

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে গাভাসকর বলেছেন ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে ভারতে যে এত পেসার উঠে এসেছে, তাদের প্রধান প্রেরণা কিন্তু কপিলদেব। শ্রীনাথ, প্রসাদ থেকে সামি, বুমরাহকে নিয়ে আলোচনা রয়েছে এই বইতে, পাশাপাশি রয়েছে এমআরএফ পেস ক্যাম্পের উল্লেখ। ১৯৮৭-এর এই প্রকল্পের অন্যতম নির্দেশক ছিলেন ডেনিস লিলি, এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় সহায়ক ছিলেন কপিল।
বইয়ের শিরোনাম দেখে প্রথমেই মনে পড়েছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবির একটি সংলাপ, যেখানে অরিন্দম অদিতিকে বলছে– ‘শুনুন, আমার জীবনী জিনিসটা এত বেশিবার এত জায়গায় বেরিয়েছে যে, ওটার মধ্যে নতুন করে কিছু বলার নেই’।
অরিন্দমের জায়গায় সচিন বা ধোনিকে বসালে খুব ভুল হয় না। কপিল দেবই বা নয় কেন? গোটা তিনেক বিশ্বকাপ ভারত যতই জিতুক– ট্যালেন্ট, পরিশ্রম আর সমকালীন জনপ্রিয়তার নিরিখে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত ক্রিকেটারদের মধ্যে অন্যতম কপিল দেব নিখাঞ্জ। ’৮৩-র কীর্তি, ৪৩৪ উইকেট বা পাঁচ হাজার রান নয়। নবাব পতৌদি, বিষেণ সিং বেদি আর উল্টোদিকে ওয়াদেকর, গাভাসকর– কপিলের এই চার প্রাক্তন অধিনায়কের মধ্যে একটা জিনিস কমন ছিল; তা হল শিক্ষিতের আভিজাত্য। কপিল অবশ্যই সেই পাঠশালার ছাত্র নন, কিন্তু সে কারণেই আপামর ভারতবাসীর কাছে তিনি অনায়াস গ্রহণযোগ্যতার টেমপ্লেট তৈরি করতে পেরেছিলেন । সাফল্যের পাশাপাশি ‘নেক্সট ডোর’ ইমেজটা তাঁর এমনভাবে ছিল যে ভারতীয় ক্রিকেটে আটের দশক তাঁকে ঘিরেই চিহ্নিত হয়েছে। তাই অবসরের ৩২ বছর পরে বাংলাতে যখন তাঁকে নিয়ে বই লেখা হয়, তখন আর একটি জীবনী ভেবে প্রাথমিকভাবে একটু হতাশই হয়েছিলাম।

গতিদেবতার সঙ্গে ক্রিকেটের আশ্চর্য ভ্রমণ– ভারতীয় তারকার দীর্ঘ কেরিয়ারের সঙ্গে সমান্তরালভাবে লেখক দু’জন দেখাতে চেয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেটের বিবর্তনকে। বইটির পূর্বরূপটি প্রকাশিত হয়েছিল ইংরেজিতে, পরে অনূদিত রূপটি উক্ত শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬-এ। ভূমিকা বাদে আরও ১৪টি অধ্যায়ে ছড়িয়ে রয়েছে কপিলদেব তথা ভারতীয় ক্রিকেটের বিবর্তনের এক রেখাচিত্র। এ চিত্র আঁকতে চেয়েছেন ভাস্কর বসু ও কলরব রায়। বইটির পরিসর ১৯৩২-এ ভারতের টেস্ট-মঞ্চে পদার্পণ থেকে ২০০৭-’০৮-এ আইএসএল পর্যন্ত।
একজন মহান ব্যক্তিত্বকে জানতে গেলে তাঁর কৃতির পাশাপাশি অতীত ও বেড়ে ওঠার পটভূমি জানা প্রয়োজন। বইটির প্রথম তিনটি অধ্যায় মিলিয়ে প্রায় ৫০ পাতার বেশি অংশ জুড়ে লেখকরা ক্রিকেট-ইতিহাসে আলো ফেলতে চেয়েছেন। এই সময়পর্বে অনুষ্ঠিত সবক’টি সিরিজ ও ম্যাচের পরিসংখ্যান এখানে বিধৃত। প্রত্যেক ম্যাচে বোলারদের পরিসংখ্যান আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে লেখকদ্বয় দেখিয়েছেন ভারতে চিরকালই ফাস্ট বোলারের অভাব। কখনও দাত্তু ফাদকার, কখনও রমাকান্ত দেশাই পেস বিভাগের প্রতিনিধি হয়ে বিদেশ সফরে যেতেন। কপিলের উত্থান যেন এই দীর্ঘ খরা কাটিয়ে ভারতকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠার দেওয়ার জন্যই হয়েছিল। তবে দীর্ঘ বিবরণের বদলে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভারতীয় পেস বোলিং-এর হতশ্রী চেহারাকে বোঝানোর সুযোগ ছিল লেখকদের হাতে। পাঁচ ও ছয়ের দশকে সুঁটে ব্যানার্জি ও সমর চক্রবর্তীর মতো বোলাররা কেন যথেষ্ট যোগ্য হয়েও পশ্চিম লবির প্লেয়ার নন বলে বঞ্চিত হলেন– তার উল্লেখ করার সুযোগ ছিল। একথা তিক্ত হলেও সত্য যে ছয়ের দশকে বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর-ভেঙ্কট-এর স্পিন চতুষ্টয়ের সাফল্যের মাতামাতি, বিদেশের মাটিতে আরও বেশি পিছিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় পেস-বিভাগকে। এই বিশ্লেষণগুলিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিলে প্রথম অধ্যায়গুলি আরও গুরুত্ববহ হত এবং অনাবশ্যক বিবরণের ভার কমতে পারত।

গাভাসকরের বই ‘Idols’ প্রকাশ করেছিলেন কপিল ও ক্লাইভ লয়েড। সেই বইয়েরই একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু হয়েছে চতুর্থ অধ্যায়– যার সারমর্ম হল ১৯৭৮-এর পাকিস্তান সফরে কপিলের অভিষেক ও বছর দুয়েকের মধ্যে দলের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে ওঠা। ১৯৭৯-এর ইংল্যান্ড সফরের প্রথম টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়ার মধ্য দিয়ে কপিলের তারকা ওঠার সূচনা বলে মনে করেছেন আলোচ্য বইয়ৈর লেখকরা। অন্যদিকে বাংলা সংবাদমাধ্যমের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব তাঁর রচনায় লিখেছেন পাকিস্তার সফরের একটি ঘটনার কথা। কপিল একটি ইনিংসে দিনের শেষে ব্যাট করতে আসেন নাইট ওয়াচম্যান হয়ে এবং দ্রুত অর্ধশতরান করেন। অধিনায়ক বেদি, কপিলকে জানান তাঁর দায়িত্ব ছিল উইকেট পড়তে না দেওয়া। কপিলের সহজাত উত্তর ছিল– নাইট ওয়াচম্যান ব্যাপার কী, তিনি সেটাই জানেন না। বর্তমান সমালোচকের মতে, ওই ইনিংসটাই বুঝিয়ে দিয়েছিল চিরাচরিত মুম্বই স্কুলের দিন ফুরিয়েছে।

পরের দু’টি অধ্যায়ের একত্রে নাম দেওয়া যেত ‘কপিল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা’। ১৯৮১-এর মেলবোর্ন টেস্টের শেষ দিনে পাঁচ উইকেট নেওয়া যে কোনও ক্রিকেটপ্রেমীর কাছেই ইতিহাস হয়ে আছে। কিন্তু এই বইয়ের দুই লেখক পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এইসময়ে কপিল বেশ কিছু ইনিংস খেলেন ১০০-র উপর স্ট্রাইকরেট রেখে। কপিলের চরিত্র চেনার জন্য এই হিসেবটা সত্যিই জরুরি ছিল। বেশ কয়েকজন সিনিয়রকে সরিয়ে কপিলকে অধিনায়ক করার বিষয়টিকেও চমৎকার বিশ্লেষণ করা হয়েছে বইতে। তবে একথাও বলা যেত যে, পাকিস্তান থেকে ভারত হেরে ফিরলে অধিনায়কের অবশ্যই চাকরি যেত। গাভাসকর ব্যাটে যথেষ্ট সফল হলেও সেই ভবিতব্য তাঁকেও তাড়া করেছিল। অথবা এক দিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপে তাঁকে অধিনায়ক হিসেবে ভাবেইনি বিসিসিআই।

১৯৮৩ এমনই বহু আলোচিত এক মহোৎসব– যা নিয়ে কয়েক টন নিউজপ্রিন্ট খরচ হয়ে গিয়েছে। এই আলোচনার মধ্যেও প্রধানত তারই অনুবৃত্তি রয়েছে। লেখক দু’জন উল্লেখ করেছেন যে বিশ্বকাপের আগেই দল থেকে বাদ যান গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ। এই বিশ্বকাপ কার্যত বুঝিয়ে দিয়েছিল স্টাইলিশ বা কপিবুক ক্রিকেটের বাইরে ইউটিলিটি ক্রিকেটাররাই এখন থেকে দলের চালকশক্তি হবেন। কপিল-অমরনাথকে বাদ দিলে বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা ছিল মদনলাল, কীর্তি আজাদ, সন্দীপ পাটিল প্রমুখের। তাঁরা ইতিহাসে স্মরণীয় হননি। কিন্তু ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। তাই বলা যায় ১৯৮৩ শুধু বিশ্বজয় নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের দিকবদলের মাইলস্টোন।

১৯৮৩-র পর ভারতের বড় সাফল্য ছিল ১৯৮৫-এর বেনসন অ্যান্ড হেজেস ট্রফি জেতা। মাঝের দুটো বছর কার্যত ব্যর্থতারই ইতিবৃত্ত। দেশের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের কাছে সিরিজ হারের মাঝে ছিল নেতৃত্ব হারানো প্রথম ও শেষবার কপিলের দল থেকে বাদ পড়া। কিন্তু এই ঘটনাই বুঝিয়ে দিয়েছিল– কলকাতা তথা ভারতের দর্শকও দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়েছে, সানি ও কপিল। ‘নো কপিল নো টেস্ট’-এর জোরালো আওয়াজের মাঝেই উঠে এলেন আর এক তারকা। ভারত পেল মহম্মদ আজহারউদ্দিনকে। ১৯৮৫-তে অধিনায়কত্ব ফিরে পাওয়ার পর কপিলের একমাত্র বড় সাফল্য ইংল্যান্ডে ২-০ সিরিজ জেতা। ’৮৩ পরবর্তী সময়ের নামকরণ যথার্থ– ‘অন্তর্বর্তী বছরগুলো’। সত্যিই এই পর্বের নামকরণে কোনও বিশেষণ হয় না।
১৯৮৭-এর বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের হার ছিল কপিলের অধিনায়ক হিসেবে শেষ ম্যাচ ও গাভাসকরের শেষতম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ঘরের মাটিতে পাকিস্তানের কাছে সিরিজ হারও ছিল এক দগদগে ঘা। ব্যাঙ্গালোরের শেষ টেস্ট বন্দিত গাভাসকারের ৯৬ রানের অমর ইনিংসের জন্য, কিন্তু কপিলের অধিনায়কত্বের ত্রুটি বারবার চোখে পড়ছিল ইমরানের সঙ্গে তুলনায়। শারজায় কুখ্যাত ফাইনালে মিয়াদাঁদের শেষ বলে ছয় মারার পেছনেও কপিলের ভুল পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন লেখকরা। এই নির্মোহ সমালোচনার জন্য তাঁদের অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য।

১৯৮৭ থেকে ১৯৯৪– এই সময়কালকে বিবৃত করতে লেখকেরা অল্প পাতাই বরাদ্দ রেখেছেন। বেঙ্গসরকার, রবি শাস্ত্রী ও শ্রীকান্তের অধিনায়ক হিসেবে মোট সময়কাল ছিল দু’ বছর। ১৯৯০-এর নিউজিল্যান্ড সফর থেকে দীর্ঘকালীন অধিনায়ক হন আজহার। কপিল অবশ্যই দলের অনুগত সৈনিক এবং ওপেনিং বোলার ছিলেন, কিন্তু তাঁর ক্রিকেটীয় দক্ষতার সেরা সময় যে পার হয়ে এসেছেন, তা সহজেই বোঝা যেত। শেষ পর্বে তিনি বেশি সাফল্য পেয়েছেন ব্যাটে। হাঁটু ও পিঠের চোটের পর বলের গতিও কমে এসেছিল। ১৯৯২-এর বিশ্বকাপের ব্যর্থতার হতাশাও তাঁকে বারবার বিদ্ধ করেছিল। পরিসংখ্যান-সহ এইসবের ধারাবিবরণী দিয়েছেন লেখকেরা। তবে হয়তো অবিতর্কিত থাকতে চেয়েই তাঁরা দু’টি স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ বিস্তারিতভাবে লেখেননি।
১৯৯২-’৯৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের ব্যর্থতার পর কপিলের আবার অধিনায়ক হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা ছিল। আজহার তার আগে চারটি টেস্ট সিরিজেই হেরেছিলেন। এই পরিস্থিতিতে গাভাসকর বা কপিল হলে তাঁর পদচ্যুতি ছিল নিশ্চিত। কপিল ছাড়াও জোরালো দাবিদার ছিলেন রবি শাস্ত্রী। কিন্তু দু’জনের কেউই বোর্ডের ইয়েসম্যান ছিলেন না। তৎকালীন নির্বাচক চেয়ারম্যান ছিলেন রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর, যাঁর সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল আজহারকে অধিনায়ক রেখে দেওয়ার পেছনে। কপিল-আজহারের সম্পর্কে চোরাস্রোতের শুরু সেখানেই। হালকা অভিযোগ ওঠে তাঁর ৪৩১ উইকেট ভাঙার রেকর্ডের জন্যই শ্রীনাথ দলে আসতে পারছেন না। গূঢ়ার্থে বোঝানো হয়েছিল হ্যাডলিকে টপকানোর পরই তাঁকে অবসর নিতে হবে। কপিল চেয়েছিলেন ৫০০ উইকেটের লক্ষ্যে ছুটতে। বাস্তব কী? ১৯৯৪-এর অকল্যান্ড টেস্টে আজহার তাঁকে বলই দেননি গোটা প্রথম দিন। ওটাই ছিল কপিলের শেষ টেস্ট।

এই বইতে গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের পাশাপাশি অংশুমান গায়কোয়াড়ের প্রসঙ্গ আসার কারণ বোঝা গেল না। অন্যদিকে তৎকালীন ম্যানেজার অজিত ওয়াদেকরের প্রসঙ্গ আলোচিতই হয়নি। অবশ্যই তা উচিত ছিল। ১৯৯২-’৯৬ সময়কালে ম্যানেজার ওয়াদেকর মনোযোগ দিয়েছিলেন দেশের মাটিতে সিরিজ জেতায় এবং দলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনায়। জনৈক সাংবাদিক লিখেছেন– ‘এইসময় কপিল তাঁর সংস্থা দেব ফিচার্সের কাজে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন’। কোনওদিনই তিনি ওয়াদেকরের গুডবুকে ছিলেন না। নির্বাচক চেয়ারম্যান বিশ্বনাথ কপিলকে বুঝিয়েছিলেন রেকর্ড হয়ে যাওয়ার পর অবসর নিতে। কিন্তু এই বইতে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে পরিস্থিতি কখনওই অত মধুর ছিল ছিল না।

কপিলের কেরিয়ারের ধারা বিবরণীর সমাপ্তির পর এই বইতে আলোচিত হয়েছে তাঁর অধিনায়কত্বের দক্ষতা ও অলরাউন্ডার হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব। টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে কপিল সফল নন, একই কথা বলা চলে তাঁর একদা প্রতিযোগী ইয়ান বথামের ক্ষেত্রেও। এই বইতে কপিলের অধিনায়ক হিসেবে বেশ কিছু সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁকে কখনওই টানা অধিনায়কত্ব দেওয়া হয়নি, এই বিরতিও অনেকসময় তাঁর ক্ষতি করেছে। দলে কয়েকজন সিনিয়র থাকলে তরুণ অধিনায়কদের সমস্যা হয় একথা সুবিদিত। কপিলের প্রতিযোগী ইমরানের সে সমস্যা ছিল না। লেখকদের বিশ্লেষণ সঠিক।
কপিলের সাফল্যের অন্তরায় কি একজন কোচের অভাব? টিম স্ট্র্যাটেজিতে সেই কোচ ভূমিকা নিলে তিনি হয়তো আরও চাপমুক্ত মনে খেলতে পারতেন। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে, অধিনায়ক হিসেবে তাঁর বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। ইতিহাস সর্বদা পুনরাবৃত্ত হয়। ১৯৯৯-এ ভারতের কোচ হিসেবে অধিনায়ক তেন্ডুলকরের সঙ্গে যোগ দেন কপিল। একের পর এক সিদ্ধান্তে তাঁর ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়। এ ঘটনা খুবই স্বাভাবিক ছিল, কারণ কপিলের গেমপ্ল্যান ও পরিকল্পনা কোনওদিনই ছিল না। মাঠে নেমে শক্তিনির্ভর, সহজাত ক্রিকেট খেলতেই তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন । ২০০০-এর এপ্রিলে সৌরভ পাকাপাকি অধিনায়ক হওয়ার পর কলকাতার একটি সংবাদপত্রে বলা হয়– ‘সৌরভের বাড়তি কাজ হবে কোচের খাতার অঙ্কগুলোও ঠিক করে দেওয়া’। কোচ কপিল কোনওদিনই প্রশংসাযোগ্য ছিলেন না, এই বইয়েও তারই প্রমাণ বিধৃত।

কপিলের কেরিয়ারের কালো দাগ বেটিং কেলেঙ্কারি এবং লেখকরা সে বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ২০০০ সাল থেকে শুরু করে আজ অবধি বেটিং বিতর্কের সমাপ্তিরেখা টানা যায়নি এবং তাঁরাও সেটা করার চেষ্টা করেননি, সংক্ষেপে বিষয়টি ছুঁয়ে গিয়েছেন মাত্র। কিন্তু তাঁর জীবনের অন্যতম হঠকারী সিদ্ধান্ত ২০০৭-এ আইএসএল-এ যোগ দেওয়া, যা নিয়ে বাংলায় কোনও বইতে বিস্তারিত আলোচনা সেভাবে পাওয়া যায় না। এই বইতে নাতিদীর্ঘ একটি উপ-অধ্যায়ে সে আলোচনা থাকায় ক্রিকেট-পাঠকরা অবশ্যই উপকৃত হবেন। কপিল সম্পর্কে কিছু উন্নাসিক বাঙালি বলতেন: ‘জাঠ তো, হাতে পায়ে বুদ্ধি, মাথায় নেই’। এনসিএ-র মতো সংস্থার দায়িত্বে থেকে হঠাৎ বিসিসিআই-এর বিরুদ্ধে চলে যাওয়া, আবার ফিরে আসা, কখনও কখনও কপিলের বাস্তববুদ্ধি সত্যিই সংশয় জাগায়!

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে গাভাসকর বলেছেন ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে ভারতে যে এত পেসার উঠে এসেছে, তাদের প্রধান প্রেরণা কিন্তু কপিলদেব। শ্রীনাথ, প্রসাদ থেকে সামি, বুমরাহকে নিয়ে আলোচনা রয়েছে এই বইতে, পাশাপাশি রয়েছে এমআরএফ পেস ক্যাম্পের উল্লেখ। ১৯৮৭-এর এই প্রকল্পের অন্যতম নির্দেশক ছিলেন ডেনিস লিলি, এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় সহায়ক ছিলেন কপিল। অলরাউন্ডার হিসেবে হার্দিক পাণ্ড্য বা রবীন্দ্র জাদেজার আলোচনা একান্তভাবেই স্বাভাবিক ছিল।

কোনও বিশেষ ব্যক্তিত্বের সুদীর্ঘ কর্মজীবন সম্পর্কে বলতে গেলে ‘ক্রোনোলজিক্যাল কম্পেনডিয়াম’ শব্দটি ব্যবহার করেন অনেকেই। এই বইয়ের ভূমিকায় লেখকরা বারবার কপিলকে উল্লেখ করেছেন তাঁদের কৈশোরের হিরো হিসেবে। বাঙালি সমাজের নস্টালজিয়া মেখে স্মৃতিতে থাকা যে আটের দশক, তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ কপিলদেব। হরিয়ানার মতো একটি ছোট রাজ্য, সেখানে একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে শুধু প্রতিভা আর পরিশ্রমের জোরে উঠে আসা একজন তারকা যে সুপার-হিরো হবেন তা স্বাভাবিক। সেকারণেই মনে হয় এই বইতে আরও বেশি উল্লেখ দরকার ছিল তাঁর শৈশব-কৈশোরের লড়াই করার সময়ের দিনলিপির। দেশপ্রাণ আজাদের আখড়া থেকে লড়াই শুরু করার প্রথম প্রহরগুলির উল্লেখ প্রয়োজন ছিল।

বইটির অন্যতম ইউএসপি পরিসংখ্যান। আবার অনেকসময় অতিরিক্ত পরিসংখ্যানই বইটির পাঠের গতিকে রুদ্ধ করেছে। আমাদের ছেলেবেলার হিরো ছিলেন সচিন-সৌরভ। তাঁদের রান আর সেঞ্চুরি নিয়ে পাতলা বই, ছোটরা গোগ্রাসে গিলত। এই বইয়ের ভাষা, অধ্যায় নামকরণ এবং পরিসংখ্যানের মধ্যে সেই বইগুলির মিল পাওয়া যায়। প্রতিটি তথ্যের শেষে ফুটনোট এবং সূত্রনির্দেশ নজর কাড়ে। লেখকদের এই অ্যাকাডেমিক মানসিকতাকে প্রশংসা করেও বলতে হয় যে, তথ্যসূত্রে ‘Sunil Gavaskar Omnibus’ না লিখে বইটির নাম দেওয়াটা জরুরি ছিল (পৃ. ১০৮)। ক্রিকেটীয় বিষয়ে সীমাবদ্ধ থেকে বিতর্ক এড়িয়ে চলা এই বইটিকে ‘ফিল গুড’ বলা যেত, যদি এত বেশি পরিসংখ্যান ও প্রথম তিন অধ্যায়ের দীর্ঘ ধারাভাষ্য না থাকত।

সমাপ্তিতে ফিরতে হচ্ছে ‘নায়ক’ ছবিটির কাছেই। অদিতি অরিন্দমকে বলেছিল, ‘আপনার সম্পর্কে যা বেরিয়েছে সেগুলো খুব ইন্টারেস্টিং নয়’। অকপটেই বলা যায়, কয়েকটি অনালোচিত প্রসঙ্গ উল্লেখ করার জন্য সাধুবাদ থাকলেও, বইটি সব মিলিয়ে ‘ইন্টারেস্টিং’ হয়ে উঠতে পারল না। আরেকটি ক্রিকেটের বই হয়েই রয়ে গেল।
——————————————————-
কপিল দেব: গতিদেবতার সঙ্গে ক্রিকেটের আশ্চর্য ভ্রমণ
ভাস্কর বসু ও কলরব রায়
সৃষ্টিসুখ
৩৪৯ টাকা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved