social media addiction death threat for next generation। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সোশাল মিডিয়া বর্জনই কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ‘সোশাল’ হওয়ার উপায়?

কোভিডের সময়ে এবং তার পরবর্তীতে মোবাইল ফোন এবং সেই সংলগ্ন সরঞ্জামের ব্যবহার বেড়েছে। লকডাউনের সময়ে  মোবাইল এবং তার সমতুল্য গেজেট-ই ছিল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার  মাধ্যম। বহু কিশোর-কিশোরী ওই সময় থেকে মোবাইল ফোনে সড়গড় হয়ে তাদের পড়াশুনা চালানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু যে বস্তুকে একদিন তারা ব্যবহার করে ভেবেছে দুনিয়া হাতের মুঠোয় চলে এল, সেই মোবাইল ফোনের নেশা যে প্রায় সমস্ত কিশোর-কিশোরীকে তাদের নিজস্ব সুন্দর সময়ে একলা করে দিয়েছে, তা যে কেউ স্বীকার করবেন।

প্রচ্ছদ অলংকরণ: দীপঙ্কর ভৌমিক

শেষ আপডেট: মার্চ ১৪, ২০২৬, ১৭:১৪   
Facebook WhatsApp Messenger

সাম্প্রতিক একটা খবর নিশ্চিত অনেকের চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। গাজিয়াবাদে তিন বোন একটি বাড়ির ৯ তলা থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মারা গিয়েছে। খবরে প্রকাশ ওই তিন বোনকে তাঁদের অভিভাবকরা মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্তি নিয়ে বকাঝকা করেছিলেন। আরও জানা গিয়েছে, ওই কিশোরীরা অনলাইনে বিভিন্ন গেম এবং অন্যান্য বেশ কিছু মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকত, তার ফলেই তাদের সঙ্গে তাদের অভিভাবকদের কথা কাটাকাটি হয় এবং তাদের থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, আজকের সময়ে মোবাইল ফোনে নানা অনলাইন গেমে আমাদের বাড়ির কিশোর-কিশোরীরা কতটা মানসিক এবং শারীরিকভাবে আসক্ত এবং তাদের কাছ থেকে ওই মোবাইল ফোন কেড়ে নিলে, তারা কতটা অসহায় বোধ করে এবং নিজের জীবন শেষ করে দিতেও দ্বিধা করে না।

zoom
মোবাইল আসক্তি ঘনিয়ে তুলছে বিপদ

কয়েকমাস আগে অস্ট্রেলিয়া আইন বানিয়েছে যে, ১৬ বছরের কম কিশোর-কিশোরীরা সোশাল মিডিয়ায় থাকতে পারবে না। সম্ভবত, অস্ট্রেলিয়া প্রথম দেশ হিসেবে এই আইন বানিয়েছে, কিন্তু সারা পৃথিবীর সমস্ত দেশ যে এই বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। শোনা যাচ্ছে, বহু দেশ অস্ট্রেলিয়ার মতো আইন কার্যকর করার কথা ভাবছে। আমাদের দেশেরও অবিলম্বে এই বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করা দরকার। এর মধ্যেই, অঙ্গরাজ্য হিসেবে কর্নাটক আইন আনার কথা চিন্তাভাবনা করছে বলে শোনা যাচ্ছে। একটা পর্যায়ে সরকারের তরফ থেকে অনলাইন পড়াশোনার জন্য যে বিভিন্ন সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে কীভাবে সামাজিক মাধ্যমের জন্য ব্যবহার না করতে দেওয়া যায়, সেই সংক্রান্ত ভাবনাচিন্তাও চলছে।

নতুন করে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কীভাবে বিভিন্ন সোশাল মিডিয়া কোম্পানির তৈরি করা অ্যালগরিদমগুলি শিশুদের নিরাপত্তার চেয়ে আসক্তিমূলক সম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দেয়। তাদের উদ্বেগ, নিজের শরীর বা সামাজিক জীবনের প্রতি অসন্তুষ্টি এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি করে। এই আসক্তি যে বাবা-মা কিংবা অন্য যে কোনও অভিভাবকদের সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন দূরত্ব বাড়াচ্ছে, তা আশেপাশে তাকালে বেশ বোঝা যায়। মোবাইল ফোন এবং সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার শুধু তাদের পড়াশুনা, খেলাধূলা নয়, তাদের শারীরিকভাবেও অসুস্থ করে তুলছে। চিকিৎসকরা দেখেছেন এবং বিভিন্ন গবেষণা বলছে, একজন মোবাইল আসক্ত কিশোর কিংবা কিশোরীর খিদে কমে যাওয়া এবং ঘুমের সমস্যা হওয়া একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

zoom
মোবাইল আসক্তি বাড়িয়ে তুলছে মানসিক সমস্যা

অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন এই সমস্যা শুধু কিশোর-কিশোরীদের বা শুধু বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েদের। তার কারণ কী? আসলে এই বয়সি ছেলেমেয়েদের মস্তিষ্কে এই সময়ে যে পরিবর্তন হয়, যে দ্রুততার সঙ্গে তাদের বদলগুলো চলতে থাকে, তাতে এই বয়সটাই অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গায় নিয়ে যায়। আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের সামাজিক পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল, এই সত্যের সঙ্গে মিলে যায়, বয়ঃসন্ধিকাল হল সেই পর্যায় যখন একজন ব্যক্তি বিকাশের দিক থেকে নিজেকে সমবয়সিদের সঙ্গে তুলনা করার এবং মডেল হিসেবে করার জন্য প্রস্তুত থাকে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি তরুণদের মস্তিষ্কের পুরস্কারের পথগুলিকে উত্তেজিত করে তোলে এবং এমন জিনিসের প্রতি আসক্তির সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে এবং সংবেদনশীল করে তোলে।

দীর্ঘদিন ধরে আমরা এই বিষয়টা জানি। এই কারণেই তামাক কিংবা মদ্যপানের নেশার জন্য একটা নির্দিষ্ট বয়স ধার্য করা আছে বিভিন্ন দেশে। মদ এবং তামাকের কারণে কোশের কিংবা রক্তের বা মস্তিষ্কের যে যে অংশ উত্তেজিত হয়, দেখা গিয়েছে সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম, শরীরের সেই অংশগুলোতেই উত্তেজনা পৌঁছে দেয়। সামাজিক মাধ্যম তৈরি করা কর্পোরেট সংস্থাগুলো এই বিষয়টা জানে এবং জেনে বুঝেই তাঁরা ওইভাবেই অ্যালগরিদম তৈরি করে, যাতে কিশোর-কিশোরীদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলা যায়। তাঁদের আরও একটা যুক্তি আছে, এই বয়সি ছেলেমেয়েদের থেকে যদি মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে তাদের জানার যে অধিকার, সেই অধিকার থেকে নাকি তাদের বঞ্চিত করা হয়। তাদের দাবি, অভিভাবকদের নাকি দায়িত্ব, সন্তানদের কীভাবে তাঁরা সুরক্ষিত রাখবে, সেই দিকে নজর দেওয়া।

এই একই কথা তামাক জাতীয় পণ্যের প্রস্তুতকারক সংস্থারা দীর্ঘদিন বলে এসেছে এবং চেষ্টা করেছে যে, শারীরিক ক্ষতির বিপদের বার্তা ছাড়াই যাতে তামাকজাত পণ্য বিক্রি করা যায়। এই সংস্থাগুলো যেমন তামাকজাত পণ্যের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন, তেমনই বেশ কিছু খাবার প্রস্তুতকারক সংস্থারাও জানে কোন বিজ্ঞাপনে বাচ্চারা আকৃষ্ট হয় এবং সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন সংস্থাও জানে কীভাবে কমবয়সি ছেলেমেয়েদের কাছে টানতে হয় বা প্রলুব্ধ করতে হয়। আমেরিকার কোর্টে একটি মামলা চলাকালীন ‘মেটা’ স্বীকার করেছিল, যে তারা খুব জেনে বুঝে কমবয়সি মেয়েদের যৌন হিংসা এবং মানুষ পাচার সংক্রান্ত একটি সামাজিক মাধ্যমে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চালিয়েছিল।

zoom
প্রতীকীচিত্র

সমস্ত সামাজিক মাধ্যম প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলো বলে থাকে যে, তাঁরা শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট বয়সসীমা তো ইতিমধ্যেই বেঁধে রেখেছে। ১৩ বছরের কমবয়সি শিশুদের তো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয় না তাঁদের পক্ষ থেকে, কিন্তু তার বয়সের প্রমাণ হিসেবে কি তাঁরা কোনও নথি চায়? যদি সেই পরীক্ষা না করেই সবাইকে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ঢালাও অনুমতি দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আর কী লাভ হয়? তথ্য বলছে, শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ৮ থেকে ১২ বছর বয়সি শিশুদের প্রায় ৪০ শতাংশই ইন্সটাগ্রাম এবং স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহার করে থাকে। অস্ট্রেলিয়া যে নতুন আইন এনেছে, তাতে বলা হয়েছে, এই সংস্থাগুলোকেই বয়সের প্রমাণ দেখে নিতে হবে। পাশাপাশি তাঁরা বলেছে, এই আইন লঙ্ঘন করা হলে অভিভাবকরা অভিযুক্ত সংস্থার বিরুদ্ধে মামলাও করতে পারবে।

অস্ট্রেলিয়া এই আইন আনার পরে অনেক দেশই ভাবনাচিন্তা করছে, এই জাতীয় আইন আনা যায় নাকি। গাজিয়াবাদের এই ঘটনার পরে ভারতেরও এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবতে হবে। যদিও ASER ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান বলছে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, কিন্তু পাশাপাশি তাঁরা এও বলছে গ্রামীণ অঞ্চলে বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েদের অর্থাৎ, ১৬ বছরের নিচের এক তৃতীয়াংশের মাত্র নিজস্ব স্মার্টফোন আছে। কিন্তু এই সংখ্যাও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়ছে। সেই জন্য এটাই আদর্শ সময়, ভারতের এই সংক্রান্ত আইন তৈরি করার, যাতে ভবিষ্যতের বাচ্চাদের অন্তত রক্ষা করা যায়। মানসিক সমস্যা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা এই বিষয়টা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন, এবং কেন এই বয়সি ছেলেমেয়েরা হিংসাত্মক হয়ে উঠছে, তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁরাও সামাজিক মাধ্যমের কুপ্রভাবের কথাই বলছেন এবং সাবধান করছেন, যাতে বাচ্চাদের মোবাইল ফোন এবং সামাজিক মাধ্যম থেকে তাঁদের দূরে রাখা যায়।

zoom
এমন দৃশ্যই আশঙ্কা আর আতঙ্কের

কোভিডের সময়ে এবং তার পরবর্তীতে মোবাইল ফোন এবং সেই সংলগ্ন সরঞ্জামের ব্যবহার বেড়েছে। লকডাউনের সময়ে  মোবাইল এবং তার সমতুল্য গেজেট-ই ছিল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার  মাধ্যম। বহু কিশোর-কিশোরী ওই সময় থেকে মোবাইল ফোনে সড়গড় হয়ে তাদের পড়াশুনা চালানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু যে বস্তুকে একদিন তারা ব্যবহার করে ভেবেছে দুনিয়া হাতের মুঠোয় চলে এল, সেই মোবাইল ফোনের নেশা যে প্রায় সমস্ত কিশোর-কিশোরীকে তাদের নিজস্ব সুন্দর সময়ে একলা করে দিয়েছে, তা যে কেউ স্বীকার করবেন।

একটা সময়ে অঞ্জন দত্ত গান লিখেছিলেন, ‘জানলা দিয়ে আকাশটাকে দেখো, টিভি দেখো না’। আজকে নিশ্চিত, অন্য কোনও গায়ক কিংবা কবি লিখবেন, মোবাইলে আটকে থেকো না, বন্ধু বানাও নতুন, তাদের সঙ্গে কথা বলো, তাদের ছুঁয়ে দেখো বা ঝগড়া করো, মারপিট করো, খেলাধূলা করো, কিন্তু সেটাও করো। মোবাইল ফোন দেখার চেয়ে, সেটা অনেক ভালো।

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন সুমন সেনগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

…………………….

Mental Health mobile addiction negative effects Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar social media Social Media Addiction

Share this article on