না, আজ আর লেখার তাড়া নেই। তাঁর শেষ লেখা তিনি লিখে ফেলেছেন। বারবার রিভাইস করেছেন। যেমন করেন তিনি প্রতিটি বই। তবে এ বছর তিনি স্পেনের মালোরকা দ্বীপে ভূমধ্যসাগরের তীরে, পাহাড়ের ওপরে, তাঁর লেখার বাড়িতে নতুন বইটা শেষ করার জন্য যেতে পারেননি। শরীর আর নিচ্ছে না। স্পেনের বাড়ির নাম তিনি মজা করে রেখেছেন ‘রাইটার্স ব্লক’। ব্রিটিশ হিউমার তাঁকে ছেড়ে যাবে না কখনও।
১১১.
তিনি জন্মেছিলেন ১৯৪০-এর ১৫ এপ্রিল। আমার জন্ম ১৯৪১-এর ১৫ সেপ্টেম্বর। আমার থেকে ঠিক পাঁচ মাসের বড়। সত্যজিৎ রায়ের মতো কখনও নিজেকে সাহিত্যিক ভাবেননি। নিজেকে বলতেন, নিখাদ নির্ভেজাল কাহিনিকার। গল্প-বলিয়ে। শুধু গল্প লিখে, টাকায় নয়, ডলারে নয়, পাউন্ডে মিলিয়নিয়ার! রেখে গেলেন ২৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি। রেখে গেলেন ২৪৯টা অবিশ্বাস্য বেস্টসেলার উপন্যাস। রেখে গেলেন ৮১ বছরের স্ত্রী– যিনি তাঁর স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ চাননি এই কথা জেনেও যে, তাঁর স্বামী এক বেশ্যার সঙ্গ করেন এবং তিনি আদালতে মিথ্যা বলার অপরাধে চার বছরের জন্য জেলে যেতে বাধ্য হলেন। তবে এইসব অপরাধ এবং অপবাদ সত্ত্বেও তিনি ভুবনবিখ্যাত লেখক জেফ্রি আর্চার। আমার কী ভাগ্য, আমি তাঁকে প্রশ্ন করতে পেরেছিলাম, আপনার লেখার এই বাণিজ্যিক সাফল্যের কারণ কী? জেফ্রি হাসতে হাসতে কবুল করেছিলেন, প্রধান কারণ, ভারতে আমার জনপ্রিয়তা এবং লক্ষ লক্ষ বই বিক্রি। ভারতে আমিই ইংরেজি ভাষার বইকে পপুলার করেছি। কথাটা কিন্তু মিথ্যে নয়। জেফ্রি আর্চার আমার সমবয়সি কনটেম্পোরারি। ওঁর প্রথম উপন্যাস, ‘নট আ পেনি মোর নট আ পেনি লেস’ যেই পড়লাম, তাঁর গল্প ও ভাষার ছিপ আমাকে পাকড়ে ফেলল। সেই থেকে জেফ্রির ফাঁদ থেকে বেরতে পারিনি। তাঁর শেষ বই, ‘অ্যাডম অ্যান্ড ইভ’, আমাকে এই বয়েসে রাত জাগালো। জেফ্রিকে স্যালুট।

আজ ৫ অক্টোবর ২০২৬। ঘুম ভাঙল জেফ্রি আর্চারের সকাল ছ’টায়। না, আজ আর লেখার তাড়া নেই। তাঁর শেষ লেখা তিনি লিখে ফেলেছেন। বারবার রিভাইস করেছেন। যেমন করেন তিনি প্রতিটি বই। তবে এ বছর তিনি স্পেনের মালোরকা দ্বীপে ভূমধ্যসাগরের তীরে, পাহাড়ের ওপরে, তাঁর লেখার বাড়িতে নতুন বইটা শেষ করার জন্য যেতে পারেননি। শরীর আর নিচ্ছে না। স্পেনের বাড়ির নাম তিনি মজা করে রেখেছেন ‘রাইটার্স ব্লক’। ব্রিটিশ হিউমার তাঁকে ছেড়ে যাবে না কখনও।
তাঁর লন্ডনের পেন্ট হাউস টেমস নদীর ওপরে। তাঁর লেখার ঘরের এক জানলায় ছবির মতো বাকিংহাম প্যালেস। আর এক জানলায় যতদূর চোখ যায় টেমসের প্রবাহ। তিরিশের বেশি ভাষায় তাঁর প্রতিটি বইয়ের অনুবাদ বিক্রি হচ্ছে কোটি কোটি সংস্করণে। তিনি ২৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের মালিক। অতি ধনী ইংরেজদের একজন। অথচ তাঁর জীবনে ক্লেদ, গ্লানি, নিন্দা কম জোটেনি। তিনি ৩০ বছর বয়েসে হয়েছিলেন লর্ড জেফ্রি আর্চার। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে হাউস অফ লর্ডস-এর সদস্য। তারপর প্রমাণিত হল এক বেশ্যাকে টাকা দিয়ে রক্ষিতা রেখেছেন। এবং এরপর কোর্টে মিথ্যে কথা বলার জন্যে তাঁর চার বছরের জেল হল। জেল থেকে বেরিয়ে জেলের দিনলিপি লিখলেন তিন খণ্ডে। তাও বেস্ট সেলার!

কিন্তু আজ ৫ অক্টোবর সকাল থেকে তাঁর শরীর বেশ খারাপ। ৮১ বছরের স্ত্রী মেরিকে কিছু বললেন না। জীবনে এত কেচ্ছা, তবু মেরি তাঁকে ছেড়ে যাননি। দুই পুত্র, তারা নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। জেফ্রি ক্লান্ত শরীরে বসলেন তাঁর লেখার টেবিলে। আর তখুনি অনুভব করলেন, এই মৃত্যুই তিনি চান। আগামিকাল সারা পৃথিবী জুড়ে প্রকাশিত হবে তাঁর বই, শেষ উপন্যাস এবং এটাই তার শ্রেষ্ঠ লেখা, ‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’!
“আমি জানি, কেউ কেউ আমার এই উপন্যাসের সঙ্গে তুলনা করবেন, আমার আরও দু’টি সর্বকালের বেস্ট সেলার, ‘কেন অ্যান্ড অ্যাবেল’ এবং ‘ফার্স্ট আমং ইকুয়ালস’-এর। আমার অনুরোধ, এই তুলনা করবেন না। তবে, আপনারা যাই লিখুন, আমি দুঃখ পাব না। আনন্দ? না তাও না। কেননা ‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’ প্রকাশিত হবে পোস্থুমাসলি, আমার মৃত্যুর পরে। আপনাদের সঙ্গে সেটাই আমার ‘এন্ডগেম’!
ভাবতে পেরেছিলেন, আমার নাটকীয় জীবনের শেষটাও হবে এমন নাটকীয়?

আমার স্ত্রী এখনও বিছানায়। ঘুমিয়ে। বেলা দশটার আগে ওঠে না। এই বছর আমরা পালন করেছি আমাদের দাম্পত্য জীবনের ৬০-তম অ্যানিভারসারি। তখনই মনে মনে চেয়েছি, এটাই যেন হয় শেষতম। নাটকটা সব দিক থেকে কেমন অবিশ্বাস্য জমজমাট বলুন তো! আমার শেষ উপন্যাস বেরচ্ছে আমার জীবন শেষের একদিন পরে! কী অব্যর্থ নির্ভুল প্রোগ্রামিং। ঈশ্বরের পক্ষে অসম্ভব এই অনিবার্য নিয়তির নাটক। এই দায়িত্ব তাই আমাকেই নিজের ইচ্ছার হাতে তুলে নিতে হল। আমার শেষ বইয়ের মার্কেটিংয়ের চূড়ান্ত স্টেপ। ‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’-এর বিশ্বজোড়া প্রচার প্রসার প্রিয়তা কোথায় গিয়ে পৌঁছয় এবার দেখুন। আর আমার স্ত্রী ডেম মেরি আর্চার এবার হবে ইথার স্তরের বিলিয়নেয়ার! ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে স্ত্রী আমার জন্যে এত করল ৬০ বছর ধরে, আমি তার জন্যে এইটুকু করব না?
ভালো কথা, আমার সমাধির ওপরে যে এপিটাফ লেখা হবে, সেটাও লিখে রেখে যাই।”
লেখার টেবিলের দিকে তাকান লর্ড জেফ্রি আর্চার। তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে কান্নায়। তারপর ল্যাপটপে টাইপ করেন ক্যাপিটাল লেটারে: I HAVE GOT ONE MORE CHAPTER TO WRITE!

“যে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তে চলেছি এবার, আর জাগব না, সাডেন ডেথ, মাত্র দু’টি শব্দে সংজ্ঞায়িত হবে আমার চিরপ্রস্থান, সব ব্যবস্থা পাকা। টেবিলের ওপর কয়েক পাতা পড়ে থাকল আমার হস্তাক্ষরে, আপনাদের জন্যে, ‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’-এর মারাত্মক কাহিনি নিয়ে। পৃথিবীর আর কেউ ভাবতে পারত না এমন গল্প। আমি পেরেছি। এবং সেটাই আমি, আপনাদের চির প্রিয় জেফ্রি, সেরা কাহিনিকারদের অবিস্মরণীয় অন্যতম:
১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এই দিন শেষ হল। থামল বন্দুক কামান বোমার শব্দ। থামল ধ্বংস মৃত্যু রক্তপাত। এই দিন সমাজ সংসারের দুই স্তরে জন্মাল দুই শিশু। ইভ বড়লোকের মেয়ে। তার বাপ প্রভাবশালী ব্রিটিশ আর্ল। অ্যাডাম জন্মাল গরিবের ঘরে। তার বাপ মেষপালক। কিন্তু ছেলেবেলাতেই এদের দেখা হল পাকেচক্রে। দু’জনেই ব্রিলিয়ান্ট। তাই শুরু হল নানা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা দু’জনের মধ্যে। এবং এই প্রতিযোগিতার মধ্যে চোরাস্রোতে এল প্রেম। এবং সেই প্রেম ক্ষতবিক্ষত হতে লাগল দু’জনের সামাজিক পরিচয়ে বৈষম্যের বাধায়। এরপর গল্পে আসছে ১৯৪০ সালের এক সেপ্টেম্বর রাত্রি। হিটলার তৈরি ব্রিটেন আক্রমণের জন্য। কিন্তু অ্যাডাম এবং ইভ এমন কিছু কাজ করে, কী করে জানবার জন্য বইটা পড়তেই হবে, যাতে হিটলার সিদ্ধান্ত বদলায়! নায়ক নায়িকার এই অ্যাকশন শুধু ওদের জীবনটাই বদলে দেয় না, বদলে দেয় একটা জাতির ভবিষ্যৎ। এই প্রেমিক-প্রেমিকা দেখায় অসামান্য সাহস! এবং বেছে নেয় অবিশ্বাস্য ত্যাগের পথ।

আমার উপন্যাসের শেষ পাতা পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাসে আপনাদের টেনে নিয়ে যাবে এই মানব-মানবীর অ্যাকশন। এবং আমার এই গল্প ক্রমে হয়ে ওঠে রোম্যান্টিক প্রেমের মহাকাব্য, ত্যাগের গল্প, দুই প্রেমিক-প্রেমিকার মহিমার গল্প, ব্রিটেনের গভীরতম অন্ধকার সময়ে। বইটা শেষ হওয়ার পরেও এই গল্প থেকে যাবে আপনাদের মনে। এবং থেকে যাব আমিও।
এই বই প্রকাশিত হল আমার মৃত্যুর পরের দিন। আমি তাই চেয়েছিলাম। এর থেকে নাটকীয় কিছু হতে পারে না। এখন কলকাতায় দুর্গাপুজো। আমি জানি। আমি জানি বাঙালিদের কাছে এই পুজো কত আনন্দের। এবং আমি এ-ও জানি কলকাতার বাঙালিরা আমার বই খুব ভালোবেসে পড়ে। তাদের পুজোর ছুটিতে তাদের হাতে আমার শেষ বই তুলে দেবার আনন্দ নিয়ে আমি পৃথিবী ছাড়লাম। এই কাজটি আমার কাছে কম আনন্দের, কম গৌরবের নয়। আমার জন্যে কষ্ট পাবেন না। এক পূর্ণ সফল জীবন যাপন করেছি আমি। শ্রেষ্ঠ লেখাটা লিখে ফেলার পরে, ৮৬ বছর বয়েসে, আর কী পেতে পারি? আপনাদের স্মৃতিতে জায়গা পাওয়া ছাড়া?
…………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব
…………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved