Abbasuddin Bhatiyali and our culture | Robbar
Robbar
  • ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তোর্সা পারের আব্বাস বন্ধু

সাইবেরিয়ার পরিযায়ী পাখিদের মতো আব্বাসউদ্দিনের জন্মভূমির প্রতিবেশীরা, সহনাগরিকেরা– ভিটেমাটি, প্রিয় মানুষকে ছেড়ে যখন এখনও পাড়ি জমায় ভারত মহাসাগর কিংবা আরব সাগর-পারে সামান্য ‘রুটি-নুন-চা’র টানে, দু’বেলা দু’মুঠো মুখে দেবার আশায়, ‘সোনা বন্ধুর তানে’ তাঁর স্ত্রী হয়তো এখনও তাকিয়ে থাকেন তোর্সা-কালজানি-ধরলা পারের আকাশ পানে, ভেসে আসা মেঘে যক্ষবধূর মতো প্রিয়জনের সংবাদ না পেলেও মাথার ওপর চলন্ত উড়োজাহাজ দেখে– বর্ডারে আটকে রাখা আব্বাসউদ্দিনের তেতুল খুঠার (কাঠের) চকচকে কালো দোতারা উড়োজাহাজে ঝুলিয়ে দিল্লিতে নিয়ে আসার লোককথা মনে পড়ে হয়তো-বা, আব্বাসের তোর্সা পারের উত্থাল পাতাল গানে আশ্রয় খোঁজেন ভরসায়, খুঁজে পেতে চান বাঁচার আয়ুধ, অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকেন প্রিয় মানুষটির জন্য।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১৮:৫০   
Facebook WhatsApp Messenger

‘অটোগ্রাফ’ সিনেমার সুবাদে আনন্দী বসুর কণ্ঠে ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’ ভাওয়াইয়া গানটির ফিল্মি সুর সংগীতপ্রিয় নাগরিক জীবনে অনেকেই শুনেছি হয়তো-বা, কিন্তু প্রচলিত ‘কথা ও সুরে’ ভাওয়াইয়া গানটি প্রথম গ্রামোফোন কোম্পানিতে রেকর্ড করে যিনি আমাদের উপহার দিয়েছিলেন– অখণ্ড বাংলার হৃদয়ের সম্পদ ভাওয়াইয়া সম্রাট সেই আব্বাসউদ্দিন আহমেদকে যেন না ভুলি আমরা। ২০০১ সালে তাঁর জন্মশতবর্ষ পেরিয়ে এসেছি প্রায় নিঃশব্দে, ১২৫ ছাপিয়ে, ২৭ অক্টোবর, গতকাল চলে গেল জন্মদিবস তাঁর। প্রায় এক দশক আগে কলকাতার শীততাপ নিয়ন্ত্রিত প্রেক্ষাগৃহে বসে– না, মন্দ লাগেনি গানটি শুনতে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ছোটবেলা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাছের মগডালে বাঁধা ভারাটে চোঙামাইকে আব্বাস সাহেবের কণ্ঠে ভেসে আসা ‘আমাছামা’ সুরে বগা-বগীর যন্ত্রণা– সে এক অন্য অনুভূতি! আব্বাসের সেই তোর্সা-ধরলা-কালজানি নদী পারের বগা-বগীর হাহাকার, নিধুয়া পাথারে সাধারণ মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণার আঁচ এ গানেও খুঁজে পেতে চেয়েছি কখনও-বা… 

zoom
আব্বাসউদ্দিন আহমেদ

ছোটবেলা থেকে ভাওয়াইয়া গান ও আব্বাসউদ্দিন আহমেদের প্রতি বাড়তি টান গ্রামতুতো জন্মভিটে বলরামপুর গ্রাম ও যাপনের প্রিয় শহর রাজনগর কুচবিহার। মুখের ভাষা– দেশি রাজবংশী বা কামতাপুরি। আব্বাস সাহেবের মতো ছোটবেলা থেকে আমরাও অনুভব করেছি উত্তরবঙ্গের তিস্তা-তোর্সা-কালজানি-ধরলা-ঘড়ঘড়িয়া নদীর চোরা স্রোত, ঘোলা জল ও পানি, দেখেছি বিভিন্ন ভাঙাগড়ার খেলা, নিধুয়া পাথারে শুনেছি ‘গাড়িয়াল বন্ধু’, ‘মাহুত বন্ধু’ কিংবা ‘কাজল ভ্রমরা’র গান। তোর্সা, রায়ঢাক, কালজানির চরায় দেখেছি রাজহংসী পঙ্খীর গলায় গজমোতির মালা, চকোয়াদের ঠাটবাট, ঝড়ে বক মড়া ফকিরদের কেরামতি, ফান্দি ভাইদের কারসাজির ফন্দি-ফক্কর। উত্তরের ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, পালাটিয়া পালা, জারি, সারি, যাত্রা, খন, দোতারা, কুশান গানে সহ-যাপনে– নিজেদের মধ্যে অজান্তে আমরা সেইসব ‘পালা ও গান’ খুব সহজেই বড্ড আপন, আঁকড়ে ধরে ‘আমাদের’ করে নিয়েছি। স্মৃতিভারাক্রান্ত মন আজও উত্তরের আসন্ন শীতে কখনও-বা ভান খোঁজে, পেতে চায় মুক্তির আস্বাদ আব্বাসউদ্দিনের ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালিতে। 

না, ছোটবেলাতে উত্তরবঙ্গে এতটা ডিজে সংস্কৃতির চল ছিল না। এতটা কেউ দেখেননি রাজনীতির ট্রাম্প-কার্ডের চালে অমুক সাহেব, তমুক বিবি কিংবা অন্যের খোঁয়াড়ে বাঁধা গোলামকে নিজের দলে টেনে আনার বেলেল্লাপনা। ছিল না খারাপ বনাম ভালো, রাজনৈতিক স্লোগানের হুংকার। নেতাদের রমরমা বাজারে কেঁপে উঠত না তরাই-ডুয়ার্সের আকাশ-বাতাস। ভুয়ো মহারাজাদের লোভ-লালসার কারবার, মিথ্যে বুলির কারবার এতটা দেখতে হয়নি। তিস্তা-তোর্সা-জলঢাকার বালি রাজনৈতিক দূষণে বিবর্ণ হয়নি এতখানি, তখনও। উত্তরবঙ্গের বন-জঙ্গলে, চরাই-উতরাই মেঠো পথে, খেত-খামারে সে সময় কর্মমুখর জীবন-শিল্পীদের নিজস্ব ব্যথা-বেদনা, ত্যাগ ও ভোগের যাপন, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের কথা ভাওয়াইয়ার সহজ-সরল সুরে মিশে ভেসে আসত এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। খুব মনে পড়ে আজকাল, গ্রামগঞ্জের বিয়ে বা যে কোনও অনুষ্ঠানে ভাওয়াইয়া গানের প্রতি মানুষের মুগ্ধতার কথা। শুনতে পাওয়া যেত বিয়ের অনুষ্ঠানে চোঙামাইক ভাড়া আনার সময় প্রতিবেশী দাদিমা, ঠাকুমা, নানিমাদের আবদার– ‘ফাইককরি (বেশি করে) নিকান বাপৈরঘর ভাবিয়া গানের ক্যাসেট।’ হারাধন, চ্যারকেটু, হাচেন মিয়াঁদের ভারাটে ভাঙাচোঙা মাইকে রাতের দিকে ফুরিয়ে আসা ব্যাটারির চার্জে আব্বাস সাহেবের কণ্ঠে দীঘল নাসা কাহারবার ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’, ‘তোর্সা নদীর উথালপাতাল কার-বা চলে নাও’, চিতানে ‘ও কি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে’, ক্ষীরোল ডাং-এর ‘আজি নদী না যাইওরে বৈদ’, ‘নদীর ঘোলারে ঘোলা পানি’, চটকায় ‘আবো নাওদাড়ীটা মরিয়া’, ‘ওরে ও পরানের মাঝি’, শ্রদ্ধেয় প্রতিমা বড়ুয়ার ‘হস্তীর কন্যা’র গান, ‘দিনে দিনে খসিয়া পড়ে/ রঙ্গিলা দালানের মাটি’, ‘মোর মাহুত বন্ধু রে’ গান আরও বেশি আবেগঘন আবেদন রাখত। বিয়ের অনুষ্ঠানের পর মেয়ে বিদায়ের ভোরবেলায় দেশি ঢোল ও করকার কাটির তালে সানাইয়ে বেজে উঠত প্রচলিত ভাওয়াইয়া গানের বিচ্ছেদের সুর। 

zoom
আব্বাসউদ্দিন, আলাউদ্দিন খাঁ এবং কাজী মোতাহার হোসেন

আমরা তানসেনকে পাইনি, কিন্তু উত্তরবঙ্গের মাটিতে পেয়েছি আব্বাসউদ্দিন আহমেদ, প্যারীমোহন দাস, সুরেন্দ্রনাথ রায় বসুনিয়া, নায়েব আলি (টেপু), আয়েষা সরকার, গৌরীপুরের প্রতিমা বড়ুয়ার মতো বহু শিল্পীকে, এঁরাই আমাদের কাছে শ্রদ্ধেয় তানসেন, লতা-আশা-আকাঙ্ক্ষা, বট-পাকুর-ভাওয়াইয়ার ‘শিপা’। উত্তরবঙ্গের বাওকুমটা বাও, হাওয়া-মাটিতে সৃষ্টি ভাওয়াইয়া গান বিশ্বের দরবারে আব্বাস সাহেবদের মতো শিল্পীদের হাত ধরে বেশি প্রচার পেয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন পল্লিমায়ের এই মেঠো সুর বিশ্ব-সংগীত সভায় আসন পাতুক। আব্বাসউদ্দিন, প্যারীমোহন দাস, প্রতিমা বড়ুয়ারা না থাকলে আমরা উত্তরবঙ্গের প্রায় ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায় এত বেশি পরবর্তী প্রজন্মের নামকরা ভাওয়াইয়া শিল্পীদের পেতাম না, ‘রক্তকরবী’ নাটকের গান-পাগল বিশুদের মতো ভাওয়াইয়া পাগল ‘গিদাল’, ‘দোয়ারী’ ‘বাউদিয়া’দের দেখতাম না– যারা লোকগানগুলি আদর-যত্নে লালনপালন করে আসছে। উত্তরের মন ও মননে ভাওয়াইয়া গানের বীজমন্ত্র তাঁর মতো জীবনশিল্পীরাই সযত্নে বিছিয়ে দিয়েছেন।

আব্বাস ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন, ধর্মান্ধ ছিলেন না। বাউল শাহ আবদুল করিমের মতো সব ধর্মের মানুষদের মিল-মহব্বতের কথা বলেছেন জারি, সারি, ইসলামি, লোক ও নজরুল সংগীতে। মনে মনে কষ্ট পেতেন খুব, অপমান বোধ করতেন চিলমারী বন্দরের মাঝিমাল্লা, গাড়িয়াল ভাই, কৃষক ভাইদের কণ্ঠে ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালির সুর শুনতে না পেলে, নিজের আত্মজীবনী ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’ ও ‘দিনলিপি’র পাতায় বলেছেনও সেকথা তিনি। গোটা বিশ্বকে বেঁধে রাখার স্বপ্ন দেখেছেন ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালির লোক-সুরে, আমাদের কাছে হতে পেরেছেন সেখ আব্বাসউদ্দিন আহমেদ থেকে প্রিয় আব্বাস গিদাল। ছোটবেলায় ‘পাজী ছেলে মুসলমানের গান গাইতে আছে’– এরকম তীর্যক শব্দবাণকে উপেক্ষা করে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য সহ্য করেও সংগীত সাধনা করেছেন আজীবন। তোর্সা, কালজানির বরফ গলা ‘ছ্যাংছেঙা’ কালো জলের ঢেউয়ে বুক ভাসিয়ে নজরুল, জসীমউদ্দিন কিংবা জীবনানন্দের মতো গ্রামবাংলার পথেঘাটে লোকগানের ঝুলি নিয়ে হাজার হাজার বছরের পথ হাঁটার ব্রত ধারণ করেছেন স্বেচ্ছায়। 

zoom
শাহ্‌ আবদুল করিম

র‍্যাডক্লিফের দেশভাগের পর ওপার থেকে আসার সময় বর্ডারের কাঁটাতারের বেড়ায় সাময়িকভাবে তাঁর দোতারা টাঙিয়ে রাখা হলেও, দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে শোনাতে পেরেছিলেন তোর্সা নদীর ঘোলা জলে বুকভাঙা ঢেউয়ের যন্ত্রণা, কালজানির কালো জলের হাহাকার। সাইবেরিয়ার পরিযায়ী পাখিদের মতো আব্বাসউদ্দিনের জন্মভূমির প্রতিবেশীরা, সহনাগরিকেরা– ভিটেমাটি, প্রিয় মানুষকে ছেড়ে যখন এখনও পাড়ি জমায় ভারত মহাসাগর কিংবা আরব সাগর-পারে সামান্য ‘রুটি-নুন-চা’র টানে, দু’বেলা দু’মুঠো মুখে দেবার আশায়, ‘সোনা বন্ধুর তানে’ তাঁর স্ত্রী হয়তো এখনও তাকিয়ে থাকেন তোর্সা-কালজানি-ধরলা পারের আকাশ পানে, ভেসে আসা মেঘে যক্ষবধূর মতো প্রিয়জনের সংবাদ না পেলেও মাথার ওপর চলন্ত উড়োজাহাজ দেখে– বর্ডারে আটকে রাখা আব্বাসউদ্দিনের তেতুল খুঠার (কাঠের) চকচকে কালো দোতারা উড়োজাহাজে ঝুলিয়ে দিল্লিতে নিয়ে আসার লোককথা মনে পড়ে হয়তো-বা, আব্বাসের তোর্সা পারের উথাল-পাতাল গানে আশ্রয় খোঁজেন ভরসায়, খুঁজে পেতে চান বাঁচার আয়ুধ, অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকেন প্রিয় মানুষটির জন্য। রাস্তার সস্তা ধুলো উড়িয়ে কালো কাঁচের গাড়িতে আসা ‘উম্রা’ (তথাকথিত সমাজসেবক) আব্বাসউদ্দিনের জন্মভিটের ছ্যাচার বেড়ায় ঘেরা জংধরা টিনের ঘর দেখতে এসে তিস্তা-তোর্সা-কালজানি-ধরলায় বয়ে চলা লক্ষ লক্ষ কিউসেক জল ও পানি মেপে দেখেন না শুধু– মেপে দেখেন, কীভাবে লোক-ঐতিহ্য ভুলিয়ে দিয়ে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে আরও সাচ্চা হিন্দু বা মুসলমান করানো যায়, ভাতের মধ্যে আরও কত বেশি মাছের ঝোল ঢেলে বাঙালি করানো যায়! কতটা অতীত ঐতিহ্য ভুলিয়ে দিলে রাষ্ট্রবাদী করানো যায়, হিসেব রাখেন তার কেবল। শুনতে পান না, চানও না, আব্বাসের জন্মভিটের জীর্ণ ঘর থেকে ভেসে আসা সহ-নাগরিকদের ‘আনাহত মেম্ননের স্বর’ ও কেচ্ছা; ফিরে যাওয়ার সময় ‘ঘাড়ের গামছা’র বদলে রেখে যান ‘ভিজে গামছার’ একরাশ প্রতিশ্রুতি কেবল; আবারও আশায় সবাই বুক বাঁধেন, আনন্দে কোনও প্রিয় বিরহী বধূর চোখের জলে খেলা করে স্বপ্নরা। আহা! সব স্বপ্ন কেন সত্যি হয় না?

Abbasuddin Ahmed Bhatiyali bhawaiya folk songs Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar shah abdul karim

Share this article on