তলস্তয়ের ‘পাওয়ার অফ ডার্কনেস’ থেকে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পাপ পুণ্য’ নাটকটি নির্মাণ করেছিলেন। এই নাটক মূলত হীনতা ও স্বীকারোক্তির নাটক। নিতাই তাঁরই মেয়ের সঙ্গে ব্যভিচারে জড়িয়ে পড়ে এবং নিজের হাতে অবৈধ সন্তানকে হত্যা করে। বাড়ির পুরনো ভৃত্য নিতাইকে বলে, ‘সব মানুষই পাপ করে, স্বীকার করতে পারাটাই আসল শক্তি’। ওই একটা ছোঁয়াই নিতাইকে স্বীকার করার শক্তি দেয় আর মুহূর্তের মধ্যেই তলস্তয়ের নাটক এদেশের হয়ে ওঠে।
‘অ্যাডাপটেশন’ কথাটার সঙ্গে কমবেশি আমরা সকলেই পরিচিত। আলোচনার সুবিধার্থে অ্যাডাপটেশনের বাংলা অর্থ মানিয়ে নেওয়া বা কোনও সাহিত্য বা আর্ট-এর রূপান্তরকে ধরে নিচ্ছি। যেমন কোনও বিদেশি রচনার উপর ভিত্তি করে তৈরি হতে পারে একটি নাটক। কিন্তু এই রূপান্তর বিষয়টি নিয়ে আমাদের মধ্যে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা থেকেই গিয়েছে। অর্থাৎ ‘রূপান্তর’ মানে কি অনুবাদ করা? না কি অনুকরণ কিংবা অনুসরণ করা? অথবা রূপান্তরের সময় কতটা মূল সৃষ্টির থেকে নেওয়া হবে বা বর্জন করা হবে– এ-ও ভেবে দেখবার বিষয়! কে বা কারা রূপান্তর করছেন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বা মতাদর্শের ওপর নির্ভর করে বিষয়টি। তাই একেবারে আক্ষরিক অনুবাদ হওয়াও যেমন বাঞ্ছনীয় নয়, ঠিক এর বিপরীতটা হলেও বিপদ। কারণ একেবারে মূল লেখা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সেই রূপান্তরের কোনও মানে থাকে না। পাঠক দেখবেন, অনেক চিত্রনাট্যের ওপরেই লেখা থাকে ‘দ্য স্টোরি বেসড অন’– এই যে কোনও কাহিনির উপর ভিত্তি করে যখন কিছু লেখা হয়, তখন এই দেওয়া-নেওয়ার সাযুজ্য ঠিকমতো না হলে সেই রূপান্তরের কোনও মানে হয় না। তবে এখানেও একটা ভেবে দেখবার বিষয় আছে, এই নেওয়া-দেওয়ার পরিমাপ কে ঠিক করে দেবে? আর কোন পরিমাপকেই বা আমরা সঠিক বলে ধার্য করব? এই তুল্যমূল্য বিচারে না গিয়ে অতীতের দৃষ্টান্তগুলি থেকেই বুঝে নেওয়া বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমাদের এখানেও অ্যাডাপটেশনের বেশ কিছু ভালো কাজ হয়েছে। যেমন চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায়ের ‘গণদেবতা’ বা বিশাল ভারদ্বাজ -এর ‘হায়দার’ ইত্যাদি। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালিদাসের কবিতা, কবীরের দোহা, বিদ্যাপতির মৈথিলি ও বৈষ্ণব পদাবলি বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত করেছিলেন। এছাড়াও তিনি আজীবন বহু পাশ্চাত্য কবিতার অনুবাদ করে গিয়েছেন। একইভাবে বলতে হয় বাংলা থিয়েটারে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রূপান্তরিত নাটকগুলির কথা। কারণ তাঁর রূপান্তরিত ‘পাপ পুণ্য’, ‘পাখি’, ‘৩৩তম জন্মদিবস’ ইত্যাদি প্রযোজনা মৌলিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।

এই প্রশ্ন অনেকের মনেই আসতে পারে যে, রূপান্তরের বিষয়টি বুঝে নেওয়ার জন্য অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ই কেন? এখন তো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রান্সলেশন স্টাডিজ পড়ানো হয় এবং বিভিন্ন সাহিত্যতত্ত্বের মাধ্যমে আলোচনার গভীরে সহজেই যাওয়া
যায়। হ্যাঁ, একথা সত্যি যে সাহিত্যের বিভিন্ন তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে রূপান্তরের বিষয়টি বুঝে নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু হাতের সামনে একজন মহীরুহ থাকলে তাঁর করে যাওয়া কাজের দীপ্তি সহজেই অনুমেয়। আসল কথা হল: কেন আমরা রূপান্তর করব?
অ্যাডাপটেশনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? শুধুই কি বিদেশি নাটককে বাংলায় রূপান্তর করা একজন নাটককারের কাজ? না কি সাহিত্যের বিষয়বস্তুকে মঞ্চে বা চলচ্চিত্রে তুলে ধরাই অ্যাডাপটেশনের কাজ? প্রসঙ্গত প্রয়াত সুরকার-সমালোচক দেবাশীষ দাশগুপ্ত একবার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে বলেছিলেন– ‘অ্যাডাপটেশনের মানে যে শুধু গ্রহণ করা নয় তা অজিতেশই একমাত্র প্রমাণ করেছে।’
তলস্তয়ের ‘পাওয়ার অফ ডার্কনেস’ থেকে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পাপ পুণ্য’ নাটকটি নির্মাণ করেছিলেন। এই নাটক মূলত হীনতা ও স্বীকারোক্তির নাটক। নিতাই তাঁরই মেয়ের সঙ্গে ব্যভিচারে জড়িয়ে পড়ে এবং নিজের হাতে অবৈধ সন্তানকে হত্যা করে। বাড়ির পুরনো ভৃত্য নিতাইকে বলে, ‘সব মানুষই পাপ করে, স্বীকার করতে পারাটাই আসল শক্তি’। ওই একটা ছোঁয়াই নিতাইকে স্বীকার করার শক্তি দেয় আর মুহূর্তের মধ্যেই তলস্তয়ের নাটক এদেশের হয়ে ওঠে।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে কোনও ভনিতা ছিল না। একটা ঘটনার কথা বলি। ১৯৮১ সালে শিশির মঞ্চে ‘রাণী কাহিনি’ নাটকের অভিনয় ছিল। নাটক শুরুর আগে গ্রিনরুমে এসে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রমাপ্রসাদ বণিকের হাত ধরে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন! একজন যুক্তিবাদী মানুষের এই ধরনের আচরণে প্রথমে রমাপ্রসাদ বণিক অবাক হয়েছিলেন। যদিও অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ অনেকেই মনে করতেন, এই সমস্ত আচরণ ছিল তাঁর ‘গেঁয়োমি’। পরবর্তীকালে ‘পাপ পুণ্য’ নাটক দেখতে এসে রমাপ্রসাদ বণিক বোধহয় তাঁর প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়– ‘আমার নাটক অভিনয় হবার আগে আমাকে ছুঁয়ে সেই শক্তি দিতে চেয়েছিলেন উনি।’
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের ভাবনায় অদ্ভুত ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারতেন। এই কারণে তাঁর নাটকে জীবন প্রকট হয়ে উঠে এসেছে। ওই গেঁয়ো বিশ্বাসটাই ছিল ওঁর মৌলিক দর্শন। আন্তন চেখভের ‘দ্য সিগাল’ থেকে ‘পাখি’ নাটকটি বাংলায় রূপান্তর করেছিলেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। নাটকটি ‘চেনামুখ’ নাট্যদলের তৃতীয় প্রযোজনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, অ্যাডাপটেশনের মানে শুধুই গ্রহণ করা নয়, প্রদান করাও। তাই রূপান্তরের সময় করে দেওয়া সমাধানের মধ্যে প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে, মাথা খাটিয়ে নতুন সূত্রের সন্ধান করতেন। ১৯৮৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ‘চেনামুখ’ নাট্যগোষ্ঠী ‘পাখি’ নাটকটি মঞ্চস্থ করে। বাংলা নাটককে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় এক নতুন পথের দিশা দেখাতে চেয়েছিলেন। অ্যাডাপটেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন– ‘আপনার দামী বিদেশি সিগারেট থেকে আমি চারমিনার ধরাবো, কিন্তু আমার ধূমপানে চারমিনারের আনন্দই পাব, ফাইভ ফিফটি-ফাইভ নয়।’

‘পাপ পুণ্য’র মতো একটা উচ্চমানের প্রযোজনার পর দর্শক অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে একটা ভালো কিছু পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, ঠিক সেই সময় ১৯৮১ সালে তিনি মঞ্চস্থ করলেন হ্যারল্ড পিন্টারের ‘৩৩তম জন্মদিবস’। প্রযোজনাটি দর্শকের ভালো তো লাগলই না, বরং অ্যাকাডেমির দর্শক নাটক দেখে বিরক্তবোধ করেছিলেন। সেদিন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থা হয়েছিল বিষণ্ণ নেপোলিয়নের মতো! নাটকের পরে তাঁর ঘনিষ্ঠ অনেকেই বলেছিলেন, এই নাটক সাধারণের জন্য নয়। এই কথায় কান না দিয়ে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রিনরুমে বসে স্বীকার করে নিয়েছিলেন, তিনি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। তিনি নিজের কাজ সম্পর্কে গঠনমূলক সমালোচনা যেমন গ্রহণ করে নিতেন, আবার পরবর্তী কাজের জন্য নিজেকে তৈরিও করে ফেলতে পারতেন। যদিও ‘৩৩তম জন্মদিবস’ প্রযোজনাটি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ নির্দেশিত নাটক। সে বছর এই নাটকটির জন্য তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নাট্য অ্যাকাডেমির শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মান দেওয়া হয়েছিল।

নির্দ্বিধায় একটা কথা স্বীকার করে নেওয়া যায় যে, নাট্যরচনায় তুলনামূলকভাবে পশ্চিমের থেকে আমরা এখনও কিছুটা পিছিয়ে। হ্যাঁ, ব্যতিক্রমী কিছু দৃষ্টান্ত অবশ্যই রয়েছে। তবে বিদেশি নাটক যখন ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে আমার দেশের ঘটনা হয়ে ওঠে, তখন অবশ্যই আমরা সমৃদ্ধ হই। এখানে আবার একটা ভয়ের কারণও রয়েছে। কারণ পশ্চিমের সমাজ, চিন্তাধারা, রীতিনীতি এতটাই আমাদের থেকে আলাদা যে, রূপান্তরের সময় আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়। এক্ষেত্রে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রূপান্তরিত নাটকগুলি অবশ্যই স্মরণীয়। কারণ বিদেশি নাটকও ভীষণভাবে মৌলিকতার দাবি করে। নাটকের বিষয়বস্তু, গঠনশৈলী এবং কথোপকথনে আর্থার মিলার, আন্তন চেখভ এবং ইবসেনের রচনাগুলো মানুষের মনে ঘাত-প্রতিঘাত সঞ্চার করতে পারে। যার ফলে দর্শকের চোখের সামনে একটা সত্যের উদ্ঘাটন হয়। থিয়েটার আসলে তাত্ত্বিক আলোচনা বা প্রবন্ধ পাঠের বিষয় নয়। এখানে সবকিছুই চোখের সামনে করে দেখাতে হয়। আবার থিয়েটারকে অনেকেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু এটা ভেবে দেখবার বিষয় যে, তাতে থিয়েটারের কতটা লাভ হচ্ছে! একথা সত্যিই যে, একটা সমাজ সচেতনতার লক্ষ নিয়েই আমরা থিয়েটার করে থাকি। আমার মনে হয়, থিয়েটারকে থিয়েটারের শর্তেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ভালো। বিদেশি নাটকের রূপান্তরের প্রয়োগে থিয়েটারের একটা স্বতন্ত্র উপলব্ধি রয়েছে, আবার সমস্যাও রয়েছে। তাই রূপান্তরের সময় কিছু বিষয়ের ওপর আমাদের সতর্ক থাকতে হয়। প্রথমত, নাটক নির্বাচন এবং এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া। দ্বিতীয়ত, নাটককারের সময় এবং মতাদর্শগত অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, রূপান্তরের সময় নিজের সমাজ ও দেশ সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং সবশেষে মৌলিক চিন্তার প্রসার ঘটানো। এক্ষেত্রে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের করে যাওয়া রূপান্তরগুলি ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। যেমন ‘তিন পয়সার পালা’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘পাপ পুণ্য’, ‘পাখি’ ও ‘৩৩তম জন্মদিবস’ ইত্যাদি।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর একটি দৈনিক কাগজের এক তরুণ সাংবাদিককে উৎপল দত্ত বলেছিলেন– ‘ওঁর ব্যক্তিগত জীবনে এত মৌলিক ভাবনা ছিল, মৌলিক নাটক লিখলে ভারতীয় থিয়েটার সম্পদশালী হত।’ কথার ভুল ব্যাখ্যা করে ওই সাংবাদিক উৎপল দত্তকে জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে কি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও মৌলিক ভাবনা ছিল না? উৎপল দত্ত অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে আলোচনার যবনিকা টেনেছিলেন। আজকের দিনে থিয়েটারে যে সমস্ত ছেলেমেয়েরা কাজ করতে আসছে– তাদের ভালো বই, উৎকৃষ্ট আর্টের সংস্পর্শে থাকাই ভালো– তা সে মৌলিক নাটকই হোক বা বিদেশি নাটকই হোক। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রূপান্তরগুলির মধ্যে যে মৌলিক দর্শনের কথা রয়েছে, সেই একই সুর ভিন্নমাত্রায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাতেও রয়েছে– ‘আমি যখন আমার লেখা অনুবাদ করি, আমি নতুনতর চিন্তার প্রসার ঘটাই। ফলে শেষ পর্যন্ত সেই অনুবাদ প্রায় নতুন লেখা হয়ে ওঠে। মূল চিন্তা এক, কেবল দেখবার চোখ বদলে যায়।’
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved