archival and historical photographs of mahatma gandhi | Robbar
Robbar
  • ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ২ অক্টোবর ২০২৬

আলোকচিত্রের গান্ধীবাদ

ছবি তোলাতে আপত্তি ছিল তাঁর, ফ্ল্যাশের আলোয় অস্বস্তি হত। তবু বিশ শতকের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছবি তোলা হয়েছে তাঁরই। ওয়াল্টার বসহার্ড থেকে লাইফ ম্যাগাজিনের মার্গারেট কিংবা ব্রেসোঁ– বিদেশ থেকে তাঁর ছবি তুলতে এসেছেন। এদেশের কুলবন্ত রায় কিংবা কানু গান্ধীও তুলেছেন বহু ছবি। মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে বিভিন্ন সময়ে তোলা তাঁর বিখ্যাত আলোকচিত্রগুলি নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ।

 

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২, ২০২৬, ০৮:৪৮   
Facebook WhatsApp Messenger

প্রতিবাদ প্রতিরোধের রাজনীতির সঙ্গে আলোকচিত্রের এক দীর্ঘকালীন বন্ধুতা। বিরুদ্ধাচরণের রাজনীতি যে প্রতিবাদের ভাষ্য তৈরি করে, তাকে চিরকালীন করে তোলে আলোকচিত্রের প্রামাণ্য শক্তি। কিন্তু শুধু প্রামাণ্য শক্তিতেই তা সীমাবদ্ধ থাকে এমনটা নয়, বরং কালের অমোঘ নিয়মে তা যে নানা শৈল্পিক আলোচনার প্রেক্ষিত তৈরি করে না– তা একেবারেই বলা যায় না।

কারণ আলোকচিত্রের মধ্যে যে অন্তর্নিহিত সম্মোহনী শক্তি, তা প্রতিবাদের চেতনাকে শুধু ‘ঐতিহাসিক’ করে তোলে এমন নয়, তাকে জীবিত রাখে, তাকে উজ্জীবিত করে, তাকে ধারণ ও বহন করার শক্তি জুগিয়ে চলে প্রতিনিয়ত। 

প্রসঙ্গক্রমে, বিশ শতকে সবচেয়ে বেশি ছবি তোলা হয়েছে এমন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কোনও তালিকা যদি প্রস্তুত করা যায়, সেই তালিকায় অন্যতম নাম– মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। বিভিন্ন সময়ে তার নানা আলোকচিত্রের খোঁজ আর্কাইভ ঘাঁটলে পাওয়া যায়। নানা দেশ থেকে ছুটে এসেছিলেন বিভিন্ন আলোকচিত্রী। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কারণে। শুধুই যে নিছক ছবি তোলা, ডকুমেন্ট করা কিংবা খবর সংগ্রহের তাগিদ নিয়ে আসা, এমন নয়। বরং তাঁরা অনেকেই কিছু-না-কিছু নিয়ে গিয়েছেন গান্ধীর ভারত থেকে। এক অদ্ভুত সম্পর্কের সমীকরণ তৈরি হয়েছে বারবার। প্রতিটি সমীকরণ একে অন্যের থেকে ভীষণ আলাদা। 

zoom
মহাত্মা গান্ধী, স্টুডিও ফোটোগ্রাফ, লন্ডন, ১৯৩১

‘গান্ধীর ছবি’ বলতে আমাদের সামনে যে দৃশ্যপট ভেসে ওঠে তা হল লাঠি হাতে, যৎসামান্য শ্বেতশুভ্র চাদর আবৃত এক বৃদ্ধ। চোখে গোলাকার ফ্রেমের চশমা। বইখাতা থেকে শুরু করে বিলবোর্ড, কড়কড়ে নোটের বান্ডিল, সরকারি ক্যাম্পেইন– সর্বত্র একই ধরনের ছবি। স্বয়ং নন্দলাল বসু থেকে শুরু করে মকবুল ফিদা হোসেন– প্রত্যেকেই ‘গান্ধী’ বলতে যে ছবি এঁকেছেন– তাও গান্ধীর এই রূপকে কেন্দ্র করেই। অস্বীকার করার জায়গা নেই, এই রূপের পিছনে কিন্তু গান্ধীর যথেষ্ট দার্শনিক চিন্তাভাবনা ছিল, ছিল এক গভীর দর্শন। আর সেই দর্শনকে জনমানসে প্রতিষ্ঠা দিতে আলোকচিত্রেরও গভীর অবদান রয়েছে। গান্ধী নিজেও সেকথা অনুভব করেননি এমন না। 

কিন্তু এই রূপ তো একদিনে তৈরি হয়নি, আর গান্ধীও গোটা জীবন জুড়ে প্রৌঢ় ছিলেন না। তাঁর জীবনের শুরু বরং হয়েছিল এক ঔপনিবেশিক পোশাকের মোড়কেই। রীতিমতো কোটপ্যান্ট পরে সাহেবদের দেশে তাঁর আইনের পাঠ পড়তে যাওয়া। গান্ধীর সেই রূপের ছবিও মেলে তাঁর আর্কাইভে। রীতিমতো এক দেশি সাহেব যেন। তবে এই পোশাক তাঁর জীবনে স্থায়ী হয়নি। ঔপনিবেশিক মোড়কের মোহ তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা থাকতেই একটু একটু করে কাটিয়ে উঠছিলেন। 

zoom
দক্ষিণ আফ্রিকায় কোটপ্যান্ট পরা গান্ধীর ছবি

১৮৯৩ সালের ৭ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার এক রেলস্টেশনে প্রথম শ্রেণির কামরায় ওঠার অপরাধে তাঁকে ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হয়। সেই পতনই বোধহয় তাঁর জীবনে সেই সেই ঔপনিবেশিক মোড়ক থেকে বেরিয়ে আসার প্রেক্ষিত তৈরি করে। একটি মামলার সূত্রে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়ে এক দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয় সেখানে। এক দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন। এই সময়েও গান্ধীর কিছু ছবি পাওয়া যায় বিভিন্ন আর্কাইভে। দেখা যায় অন্যান্য সত্যাগ্রহীদের মধ্যমণি হয়ে বসে রয়েছেন যুবক গান্ধী। 

…………………………………………………………………………………

zoom

…………………………………………………………………………………

আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তির কালে, আমরা খুঁজে পাব মুণ্ডিত মস্তকে, লাঠি হাতে ধুতি-কুর্তা পরিহিত ৪৪ বছরের এক গান্ধীকে। জীবনের মধ্যগগনে যিনি খুঁজে পেয়েছেন সত্যের পথ। তাঁর সত্যের রাজনীতি। ১৯১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিবাদরত ভারতীয় সত্যাগ্রহীদের ওপর ব্রিটিশ পুলিশ বর্বর অত্যাচার চালায়। অনেকে মারাও যান। তার প্রতিবাদস্বরূপ মুণ্ডিত মস্তকে এই পোশাকের চয়ন। ভারতের প্রাঙ্গণে নিজেকে বিকশিত করার ঠিক আগে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর এই চেহারাও সেই সময় লেন্সবন্দি হয়েছিল। 

zoom
সত্যাগ্রহী রূপ, ১৯১৩

এভাবেই ক্যামেরা তাঁর পিছু পিছু ধাওয়া করেছে। এরকম নজির ঢের মেলে। যদিও নিজের ব্যক্তিজীবনে ক্যামেরার সঙ্গে তাঁর সমীকরণটা কিন্তু বেশ অন্যরকম ছিল। বেশ কিছু ঘটনা, বক্তব্যের মধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে বা পোজ দিয়ে ছবি তোলাতে তাঁর আপত্তি ছিল বেশ খানিক। বিরক্তবোধ করতেন ফ্ল্যাশের আলোতেও। এমনকী আলোকচিত্রীদের দর্শন দেওয়াতেও তাঁর খানিক বিরক্তির ইঙ্গিত বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়। আবার আলোকচিত্রের সম্মোহনী শক্তি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না এমনটা নয়। আর সেই কারণেই অস্বস্তি বা বিরক্তি থাকলেও তিনি প্রয়োজনে লেন্সের সম্মুখীন হয়েছেন। সম্মুখীন হয়েছেন, কারণ জানতেন তাঁর বক্তব্য, জীবনযাত্রা, জীবন দর্শন কোথাও গিয়ে জনমানসে প্রকাশ হওয়া জরুরী। আলোকচিত্র সেই কাজ করতে সক্ষম। 

১৯৩০ সালে ডান্ডি অভিযানের ছবি তুলতে এসেছিলেন সুইস আলোকচিত্রী ওয়াল্টার বসহার্ড। জার্মানির ফোটোগ্রাফি এজেন্সি ‘Dephot’ তাকে পাঠিয়েছিল ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতের ছবি তুলে আনতে। তিনি পৌঁছন ডান্ডিতে লবণ আইন ভঙ্গের ছবি তুলতে। ছবিও তোলেন কিছু। কিন্তু আলোকচিত্রীর মূল লক্ষ্য তো ছিল আলাদা। তাঁর কাছে পাখির চোখ ছিলেন স্বয়ং গান্ধী। ডান্ডিতেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় সরোজিনী নাইডুর। সরোজিনীর সাহায্যে ওয়াল্টার পৌঁছন গান্ধীর কাছকাছি। উদ্দেশ্য ছিল, গান্ধীর একান্ত ব্যক্তিগত জীবন কেমন তা ছবিতে তুলে আনা। 

zoom
সুইস আলোকচিত্রী ওয়াল্টার বসহার্ড

সাক্ষাতে সেই অভিপ্রায়ের কথা বলেছিলেন গান্ধীকে। নিজের একাগ্রতা ও অধ্যবসায় দিয়ে গান্ধীকে রাজি হতে প্রায় বাধ্য করেছিলেন। গান্ধীও বেশ মজার ছলেই বলেছিলেন যে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, কোনও আলোকচিত্রীর জন্য পোজ দেবেন না। কিন্তু ওয়াল্টার যদি চান, নিজের ভাগ্যের পরীক্ষা করে দেখতেই পারেন, হয়তো তাঁর অভিপ্রায় পূরণ হতে পারে। 

অভিপ্রায় পূরণ হয়েছিল আলোকচিত্রীর। তিনি সেদিন গান্ধীর ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ছবি তুলেছিলেন। সেই ছবির ডালি থেকেই উঠে এসেছিল একটি ছবি– যেখানে গান্ধী বাটি হাতে পিয়াঁজের স্যুপ খাচ্ছেন। উঠে আসে একটি ছবি– যেখানে দেখা যায় রেজর দিয়ে গান্ধী দাড়ি কামাচ্ছেন। আজকের ‘জাতির জনক’-এর সেদিনের ন্যূনতম জীবনধারণের চিত্র এই ছবিতে উঠে আসে। আলোকচিত্রীও ততক্ষণে নিজের পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছেন। মনের আনন্দে গান্ধীকে ডকুমেন্ট করতে থাকেন। একটা সময় আসে যখন তাঁর মনে আশা জাগে যে, তিনি ঘুমন্ত গান্ধীর ছবি তুলবেন। জানা যায়, আলোকচিত্রী আশ্রমে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তিনি ঘুমন্ত অবস্থায় বাপুর ছবি তুলতে পারেন কি না! অনুমতিস্বরূপ উত্তর এসেছিল– তুলতে পারেন, কিন্তু তিনি (গান্ধী) ক্লান্ত, তাঁকে জাগানো যাবে না। ওয়াল্টার বসহার্ডের লেন্সের মধ্য দিয়েই সেদিন আন্তর্জাতিক বিশ্ব প্রথমবারের জন্য গান্ধী ও তাঁর ব্যক্তিজীবনকে এত কাছ থেকে দেখতে পায়। 

zoom
পেঁয়াজের স্যুপ খাচ্ছেন গান্ধী, বসহার্ডের তোলা বিখ্যাত ছবি

ওয়াল্টারের দেখানো পথেই হয়তো ১৯৪৬ সালে সুদূর মার্কিন মুলুক থেকে ভারতে এলেন প্রখ্যাত মহিলা চিত্রসাংবাদিক মার্গারেট বার্ক-হোয়াইট। মার্গারেট তখন ‘লাইফ’ ম্যাগাজিনে কর্মরত। ম্যাগাজিনের তরফ থেকেই তাঁর ভারতে আসা। উদ্দেশ্য স্বাধীনতাকামী ভারতবর্ষের বড় বড় নেতৃবৃন্দের আলোকচিত্র তুলে নিয়ে যাওয়া। তৎকালীন ভারতবর্ষে সবথেকে বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব স্বয়ং এম কে গান্ধী। কিন্তু গান্ধীর ব্যক্তিগত জীবনের ছবি তোলা যে কঠিন ব্যাপার তা মার্গারেট ইতিমধ্যেই জানতেন। এদিকে মার্গারেট নিজেও একজন ধৈর্যশীল, একরোখা চিত্রসাংবাদিক। বিপদসংকুল পরিবেশের ছবি তোলার বিস্তারিত অভিজ্ঞতা তাঁর। নানান দেশে যুদ্ধের ছবি তুলেছেন। তাঁর ধৈর্য ও জেদের কাছে গান্ধীও পরাজয় স্বীকার করেছিলেন। 

zoom
চিত্রসাংবাদিক মার্গারেট বার্ক-হোয়াইট

রীতিমতো ফ্ল্যাশ দিয়ে, সাজিয়ে-গুছিয়ে তিনি গান্ধীর ছবি তোলেন। তৈরি হয় সেই ঐতিহাসিক ছবি যেখানে দেখা যায় একটি চরকার সামনে বসে আপন মনে গান্ধী খবরের কাগজ পড়ছেন। অসম্ভব সুন্দর Depth of Field ও কম্পোজিশনে তৈরি সেই ছবি ভারতের অহিংস রাজনৈতিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ চিত্র।

একরোখা জেদি তরুণী আলোকচিত্রীর একাগ্রতা হয়তো গান্ধীকে নাড়া দিয়েছিল। তাই হাজার আপত্তি অস্বস্তি সত্ত্বেও মার্গারেটের ফ্ল্যাশ-এর সম্মুখীন গান্ধীকে হতে হত। গান্ধীও মার্গারেটকে উদ্দেশ্য করে বলতেন: “There’s the Torturer again”। রিচার্ড অ্যাটেনবোরো পরিচালিত অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘গান্ধী’-তে (১৯৮২) মার্গারেটের সঙ্গে গান্ধীর এই মিষ্টি সম্পর্ক উঠে এসেছে। পরিচালক অদ্ভুতভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে মার্গারেট গান্ধীকে বিভিন্ন জায়গায় দাঁড় করিয়ে ছবি তুলতেন। রীতিমতো দায়িত্ব নিয়ে সুন্দরভাবে ছবি কম্পোজ করতেন। 

zoom
মার্গারেটের ক্যামেরায় গান্ধী, সূত্র: লাইফ ম্যাগাজিন

অবশ্য এর বিনিময়ে মার্গারেটকেও খেসারত দিতে হয়েছিল। গান্ধীর আদেশে রীতিমতো তাঁকে চরকা কাটা শিখতে হয়েছিল। সেটাই ছিল ছবি তুলতে দেওয়ার শর্ত। শিখেছিলেন মার্গারেট। শিখতে শিখতে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, চরকা কাটা আর ফোটোগ্রাফি করা দুটোই যেন এক অদ্ভুত শিল্প, দু’টির মধ্যেই অদ্ভুত রকমের শৈল্পিক কৌশল লুকিয়ে থাকে। সেকথা তিনি প্রকাশও করেছিলেন গান্ধীর অনুগামীদের কাছে। উত্তর এসেছিল– চরকা কাটা অবশ্যই এই দু’য়ের মধ্যে খানিক এগিয়ে থাকবে।

গান্ধী ও মার্গারেট– এই দু’জনের সম্পর্ক শুধুমাত্র আলোকচিত্রী ও তার বিষয় হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গান্ধীর জীবন দর্শন ও আদর্শ সেদিনের মার্গারেটকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল। সে কারণেই হয়তো মার্গারেট আবার ফিরে এসেছিলেন দু’বছর পরে। সে সময় গান্ধীর শেষ অনশন। দাঙ্গাবিধ্বস্ত ভারতের করুণ পরিস্থিতি। নোয়াখালীর ভয়ংকর পরিবেশের পরে গান্ধী সেই বৃদ্ধ বয়সে স্থির করলেন অনশনে নামবেন। 

zoom
সংবাদপত্র পড়ছেন গান্ধী, আলোকচিত্র: মার্গারেট বার্ক-হোয়াইট, সূত্র: লাইফ ম্যাগাজিন

সেদিনের অনশনরত গান্ধীর সামনেও ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন চিত্র সাংবাদিক মার্গারেট। 

এরপর সেই ভয়াবহ দিন। ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮। বিড়লা হাউসে ছিল প্রার্থনাসভার আয়োজন। সেখানেই সেদিন ছিলেন গান্ধী। দুপুরে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন মার্গারেট। নেন দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। সমাজচিন্তা ও আদর্শ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনার শেষে বিদায় নেন মার্গারেট। 

মার্গারেট যাওয়ার পরেই, বিকেলের আগে আসেন আর এক প্রখ্যাত আলোকচিত্রী, ‘ম্যাগনাম ফোটোজ’-এর অন্যতম স্রষ্টা হেনরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ। ব্রেসোঁ-র তখন জগতজোড়া নাম। সেদিন বিরলা হাউসে এই দুই কিংবদন্তির আলাপ হয় দ্বিতীয়বারের জন্য এবং শেষবারের জন্য। 

মার্গারেট যেমন তাঁর কাছে ছিলেন ‘অত্যাচারী’, ব্রেসোঁ সম্পর্কে তাঁর মতামত ছিল খানিক ভিন্ন। কারণ সেই আবার ফ্ল্যাশ। মার্গারেট-এর মতো ব্রেসোঁ ফ্ল্যাশের যাতনায় তাঁকে ফেলেননি। বরং স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্রেসোঁ প্রাকৃতিক আলোকে সুনিপুণভাবে ব্যবহার করে ছবি তোলায় বিশ্বাসী ছিলেন। ছবি তোলার এই কৌশলগত দর্শন গান্ধীর বেশ পছন্দ হয়েছিল। 

zoom
হেনরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ

শোনা যায়, তাঁর ছবির প্রতি গান্ধী অনুরাগ প্রকাশ করেছিলেন। সেদিনের সাক্ষাৎকালে কিংবদন্তি আলোকচিত্রী নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্টে হওয়া তাঁর একক প্রদর্শনীর একটি ক্যাটালগ গান্ধীকে দেখান। গান্ধীও খুব মনোযোগ সহকারে প্রতিটি ছবি পাতা উল্টে দেখেন। শোনা যায়, একটি ছবির প্রতি গান্ধী আকৃষ্ট হন এবং সেই ছবিতে তাঁর চোখ আটকে যায়। তিনি আলোকচিত্রীকে ছবিটির বিষয়ে বিস্তারে ব্যাখ্যা করতে বলেন, ছবিটির অন্তর্নিহিত অর্থ জানতে চান। 

ছবিটি ছিল ফরাসি কবি Paul Claudel-এর, সেসময় তিনি একটি শববাহী যানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। ছবিটির দিকে তাকিয়ে গান্ধী কিছুটা আবেগমথিত হয়েই বলে বসেন, ‘মৃত্যু, মৃত্যু, মৃত্যু’। কী অদ্ভুত বিষয়! কথা বলার কয়েক ঘণ্টা পরেই প্রার্থনাসভায় যাবার সময় আততায়ী নাথুরাম গডসের গুলিতে তাঁর প্রাণ যায়। তাঁর সেই শবযাত্রার ছবিও ব্রেসোঁ তোলেন। সেসব ছবি ‘লাইফ’ ম্যাগাজিনে সেসময় প্রকাশিত হয়। আলোরিত হয় গোটা বিশ্ব। আলোকচিত্রী ব্রেসোঁ নিজেকে একজন ‘Observer’ হিসেবে দেখতেন, তিনিও সেদিন উপলব্ধি করেন তাঁর ক্যামেরার ঐতিহাসিক দায়িত্ব কতটা গভীর।

zoom
ব্রেসোঁর তোলা গান্ধীর মৃতদেহের ছবি

ব্রেসোঁ বলতেন, ‘To me photography is the simultaneous recognition, in a fraction of a second, of the significance of an event as well as of a precise organization of forms which give that event its proper expression.’ সেদিন যখন গান্ধীর বুক চিরে গুলি প্রবেশ করল, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ‘হে রাম’ বলে– সেসময় ভারতের বুকে আর এক প্রবাদপ্রতিম আলোকচিত্রী তখন সাইকেলে চড়ে সেই প্রার্থনাসভায় ছবি তোলার উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিলেন। কিন্তু বের হওয়ার পথে তাঁর স্বামী তাঁকে অন্য একটি ছবির কাজের জন্য ডেকে নেন। আলোকচিত্রীর সেদিন আর বিড়লা হাউস যাওয়া হয়নি। তিনি আর কেউ নন, ভারতের প্রথম মহিলা চিত্রসাংবাদিক হোমাই ভ্যারাওয়ালা। দাপটের সঙ্গে সেই সময় তিনি পুরুষদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেন। 

নিজের জায়গা করে নিতে হোমাই লড়াই করেছিলেন বিস্তর। তিনিও গান্ধীর ছবি তুলেছেন বেশ কিছু। অনুরাগী ছিলেন। তাঁর প্রার্থনাসভায় প্রায়শই ছবি তুলতেন। কিন্তু শেষবারের মতো না যাওয়ার আক্ষেপ তাঁর শেষদিন পর্যন্ত ছিল। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি এই আক্ষেপের কথা বলে গিয়েছেন। অদ্ভুত বিষয় হল, সেদিন বিড়লা হাউসে আর কোনও চিত্রসাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন না।

zoom
হোমাই ভ্যারাওয়ালা

শুধু বিদেশের নয়, হোমাইয়ের মতো এদেশের অনেক আলোকচিত্রীই গান্ধীর ছবি তুলেছেন। তাঁর চিন্তাভাবনার দর্শন তাঁদেরকে প্রভাবিত করেছে। যেমন কুলবন্ত রায়– ভারতীয় চিত্রসাংবাদিকতার ইতিহাসে আর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। গান্ধী যখন ভারতবর্ষে তাঁর যাত্রা শুরুর প্রাক্কালে বিভিন্ন ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণির কামরায় সফর করছেন, সেই সময় চিত্রসাংবাদিক হিসেবে সফরসঙ্গী হয়ে তাঁর ছবি তুলেছিলেন কুলবন্ত। তিনিও একইভাবে গান্ধীর আদর্শে অনুরক্ত ছিলেন। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অসংখ্য ছবি তুলেছেন। তাঁর তোলা প্রায় সমস্ত ছবি ‘ইন্ডিয়া ফোটো আর্কাইভ ফাউন্ডেশন’-এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

কুলবন্ত ছাড়া যে সমস্ত ভারতীয় চিত্রসাংবাদিক গান্ধীর ছবি তুলেছেন, তাঁর কর্মকাণ্ড ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন– তাঁদের মধ্যে প্রথম সারিতে থাকবেন জগন ভি মেহতা, ড্যাডি রুস্তম দোসাভয় ওয়াদিয়া, বীরেন জে শাহ প্রমুখ। তবে এই তালিকায় একজনের নাম না করলে তালিকা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি সম্পর্কে গান্ধীরই ভ্রাতুষ্পৌত্র, একটা দীর্ঘ সময় ধরে গান্ধীর সহচর। লোকজন তাঁকে মজা করে ‘বাপুর হনুমান’ বলে ডাকত। তিনি কানু গান্ধী। 

zoom
কানু গান্ধীর তোলা মহাত্মার ছবি

১৯৩৬ সালে তিনি সেবাগ্রাম আশ্রমে যোগদান করেন এবং গান্ধীর নানা কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করতে থাকেন। আলোকচিত্রের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। বিনোভা ভাবের ভাই শিবাজীর অনুপ্রেরণায় কানু আশ্রমের কর্মকাণ্ড ও গান্ধীর জীবন ডকুমেন্ট করতে আগ্রহী হন। গান্ধী সেকথা জানার পর স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি ‘পোজ’ দিতে পারবেন না। এছাড়াও কড়া নির্দেশ: ফ্ল্যাশ ব্যবহার করা যাবে না এবং কানুর আলোকচিত্র-চর্চা বাবদ কোনও খরচ আশ্রম দেবে না। 

পরিশেষে, কানুর ক্যামেরা কেনার জন্য পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এগিয়ে আসেন উদ্যোগপতি ঘনশ্যাম দাস বিড়লা। কানু, গান্ধীর আশ্রমজীবন, আশ্রমের কর্মকাণ্ড সমস্ত কিছু শেষ ১০ বছর ধরে ডকুমেন্ট করেন। সেসব ছবি গান্ধীর জীবনচর্চা এবং দর্শনের আরেক অন্যতম ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রয়েছে। 

…………………………………………………………………………………

zoom

…………………………………………………………………………………

ইতিহাসে বারবার বিভিন্ন আলোকচিত্রী গান্ধীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ছবি তুলতে এসেছেন, তাঁর কর্মকাণ্ড ডকুমেন্টেশন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আকর্ষণের কারণ যথেষ্ট স্পষ্ট– গান্ধী যে শুধু একজন নিছক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন এমনটা নয়, বরং তিনি ছিলেন একজন দক্ষ পারফরমার। তাঁর রাজনীতির পথ ছিল অহিংস, কিন্তু সেই অহিংসতার কর্মকাণ্ডে এতখানি তীব্রতা ছিল যে, তা মাঝেমধ্যেই ব্রিটিশ শাসককে নাড়িয়ে দিত। তাঁর সেই অহিংসতার জেদ, উন্মাদনা অসম্ভব রকমের তছনছ করার ক্ষমতা রাখত। তাঁর কাছে ‘সত্যাগ্রহ’ ছিল প্রকৃতই বিরুদ্ধাচরণের মাধ্যম। বিরুদ্ধাচরণকে (‘Dissent’) তিনি মানবাধিকার হিসেবে দেখতেন, ক্ষমতার রক্তিম আস্ফালন অমান্য করাকে নৈতিক দায় হিসেবে দেখতেন। আর সেই দায় থেকেই তিনি ‘ডিসেন্ট’কে নিজের গোটা শরীরের অংশ করে তুলতেন, বানিয়ে তুলতেন এক একটি পারফরম্যান্স– কখনও তা অনশনের মাধ্যমে, কখনও বারবার পোশাক চয়নের মাধ্যমে। এই পারফরম্যান্সকে লেন্সবন্দি করার লোভ সামলানো যে আসলেই বড় কঠিন! 

Henri Cartier-Bresson homai vyarawalla Kanu Gandhi Kulavant Roy Mahatma Gandhi Margaret Bourke-White Photography Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Walter Bosshard

Share this article on