Jogindranath Sarkar: Pioneer of Bengali Children’s Books। Robbar
Robbar
  • ৯ কার্তিক ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬

ছড়ার সরকার

স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন যোগীন্দ্রনাথ, প্রাধান্য দিয়েছিলেন শিশুতোষ সাহিত্যকে। তাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সহজ পাঠ’ কালজয়ী পাঠ্যপুস্তক হলেও শিশুদের কাছে যোগীন্দ্রনাথের ‘হাসিখুসি’-র ছড়াগুলো যেন আরও সহজবোধ্য হয়ে ধরা দিয়েছে। আজও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি ভালোলাগা তৈরি করতে গেলে যোগীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে হয়, এ বিশ্বাস রাখেন বেশিরভাগ সাহিত্যমনস্ক মানুষ।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ১৭:৪৪   
Facebook WhatsApp Messenger

১৮৬১, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম। সেই বছরেই সাড়ে চার মাস পরে জন্ম নীলরতন সরকারের। পরবর্তীতে দু’জনের পরম বন্ধুত্ব নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। ১৯১৬ সাল থেকে তিনি ছিলেন কবির চিকিৎসক ও পরামর্শদাতা। ডায়মন্ড হারবারের নেত্রা গ্রামে ১৮৬১ সালের ১ অক্টোবর জন্মেছিলেন নীলরতন। বাবা নন্দলাল সরকার, মা থাকোমণি দেবী। তখন নীলরতনের বয়স সাত। ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে ভিটেমাটি ধ্বংস হল। পাঁচ ছেলে, তিন মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে নন্দলাল উঠলেন শ্বশুরবাড়ি। জয়নগরে। এই জয়নগরেই ১৮৬৬ সালে ২৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার। নীলরতন সরকারের নামে একটা হাসপাতাল থাকার সুবাদে, আমরা একটু হলেও তাঁর সম্পর্কে জানি, কিন্তু কতজন আর যোগীন্দ্রনাথকে মনে রাখবেন আগামিদিনে?

zoom

১৮৮৩ থেকে নন্দলাল সপরিবার জয়নগর ত্যাগ করে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। যোগীন্দ্রনাথ বসু দেওঘর নিয়ে যান যোগীন্দ্রনাথ সরকারকে। যোগীন্দ্রনাথ বসু ছিলেন দেওঘর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সেখানে যোগীন্দ্রনাথ সরকারকে স্কুলে ভর্তি করে দেন তিনি। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগীন্দ্রনাথ ফিরে আসেন কলকাতায়। আরম্ভ করেন সিটি কলেজে এফএ পড়া। কিন্তু আর্থিক অনটনের জন্য পড়া অসম্পূর্ণ রেখেই সিটি কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। বেতন ১৫ টাকা।

ওই সময়ে ছোটদের বইয়ের সত্যি অভাব ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সাধনা’ পত্রিকার ১৩০১ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন সংখ্যায় লিখলেন, ‘… ছোট ছেলেদের জন্যে যে সকল বই আছে তাহা স্কুলে পড়িবার বই; তাহাতে স্নেহের বা সৌন্দর্যের লেশমাত্র নাই, তাহাতে যে পরিমাণ উৎপীড়ন হয় সে পরিমাণ উপকার হয় না।’ বিষয়টা ভাবিয়েছিল যোগীন্দ্রনাথকেও। ১৮৯১ সালে প্রকাশিত হল তাঁর সংকলিত ‘হাসি ও খেলা’। বাংলায় প্রকাশিত প্রথম সচিত্র শিশুপাঠ্য বই। আজ যখন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আক্রান্ত, বেশিরভাগ বাবা-মা মনে করেন, ‘অ-এ অজগর আসছে তেড়ে/ আ-এ আমটি আমি খাবো পেড়ে/ ই-তে ইঁদুরছানা ভয়ে মরে/ ঈ-তে ঈগল পাখি পাছে ধরে’ না পড়ে, ‘A for Apple, B for Ball’ পড়াটা লাভজনক, তখন যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ভাবনাচিন্তাকে আরও একবার ফিরে দেখা জরুরি।

zoom

সিটি স্কুলে পড়ানোর পাশাপাশি ‘মুকুল’ পত্রিকার কার্যাধ্যক্ষর দায়িত্বও সামলেছেন। সে-সময় একমাত্র উড ব্লক প্রস্তুতকারক ছিলেন প্রিয়গোপাল দাস। ‘মুকুল’-এর জন্য প্রিয়গোপালের কাছে প্রায়ই ছুটতে হত যোগীন্দ্রনাথকে। বেশিরভাগ দিন সময়ে রোজ স্কুলে পৌঁছনো সম্ভব হত না। সামান্য় মাইনে থেকেও বেশ কিছু টাকা লেটের দায়ে কাটা পড়ত।

zoom
যোগীন্দ্রনাথ সরকার

শেষমেশ স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে যোগীন্দ্রনাথ নেমে পড়লেন বই প্রকাশনায়। ১৮৯৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজস্ব প্রকাশনালয় ‘সিটি বুক সোসাইটি’। সেখান থেকেই প্রকাশিত হয় যুগান্তকারী প্রাইমার ‘হাসিখুসি’। সহজ ভাষায় শিশুদের প্রাথমিক পড়াকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে এই বই। হারাধনের দশটি ছেলের এক-এক করে হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বিয়োগের অঙ্ক সহজে শেখানোর মাস্টারমাইন্ডও যোগীন্দ্রনাথ। পরবর্তীতে সেই প্রকাশনা থেকেই প্রকাশ পায়, ‘ছোটদের রামায়ণ’, ‘ছেলেদের মহাভারত’ প্রভৃতি। যে-সময়ে সচিত্র গ্রাফিক নভেলের কথা ভাবা যেত না, সেই সময়ে যোগীন্দ্রনাথ সরকারের এই অবদান নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের দাবি রাখে।

zoom

‘হাসিখুসি’র নিবেদন অংশে সংকলক যোগীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “আমাদের দেশে বালক বালিকাদের উপযোগী স্কুলপাঠ্য পুস্তকের নিতান্ত অভাব না থাকিলেও গৃহপাঠ্য ও পুরস্কার-প্রসাদযোগ্য সচিত্র পুস্তক একখানিও দেখা যায় না। এই অভাব কিঞ্চিৎ পরিমাণে দূর করিবার জন্যে ‘হাসি ও খেলা’ প্রকাশিত হইল।”

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সহজ পাঠ’ কালজয়ী পাঠ্যপুস্তক হলেও শিশুদের কাছে ‘হাসিখুসি’-র ছড়াগুলো যেন আরও সহজবোধ্য হয়ে ধরা দিয়েছে। কেন মাতৃভাষায় এই ধরনের প্রাইমার থাকা জরুরি, কেন এখনও বাংলার শিশুদের কাছে এই বইগুলো নিয়ে যাওয়া জরুরি– সে-প্রশ্নের উত্তর দিতে, আজও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি ভালোলাগা তৈরি করতে গেলে যোগীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে হয়।

zoom

শুধু অঙ্ক শেখা নয়, মনে রাখার পদ্ধতি নিয়েও তাঁর বিখ্যাত ছড়া আছে– ‘কাজের ছেলে’। ‘দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, দুটো পাকা বেল, সরিষার তেল, চিনি পাতা দই, ডিম ভরা কই…’ কিন্তু শুধু মজার ছড়া নয়। এ যে আদতে বাঙালির রান্নাঘর এবং রসনা তৃপ্তিরও বিবরণ, তা ভালোই বোঝা যায়। খাবারের প্রতি এই ভালোবাসা আমাদের ত্বকের পরতে পরতে মিশে আছে– শৈশবে সরিষার তেলের ঝাঁজালো মালিশের মাধ্যমে তা আমাদের শরীরে প্রবেশ করেছে, আবার আমাদের জিভেও লেগে আছে– প্রথম অন্নপ্রাশনের ভাতের গ্রাসের সঙ্গে, কিংবা ছড়া-কবিতায় শেখা প্রথম শব্দগুলোর সঙ্গে।

‘মজার দেশ’ কবিতাটি যোগীন্দ্রনাথ সরকার লিখেছিলেন প্রায় ১০০ বছর আগে, কিন্তু বৃহত্তর বাংলার বর্তমান অবস্থা দেখলে এই কবিতাটির পঙ্‌ক্তির মাঝে প্রচ্ছন্ন অর্থটুকু বড় প্রতীয়মান ঠেকে। যা হওয়ার, তার উল্টোটা নিয়ে লেখা এই কবিতাটির অংশ আজ তাই তুলে দিলাম।

zoom

“এক যে আছে মজার দেশ, সব রকমে ভালো,
রাত্তিরেতে বেজায় রোদ, দিনে চাঁদের আলো।
আকাশ সেথা সবুজবরণ গাছের পাতা নীল;
ডাঙ্গায় চরে রুই কাতলা জলের মাঝে চিল!
সেই দেশেতে বেড়াল পালায়, নেংটি-ইঁদুর দেখে;
ছেলেরা খায় ‘ক্যাস্টর-অয়েল’– রসগোল্লা রেখে!
মণ্ডা-মিঠাই তেতো সেথা, ওষুধ লাগে ভালো;
অন্ধকারটা সাদা দেখায়, সাদা জিনিস কালো!
ছেলেরা সব খেলা ফেলে বই নে বসে পড়ে;
মুখে লাগাম দিয়ে ঘোড়া লোকের পিঠে চড়ে!
ঘুড়ির হাতে বাঁশের লাটাই, উড়তে থাকে ছেলে;
বড়শি দিয়ে মানুষ গাঁথে, মাছেরা ছিপ ফেলে!”

কবিতার শেষাংশটিও অত্যন্ত অর্থবহ– ‘মজার দেশের মজার কথা বলবো কত আর; চোখ খুললে যায় না দেখা মুদলে পরিষ্কার!’

এ-বছর উত্তর কলকাতার একটি পুজোমণ্ডপের বিষয়ভাবনা ছিল যোগীন্দ্রনাথ সরকার ও তাঁর সৃষ্টি। কলকাতার থিমপুজো বহুবারই স্মরণ করেছে এমন মানুষদের, যাঁদের সঙ্গে বাঙালির ঐতিহ্য ও কৃষ্টি জড়িয়ে, তা অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু চার-পাঁচদিনের অগণন মানুষের ভিড়ের এক-দু’জনও কি ফিরে যাবেন ‘হাসিখুসি’র কাছে? সন্তান-সন্ততিদের হাতে তুলে দেবেন? বিক্রি বাড়বে যোগীন্দ্রনাথ সরকারের?

সে নিতান্তই দুরাশা।

…………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন সুমন সেনগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

…………………..

bengali literature Children literature Jogindranath Sarkar Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar হাসিখুসি

Share this article on