cancer-costs-in-india-saving-lives-without-financial-ruin | Robbar
Robbar
  • ৬ কার্তিক ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ২৪ অক্টোবর ২০২৬

প্রাণের লড়াই, পুঁজির চাপ

ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে একদিকে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতি, অন্যদিকে সেই চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের কঠিন আর্থিক সংগ্রাম। যে চিকিৎসা একজন বিত্তবান মানুষের কাছে সহজলভ্য, সেই একই চিকিৎসা একজন নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। অথচ জীবন বাঁচানোর অধিকার ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের সমান।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ১৪:০৮   
Facebook WhatsApp Messenger

চিকিৎসা-বিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতির কল্যাণে ক্যানসারের মতো জটিল রোগকে টেক্কা দিয়ে অসংখ্য মানুষ আজ জীবনের মূল স্রোতে শামিল হয়েছেন। কিন্তু প্রিয়জনকে সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা আর চিকিৎসার বিপুল খরচ মেটানোর চিন্তায় বহু পরিবার আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার আশাকে আঁকড়ে ধরেও তাঁদের প্রতিনিয়ত ভাবতে হচ্ছে, চিকিৎসার টাকা আসবে কোথা থেকে। অনেক সময় অসুখের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে চিকিৎসার বিপুল খরচ মেটানোর উদ্বেগ। ‘ক্যানসার’ নামটি শুনলে আজও সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হয় এক অজানা আতঙ্ক। অনেকেই ক্যানসারকে ‘মারণরোগ’ বলে উল্লেখ করেন, যেন এই রোগের একমাত্র পরিণতি মৃত্যু। এমন ভুল ধারণা রোগীর মনে অকারণ ভয় সৃষ্টি করে এবং রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। ক্যানসার চিকিৎসার গোড়ার কথাই হল ‘মনোবল’ এবং বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। অথচ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বহু ক্যানসার এখন নিরাময়যোগ্য। তাই ক্যানসার ধরা পড়লেই আশাহত হওয়ার কারণ নেই। প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা, সাহস এবং সুস্থ হয়ে ওঠার ভরসা।

zoom
সূত্র: পিন্টারেস্ট

একসময় ক্যানসারের চিকিৎসা বলতে মূলত অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি আর রেডিয়োথেরাপিকেই বোঝানো হত। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, হরমোন থেরাপি এবং আরও অনেক কিছু। আধুনিক চিকিৎসার এই অগ্রগতি রোগীদের মনে জাগিয়েছে নতুন আশা। ক্যানসারের ধরন, রোগ কতটা ছড়িয়েছে, কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন এবং কোথায় চিকিৎসা করা হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে খরচের পরিমাণ। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় খরচ হতে পারে লাগামছাড়া, বিশেষ করে যখন চিকিৎসকের নির্দেশে কোনও ওষুধ দিনের পর দিন ব্যবহার করে যেতে হয়।

চিকিৎসার খরচ মেটাতে রোগীর পরিবার প্রথমে সঞ্চয় ভাঙেন। তারপর শুরু হয় ধারদেনা। কারও জমি বিক্রি হয়, হাত পড়ে সোনার গয়নাতেও। সন্তানের পড়াশোনার জন্য জমানো অর্থ কিংবা অবসর জীবনের সম্বল নিঃশেষ হয়ে যায়। চিকিৎসা চলাকালীন রোগী কাজ করতে না পারলে পরিবারের নিয়মিত আয়ও তলানিতে ঠেকে। এই পরিস্থিতিকে স্বাস্থ্য অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘ফিনানশিয়াল টক্সিসিটি’ বা চিকিৎসাজনিত আর্থিক বিপর্যয়। এর ফলে রোগীর দুশ্চিন্তা ও হতাশা আরও বেড়ে যায়। পরিবারের উপর বোঝা হয়ে পড়ার আশঙ্কা তাঁকে মানসিকভাবে আরও দুর্বল করে তোলে।

zoom
সূত্র: পিন্টারেস্ট

তবে চিকিৎসার খরচ কিছুটা কমানোর পথও রয়েছে। আজকাল সরকারি হাসপাতাল আর ক্যানসার-চিকিৎসার বিশেষ কেন্দ্রগুলিতে তুলনামূলক কম খরচে উন্নত চিকিৎসা পাওয়া যায়। সরকারি ‘স্বাস্থ্যবিমা’, ‘স্বাস্থ্যসাথী’র মতো প্রকল্প এবং বিভিন্ন সরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আর্থিক সহায়তাও অনেক পরিবারের বুকে সাহস যোগায়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সমান কার্যকার অথচ কম দামি ওষুধ ব্যবহার করা সম্ভব কি না, সেটিও জেনে নেওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসা শুরুর আগেই সম্ভাব্য খরচ, বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি এবং আর্থিক সহায়তার সুযোগগুলি সম্পর্কে হাসপাতালের সঙ্গে আলোচনা করলে অনেক সময় অপ্রত্যাশিত ব্যয় এড়ানো যায়। তবে শুধু খরচ কমানোর জন্য চিকিৎসার মানের সঙ্গে আপস করা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা কখনও উচিত নয়।

ভারতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ক্যানসারের চিকিৎসার সুযোগ ও খরচের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতাল, কলকাতার চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন সরকারি মেডিক্যাল কলেজে তুলনামূলকভাবে অনেক কম খরচে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষের কাছে এই প্রতিষ্ঠানগুলি তাই বড় ভরসার জায়গা। কিন্তু রোগীর বিপুল চাপ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা, চিকিৎসা শুরু করতে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সব জায়গায় সমান পরিষেবা না পাওয়ার মতো সমস্যাও রয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া গেলেও তার বিপুল ব্যয় সাধারণ পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সব সরকারি হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা যেমন এক নয়, তেমনই সব বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার খরচও সমান নয়। আসল সমস্যা হল, আর্থিক সামর্থ অনুযায়ী চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগে যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, তা দূর করা। কারণ ক্যানসারের মতো গুরুতর রোগের চিকিৎসায় অর্থের অভাব যেন কারও সুস্থ হয়ে ওঠার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। সরকারি হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো, ওষুধের দাম সাধারণের নাগালে রাখা এবং স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা আরও সহজলভ্য করা জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন অর্থের অভাবে কাউকে সুস্থ হয়ে ওঠার আশা হারাতে হবে না।

zoom
সূত্র: পিন্টারেস্ট

বড় শহরে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হলেও প্রত্যন্ত জেলার মানুষকে চিকিৎসার জন্য কলকাতা, মুম্বই, চেন্নাই কিংবা অন্য শহরে যেতে হয়। যাতায়াত, থাকা, খাওয়া এবং রোগীর সঙ্গে আসা পরিবারের সদস্যের কাজের ক্ষতির ব্যয় মূল চিকিৎসার খরচের সঙ্গে যুক্ত হয়। ক্যানসার চিকিৎসার আর্থিক বোঝা কমাতে সরকার বিভিন্ন স্বাস্থ্যসুরক্ষা প্রকল্প চালু করেছে। ‘আয়ুষ্মান ভারত’, ‘প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা’য় যোগ্য পরিবারগুলি বছরে সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস সুবিধা পেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পেও পরিবারপিছু বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে।

২০২৬ সালের জুন মাসে পশ্চিমবঙ্গে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমঝোতাও হয়েছে। তবে প্রকল্পের আওতায় থাকার অর্থ এই নয় যে, ক্যানসারের সব ধরনের চিকিৎসা বা সমস্ত ওষুধের খরচ একেবারেই মিটে যাবে। বিশেষত যে রোগীর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, ব্যয়বহুল ওষুধ বা বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন, তাঁর ক্ষেত্রে পাঁচ লক্ষ টাকার সীমা অনেক সময় পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। ফলে স্বাস্থ্যবিমার পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসার সরাসরি প্রাপ্যতা বাড়ানো জরুরি।

ক্যানসার রোগীদের সুবিধার্থে ২০২৫-’২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে জেলা হাসপাতালগুলিতে ডে-কেয়ার ক্যানসার সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ২০০টি কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। এই উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বহু রোগী নিজের জেলার কাছাকাছি কেন্দ্রেই চিকিৎসার সুবিধা পেতে পারেন। ২০২৬-২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত দামি ক্যানসারের ওষুধের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলি বাস্তবায়িত হলেও, ওষুধের দাম সমপরিমাণে কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উৎপাদন, বিপণন, সরবরাহ এবং হাসপাতালভিত্তিক মূল্যনির্ধারণও চিকিৎসার মোট ব্যয়কে প্রভাবিত করে।

রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ক্যানসারের চিকিৎসার ব্যয় অনেকটাই কমানোর সম্ভব। অনেক ক্যানসারে প্রথমদিকে বিশেষ উপসর্গ থাকে না। ফলে রোগী চিকিৎসকের কাছে আসতে দেরি করেন। রোগ যখন অনেকটা ছড়িয়ে পড়ে, তখন চিকিৎসা জটিল হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়ও বেড়ে যায়। মুখ, জরায়ু ও স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনমতো পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি। এইচপিভি টিকা জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। তামাক বর্জন করলেও অনেক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমে।

zoom

ক্যানসার চিকিৎসার উন্নত প্রযুক্তি দেশের কয়েকটি বড় শহরে সীমাবদ্ধ থাকলে জনস্বাস্থ্যের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। জেলা ও মহকুমা স্তরে রোগনির্ণয়ের পরিকাঠামো বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, প্যাথোলজিস্ট, অনকোলজি নার্স এবং কাউন্সেলরের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। একইসঙ্গে অত্যাবশ্যক ক্যানসারের ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ, সুলভ জেনেরিক ও বায়োসিমিলার ওষুধের প্রাপ্যতা, সরকারি স্বাস্থ্যবিমার বাস্তব কার্যকারিতা এবং রোগীদের জন্য স্বচ্ছ চিকিৎসাব্যয়ের হিসাব নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু রোগ নিরাময় নয়, ব্যথা উপশম, প্যালিয়েটিভ কেয়ার, পুনর্বাসন এবং মানসিক সহায়তাকেও ক্যানসার চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

শেষ কথা
ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে একদিকে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতি, অন্যদিকে সেই চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের কঠিন আর্থিক সংগ্রাম। যে চিকিৎসা একজন বিত্তবান মানুষের কাছে সহজলভ্য, সেই একই চিকিৎসা একজন নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। অথচ জীবন বাঁচানোর অধিকার ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের সমান। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু নতুন ওষুধ আবিষ্কার কিংবা অত্যাধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে হতে পারে না। তার সার্থকতা নির্ভর করে সেই চিকিৎসা সমাজের কতজন মানুষের কাছে পৌঁছাল, তার উপর। ক্যানসার রোগীকে শুধু মৃত্যুভয় থেকে নয়, চিকিৎসার খরচে সর্বস্বান্ত হওয়ার ভয় থেকেও মুক্তি দিতে হবে। আধুনিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাছে এটাই আজ অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

তথ্যসূত্র:
১। ২০২৫ সালের জেএএমএ নেটওয়ার্ক ওপেন-এর ক্যানসার রেজিস্ট্রি গবেষণা (জেএএমএ নেটওয়ার্ক ওপেন: আমেরিকার একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসাবিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা পত্রিকা)
২। ২০২৩ সালের ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথের চিকিৎসাব্যয় সমীক্ষা ( ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথ: জনস্বাস্থ্যবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গবেষণা পত্রিকা।)
৩। ফ্রন্টিয়ার্স: ভারত সরকারের ২০২৫ ও ২০২৬ সালের বাজেট সংক্রান্ত প্রকাশনা
প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো এবং সরকারি স্বাস্থ্যবিমা-সংক্রান্ত তথ্যাদি

Cancer Cancr awareness Health Health system Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on