১৮৩৬ সালে হঠাৎ সন্ন্যাস রোগে আক্রান্ত হয়ে, স্ত্রী রাসমণিকে একা রেখে বিদায় নিলেন বাবু রায় রাজচন্দ্র দাস। এইসময় বিধবা রাসমণির ম্যানেজার হওয়ার অভিলাষ নিয়ে জানবাজারে আসেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। শোকসন্তপ্তা রাসমণি দ্বারকানাথকে জানান, তিনি যেন রাজচন্দ্রের দেওয়া দেড় লক্ষ টাকা ফিরিয়ে দেন। দ্বারকানাথ বোঝেন, এই টাকা ফেরত না দিলে, জুটবে না ম্যানেজারির পদ। তড়িঘড়ি দেড় লাখ ফিরিয়ে দিলেন দ্বারকানাথ। কিন্তু দুঁদে ব্যবসায়ী দ্বারকানাথের ভুল হল ‘পিসি’ রাসমণি দাসীকে চিনতে। রাসমণি স্পষ্টত জানিয়ে দিলেন, তাঁর ব্যবসা বাণিজ্য, জমিদারি সামলাতে কোনও ম্যানেজারের প্রয়োজন নেই।
ঈশ্বর গুপ্ত– যুগসন্ধির কবি। যদি কোনও নারীকে ‘কবি’ অভিধা মুক্ত করে উনিশ শতকের প্রথমার্ধ আর দ্বিতীয়ার্ধ– এর সন্ধিক্ষণে রেখে চর্চা করতে হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি রানি রাসমণি। অন্তত, নারীর ক্ষমতায়ন ইতিবৃত্তের গূঢ়ার্থগত দিক থেকে তো বটেই।
ত্রিবেণীর গঙ্গাবক্ষ দিয়ে বয়ে চলেছে একটা নৌকা। একের পর এক ঘাট পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে নৌকাটি। ঘাটের মানুষের ক্রিয়াকলাপ আপন খেয়ালে দেখছেন এক যুবক। হঠাৎ চোখ স্থির হয়, সন্তরণরত এক কিশোরীতে (পড়ুন– love at first sight)। পুনর্বিবাহ না করার ধনুর্ভাঙা পণ ভঙ্গ হয় মুহূর্তে। ঘুণাক্ষরেও এইসব টের পান না কিশোরীটি। সে তখন মগ্ন আপন সহচরী আর সন্তরণে। ভাগ্যে বদলের ক্ষণ ঘনিয়ে এল, অগোচরেই। হুগলির ‘কোণা’ গ্রামের মেয়ে পা রাখবে শহর কলিকাতায়। হয়ে উঠবে জানবাজারের সাতমহলা বাড়ি থেকে গোটা বঙ্গদেশের রানিমা– রানি রাসমণি।

১৭৯৩ সালের আজকের দিনে, অর্থাৎ ২৪ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার হালিশহরের কোণা গ্রামে জন্ম হয় রাসমণির। মা রামপ্রিয়া দেবী আদর করে মেয়েকে ডাকেন ‘রানি’– অলক্ষে হাসেন প্রসন্না ভাগ্যদেবী। পিতা হরেকৃষ্ণ দাস– লোকে চেনে হরু ঘরামী বলে। বাবা-মায়ের যথেষ্ট বয়সকালের সন্তান রানি। দুই পুত্রের অনেক পরে জন্ম তাঁর। ফলত, পিতা মাতার স্নেহের আঁচলে ম্লান হয় সংসারের আর্থিক অসচ্ছলতা। মেয়েও তার স্বভাবসিদ্ধ উচ্ছ্বাস, আনন্দ, ভালোবাসায় আগলে রাখে গোটা পরিবারকে। কিন্তু, হঠাৎই হরেকৃষ্ণ দাসের জীবনে ঘটে যায় অঘটন, চলে যান স্ত্রী রামপ্রিয়া। পিতাকে আরও বেশি আগলে রাখতে শুরু করে রানি। কিন্তু, মেয়ের বয়স ১১, কন্যাদায়গ্রস্থ দরিদ্র পিতা মেয়ের জন্য খুঁজতে থাকেন উপযুক্ত পাত্র।
শহর কলকাতার ধনী ব্যবসায়ী প্রীতরাম দাস। লোকে চেনে প্রীতরাম মাড় নামে। প্রীতরামের ছিল বাঁশের ব্যবসা। মকিমপুর থেকে বাঁশ জলে ভাসিয়ে আনা হত, এই রাশিকৃত বাঁশকে বলা হত ‘মাড়’। এর থেকেই প্রীতরামের পদবি হয়ে যায় মাড়। রাজচন্দ্র দাস তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র। জ্যেষ্ঠপুত্র হরচন্দ্র দাসের মৃত্যু হয়েছে পূর্বেই তাই, প্রীতরামের সবেধন নীলমণি, রাজচন্দ্র। আগেই দু’বার বিবাহ হয়েছে রাজচন্দ্রের। কিন্তু দু’বারই বিয়ের অল্পদিনের মধ্যেই পত্নীবিয়োগ হওয়ায়, আর বিয়ে করতে রাজি নয় রাজচন্দ্র। ছেলের এই ধনুর্ভাঙা পণে প্রীতরামের চিন্তা হয় ভারি। রাজচন্দ্র নানান স্থানে ঘুরে বেড়ান আপন খেয়ালে। সেই রকমই ত্রিবেণী যাওয়ার মানসে, চলে এসেছেন হালিশহরের কোণা গ্রামের স্নানঘাটের নিকটে। আর এখানেই তাঁর মনে কুটো বাঁধলেন কৈবর্ত হরেকৃষ্ণ দাসের কন্যা রাসমণি। ১২১১ বঙ্গাব্দের ৮ বৈশাখ মহাধুমধামে রাজচন্দ্র দাসের সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন হল রাসমণির। ত্রিবেণীর মুক্তবেণী রাজচন্দ্র দাসকে পুনরায় সংসার বেণীতে রুদ্ধ করল। কোণা থেকে কলিকাতায় পা রাখলেন রাণী। যে গ্রামে তিনি ফিরবেন আবার ৩৭ বছর পর।

উনিশ শতকের শিক্ষিত যুবকদের প্রতিভূ হিসেবে রাজচন্দ্র দাস স্ত্রী রাসমণিকে বিদ্যাশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে সচেষ্ট হলেন। আর রাসমণি নিজের বুদ্ধিবলে, কর্মপটুতায় হয়ে উঠলেন পরিবারের সকলের হৃদয়ের রানি। ১৮১৭ সালে পিতা প্রীতরাম দাসের মৃত্যুর পর ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজচন্দ্র। তিনি যে ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে তুখোড়, সেটি তাঁর কর্মকাণ্ড এবং তাঁর স্থাবর-অস্থাবর বিষয় সম্পত্তির পরিমাপ দেখলে সহজেই অনুমেয়। কালের নিয়মে চিরকাল প্রচারবিমুখ মানুষের কর্ম হারিয়ে যায়, বিস্মৃতির অন্তরালে। বাবু রাজচন্দ্র দাস– তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পিতা হরেকৃষ্ণ দাসের মৃত্যুর চারদিনের মাথায় পারলৌকিক কাজ সম্পন্ন করতে মেয়ে রাসমণি বাড়ির নিকটস্থ গঙ্গার ঘাটে গেলেন। ঘাটের ভগ্নদশায় সাধারণ মানুষের জন্য চিন্তা হল তাঁর। স্বামীকে সেকথা জানাতেই নির্মিত হল ঘাট। আজ যে ঘাটের নাম ‘বাবু ঘাট’। এককালে তা-ই লোকমুখে পরিচিত হয়েছিল, ‘বাবু রাজচন্দ্র দাসের ঘাট’ নামে। ঘাটের ফলকে আজও সেই স্মৃতি জাগরুক। তবে, বাবুঘাটে থেমে যায়নি রাজচন্দ্র দাসের ঘাটের কথা। একে একে তৈরি হয়েছিল– আহিরীটোলা, তালতলা, বহুবাজার ঘাট। উইলিয়াম বেন্টিং, তাঁর ৮ বছরের কর্মজীবন শেষ করে দেশে ফিরে গেলে, ভারতবর্ষে আসেন মেডকাফ সাহেব। সাহেব ভারতবাসীদের সংবাদপত্র ও মুদ্রণযন্ত্রের স্বাধীনতা দিয়ে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন একটি সাধারণ পুস্তকালয়। গ্রিক স্ট্রাকচারে নির্মিত এই হলের নামকরণ হয় সাহেবের নামেই। এই Hall প্রতিষ্ঠার সময় রাজচন্দ্র ১০,০০০ (মতান্তরে, ৫০০০) দেন। শর্ত ছিল, তিনি ও তাঁর উত্তরাধিকারীগণ চিরকাল এখান থেকে বিনামূল্যে পুস্তক সংগ্রহ করতে পারবেন। যদিও তাঁর উত্তরাধিকারীরা এ বিষয়ে মনোযোগ না দেওয়ায় সেই স্বত্ব থেকে পরবর্তীকালে বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু এই তুখড় ব্যবসায়ী রাজচন্দ্রকেও অনেক সময়ই স্ত্রী রাসমণি বিচক্ষণ বুদ্ধিমত্তায় বিস্ময়ান্বিত হতে হয়েছে। এমনকী নাস্তানাবুদ হতে হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকেও!

১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর– রাজা রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ও তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিং-এর নির্দেশে রদ হল সহমরণ ও সতীদাহ প্রথা। বাবু রাজচন্দ্র প্রফুল্লতার সঙ্গে স্ত্রীকে জানালেন সেকথা। রাসমণি খুশি হলেন। কিন্তু তৎকালীন বঙ্গদেশের অবলা নারীদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সংশায়িত চিত্তে বললেন, ‘…বঙ্গবিধবাদের পরিত্রাণের অন্য বিধ উপায় রহিল না। তাহারা যে কত কলঙ্ক রাশিতে কলঙ্কিত হইবেন বলা যায় না।’ ঠিক একই ধরনের চিন্তা তিনি করেছিলেন, ‘বিধবা বিবাহ’ প্রচলিত হওয়ার পর। বিদ্যাসাগর মশাইকে অকপটেই সেকথা জানিয়েছিলেন। পিসি রাসমণির বলা কথা কতটা সত্য, বিদ্যাসাগর নিজে পরবর্তী জীবনে তা বুঝেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে রাসমণি সহমরণ, সতীদাহ প্রথা রদ হওয়া কিংবা বিধবা বিবাহের প্রচলনকে সমর্থন করলেন না। কিন্তু, পরবর্তীকালে বিধবা নারীদের অগণিত লিখিত-অলিখিত নির্যাতন, লাঞ্ছনা, অত্যাচারের ইতিবৃত্তের ফাইল আজও বাঁধা আছে, রাসমণির মতো নারীর বিচক্ষণ দূরদর্শী চিন্তনের লাল দড়িতে।
১৮৩৬ সালে হঠাৎ সন্ন্যাস রোগে আক্রান্ত হয়ে, স্ত্রী রাসমণিকে একা রেখে বিদায় নিলেন বাবু রাজচন্দ্র দাস। যদিও তিন কন্যা ও তিন জামাই তখন বর্তমান। রাজচন্দ্র ও রাসমণির সেজকন্যা করুণাময়ীর মৃত্যু হয় পিতা রাজচন্দ্র বেঁচে থাকাকালীন। সেজজামাই মথুরামোহন বিশ্বাসের সঙ্গে ছোট মেয়ে জগদম্বার বিবাহ হয়। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু রানিকে কিছুদিনের জন্য বিচলিত করে দিলেও এই বিপুল বাণিজ্য ও সম্পত্তি জামাইদের সঙ্গে নিয়ে পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এইসময় বিধবা রাসমণির ম্যানেজার হওয়ার অভিলাষ নিয়ে জানবাজারে আসেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। শোকসন্তপ্তা রাসমণি দ্বারকানাথকে জানান, তিনি যেন রাজচন্দ্রের দেওয়া দেড় লক্ষ টাকা ফিরিয়ে দেন। দ্বারকানাথ বোঝেন, এই টাকা ফেরত না দিলে, জুটবে না ম্যানেজারির পদ। তড়িঘড়ি দেড় লাখ ফিরিয়ে দিলেন দ্বারকানাথ। কিন্তু দুঁদে ব্যবসায়ী দ্বারকানাথের ভুল হল ‘পিসি’ রাসমণি দাসীকে চিনতে। রাসমণি স্পষ্টত জানিয়ে দিলেন, তাঁর ব্যবসা বাণিজ্য, জমিদারি সামলাতে কোনও ম্যানেজারের প্রয়োজন নেই– তিনি আর তাঁর জামাইরা আছেন। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘টোপী পিসি আর ঠক চাচার কাহিনি’ হিসাবে রয়ে গেল।

মেয়েমানুষের বুদ্ধি একটা বালাই! সেকথা কেবল প্রিন্স দ্বারকানাথ মজ্জায় মজ্জায় টের পাননি, পেয়েছিল ব্রিটিশ সাহেবরাও। একবার দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন নবপত্রিকার স্নানযাত্রার সময় ঘুম নষ্ট হয় এক সাহেবের। তিনি মামলা ঠুকে দেন রানির নামে। মামলায় হার হয় রানির। মুখ বুজে ৫০ টাকা জরিমানা দিয়ে দেন। কিন্তু জানবাজার থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত রাস্তা গরান কাঠ দিয়ে মজবুত করে বন্ধ করে দেন। সাধারণ মানুষের চলাচলের রাস্তা বন্ধ হতেই টনক নড়ে ইংরেজ সরকারের। রানির কাছে লোক যায়, তিনি বলে পাঠান– এটা তাঁর খাস জমিদারিভুক্ত জমি। তিনি যা ইচ্ছা করতে পারেন। নিরুপায় ইংরেজ সরকার রানিকে তাঁর জরিমানার টাকা ফেরত দেয়, রানিও খুলে দেন রাস্তা। কিন্তু একবার নাস্তানাবুদ হয়ে শখ মেটেনি ইংরেজ সরকারের। নীল চাষ নিয়েও রানির সঙ্গে বিরোধ বাধে। রানির লেঠেল বাহিনীর ভয়ে জমিদারিতে বন্ধ হয়ে যায় নীল চাষ। তখন বাংলায় ‘নীল বিদ্রোহ’ অনেকদূর। এবার, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিল, যারা গঙ্গায় মাছ ধরবে তাদের ‘জলকর’ দিতে হবে। গরিব জেলেরা পড়ল মহাবিপদে। তারা এসে উপস্থিত হল রানির কাছে। রানি তাদের আবেদন শুনলেন কিন্তু ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে প্রথমেই কোনও পদক্ষেপ নিলেন না। উল্টে মাছের ব্যবসা করবেন বলে ঘুসুরি থেকে মেটিয়াবুরুজ পর্যন্ত গঙ্গার অংশ জমা নিলেন, এবং নগদ ১০,০০০ টাকা তুলে দিলেন কোম্পানির হাতে। রানির অভিসন্ধি বিন্দুমাত্র ধরতে পারলেন না কোম্পানির সাহেবেরা। সাহেবদের চোখের সামনে গঙ্গার এই অংশ বাঁশ আর দড়ি দিয়ে ঘিরে ফেললেন– এবার চোখ কপালে উঠল সাহেবদের, কারণ তাদের জাহাজ আসা বন্ধ হয়ে গেল। এদিকে এতগুলো টাকাও তারা নিয়ে নিয়েছে, ফলে এই বাঁধন কাটার অধিকার তাদের নেই। নিজেদের নির্বুদ্ধিতায় নিজেরাই বিপদে পড়লেন। বাধ্য হয়ে, জলকর আজীবনের জন্য তুলে নিয়ে রানির সঙ্গে আপস করলেন তারা। ‘মেয়েমানুষের পক্ষে এ এক বালাই’– মেয়েমানুষের বুদ্ধি যে সত্যিই বালাই, কোম্পানির সাহেবেরা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন এবার। আর দেশের লোকের চমক লাগল, এক বিধবা নারীর সাহস আর বুদ্ধি দেখে। তবে ঘরে বাইরে সাংঘাতিক সমালোচিত হলেন তিনি। বিদেশি সরকারের বিরুদ্ধে এমন করে ব্যবস্থা নেওয়ার ফল যে তাঁকে পেতে হবে, সেটা বারংবার তাঁর কর্ণকুহরে প্রবেশ করানো হল।
সমাজ কবেই বা, অন্তঃপুরের বাইরে নারীর কর্মকে, তাঁর বুদ্ধি, চিন্তা, দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতার যথার্থ মূল্য দিতে পেরেছে। তারপর যদি সেই নারী উনিশ শতকের অল্পশিক্ষিতা, নিম্নবর্ণের বিধবা নারী হন, তাহলে তাঁর তো অধিকারই নেই, সমাজের কাছ থেকে নূন্যতম সম্মান অর্জন করার। তাই অবলীলায় সরকারি নথিপত্রে লেখা থাকে ‘দাসী’– রাসমণি দাসী। স্পষ্টত উল্লেখ করা থাকে, তিনি একজন মাহিষ্য নারী কিংবা কৈবর্ত নারী। সরকারি নথিতে এই ধরনের উল্লেখের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল, বোঝা যায় না। যদিও নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত অভিধা নিয়ে সরাসরি প্রতিবাদ তিনি কখনও করেননি। নিজের কর্মের মধ্য দিয়ে, সমাজের এই গতে-বাঁধা রীতিতে আঘাত করেছেন বারবার। রাসমণির কর্মযজ্ঞের এক বৃহৎ অংশ জুড়ে আছে ধর্ম। তিনি ধর্মপ্রাণা। নবদ্বীপ থেকে নীলাচল সকল স্থানেই পৌঁছে যেত রানির দান। পুরী অবধি রাস্তা বানানো থেকে বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রে ঘাট নির্মাণ করা, সবেতেই করে গিয়েছেন দান। তবু, ইতিহাস প্রায় মুছে ফেলেছে সেইসব তথ্য। কারণ নিম্নবর্ণের মহিলার দানের কথা লিখে রাখতে বোধ করি তাদের আঁতে লেগেছিল। মানুষ বেশিরভাগ সময় ভুলে যায়, তার জন্য নির্ধারিত কুল, ধর্ম, বর্ণ, জাতি– জন্মগত সূত্রে প্রাপ্ত এইসব বিষয় নির্ণয়ে নিজের কোনওকিছুই করণীয় থাকে না। পরবর্তী জীবনের কর্ম তাঁর পরিচয় হয়। এটা রাসমণি বুঝলেও, সমাজ বোঝেনি। ধর্মপ্রাণ এই নারীকে ধর্মের কাজেই সবচেয়ে বেশি বাধা পেতে হয়েছে। দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আজ শহর কলকাতার নামের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে জড়িত একটি নাম দক্ষিণেশ্বর মন্দির। কিন্তু এই মন্দির নির্মাণের অন্তরালে রয়ে গিয়েছে একজন কৈবর্ত নারীর গোটা হিন্দু পুরুষতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের সঙ্গে অদেখা লড়াই।

এল ১৮৫৫ সালের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যখন কৈবর্ত বিধবা নারী মা ভবতারিণীর আদেশে দক্ষিণেশ্বরে তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠান করতে গেলেন। বিপুল অর্থ আর শ্রম ব্যয়ে জামাই মথুরের চেষ্টায়, উদ্যোগে জমি নির্ণয় থেকে মন্দির নির্মাণ সবই হল। কিন্তু বাধ সাধল ‘বর্ণাশ্রম প্রথা’। শুরু হল বর্ণাশ্রম প্রথার বিরুদ্ধে রানির এক অদৃশ্য লড়াই। নিম্নবর্ণের জমিদার গৃহিণীর দান গ্রহণ করে, কোনও ব্রাহ্মণ ভবতারিণী মন্দিরে পুজো করতে রাজি হলেন না। অন্তরাত্মায় আঘাত লাগল তাঁদের, শেষে কি না, নিম্নবর্গীয়া এক নারীর অন্নে প্রতিপালিত হতে হবে তাদের! নারীর স্পর্ধায় বাক্রুদ্ধ হলেন তাঁরা। ভাটপাড়া থেকে নবদ্বীপ দিকে দিকে ব্রাহ্মণদের কাছে পত্র গেল। প্রত্যেকে পত্র ফেরত দিলেন। কদর্য ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিলেন, কোন কূলে জন্ম তাঁদের! ‘বামন হয়ে চাঁদে হাত’– জীবনে এত অসহায় রানি বোধহয় আর কখনও বোধ করেননি। কিন্তু, হাল ছাড়লেন না, সুতরাং উপায় হল। উপায় বাতলে দিলেন, কামারপুকুরের রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। উপদেশ দিলেন মূর্তি প্রতিষ্ঠার পূর্বে কোনও ব্রাহ্মণকে উপযুক্ত পরিমাণ সম্পত্তি, অর্থ দান করতে। সেই ব্রাহ্মণই তখন মূর্তি প্রতিষ্ঠা করবেন, মা-কে অন্ন ভোগ দেবেন। কিন্তু, কৈবর্ত নারীর সেই দান গ্রহণ করতেও কেউ রাজি হলেন না। অগত্যা রামকুমারকেই এই দান গ্রহণ করে, মা ভবতারিণীর পুজো করতে হয়। স্থায়ী পূজারী হতে প্রথমে রাজি না হলেও, তাকে দীর্ঘদিন দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণী পুজোর দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। যদিও মন্দির নিয়ে রানিমা-র চিন্তা ছিল জীবনের শেষলগ্ন অবধি। জ্যেষ্ঠ কন্যা পদ্মামণি রাজি হননি মন্দিরের দানপত্রের স্বাক্ষর করতে। দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পর দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মায়ের পুজোর দায়িত্ব গ্রহণ করে গদাধর চট্টোপাধ্যায়। যাকে পরবর্তীকালে গোটা বিশ্ব চিনবে, ‘শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণপরমহংস’ নামে। দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের ছোট ঠাকুরকে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণপরমহংস হয়ে উঠতে দেখে যেতে পারেননি রানিমা। কিন্তু দক্ষিণেশ্বরের পাগলা ঠাকুরকে ঠিকই চিনেছিলেন তিনি। তাই সকলে যখন পাগল বলে অবহেলা এবং অত্যাচার করেছিল, তখন এই আত্মভোলা মানুষকে আগলে রেখেছিল রানিমা আর তাঁর মথুর। পাগলা ঠাকুরের হাতের চড়ও মাথা নত করে গ্রহণ করেছিলেন রানিমা। কারণ জানতেন, ঠাকুর অন্তর্যামী। বিষয়ী রানিমাকে বিষয়চিন্তা থেকে তিনি মুক্ত করলেন এই আঘাতে। তাই ১৮৬১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি যখন রানিমা তাঁর ইহজীবনের লীলা সম্পন্ন করলেন, তখন তাঁর প্রিয় ‘ছোট’ গেয়ে উঠল,
ভেবে দেখে মন কেউ কারওর নয় মিছে ভ্রম ভূমণ্ডলে
ভুলো না দক্ষিণা কালী বদ্ধ হয়ে মায়াজালে।

ব্রাহ্মণদের বর্ণাশ্রম প্রথার অত্যাচারে যদি সেদিন ভয় পেতেন কিংবা পিছিয়ে যেতেন এই কৈবর্ত নারী; তাহলে আজ কোথায় থাকতেন– রামকৃষ্ণ পরমহংস, কোথায় থাকতেন যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ, কোথায় থাকত তাঁদের বিশ্বময় বিস্তৃত কর্মযজ্ঞ? তবে বিস্মৃতি বড় ভয়ানক অসুখ। তাই দ্বিশত তেইশ বর্ষে আমরা প্রায় বিস্মৃত হয়েছি সেই স্ফুলিঙ্গকে, সেই নারীকে। আজ Women Empowerment নিয়ে বিজ্ঞাপন, গবেষণা, পঠনপাঠন– ত্রুটি নেই কোনও কিছুর। তবু ফিরে দেখি না জীবনচর্যায় নারীর ক্ষমতায়নকে কেমন করে যাপন করেছিলেন ফেলে আসা উনিশ শতকের এক নারী। হ্যাঁ, স্বামীর বিপুল অর্থ, ব্যবসা, জমিদারি রাসমণির এই যাপনকে সহজতর করেছিল। কিন্তু, মনে রাখতে হবে, সেইসময় রাসমণির মতো টোপী পিসিদের জন্য ঠক চাচাদের অভাব ছিল না– সে দেশি হোক, কিংবা বিদেশি। ‘যার যেমন ভাব, তার তেমন লাভ।’– এই সহজ সত্য জীবনের শেষ অধ্যায়ে রাসমণিকে বুঝিয়েছিলেন তাঁর ছোট ঠাকুর। অথচ রানিমা এই সত্যকে যাপন করেছিলেন জীবনের সকল অধ্যায়ে। আজ বিজ্ঞাপনসর্বস্ব নারীর ক্ষমতায়নের যুগে, আজকের নারীর জন্য এইটুকুই বলার থাকে, ‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্নিবোধত।’ আর, দ্বিশত তেইশ বর্ষের জন্ম তারিখে রানির জন্য আজ থাক, রানির গুণমুগ্ধ কবিয়াল রূপচাঁদ পঙ্খীর রেখে যাওয়া সেই গান,
(রানি) রাসমণি সামান্যা নারী কে বলে, হেন নাই এ মহিতলে।
রাজ্যে আছে অনেক ধনী, কে হইয়াছে হেন দানী
পুণ্য হল ধরণী– রাসমণির পুণ্য বলে।।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved