বাস্থ্যের ভাষাও আজকের মতো সর্বজনীন ছিল না। অসুস্থতা বোঝার বদলে মানুষকে অনেক সময় বিচিত্র, অস্বাভাবিক বা সমস্যাজনক বলে চিহ্নিত করা হত।

রাজ কিরণের ক্ষেত্রে আজও আমরা জানি না, তাঁর জীবনের কোন পর্যায়ে কী ঘটেছিল! পারভীন বাবির ক্ষেত্রে কিছু তথ্য তুলনামূলকভাবে নথিবদ্ধ। তবু তাঁর জীবনও আমাদের সামনে এমন এক শূন্যতা রেখে যায়, যেখানে খ্যাতির মুখ আর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা একসময় একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়।

কখনও কখনও ভাবি, রাজ কিরণ আর পারভীন বাবিকে নিয়ে যদি একটি ছবি বানানো যেত?

জীবনী নয়। প্রচলিত অর্থে কাহিনিও নয়। একটি ক্যামেরা শুধু অনুসরণ করবে।

স্টুডিওর দরজা দিয়ে ঢুকছে এক তরুণ অভিনেতা। চারপাশে মানুষের ভিড়। মেকআপের গন্ধ। আলো জ্বলছে। কেউ নাম ধরে ডাকছে। কেউ ছবি তুলছে।

কাট।

একটি ঘর। জানালার পাশে একজন মানুষ একা বসে আছে।

কাট।

প্রেক্ষাগৃহে হাততালি।

কাট।

একটি টেলিফোন। ওপারে কেউ আর সাড়া দিচ্ছে না।

ক্যামেরা কোনও ব্যাখ্যা দেবে না। কাউকে দোষী করবে না। কোনও মনোরোগের নাম দিয়ে একটি জীবনকে বন্ধ করে দেবে না। শুধু দেখবে– সময়ের সঙ্গে একজন মানুষের চারপাশের পৃথিবী কীভাবে বদলে যায়!

শেষ দৃশ্যে কোনও অভিনেতার মুখ থাকবে না।

থাকবে মুম্বইয়ের একটি ভেজা রাস্তা। একটি বন্ধ দোকানের শাটার। দূরে একটি গাড়ির আলো। বৃষ্টির জলে ভেঙে যাওয়া প্রতিচ্ছবি। শহর তার নিজের গতিতে চলে যাচ্ছে। আর অদূরে কোথাও নিভৃতে বেজে চলেছে ‘মান অভিমান’-এর সেই চিরকালের গান। পর্দায় রাজ কিরণের বিষণ্ন মুখ। নেপথ্যে যেশুদাসের দরদী কণ্ঠ–

‘এই মেরে উদাস মন,
চল দোনো কাহি দূর চলে
মেরে হামদম তেরি মঞ্জিল,
ইয়ে নেহি ইয়ে নেহি কোই অওর হৈ…’

Amitabh Bacchan bollywood Parveen Babi Raj Kiran Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on