হেমন্তর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিচ্ছেদ হয়নি কোনওদিন। কবির অন্তিমশয্যার পাশে নীরবে ছিলেন বৈষ্ণবী। যখন বুঝলেন পথের শেষ আর বেশি দূরে নয়, নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে চিরদিনের জন্য। দিনলিপির পাতায় লিখে রাখলেন এই হৃদয়কথা: ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮। ৭ আগস্ট ১৯৪১। রাখিপূর্ণিমা, বেলা ১২ টা ১০। দিন ফুরাল আমার প্রেমিক ও কবির।
১০৯.
১৯৩১ সাল। ৭০ পেরিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। এবং প্রবল পরিশ্রম ও মানসিক অশান্তির কারণে শরীর ভালো নেই তাঁর। শরীরের সঙ্গে মন– সে-ও ভালো নেই। শেক্সপিয়রের কয়েকটি অপরিমেয় অব্যর্থ শব্দ মনে পড়ে তাঁর, ‘the pale cast of thought!’
হ্যামলেটের মুখে এই পাঁচটি শব্দ কী অনিবার্য অমরত্বতে উত্তীর্ণ! ঠিক একই রকম পেলব বিষাদ ছায়া ফেলে আছে রবীন্দ্রনাথের মনে। অনেকদিন আগে লেখা নিজের একটি গান মনে পড়ে তাঁর:
‘আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার,
দিনের আকাশ মেঘে অন্ধকার– হায় রে!’
স্পষ্ট মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের, ১৯২৪ সাল, রাণুর বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে এবং তাঁর জীবন থেকে আরও এক বাঁধভাঙা প্রেম চলে গিয়েছে, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, সেই সময়ে, ৬৩ বছর বয়সে লিখেছিলেন এই গান, কী মনের অসহনীয় অবস্থায়! রবীন্দ্রনাথ জানেন, গত বছর শেষ দেখা হয়েছে তাঁর ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে প্যারিসে। আর কোনওদিন দেখা হবে না তাঁদের। কত বছর হয়ে গেল, প্রেম নেই! কত বছর তিনি নিঃসঙ্গ! তিনি মেনে নিয়েছেন দীর্ঘ জীবনের এই পরিণতি, প্রেম আর আসবে না। বাকি জীবন কাটবে আদরের উপবাসে!

তিনি ফিরে যান তাঁর লেখার টেবিলে। আরও একবার খামের ওপর মেয়েলি হাতের লেখার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর এক লাইনের চিঠিটা পড়েন। একটি মাত্র লাইন। তবু অশেষ:
‘যোগাযোগের গ্রন্থকারকে নমস্কার।’ নিচে সই: ‘খদ্যোৎবালা’।
তাহলে কি মেয়েটির নাম জোনাকি? আর এই নারী জানে জোনাকির সংস্কৃত নাম– খদ্যোৎ!
আরও এক গভীরতর খটকা রবীন্দ্রনাথের মনে। এই মেয়ে কেন হঠাৎ ‘যোগাযোগ’-এর লেখকরূপে আমাকে স্মরণ করে নমস্কার জানিয়েছে? সে কি কোনওভাবে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে এই উপন্যাসের নায়িকা কুমুদিনীর মধ্যে? আর তার স্বামীকে পেয়েছে অর্থের অহংকারে অসহনীয় হয়ে ওঠা মধুসূদনের চরিত্রে? ‘যোগাযোগ’ দুই জমিদার পরিবারের কাহিনি। কুমু অভিজাত, রুচিসম্মত, শিক্ষিত জমিদার পরিবারের কন্যা। অহংকারী এবং রুচিহীন মধুসূদনের সঙ্গে কুমুর কোনও মনের মিল হল না। এই এক লাইনের চিঠির লেখিকা কি কুমুর মতোই স্বামীর দ্বারা অত্যাচারিত, অপমানিত? সে কি আবার চিঠি লিখবে রবীন্দ্রনাথকে?
কয়েকদিনের মধ্যেই একই হাতের লেখায় দ্বিতীয় চিঠিটি এল। এবারেও এক লাইন: ‘হে মোর অমর কবি, হে চিরমধুর’। এবার কিন্তু খদ্যোৎবালা থেকে দক্ষবালা! রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত এই মেয়ের কৌতুকবোধে এবং ভাষাজ্ঞানে! জোনাকি থেকে প্রজাপতি? তাঁর চেনা ক’জন বাঙালি জানে ‘খদ্যোৎ’ মানে জোনাকি, ‘দক্ষ’ মানে প্রজাপতি?

এরপর এল তৃতীয় চিঠি। স্বাক্ষর: জোনাকি দেবী। রবীন্দ্রনাথ দু’টি বিষয়ে এখন নিশ্চিত: এই নারী আরও চিঠি লিখবে। এবং সে আছে ছদ্মনামের আড়ালে। যদিও অনেক সহজ স্বাভাবিক হতে পেরেছে। চতুর্থ চিঠি আর এক লাইনের নয়। দিয়েছেন নিজের পরিচিতি:
আমার নাম হেমন্তবালা। গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্রকুমার রায়চৌধুরী আমার বাবা। আমার অল্প বয়সে বিয়ে হয়। স্বামীর নামও ব্রজেন্দ্র। ব্রজেন্দ্রকান্ত রায়চৌধুরী। আমি এক ছেলে ও মেয়ের জননী। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে আমার বনিবনা হল না কিছুতেই। আমার মনে ক্রমশ একটি প্রশ্ন তৈরি হল: যাঁর সঙ্গে মনের মিল হল না, তিনি স্বামী বলেই তাঁর সঙ্গে সহবাস করতে হবে? ছেলেমেয়েকে নিয়ে চলে এসেছিলাম বাপের বাড়িতে। কিন্তু সমাজের চোখে আমি সংসারভাঙা মেয়ে। তাই বাপের বাড়িতে সম্মানের আশ্রয় জুটল না। এবং আমার শ্বশুরবাড়ি আর বাপের বাড়ির মধ্যে ঝগড়া বাধল। অশান্তির চাপ এবং ঝাঁঝ এল আমার ওপর। কেউ আমার কানে তুলল এই উপদেশ, আমার বৈষ্ণব ধরনের দীক্ষা নেওয়া উচিত। তাহলে গুরু পাব এবং শান্তি পাব। শেষপর্যন্ত আমি গেলাম কিশোরানন্দ গুরু মহারাজের আশ্রমে। এবং তাঁর কাছে দীক্ষা নিলাম বৈষ্ণবধর্মে। আমার আশ্রয় জুটল পুরীর চক্রতীর্থে। কিন্তু মাথার ওপর ছাদ পেয়েও শান্তি পেলাম না। তারপর পুরীতে আমার হাতে এল ‘শেষের কবিতা’।
‘যোগাযোগ’ পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। কুমুদিনীর মধ্যে নিজেকে পেয়ে আশ্চর্য হয়েছিলাম এই ভেবে যে, আপনি আমার মনের কথা, দুঃখবেদনা বুঝতে পারলেন কী করে! কিন্তু ‘শেষের কবিতা’ পড়ে আমি বিহ্বল। শুধু মনে হয়, একবার যদি আপনার দেখা পাই, একবার যদি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারি আপনার সঙ্গে, তাহলে মনটা শান্তি পাবে, জীবনের অর্থ খুঁজে পাব। গুরুদেব কিশোরানন্দ আমার মনের এই ভাব বুঝতে পেরে সর্বক্ষণ আপনার নিন্দা করেন এবং বলেন, আপনার লেখা আমার ওপর অশুভ প্রভাব ফেলছে! এরপর আমার পক্ষে আর ওই গুরুর আশ্রমে থাকা সম্ভব হয়নি। আমি বাপের বাড়িতেই ফিরে এসেছি।

এই পর্যন্ত লিখে থামলেন হেমন্তবালা। এবার যে-কথা লিখতে ইচ্ছে করছে, লেখা কি যায় রবীন্দ্রনাথকে? বহু পুরনো লেখার টেবিলটার পানে তাকালেন হেমন্তবালা।
তারপর অনুভব করলেন, তাঁর গলা শুকিয়ে কাঠ। জানলার কাছে লাল কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে সোনার মতো ঝলমলে পিতলের গেলাস থেকে পান করলেন ঠান্ডা মিঠে জল। ফিরে এলেন লেখার টেবিলে। আর তখুনি ঘটল সেই অবিশ্বাস্য মিরাকল। টেবিলটা তাঁকে বলল: হেমন্ত, লেখো তুমি তোমার প্রাণসখাকে তোমার মনের কথা। তিনি বুঝবেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ। তিনি তোমাকে না জেনেও কুমুদিনীকে সৃষ্টি করতে পেরেছেন।
টেবিলটার কথা দৈববাণীর মতো আচ্ছন্ন করে ফেলল হেমন্তকে। তিনি ঘোরের মধ্যে লিখতে লাগলেন রবীন্দ্রনাথকে: গুরু কিশোরানন্দ আমাকে দিয়েছেন কৃষ্ণমন্ত্র। কিন্তু কৃষ্ণনাম জপ করতে বসলে আমার মন হঠাৎ চলে যায় অন্য নামে। সে নাম রবীন্দ্রনাথ। ক’দিন আগে কৃষ্ণকীর্তন গাইবার জন্য বসেছিলাম। কণ্ঠে চলে এল আপনার সুর, আপনার বাণী–
‘স্বপ্নভারে জমল বোঝা,
চিরজীবন শূন্য খোঁজা–
যে মোর আলো লুকিয়ে আছে রাতের পারে
আমায় দেখতে দাও।’

আমার সমস্ত অন্তর জুড়ে শুধুই রবীন্দ্রনাথ। কী করি আমি? প্রেমে ভক্তিতে যে একাকার। ইচ্ছে করে একটিবার আপনার কাছে যাই। একবার আপনার দেখা পাই। কিন্তু আপনি অনেক দূরের মানুষ। কোথায় কলকাতা, আর কতদূরে শান্তিনিকেতন!
একটা কথা ক্রমে বুঝতে পারছি। একবার সংসার ছেড়ে গেলে, সেখানে ফিরে এলে, কিছুই ফিরে পাওয়া যায় না। ভেবেছিলাম, কৃষ্ণনাম সম্বল করে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব। এখন মন বলছে, কৃষ্ণ না রবীন্দ্রনাথ? সত্যি কাকে চাইছে আমার মনপ্রাণ? কার কাছে আমি অর্পণ করতে চাই নিজেকে?
হেমন্ত ঘামছেন। তাঁর বেতের মতো ছিপছিপে শরীর। এবং তিনি তামাটে সুন্দরী। তিনি এতদিন নিজেকে জেনেছেন বেপরোয়া বলেই। কিন্তু পরের লাইনগুলো লিখতে গিয়ে তাঁর বুক ঘামছে। তবু হেমন্ত না-লিখেও পারলেন না: আমার মনে বড় কষ্ট। রবীন্দ্রনাথ, আপনি কেন ব্রাহ্ম? কেন বৈষ্ণব নন? আপনি বৈষ্ণব হলে তো আপনার কাছেই দীক্ষা নিতাম। আপনাকেই বসাতে পারতাম গুরুর আসনে। আপনি আমার কানে দিতেন বীজমন্ত্র। এবং আপনি সুর বসিয়ে দিতেন সেই মন্ত্রে। তাহলে আমাকে আপনার মত ‘বিধর্মী’-কে ভালোবেসে এত যন্ত্রণা পেতে হত না।

কিছুদিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের উত্তর এল। সেই চিঠি খুলতে হাত কাঁপল হেমন্তর। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন মাত্র দু’টি লাইন তাঁর মুক্তাক্ষরে: অন্তরে তুমি যাকে গ্রহণ করেছ, তাঁরই ভাবরূপ যদি আমার মধ্যে কল্পিত করে থাক, তবে কিছুতেই ক্ষতি হবে না। আমাকে তোমার গুরু বলে মান্য কোরো না, আপনার জন বলেই জেনো।
হেমন্ত বারবার পড়েন এই দু’টি লাইন। এবং ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন দু’টি লাইনের মধ্যে এক সমুদ্র লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর চোখে ছলছল করে ওঠে আনন্দ। তিনি রবীন্দ্রনাথের চিঠি বুকে ধরে টেবিলের ওপর মাথা রাখেন। তাঁর কান্নায় মিশে যায় প্রণাম।
কিছুদিনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের আরও একটা চিঠি!
এই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বোধহয় রচনা করেছেন অভিমানের দূরত্ব, ভাবেন হেমন্ত। এবং কষ্ট পান। তবু বারবার পড়েন তিনি: গৃহের ও সম্প্রদায়ের কঠোর বন্ধনে শৃঙ্খলিত এরকম বন্দিদশা আমার অভিজ্ঞতার বাইরে। কৃত্রিম ও সংকীর্ণ নিয়মের নাগপাশে মানব আত্মাকে এমনভাবে সন্ত্রস্ত ও উৎপীড়িত করাকে আমি অধর্ম বলেই জানি। এই বন্ধনকে তুমি নিজেই যখন স্বীকার করে নিয়েছ, একেই তুমি যখন মুক্তি বলে কল্পনা করো, তখন উপায় নেই। এ অবস্থায় বন্ধনে সম্পূর্ণভাবে ধরা দেওয়াতেই তুমি আরাম পাবে।

এই চিঠির বিরুদ্ধে চিৎকার করে ওঠে হেমন্তবালার মন। আমি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি– এই পুরুষশাসিত সমাজের বিধি, রীতিনীতি, কঠোর নিয়ম। কিন্তু কে বলল আপনাকে, আমি মুহূর্তের আরাম পেয়েছি? আমার বিশ্বাস, আপনি ক্রমশ বুঝবেন এই নিঃসঙ্গ বৈষ্ণবীর যন্ত্রণা। আর বুঝবেন সে কতখানি শুধুই আপনার।
কিছুদিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের এই চিঠি পৌঁছল হেমন্তর কাছে: আমার চিন্তা থেকে তোমাকে দূরে রাখতে পারিনি। তোমার চিঠি পড়ি। তোমার কথা ভাবি। একটা কথা বারবার মনে আসে। তোমার চিরঅভ্যস্ত ধর্মমত ও আচার থেকে আমি তোমাকে বিচ্ছিন্ন করিনি, বিক্ষিপ্ত করেছি। তাই নিয়ে তোমার নিরন্তর দ্বন্দ্ব চলছে। অথচ এ দুঃখ কোনওদিন তোমাকে দিতে ইচ্ছা করিনি। নানা শিক্ষাদীক্ষা অভ্যাসে সংস্কারে তোমাকে ঘিরেছে। তোমার আন্তরিক শক্তির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য হয়নি। তাই কষ্ট পাচ্ছ। অথচ তোমার আর কোনও গতি নেই। নূতন যে পথ খুঁজতে যাবে, খুঁজে পাবে না। কষ্ট পাবে।

নতুন পথ তো খুঁজে পেয়েছি। রবীন্দ্রনাথ, আমার নতুন পথ তো তুমি! বোঝো না? এত বোঝো! আর এইটুকু বুঝতে পার না? হেমন্ত একটি চিঠিতে লিখেই ফেললেন: আমি আপনার। আপনি আমার দেবতা। আমার কল্পলোকের রাজা। আমার দুর্ভাগ্য যে, আমার পূর্ণপূজা আপনার চরণে দিতে পারছি না। আপনি কি আমার মন দেখতে পারছেন না?
রবীন্দ্রনাথ ‘পূর্ণপূজা’ শব্দটি বিশেষ আদরে অনুভব করলেন। এবং এক জটিল চাল দিলেন পত্রে: অবসাদের ছায়াচ্ছন্ন তোমার চিঠিখানি পেয়ে আমি দুঃখবোধ করেছি। আমার বিশ্বাস তোমার এই মানসিক গ্লানি তোমার শারীরিক অস্বাস্থ্যেরই অনুবর্তী।
ভাষার এই মারপ্যাঁচের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ যা লুকিয়ে রেখেছেন, তা হল, শুধু হেমন্তর মন নয়, এই বৈষ্ণবীর শরীরের জন্যও তাঁর উদ্বিগ্ন ভাবনা। হেমন্তর মনে পড়ে, ক’দিন আগে আর এক পত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: শরীরটা বিধাতার দুর্লভ দান। ওটাকে অবহেলা করার অধিকার কারও নেই। লক্ষ টাকা দাম দিয়ে যদি ওকে কিনতে হত, তবু এর উপযুক্ত মূল্য হত না।

এই চিঠি পাওয়ার পরে হেমন্ত তাঁর মানবী-চেতনার তৃতীয় স্তরে অনুভব করলেন, এবার কবির ডাক আসবে। তাঁর সঙ্গে দেখা করার ডাক। ঠিক তাই হল! রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ কলকাতায়। এবং হেমন্তবালাকে ডাক দিলেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তাঁর সঙ্গে দেখা করার ডাক। এবং বললেন, রাত করে এসো। কেননা, রাত্রিবেলাতেই তিনি একা হতে পারেন। ভিড় ও ব্যস্ততা সরে যায়। নিবিড়তার প্রকৃত সময় তো রাত্রি। কবির এই আমন্ত্রণে প্লাবিত হলেন হেমন্ত। তাঁর পূর্ণপূজা ও অর্ঘের সময় এতদিনে বুঝি এল! রবীন্দ্রনাথের একটি গানের শেষটুকু আলতো সুরে গুনগুন করে ওঠে বৈষ্ণবীর মনে:
‘ওই দেখো গোধূলির ক্ষীণ আলোতে
দিনের শেষের সোনা ডোবে কালোতে
আঁধার নিবিড় হলে আসিও পাশে,’

হেমন্ত শেষপর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের ঘরের দরজায়। নিঃসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ আরামকেদারায়। জানলার পাশে। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে। অপূর্ব একা। ক্লান্ত। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ শরীর প্রান্ত বয়সেও অগ্নিভ রূপরেখায় বিস্তৃত। হেমন্তর সমস্ত শরীর মন গেয়ে উঠল: ‘এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর’। রবীন্দ্রনাথ মৃদু মধুর স্বরে ডাকলেন, এসো হেমন্ত, কাছে এসো, তোমাকে দেখি। জানলা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় শুভদৃষ্টি হল রবীন্দ্রনাথের বৈষ্ণবী হেমন্তর সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ চাঁদের আলোতেও বুঝতে পারলেন, রূপে-রসে এই যুবতী সাধারণ নয়। সাধারণ বাঙালি মেয়েদের তুলনায় অনেক লম্বা। বেতসী। একহারা। জীবনের কষ্ট এই মেয়ের শরীরে এনেছে অগ্নিতেজ। রবীন্দ্রনাথের মনে হল, আমার শেষ বয়সের উত্তাপ এই নারী।
কেমন দেখছেন আমাকে? মৃদু হেসে জানতে চাইলেন হেমন্ত। রবীন্দ্রনাথ বললেন, গভীর আনন্দ পাচ্ছি হেমন্ত। বুদ্ধিতে উজ্জ্বল তোমার মুখশ্রী। তারপর কবিতায় জানালেন:
‘কোন্খানে যে মন লুকানো দাও বলে।
চপল লীলা ছলনাভরে বেদনখানি আড়াল করে,
যে বাণী তব হয় নি বলা নাও বলে।’
হাত বাড়িয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। হাত ধরলেন হেমন্ত। বললেন, ছেড়ে যাব না কোনওদিন।

রবীন্দ্রনাথ তাঁদের শুভদৃষ্টির রাতটিকে একটি কবিতায় সেলিব্রেট করলেন হেমন্তর মুখে এই মনের কথা বসিয়ে:
‘চেনো কিম্বা নাই বা আমায় চেনো
তবু তোমার আমি।
সেই সেদিনের পায়ের ধ্বনি জেনো
আর যাবে না থামি।’
হেমন্তর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিচ্ছেদ হয়নি কোনওদিন। কবির অন্তিমশয্যার পাশে নীরবে ছিলেন বৈষ্ণবী। যখন বুঝলেন পথের শেষ আর বেশি দূরে নয়, নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে চিরদিনের জন্য। দিনলিপির পাতায় লিখে রাখলেন এই হৃদয়কথা: ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮। ৭ আগস্ট ১৯৪১। রাখিপূর্ণিমা, বেলা ১২টা ১০। দিন ফুরাল আমার প্রেমিক ও কবির। গ্রহণ করেছিলেন তিনি। দিতে পেরেছিলাম আমার পূর্ণপূজা ও অর্ঘ্য। সার্থক আমার জীবন।
…………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব
…………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved