hilsha and other lost fish preparations of bengali | Robbar
Robbar
  • ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ১০ অক্টোবর ২০২৬

জলের রুপোলি শস্য

আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষের তৈরি করা সীমান্তের দাগ, কাঁটাতারের বেড়া কি অত সহজে স্বাদের স্মৃতিকে ম্লান করে দিতে পারে? পারে না বলেই হয়তো মাছ নিয়ে আমাদের এতো রোম্যানটিসিজম, এতো উদ্দীপনা। সেসব মেলা কথা আগের তিন পর্ব জুড়ে বলেছি। তবু যেন বলা ফুরয় না। আসলে এই গল্প বলা মাছের চলার মতোই। 

শেষ আপডেট: অক্টোবর ৯, ২০২৬, ২০:২০   
Facebook WhatsApp Messenger

‘মধুর কথা কয় ঠাকুমা, মধুর কথা কয়
ইলশে মাছের গন্ধ না কি বাতাসেতে বয়

ইলশেগুড়ি বৃষ্টি হল
ইলশে হল হাওয়া
ভুলেই গেছি আমরা সবাই
ইলশে পোলাও খাওয়া

এখন সে সব ইলশে কোথায়?
কোন নদীতে মেলে?
পায় না না কি খোঁজ সেই ইলিশের
মাছ ধরে যে জেলে?’

‘আইতে শাল, যাইতে শাল’– এই প্রবাদটা যে অঞ্চলের ক্ষেত্রে খাটে, এই ছড়াটা সেখানকার লোকমুখে প্রচলিত এক জনপ্রিয় ছড়া। 

আসলে মাছের স্বাদের মধ্যে নিজের ছেড়ে আসা শিকড়ের খোঁজ পায় কত মানুষ। এই ছড়াটা শোনানোর পর অরুণ ভট্টাচার্য বললেন– ‘ইলিশ মাছকে তো আমরা এখন আর সারি (বাড়তে) হতে দিই না, আর সারি না হলে সেই ইলিশের ঘ্রাণে পাড়া ম ম করবে কী করে?’

এক বাড়িতে ইলিশমাছ রান্না হলে দশ বাড়ি তার গন্ধে পাগল হয়ে যেত! আর সেই বাড়িগুলো ছিল চার-পাঁচ বিঘা জমির। অঙ্কের মাস্টার মশাইয়ের প্রশ্রয় জড়ানো সুরেই আমায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেরকম যদি দশটা বাড়ি হয়, তাহলে কলকাতার আয়তন অনুযায়ী সেই বাড়ি কতগুলো হবে বলো দেখি?’ 

zoom
‘ইলশে পোলাও’

ছড়াটাতেই ওঁদের ছোটবেলার এক অতিপ্রিয় পদের নাম আছে। ‘ইলশে পোলাও’ অর্থাৎ ইলিশ মাছের পোলাও। শুনে যা বুঝলাম, ইলিশ মাছের কাঁটা বেছে, চালের সঙ্গে নুন-ঝাল তারে এনে সে এক ঝক্কির রান্না বাপু! এখনকার বাজারে ইলিশের পোলাও খুব সৌখিন এক পদ। যদিও তার রান্নার কৌশল অরুণবাবুর মৌখিক বিবরণের থেকে অনেকটাই আলাদা। সত্যি কথা বলতে, স্মৃতি বড় বালাই, আর আমার মনে হয় যারা খাদ্যরসিক মানুষ তাদের স্বাদের স্মৃতি সীমানার ঊর্ধ্বে গিয়েই থেকে গিয়েছে। পুব বাংলা থেকে চলে আসা মানুষদের শুধুমাত্র ইলিশমাছ বিষয়ক সাক্ষাৎকার নিয়েই এক অবিশ্বাস্য চলমান যাদুঘর তৈরি করা যেতে পারে। 

‘আসেন বাবু, আসেন মিঞা সাব।
ভালো ইলিশ, ভালো পাঙ্গাস।
পাকা পায়খানা খাইবেন ভালো।’ 

এমন হাঁকডাক ছিল রূপসা, দরাটনা, ভৈরব নদীর পাড়ে ব্যস্ত স্টিমার ঘাটগুলোয়। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় কলকাতার শিয়ালদহ থেকে বরিশাল এক্সপ্রেসের গন্তব্য স্টেশন ছিল খুলনা। তারপর ছোট রেইল লাইনের ট্রেন ধরে বাগেরহাট। সজল রায়চৌধুরী তার কলকাতা থেকে বাগেরহাটে বাড়ি যাওয়ার রাস্তা হুবহু ছবির মতো করে বুঝিয়ে দিলেন। সেই যাত্রার নিরন্তর সঙ্গী ছিল মাছ। তারপর উনি ইলিশ মাছের গল্প বলতে লাগলেন। সেইসব অঞ্চলে তখন মোহনার রুপোলি শস্যের কেবল প্রাচুর্য। বাইরে মাছ চালান হত না। এলাকার মানুষরাই মাছ কিনে কুলকিনারা করতে পারত না। খুব সস্তায় বেচাকেনা। তখন ওজন হিসেবে মাছ বিক্রি করার চল ছিল না, মাছের আকার দেখেই দাম ঠিক হত। সমুদ্র থেকে নদীর মিষ্টি জল অবধি অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর পূর্ণ দৈর্ঘের ইলিশ মাছ ধরা হত। নদী পাড়ের হোটেলগুলোয় সেই কাঁচা ইলিশ দিয়েই পাতলা ঝোল রাঁধত। হিন্দু হোটেল যাত্রীদের ‘বাবু’ আর মুসলমান হোটেল ‘মিঞা সাব’ বলে ডাকতেন। যাত্রীরা থালায় বিড়াল ডিঙানো প্রায় অসাধ্য পাহাড় সমান ভাত নিয়ে হাপুস হুপুস করে ইলিশ বা পাঙ্গাসের ঝোলভাত খেতেন। স্টিমারের সঙ্গে হোটেলগুলোর এক অলিখিত বোঝাপড়া ছিল। কোনও যাত্রী বেশি ভাত খেলেই স্টিমারে হুইসেল বেজে উঠত আর যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে বলে উঠত: ‘হুইসেল দিসে, হুইসেল দিসে!’ 

zoom
ইলিশের ঝোল

এসব কবেই গল্প হয়ে গেছে। এমন এক ভূগোলের গল্প যার আজ আর কোনও মানচিত্র নেই। 

সেই হারানো ম্যাপের পথ ধরলে আরও কত যে এমন গল্প উঠে আসবে তার হিসেব নেই। আমার মাতামহ তারাপদ লাহিড়ী তার কিশোরী নাতনি অভিরূপাকে পূর্ববঙ্গের মাছের প্রাচুর্যের গল্প বলেছিলেন। দাদাবাবা নদীতে নেমে এক জায়গায় খলুই রেখে গামছা গায়ে স্নান করতে চলে যেতেন। স্নান সেরে যখন আসতেন, দেখতেন খলুই ভরে চুনো মাছ। চাঁদা, পুঁটি, মৌরলা, খরশুলা, চাপিলা আর কত কী স্থানীয় প্রজাতির মাছ। আমরা যারা এই প্রজন্মের, তারা অনেকেই হয়তো সেসব মাছের নামই কখনও শুনিনি। সে সব টাটকা মাছ দিয়েই হাতে মাখা চচ্চড়ি বা হাতে মাখা ঝোল। 

zoom
খরশুলা মাছ

আমার মাঝেমাঝে মনে হয়, মানুষের তৈরি করা সীমান্তের দাগ, কাঁটাতারের বেড়া কি অত সহজে স্বাদের স্মৃতিকে ম্লান করে দিতে পারে? পারে না বলেই হয়তো মাছ নিয়ে আমাদের এতো রোম্যানটিসিজম, এতো উদ্দীপনা। সেসব মেলা কথা আগের তিন পর্ব জুড়ে বলেছি। তবু যেন বলা ফুরয় না। আসলে এই গল্প বলা মাছের চলার মতোই। 

‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকছিস?’ কেউ কোনও কথা আড়াল করতে চাইলেই আমরা যেন খুব সহজেই এই প্রবাদটাই বলি। বহু যুগ ধরেই তো শাক আর মাছের অন্তরের যোগাযোগ! সেই মনসামঙ্গলের পঙ্‌ক্তি ‘মাগুর মৎস্য দিয়া রান্ধে গিমা গাছ গাছ’ অর্থাৎ গিমা শাক দিয়ে মাগুরমাছ রান্না হচ্ছে। মাগুরমাছ আর তেতো গিমা শাক দিয়ে পথ্যি ঝোল। পেটের অসুখ সারিয়ে তুলবে। শাক আর মাছের যুগলবন্দির কথা উঠতেই অরুণ ভট্টাচার্য জিজ্ঞেস করলেন, ‘আগরা গাছ চেনো?’ জানালাম, চিনি না।

আগরা গাছের ডগা দিয়ে ল্যাটামাছ বা কই মাগুর শিঙ্গির মতো জিওল মাছের রান্না না কি অতি উপাদেয়! আমাকে আরও বললেন, আমাদের এইসব দক্ষিণ কলকাতার কলোনি অঞ্চলে যে সব জমিজায়গা ছিল, সেখানে মানুষের অবহেলায় বেড়ে উঠত এই সপুষ্পক ভেষজ আগরা গাছ। জলা জমি, পুকুর, খাল, বিল, ডোবা আজ বিপন্ন। তাই আগরা গাছের সঙ্গে জিওল মাছের ঝোলের স্বাদ ও অনেকেরই পাওয়া হল না। 

zoom
শিঙিমাছ

দেশ মানে তো শুধু হিন্দুস্থান পাকিস্তানের ভাগাভাগি নয়। আমার মনে হয়, মানুষের স্মৃতিতে সবার নিজের মতন করে তার দেশের ছবি আঁকা আছে। তাই কাজের সূত্রে সময়ের নিয়মে অন্য শহর বা অন্য দেশ আপন হয়ে উঠলেও, দিনের শেষে হয়তো একবার হলেও সবাই তার নিজের গ্রাম বা ঘিঞ্জি মফস্‌সল কিংবা অলস শহরে ফিরে যেতে চায়। আমার বন্ধুস্থানীয় দিদি তনুশ্রী ভৌমিক তার ছোটবেলা, কৈশোর, যৌবন কাটিয়েছেন আসামের শিবসাগর, শিলচর, ডিগবয়, গৌহাটি জুড়ে। আসামও তো এক মেছো রাজ্য। তনুশ্রী ভৌমিক বললেন– আসামের খাল, বিল, পুকুরে যা মাছের বৈচিত্র আছে, তা হয়তো ব্রহ্মপুত্রেও পাওয়া যাবে না। আপার আসামের খরস্রোতা নদী কিংবা স্থানীয় পুকুর, খালবিলের সুমিষ্ট সব মাছ। মাছের ‘মিষ্টি’ স্বাদ বোধহয় বাঙালির জিভেই ধরা দেয়। মাত্র আড়াই বছর বয়সে রসিক মাছ-খাইয়ের মতো করে মাছের মাথা খাওয়ার জন্য তনুশ্রী ‘মেছো’ তকমা পেয়ে গিয়েছেন। আসাম উত্তরবঙ্গের নদনদীর গতিপথে কত যে প্রজাতির মাছের জীবনচক্র একসময় কেটেছে, তার ঠিক নেই। সেইসব মাছ এখন আর কোথায়? বলতে বলতেই বললেন– ‘বাতাসি মাছ আর বাঁশপাতা মাছ পার্থক্য করে এখন অনেকেই চিনতে পারবেন না।’ উত্তরবঙ্গ আর আসামে আগে বোরোলি মাছ খুব পাওয়া যেত, এখন ভয়ানকভাবে ওদের জনসংখ্যা কমে আসছে। এর কারণ কী? অবশ্যই জলাভূমি বুজিয়ে বেপরোয়া উন্নয়নের থাবা এবং জলদূষণ– প্রধান কারণ। যার মাশুল দিতে হচ্ছে প্রচুর ছোট-বড় দেশীয় মাছেদের। চেলা মাছের দেখা পাওয়া আজকাল ভাগ্যের ব্যাপার। হাতের তালুর মতন লম্বা, রুপোলি, কোমল ভঙ্গুর এই চেলা মাছ। তনুশ্রীর মতে, বাঁশপাতা আর বাতাসির মতন, অনেকেই চেলা মাছ আর বোরোলি মাছ গুলিয়ে ফেলে। অনেকেই ভেবে বসেন চাপিলা মাছ ইলিশ মাছের বাচ্চা। আসলে যে প্রজন্মের মানুষেরা মাছ চিনতে এত পটু ছিলেন, তাঁরাও হারিয়ে যাচ্ছেন। চাঁদা, রানি, কাকিলা– এইসব মাছ শেষ কবে বাজারে উঠেছিল, সেটাই বড় প্রশ্ন। মাছের বাজারের শেষে চুনো মাছের মিশ্রণ নিয়ে যারা বসতেন– তাদেরও আর দেখা পাওয়া যায় না। তনুশ্রী স্মৃতি হাতড়ে বললেন, তাঁর বাড়িতে চুনো মাছের মিশ্রণ থেকে কীভাবে এক প্রজাতির মাছ আলাদা আলাদা করে বেছে রাখা হত। কোনটা ডালের পাতে মুচমুচে ভাজা হবে, কোন মাছ দিয়েই বা কালো জিরে কিংবা মেথি-ফোড়নের হলুদ গালা ঝোল হবে। IUCN-এর তথ্য অনুযায়ী বহু দেশীয় মাছ এখন লাল দাগ দেওয়া তালিকার অন্তর্ভুক্ত। গৌহাটি বিমানবন্দর থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে দীপর বিলে মাছ কেনার স্মৃতিও এখন তাঁর কাছে গল্প হয়ে গিয়েছে।

zoom
চুনোমাছের ঝাল

চুনো মাছ নিয়ে কথা বলতে বলতে আমার ঠাকুমার নোয়াখাইল্লা জীবনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। দেবীপক্ষ শুরুর লগ্নে তারা দেশের বাড়ি চৌপল্লিতে যেত। নৌকাযাত্রা। মেঘনা পেরনো ছিল এক বিষম ব্যাপার। নৌকার ছইয়ের ভিতর বসে সবাই বাড়ি থেকে আনা রান্না করা খাবার খেতে খেতে গল্পে মশগুল থাকত। মাঝিমাল্লারা নৌকা যাত্রাপথে নানা মাছ ধরত। সব মাছ মিলেমিশে সেই চুনো মাছ। শিলপাটায় শুকনো মরিচ, পেয়াঁজ আর রসুন বেটে কড়াইয়ের তেলে দিতে চড়চড় শব্দ। ঝাঁঝ, ঝাল নদীর বাতাসে মিশে সবার চোখেমুখে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে। তৈরি হল ঝালন। বা যাকে বলে মরিচ ভর্তা। সঙ্গে এক গামলা চুনো মাছের ঝোল। ঠাকুমার মায়ের খুব ইচ্ছে করত ওদের সঙ্গে বসে পাত পেড়ে ঝালন দিয়ে মাখিয়ে ঝোলভাত খেতে। কিন্তু সেই জাতপাত শ্রেণির বেড়া। জমিদার পক্ষের আর কি তাঁর কর্মচারীদের সঙ্গে বসে ভাত খাওয়া শোভা পায়? 

কোন মাছ ছোটলোকের বা কোন মাছ ভদ্রলোকের– সমাজ তার অলিখিত নিয়ম করে গিয়েছে। সেই নিয়মেই বলে, ঢাই মাছ ছোটলোকের মাছ বা গরিবের মাছ। আড় মাছের চেয়ে খানিক বড় আকারের এই মাছ বড় তেলতেলে। পেয়াঁজ রসুন দিয়ে কষিয়ে মাংসের মতন রান্না করতে হয়। সেই ঢাই মাছ বাজারে মোটেও আর দেখা দেয় না। 

কুলীন মাছ অন্ত্যজ মাছের ভাগাভাগি, মাছের টুকরো নিয়ে রাজনীতি, শিল্প সাহিত্যে লোককথায় মাছ– এগুলো অনেকখানি মানুষের স্মৃতিতে থেকে গেছে। মাছের ভিতরে একখান ‘দ্যাশ’ যে জ্বলজ্বল করে– তা শহুরে ব্যস্ত জীবনে আমরা ভুলে যাই। আমাদের পরিবারের মতন অনেক পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম কেবল সেই ফেলে আসা দেশের প্রাচুর্যের গল্প শুনে বড় হয়েছে, আর মনে মনে এক কল্পনার দেশের মানচিত্র এঁকে গেছে। ওপারে থাকতে সবারই খুব প্রচলিত একটা কথা ছিল যে, বঙ্গদেশে দুধ আর মাছের কোনওদিন কোনও অভাব হবে না। তাই খাবারের ঊর্ধ্বে গিয়ে মাছ স্মৃতি বহনকারী, চলতে থাকা এক আর্কাইভ। যার মধ্যে সযত্নে রাখা আছে হারিয়ে যাওয়া ভূগোল, বাস্তুচ্যুত হওয়ার বেদনাময় অভিজ্ঞতা। সেইসব অভিজ্ঞতা ইতিহাসের দলিল হয়ে গেলেও, ইস্কুলের ইতিহাস বইতে তাদের হদিশ মেলে না। তার হদিশ পেতে হলে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে মাছ ধরার গল্প, মাছ কোটার গল্প, মাছ রান্নার গল্প শুনতে হয়।

Fish Fish preparations Hilsha fish History of Fish Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on