সাধারণ রোম্যান্স বা প্রেমের গল্পের বাইরে গিয়ে সেসময় প্রচুর ‘অ্যাংরি’ ছবি তৈরি হয়েছিল। কারা এই ‘অ্যাংরি’? যুবসমাজেরই অংশ, যাদের হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই, সমাজের মূল স্রোত অস্বীকার করে যাদের– তাদের নিয়ে। সানি দেওলের ‘অর্জুন’ যেরকম। ‘যশবন্ত’ও তাই। এ ছবির অভিনয় আমার মনে দাগ কেটেছিল। একদম ভাঙাচোরা একটা চেহারা নিয়ে, শুধুমাত্র অভিনয় আর ওই রাগের বিচ্ছুরণ নিয়ে একজন অভিনেতা আমাদের মধ্যে জায়গা তৈরি করে নিচ্ছেন।
যতদূর মনে পড়ছে, নানা পাটেকরের কাজ আমি প্রথম দেখি আটের দশকের শেষ দিকে। ‘অঙ্কুশ’। সেই সময়ে, অর্থনৈতিকভাবে সফল একটা ছবি। তখন আমরা ছাত্র। এবং তখনও নানা পাটেকর সেই অর্থে ‘স্টার’ হননি। অন্তত আমার কাছে। ওঁর কাজের সঙ্গে আমি তখনও অতটা পরিচিত ছিলাম না। যদিও তার আগে উনি মরাঠি থিয়েটারে কাজ করেছেন। হয়তো মরাঠি ফিল্মেও।
‘অঙ্কুশ’ দেখে আশ্চর্য হয়েছিলাম। এর আগে ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’-এর যে একটা ঘরানা, একটা ধারা অমিতাভ বচ্চনের থেকে তৈরি হয়ে গিয়েছিল, নানা পাটেকর এসে তাকে অন্যদিকে একটা বাঁক দিলেন। একদম অন্য ধরনের অভিনয়– ন্যাচারালিস্টিক স্কুলিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা স্টাইলাইজেশন; এবং সেটা তৈরি করলেন এমন একজন– যার চেহারাটা সেই অর্থে খুব ‘দেবতুল্য’ নয়। সেটা তখন খুব চমকে দিয়েছিল আমাকে!

পরবর্তীকালে ওঁর খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটো কাজ দেখি। তখন ছিল ভিসিআর। আর দূরদর্শনেও তখন খুব চমৎকার সব অনুষ্ঠান, ন্যাশনাল নেটওয়ার্কের বিভিন্ন ছবি দেখানো হত। সেই টেলিভিশনেই ওঁর একখানা ছবি দেখেছিলাম। আর একখানা ভিসিআর-এ। ছবির নাম ‘সূত্রধার’। গিরিশ কারনাড ছিলেন, নানা পাটেকর ছিলেন। এই ছবিটাও আমার নাট্যজিজ্ঞাসু অভিনয়সিসৃক্ষু মনের ওপর ছাপ ফেলেছিল।

আরেকটা ছবি– অমল পালেকরের ‘থোরাসা রুমানি হো যায়ে’। রিচার্ড ন্যাশের ‘রেইন মেকার’ নাটক অবলম্বনে ১৯৫৬ সালে সিনেমা বানিয়েছিলেন জোসেফ অ্যান্থনি। ‘থোরাসা রুমানি হো যায়ে’ সেই সিনেমাটার অ্যাডাপ্টেশন। প্রথমে মরাঠি থিয়েটার, পরে সেখান থেকে হিন্দি ছবি। রেইন মেকার অর্থাৎ ‘বারিশওয়ালা’-র চরিত্রে নানা পাটেকর। খরা-আক্রান্ত পাটা গ্রামের বুকে সে এনে দেবে বৃষ্টিগর্ভ মেঘ। চমৎকার ছবি। সেখানে নানা একেবারে অন্যরকম। পরে আমরা যে স্টাইলাইজেশনে ওঁকে দেখব– তার বাইরে গিয়ে এই দু’টি কাজ, যখন সেই ছাপটা ওঁর কাজের ওপর পড়েনি, এ জন্যেই আমার গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।

তারপর যখন ‘পরিন্দা’ দেখলাম– অনেক অভিনেতার মতোই আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম! বিধু বিনোদ চোপরার ছবি। পরবর্তী কালে এ ছবির জন্য নানা বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন। অনেক অভিনেতাই, তাঁর অভিনীত খুব সফল একটা ছবির যে ‘স্টাইলাইজেশন’ বা ‘ম্যানারিজম’– বাকি জীবন সেটা বহন করে নিয়ে চলেন। নানা পাটেকরের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একেবারে শুরুর দিকের কাজে যে নানা পাটেকর, সেখান থেকে ভেঙে ‘পরিন্দা’র এক্সেনট্রিজম– এবং সেটাই তাঁর পরবর্তীকালের চরিত্রগুলোয় বহন করে নিয়ে যেতে দেখেছি ওঁকে। অবশ্য, তা খুবই ভালো লাগত। অন্তত আমার। আমি বা আমার মতো অনেকেই ওঁর এই অভিনয় ধারার গুণগ্রাহী ছিলাম।

‘যশবন্ত’ যখন দেখি, নানা একজন দলিতের চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলছেন– তার রাগ, তার সমাজ-রাজনৈতিক অবস্থান; এবং সে একজন ইন্সপেক্টর। সাধারণ রোম্যান্স বা প্রেমের গল্পের বাইরে গিয়ে সেসময় প্রচুর ‘অ্যাংরি’ ছবি তৈরি হয়েছিল। কারা এই ‘অ্যাংরি’? যুবসমাজেরই অংশ, যাদের হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই, সমাজের মূল স্রোত অস্বীকার করে যাদের– তাদের নিয়ে। সানি দেওলের ‘অর্জুন’ যেরকম। ‘যশবন্ত’ও তাই। এ ছবির অভিনয় আমার মনে দাগ কেটেছিল। একদম ভাঙাচোরা একটা চেহারা নিয়ে, শুধুমাত্র অভিনয় আর ওই রাগের বিচ্ছুরণ নিয়ে একজন অভিনেতা আমাদের মধ্যে জায়গা তৈরি করে নিচ্ছেন।

একটা সময় যখন ব্যক্তি নানা পাটেকরকে চিনতে শুরু করি, তখন মুগ্ধ হয়েছি ওঁর জীবনযাত্রা সম্পর্কে জেনে। কেবল মুগ্ধ না, অনুপ্রাণিতও হয়েছি। যদিও ‘মুগ্ধ’, ‘অনুপ্রাণিত’ এই শব্দগুলোর মধ্যে ব্যক্তি নানা পাটেকরের জীবনদর্শনকে বেঁধে রাখা যায় না। এত সাধারণ একটা জীবনযাপন। এসব খবর সংবাদমাধ্যমে আসার আগে থেকেই শুনতে শুরু করেছি যে, ওঁর পারিশ্রমিকের যে চেক– তার একটা অংশ সরাসরি বিভিন্ন এনজিও-র নামে চলে যায়। এবং ওঁর জীবন কাটানো প্রায় একজন সাধুসন্তের মতো। একটা মানুষ জীবনে যে পরিমাণ সম্পদ আহরণ করেছেন, প্রচলিত অর্থে যাকে ‘সম্পদ’ বলা হয়, তার থেকে কেবল সম্মানটুকুর অংশ ছেঁকে নিয়ে বাকিটা বিলিয়ে দিয়েছেন। খুব সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা একজন মানুষ, যাঁর একটা দারিদ্রের ইতিহাস রয়েছে– তিনি চাইলেই তাঁর শিকড়টুকু ভুলে যেতে পারতেন। কিন্তু ভোলেননি। বরং শিকড় ছাড়িয়ে আরও গভীরে যেতে চেয়েছেন। মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন। মানুষের বিভিন্ন অধিকারের পাশে, আন্দোলনের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন। এবং একেবারেই প্রচারবিমুখ ভাবে। আমি যতদূর জানি, এ সমস্ত কথা প্রকাশ্যে বললে উনি রেগে যেতেন। সব দিক থেকেই ‘মহাজীবন’ বলতে যা বোঝায়। গ্ল্যামারের আতশকাচের মধ্য দিয়েই একজন ‘স্টার’কে দেখার যে প্রচলিত নিয়ম, সেটাকে ভেঙে তার একদম বাইরে গিয়ে একজন অন্য মানুষ। আইকন।

আর পাঁচটা সাধারণ পেশার মতো অভিনয়কেও একটা পেশা হিসেবেই দেখতেন। সেজন্যেই বোধহয় শেষ জীবনে নিজেকে ‘চাষি’ বলে পরিচয় দিতেন। খেতখামার নিয়ে থাকতেন। এবং বলতেন ‘খুব ভালো আছি’।
তবে একটা কথা মনে হচ্ছে এখন, এই অবেলায়, যদি নাগরিক জীবনে থাকতেন, আরও লোকজনের মধ্যে, হয়তো ওঁর আয়ু আরেকটু দীর্ঘ হতে পারত। দেরি না হলে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা হলে হয়তো এভাবে, এই কর্মক্ষম অবস্থায় চলে যেতে হত না ওঁকে। প্রায় মাঝরাতে বন্ধুকে ফোন করে ডাকা এবং বন্ধুর আসতে দেরি হওয়া– এই পুরো অঘটনটাই ঘটত না যদি না একাকিত্বকে ওরকমভাবে বেছে নিতেন তিনি।
তবে এটুকু মনে করি– যতটা বেঁচেছেন নিজের নিয়মে বেঁচেছেন, বেঁচেছেন রাজার মতো। এবং খুব সফল ভাবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ফলে ওঁর নিজের যে সিদ্ধান্ত, যে যাপন– তাকে কুর্নিশ জানানো ছাড়া কিছু বলার নেই।

ওঁর আর আমার বয়সের পার্থক্যটা বড় চমৎকার। উনি আমার চেয়ে বছর পনেরোর বড় হবেন। ফলে আমি যখন শুরু করেছি– ওঁর কাজ মধ্য গগনে। একদম ঠিকঠাক সময়ে, যখন থেকে আমার অভিনয় দেখার চোখ তৈরি হচ্ছে– তখন থেকে ওঁর কাজ দেখতে দেখতেই বড় হয়েছি। একজন অভিনয়ের ছাত্র হিসেবে এই প্রাপ্তি অতুলনীয়! যখন কোনও বড় অভিনেতার অভিনয় দেখি, তাঁর প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সেটা অবচেতনে পড়তে থাকে। আসলে চারপাশ থেকেই তো একজন অভিনেতার শিক্ষা। অতীত গুরু পথিক গুরু গুরু অগণন। চারপাশের শিক্ষাটা মিলে যে শেখাটা তৈরি হয়, একটা সময়ের পরে তার মধ্যে থেকে আলাদা করে কোনও শেখা খুঁজে বের করতে পারি না আমরা। তাই আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে না-পারলেও, আমি মনে করি– নানা পাটেকর আমার গুরু। অসংখ্য গুরুর মধ্যে একজন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved