Are Musical Instruments Intruders in Rabindra Sangeet?। Robbar
Robbar
  • ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বাদ্যযন্ত্র রবীন্দ্রগানে অনুপ্রবেশকারী?

রবীন্দ্রনাথ নিরাভরণ কণ্ঠে গান রেকর্ড করছেন ১৯৩১ সালে। ১৯৩৭-এ ‘মুক্তি’ ছবির জন্য পঙ্কজ মল্লিকের সংগীত আয়োজনে রবীন্দ্র সংগীত গাইছেন কানন দেবী। আসছে নানা যন্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি ছোট ছোট ফিলার। রচনা করছেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। এদিকে, ১৯৩২ সালেই প্রথম রেডিওতে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সম্প্রচারিত হল, আর পঙ্কজ মল্লিক ‘অহং রুদ্রে’ স্তোত্রটির সঙ্গে একাধিক পুরুষকণ্ঠকে ব্যবহার করলেন খাঁটি বিলিতি কায়দায় হারমনাইজ করার জন্য। এই হারমনাইজেশন ধরা রয়েছে ১৯৬৬ সালের ডিস্কেও, এবং অদ্যাবধি দেবী দুর্গার সংস্কৃত ভাষায় উচ্চারিত আত্মপরিচয়, ওই রকম একটি ধ্রুপদি প্রযোজনায়, বাঙালি বিলিতি হারমনির সঙ্গে শুনে আসছে এবং শিহরিত হয়েছে। তাতে তাঁদের প্রণতি বিপন্ন হয়নি।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ১৫:৪৩   
Facebook WhatsApp Messenger

শ্রীকান্ত আচার্যের সঙ্গে কবীর সুমনের একটি দূরদর্শন আলাপচারিতা রয়েছে ইউটিউবে। সেখানে সুমন বলছেন, সলিল চৌধুরী ওঁকে বলছিলেন, যে গান খালি গলায় গাওয়া যায় না সে গান কোনও গানই নয়। একথা বলতে বলতেই তিনি গেয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথের গান। বলেন, ১৯৯৬ সালে তিনি কেবল একটি নাইলন স্ট্রিং গিটারের সঙ্গে চারটি রবীন্দ্রনাথের গান রেকর্ড করেছিলেন। বলতে বলতেই তিনি গেয়ে ওঠেন, ‘তোমার হল শুরু, আমার হল সারা’… হাতের গিটারে আলতো কর্ড, শ্রীকান্তও সুরেলা আঙুল ছুঁইয়েছেন হারমোনিয়ামে। হাতে গিটার নিয়েই সুমন হঠাৎ বলে উঠলেন, আজ তাঁর মনে হয়, খালি গলায়, ওই গিটারটুকু ছাড়াও কেন নিরাভরণ কণ্ঠে গাইলেন না ওই গানগুলি!

কবীর সুমনের মতো দেশি-বিদেশি সংগীতের একজন সন্ধানী ও শিক্ষিত সমঝদার যখন রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার প্রসঙ্গে এই কথা বলেন, থমকে যেতে হয়। আর তখনই মনে আসে কবি নবীনচন্দ্রের একটি স্মৃতিলেখা: ‘আমরা তখন তাঁহাকে একটি গান গাহিতে অনুরোধ করিয়া, হারমোনি ফ্লুট তাঁহার সম্মুখে দিলাম। তিনি বলিলেন, কোনো যন্ত্রের সঙ্গে গান গাহিতে ভালবাসেন না। কারণ যন্ত্রে গলার মাধুর্য ঢাকিয়া ফেলে। তিনি একটি মাত্র পর্দা কিছুক্ষণ টিপিয়া, সুরটি মাত্র স্থির করিয়া, যন্ত্র ছাড়িলেন। তাহার পর পকেট হইতে একখানি কাগজ বাহির করিয়া… গাহিতে লাগিলেন। আমি এমন সুন্দর গান অল্পই শুনিয়াছি।’ (আমার জীবন, তৃতীয় খণ্ড)।

zoom
নবীনচন্দ্র সেন

নবীনচন্দ্র জানাচ্ছেন, সেটি ১৮৯৪ সাল, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৩৩। কিন্তু সেই বয়সের আগেই রবীন্দ্রনাথ তো আনন্দে গান গেয়েছেন তাঁর জ্যোতিদাদার হাতের বেহালা বা অর্গানের সাহচর্যে, নতুন বউঠান, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আর রবির একান্ত সন্ধ্যায় জ্যোতিদাদা বেহালাতে লাগাচ্ছেন সুর, আর রবি গলা খুলে গাইছেন ‘ভরা বাদর মাহ ভাদর…’– এ ছবি তো এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতিতে। গান গেয়েছেন অবনীন্দ্রনাথের এসরাজের সঙ্গে, শেষ জীবনে শৈলজারঞ্জনকে নির্দেশ দিচ্ছেন অনুষ্ঠানে তাঁর গানের সঙ্গে এসরাজ বাজাতে। কিন্তু এ-ও তো ভোলার নয় যে, যখন গান রেকর্ড করছেন রবীন্দ্রনাথ তখন বিপুল সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গাইছেন নিরাবরণ এবং নিরাভরণ কণ্ঠে, যন্ত্রের কোনও ফ্রেমে বাঁধিয়ে তাঁর গানের প্রকৃতিকে প্রতিকৃতি করে তুলছেন না। নন্দনপাঠের দিক থেকে প্রকৃতি আর প্রতিকৃতির সূক্ষ্ম অথচ গভীর বিরোধ অর্থবহ হয়ে উঠছে গাইয়ে হিসেবে তাঁর অবস্থানে। রবিবাবুর গান যখন ধীরে ধীরে রবীন্দ্রসংগীত হয়ে উঠছে, শান্তিনিকেতন এবং কলকাতার ব্রাহ্মসমাজের শিল্পীরা যখন গান গাইছেন সভায় বা রেকর্ডে, তাঁদের গানের সঙ্গে বাজছে এসরাজ, অর্গান বা পিয়ানো, তা মূলত বাজছে গানের সুরের গড়নটিকে অনুসরণ করেই। গানের মাঝে গায়কের কণ্ঠের বিশ্রামের জন্য মূলত বাজছে গানের আস্থায়ীর সুরটি। অনেকের কাছে সেইটিই রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার ‘রাবীন্দ্রিক’ রীতি। কিন্তু হারমনাইজেশন? রবীন্দ্রনাথ যাকে বলছেন ‘যুক্তস্বর’– সেখানেও তো নানা পরীক্ষার পথিকৃৎ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মিউজিক ল্যাবরেটরি। সরলা দেবী পিয়ানোতে তাঁর রবিমামার গান হারমোনাইজ করে গাইছেন, গানের যে সুরের গড়ন তার সমান্তরালে পিয়ানোতে চলছে আরেকটি গড়ন, বিলিতি গানের মতো স্বরসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ তারিফ করে সরলাকে খাতা বাঁধিয়ে দিচ্ছেন সেই কম্পোজিশন লিখে রাখার জন্য– এসব তো জানতে পারছি আমরা, সরলা দেবীর স্মৃতিকথা থেকেই। তারপর সরলা চলে যাচ্ছেন দূরে, রাজনীতির পথভেদে রবিমামার সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। তাঁর কণ্ঠের গানও মিলিয়ে যাচ্ছে জীবনের ঝরাপাতার মতোই। রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার ইতিহাস থেকে খসে পড়ছে সুর-সঙ্গতের এক ‘রাবীন্দ্রিক’ অধ্যায়।

zoom
জীবনস্মৃতি-র ছবি। শিল্পী: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ নিরাভরণ কণ্ঠে গান রেকর্ড করছেন ১৯৩১ সালে, তার ঠিক ছ’বছর বছর পর। ১৯৩৭-এ ‘মুক্তি’ ছবির জন্য পঙ্কজ মল্লিকের সংগীত আয়োজনে রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন কানন দেবী। সেই গানে কী আসছে? আসছে নানা যন্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি ছোট ছোট ফিলার। সেটি রচনা করছেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। এরও ছ’বছর আগে, রবীন্দ্রনাথ খালি গলায় গান রেকর্ড করার ঠিক এক বছর পরে, ১৯৩২ সালে পঙ্কজ মল্লিক একটি সাহসী কাজ করলেন। ১৯৩২ সালেই প্রথম রেডিওতে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সম্প্রচারিত হল, আর পঙ্কজ মল্লিক ‘অহং রুদ্রে’ স্তোত্রটির সঙ্গে একাধিক পুরুষকণ্ঠকে ব্যবহার করলেন খাঁটি বিলিতি কায়দায় হারমনাইজ করার জন্য। এই হারমনাইজেশন ধরা রয়েছে ১৯৬৬ সালের ডিস্কেও, এবং অদ্যাবধি দেবী দুর্গার সংস্কৃত ভাষায় উচ্চারিত আত্মপরিচয়, ওই রকম একটি ধ্রুপদি প্রযোজনায়, বাঙালি বিলিতি হারমনির সঙ্গে শুনে আসছে এবং শিহরিত হয়েছে। তাতে তাঁদের প্রণতি বিপন্ন হয়নি।

zoom

রবীন্দ্রপ্রয়াণের পরের বছর বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড তৈরি হওয়ার আগেই, শান্তিনিকেতনের কর্তাব্যক্তিরা পঙ্কজ মল্লিকের রেকর্ড করা ‘তুমি মোর পাও নাই পাও নাই পরিচয়’ গানটি আটকে দিয়েছিলেন অর্কেস্ত্রা বেশি হওয়ার অপরাধে। কিন্তু সেই বছরই রাইচাঁদ বড়ালের পরিকল্পনায় বিপুল অর্কেস্ট্রেশন সহযোগে মুক্তি পেল ‘পরাজয়’ ছবিতে কানন দেবীর গাওয়া ‘প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’ গানটি, রবীন্দ্র সংগীতের ইতিহাসে সেই অর্থে এটিই প্রথম বিলিতি অর্থে মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট। যন্ত্র-আয়োজন এবং অনায়োজন– এই দুই নিয়েই কিছু প্রশ্ন রাখলাম শ্রীকান্ত আচার্যর কাছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘শ্রীকান্তদা, তুমি তো ‘দক্ষিণী’র মতো রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠানে গান শিখেছ, তারপর ৪০ বছর ধরে বেসিক বাংলা গানের পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীত গাইছ, হারমোনিয়াম তবলা এসরাজের ঘরানা থেকে মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্টের যুগ, অ্যানালগ থেকে ডিজিট্যাল রেকর্ডিংয়ের জমানা– এর মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার যন্ত্রসঙ্গতের যে বিবর্তন– তাকে তুমি কীভাবে দেখতে চাও?’’

zoom

‘‘শৈবাল, একটা কথা মনে রেখো, রবীন্দ্রনাথের গান একটি সজীব সংগীতধারা। সময়ের চলার থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা বা রাখা কোনওটাই যৌক্তিক বলে আমি মনে করি না। আমি বিশ্বাস করি যন্ত্রের ভালো পরিকল্পনা একটা গানকে একটা নতুন ডাইমেনশন দিতে পারে, গানকে উন্মোচিত করতে পারে। আমি যখন সলিলদার তৈরি গান শুনি, তখন কিন্তু শুধু আমি গানটা শুনি না, গানবাজনাটা শুনি, টোটাল রূপটা শুনি। আমার মনে হয় দু’টি মিলে পুরো গানটা আমার কাছে সম্পূর্ণ হয়ে আসছে। রবীন্দ্রসংগীতে দীর্ঘদিন একটা রীতি থেকেছে গানের সঙ্গে এসরাজ বা কোনও সুরযন্ত্রে গানের প্রথম লাইনটা বাজবে। আমার মনে হয়, বাংলা গানে প্রথম সার্থক অর্কেস্ট্রেশন তৈরি করেন সলিল চৌধুরী। তারপর শ্রোতার কান তৈরি হয়। রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রেও একটা পরিকল্পিত আয়োজন শুরু হয়। তুমি দেবব্রত বিশ্বাসের কথা ভাবো। একদিকে রক্ষণশীল ব্রাহ্মসমাজে ওঁর গান শেখা এবং গাওয়া, আর একদিকে নানা যন্ত্র নিয়ে রেকর্ডে তৈরি করছেন নানা সুরায়োজন, আবার গণনাট্যতে গাইছেন শুধু একটা হারমনিয়াম নিয়ে…’’

zoom
সলিল চৌধুরী

‘কিন্তু শ্রীকান্তদা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়? যখন নিজের বেসিক গানের জন্য তৈরি করছেন অপূর্ব প্রিলিউড ইন্টারলিউড, তখন ওঁর রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ডে গানের বিরামে বাজছে কেবলমাত্র গানের প্রথম লাইনের সুর? তোমার কি কখনও মনে হয়, হেমন্তবাবুর মতো সংগীতবিদ হয়তো ভাবতেন, রবীন্দ্রসংগীত সুরের দিক থেকে নিজেই একটা সম্পূর্ণ কম্পোজিশন, তার মাঝে অন্য কোনও সুরের গড়ন পুরে দেওয়া একধরনের অনুপ্রবেশ?’

‘শৈবাল, একটা জিনিস দ্যাখো…’ বলতে থাকেন আদ্যন্ত মিউজিক্যাল এক মানুষ।
কথা গড়িয়ে যায় অনেক দূরে। সেসব পরের পর্বে। আমার কানে জুড়ে যায় শ্রীকান্তদার গভীর উচ্চারণে বলা ‘সময়’ শব্দটি। কণ্ঠ কি একা? ‘মুক্তধারা’ নাটকে ধনঞ্জয় বৈরাগীর গানকে অবরুদ্ধ করার আদেশনামায় রাজা বলেছিলেন, ওঁর কণ্ঠীসুদ্ধ কণ্ঠটা চেপে ধরা চাই… ‘যাঁরা বিশ্বাস নিয়ে কণ্ঠে রাখেন কণ্ঠী, মৃত্যুতে যখন আগুন শরীর স্পর্শ করে, আর কিছু নয়, ওই কণ্ঠীই তার সঙ্গে থাকে। সে-ও পোড়ে।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন ঠাকুরঘরানা-র অন্যান্য পর্ব

………………………

A Cappella Rabindra Sangeet Singing Style Rabindra Sangeet Tradition Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Tagore Music

Share this article on