জার্মান সাহিত্যিক এলফ্রিডে ইয়েলিনেকের একই নামের ১৯৮৩ সালে লেখা উপন্যাসকে ভিত্তি করে মাইকেল হ্যানিকি এই ছবি তৈরি করেছিলেন আজ থেকে ২৫ বছর আগে। উপন্যাস জার্মান ভাষার হলেও হ্যানিকির নির্মাণের ভাষা ফরাসি। এত উচ্চকিত আঙ্গিকে মাইকেল হ্যানিকি এ-ছবি নির্মাণ করেছেন, যা সব দিক থেকে অনবদ্য। নারীত্ব, যৌনতা, হিংসাশ্রয়, বিপরীতার্থক যৌনতাবাদ আর তথাকথিত অবদমিত কামনার আজও এক পরম পাঠ।
শিল্পীর মন, তা কি কেবল আলোকময় হবে? সেই মনে অন্ধকারের চিহ্ন রয়ে যায় না কি? ভিয়েনার ফাঁকা রাস্তা ধরে এরিকা (ইসাবেল হাপার্ট) ফেরে যখন অল্প রাত করে, তার ভাবলেশহীন মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই তার মনে কী চলছে। শীতের আবহাওয়া। মাইকেল হ্যানিকি পরিচালিত ‘দ্য পিয়ানো টিচার’ (২০০১) ছবিতে এমন এক সরল দৃশ্যের পর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা নির্মিত হয়। এরিকা বাড়ি ঢুকলে তার মা (অ্যানি গিয়ারদত) তাকে মারতে শুরু করে, আর এরিকাও মায়ের চুল ধরে টানতে থাকে! হিংস্রতা মাইকেল হ্যানিকির যে-কোনও ছবির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু সেই হিংস্রতা কখনওই তেমন দৃশ্যমান নয় এবং সে কারণে এর ব্যঞ্জনা বড় তীব্র। গার্হস্থ্য হিংসা এক সুকঠিন বাস্তব, কিন্তু পুরো ব্যাপারটাকে ‘সাধারণ’ ভেবে এই মারণরোগ অনেক সময় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নয়, গার্হস্থ্য হিংসা জায়গা করে নিতে পারে সন্তান-অভিভাবক, ভাই-বোন এমনকী, চাকর-মনিবের মধ্যেও। এরিকার বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে যে অবিবাহিতা, বয়স্ক এরিকার মারধরের সম্পর্ক, তা দর্শক হিসেবে আমাদের বিচলিত করে। আমরা জানতে পারি এরিকার বাবা বহু বছর মানসিক হাসপাতালের রোগী ছিলেন। এরিকার পারিবারিক আবহ সুন্দর নয়, কিন্তু শিল্পী হিসেবে সে অনন্যসাধারণ; ভিয়েনার মিউজিক কনসার্ভেটরিতে তার পিয়ানোর শিক্ষকতা। ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও এরিকার পিয়ানো বাদনের চাহিদা দুরন্ত। এমনই এক অনুষ্ঠানে ব্লন্সকিজ দম্পতির বাড়িতে এরিকার সঙ্গে দেখা হয় ওয়াল্টার ক্লেমারের (বেনোওয়া ম্যাজিমেল)। ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, কিন্তু ওর তীব্র আকর্ষণ শাস্ত্রীয় পিয়ানোর প্রতি। এরিকা আর ওয়াল্টার– দু’জনেরই পছন্দ প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ রবার্ট শুম্যান আর ফ্রান্স শুবেয়ারের সংগীতশিল্প। ওয়াল্টার সুন্দর এক যুবক। অনবদ্য পিয়ানোর হাত তার। এরিকার সংগীতশিল্পে সে অনুরক্ত। কিন্তু সে যে এরিকার কাছে শিখবে বলে ভিয়েনা মিউজিক কনসার্ভেটরিতে ভর্তি হতে চাইবে, এমনটা এরিকা কল্পনাও করতে পারেনি। অ্যাডমিশন ইন্টারভিউতে বাকি শিক্ষকেরা ওয়াল্টারের পিয়ানো-বাদনে খুশি হতে পারলেও এরিকা ওয়াল্টারের ভর্তিতে বাধা দেয়। ওয়াল্টারের বাদনের একটি সূক্ষ্ম খুঁত তো সে ধরে ফেলেই, তাছাড়া তার বক্তব্য ইঞ্জিনিয়ার ওয়াল্টারকে কনসার্ভেটরিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেওয়া মানে একজন সত্যিকারের সংগীত-পিয়াসীকে শেখানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা। ওয়াল্টার হয়তো দেখা গেল সংগীতের শখ মেটার পর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ফিরে গেল। কিন্তু যে-ছাত্র বা ছাত্রী সংগীতকেই জীবন করবে, তার প্রতিভা ওয়াল্টারের থেকে কিঞ্চিৎ কম হলেও, এমন ছাত্র বা ছাত্রীকেই কনসার্ভেটরির মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নেওয়া দরকার।

এতসবের পরেও ওয়াল্টার কনসার্ভেটরির ছাত্র হয় এবং এরিকার তত্ত্বাবধানে শুরু হয় তার শিক্ষা। জার্মান সাহিত্যিক এলফ্রিডে ইয়েলিনেকের একই নামের ১৯৮৩ সালে লেখা উপন্যাসকে ভিত্তি করে মাইকেল হ্যানিকি এই ছবি তৈরি করেছিলেন আজ থেকে ২৫ বছর আগে। উপন্যাস জার্মান ভাষার হলেও হ্যানিকির নির্মাণের ভাষা ফরাসি। ছবিটি ২০০১ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতামূলক শাখায় গৃহীত হয়েছিল। সে-বছর জুডি ফস্টার জুরি প্রেসিডেন্ট না-হতে পারলে নরওয়ের বিখ্যাত অভিনেত্রী লিভ উলম্যান সে-স্থলে অভিষিক্ত হন।


এরিকার যৌনতা তীব্র, কেঠো, পর্নোগ্রাফি ভিত্তি করে। তার যৌনতা খানিক স্বার্থপরও বটে। সে ওয়াল্টারকে লিখে জানায় যৌনতার সময় হিংস্র হয়ে উঠতে। শারীরিক আঘাতের মধ্য দিয়ে তাকে যৌনবিদীর্ণ করতে। এরিকা যৌনতায় কোনও নমনীয়তার ধার ধারতে চায় না। অন্যদিকে, ওয়াল্টার প্রথম থেকেই এ-সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সে ঠাহর করতে পারে না, সংগীতে যে-এরিকা এমন অনির্বচনীয় শীর্ষ ছুঁয়েছে, যৌন অভিব্যক্তিতে সেই মেয়ে এত প্রকট, এত হিংসাশ্রয়ী কী করে হয়ে উঠতে পারে? নিজের অজান্তে এরিকা কীভাবে ওয়াল্টারকে যৌনপুত্তলিকায় (সেক্সটয়) পরিণত করে ফেলে, সে নিজেও যেন টের পায় না। মনুষ্য জীবন ও যাপনের এক প্রবল সংকটময় পৃষ্ঠা পরিচালক উল্টে দেখেছেন এ-ছবিতে। এখানে এক রকমের বিপরীতার্থক যৌনতাবাদ (ইনভার্টেড সেক্সিজম) কাজ করেছে। যে-ধারণায় পুরুষকে ‘অত্যাচারী’ আর নারীকে ‘অত্যাচারিত’ বলে চিহ্নিত করা হয়, তা এখানে ভেঙে পড়েছে। আবার অন্যদিকে প্রকট হয়েছে যে শিল্পীমন নমনীয়তার ধ্বজাধারী না-ও হতে পারে, এমনকী, নারী-শিল্পীমনও। তাতে অন্ধকার থাকতে পারে, অবদমিত যৌনতা প্রকাশ পেতে পারে নানা আকারে, আবার এ সমস্ত কিছুই আধারিত হতে পারে তথাকথিত প্রেমের সম্পর্ককে ভিত্তি করে।


‘দ্য পিয়ানো টিচার’ যৌনতা, বিশেষত নারী-শিল্পীমনের যৌন অভিব্যক্তি বিষয়ে এক অসামান্য নির্মাণ। যে সমাজ নারীর যৌনতাকে নমনীয়তা, সহনীয়তা আর নিষ্ক্রিয়তায় বেঁধে দিতে চায়– এ-সিনেমা সেই সমাজকে চপেটাঘাত করে। এমনকী, ২৫ বছর আগে এরিকা চরিত্রের যে যৌনকোণ, তাকে ‘অবদমিত কামনা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু এতগুলো বছর পেরিয়ে আমরা জানি– শরীর যার, তার যে-কোনও রকমের চাহিদা থাকা অন্যায় তো নয়ই, হয়তো এ-ই তার স্বাধীনতার আস্বাদ।
এ-ছবির শৈলী এক কথায় অনবদ্য। মাইকেল হ্যানিকি উচ্চকিত যৌনতা অনুচ্চারিত দৃশ্যধারণের মধ্যে দিয়ে কিছু অনন্যসাধারণ মুহূর্ত নির্মাণ করেছেন। ইয়াশুজিরো ওজুর বহু শৈলী যেন মাইকেল এখানে ধার করেছেন। ওজুর মূল দৃশ্য যেমন অনেক সময় ক্যামেরার চাহনির বাইরে ঘটে, ‘দ্য পিয়ানো টিচার’ ছবির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যও ক্যামেরার বাইরে প্রাণ পায়। আর এতেই একেকটি দৃশ্য সুতীব্র হয়ে ওঠে। মাইকেল হ্যানিকি যে এক সিনেবিশ্ব এরপর তৈরি করবেন তার সূতিকাগৃহ এই ‘দ্য পিয়ানো টিচার’।

তবে এই ছবির সম্পদ ‘এরিকা’ চরিত্রে ইসাবেল হাপার্ট আর ‘ওয়াল্টার’ চরিত্রে বেনোয়া ম্যাজিমেলের অতি উচ্চমানের অভিনয়। এরিকা চরিত্রের বেদনা আর বুদ্ধিদীপ্ততা কী অসম্ভব ক্ষমতায় তিনি মিলিয়ে দিয়েছেন ভাবলে অবাক হতে হয়! অথচ, শেষ দৃশ্যের আগে তাঁর মুখটাই ক্যামেরায় সরাসরি ধরা পড়ে মাত্র দু’-একবার। বহু শটে তিনি ক্যামেরার দিকে পেছন ফিরে আছেন এ-ছবিতে। এত কম প্রকটতার সুযোগ পেয়ে কী করে তিনি এরিকা চরিত্রের চড়াই-উৎরাই সিনেমায় ধরে রাখলেন, তা ভাবা যায় না। অন্যদিকে, বেনোয়া ম্যাজিমেল ধীর সঙ্গত দিয়ে গেছেন ইসাবেলের অভিনয়-লেখচিত্রে। ওয়াল্টার, যে না কি শ্রদ্ধামিশ্রিত হয়ে এরিকাকে ভালোবাসতে চেয়েছিল, সে যেভাবে এরিকার যৌনতার ঘূর্ণিঝড়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়, সেই অসহায়তা দেখার মতো। কিন্তু সেই ওয়াল্টারই এক লপ্তে যখন এরিকাকে তুচ্ছ করে, সেই অভিনয় আমাদের বিস্মিত করে। বলা বাহুল্য, ২০০১ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ইসাবেল হাপার্ট ও বেনোয়া ম্যাজিমেল শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী ও শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার জিতে নিয়েছিলেন। একই ছবির জন্য দু’টি শ্রেষ্ঠ অভিনয়ের পুরস্কার কান চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাসে বিরল।

A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved