

শান্তিনিকেতন থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। পুজোর আগে শিল্পের পার্বণ বসে যায় এ গ্রামে। অন্তত সাত বাড়ির দুর্গাপট আঁকা শুরু হয় আগেই। সে পটের রকমসকম ভিন্ন। ভারত জুড়ে সাধারণত পট প্রদর্শিত হয় সুর করা-গল্পের সঙ্গে; উল্লম্ব গোটানো পট, সরু অনুভূমিক পট, এক কাগজের আয়তাকার পট। বাংলার দুর্গাপট এদের থেকে আলাদা। মল্লভূমের দুর্গাপট আয়তাকার, কিন্তু উপরের কোণদুটো কাটা, তাই দেখতে ছ’কোনা। সেখানে এর নাম পটেশ্বরী।
বীরভূমের হাটসেরান্দি গ্রামে দুর্গাপুজোর আগে আসে শিল্পের পার্বণ। পটে আঁকা দুর্গা ঠাকুরের বাবার ভিটে এটা। অবশ্য বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর আর বর্ধমানেও এমন কিছু ঘটনা ঘটে। এখানকার পুজো কিন্তু শুরু হয়েছিল ঘটে। তারপরে ত্রিমাত্রিক ঘটপুজো থেকে দ্বিমাত্রিক পটপুজো এখানে কবে থেকে শুরু হল, সে মাত্রান্তরের কথা আজ আর কারওর মনে নেই। কিন্তু মনে রাখাটা যে শিল্পের ইতিহাস-ঐতিহ্যের জন্য নিতান্ত দরকারি ছিল! হাটসেরান্দির যে সাত বাড়িতে এখনও পটে দুর্গাপুজো হয়, তাদের কারওর দাবি ৩০০ বছরের ইতিহাসে, আবার কারওর কথা ২০০ বছরের ঐতিহ্যের। আবার মাটির মূর্তির বদলে কেন পট, তা জানতে চাইলে সোজা উত্তর– ‘পুজোয় সুবিধা হয়। পট বসাতে বা বিসর্জনে লোকবল তেমন লাগে না’। পুজো শুরুর আগে হাটসেরান্দির অভিজ্ঞতা পুজোর পরে ফিরে দেখতে মন্দ লাগে না। যেন দুর্গাপটের ঋতুটা ফিরে আসে হেমন্ত দিনের মনের মধ্যে।

শান্তিনিকেতন থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। বাস চলাচলের রাস্তা থেকে যে পিচের সরু রাস্তাটা গ্রামে যায়, তার মুখেই বেশ বছর কয়েক হল বড় তোরণ বসেছে। তোরণ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার গেলে তবে গ্রাম। রাস্তার দু’পাশেই ঘন ধানের খেত; আস্তে আস্তে রং বদলায়। রাস্তার পাড় বেঁধে দিয়েছে জংলা ফুলের ঝোপঝাড়। আর বড় গাছের ছায়ায় বসে পড়ছে শুকনো কাশের ঘাস নিতে আসা লোকজন। যখন এসেছি তখন আশ্বিনের রোদে-হাওয়ায় কার্তিকের টান। বড় রাস্তার পাশের কাশফুল ঝরে এসেছে। মহালয়া পেরিয়ে গিয়েছে। শিল্পীর হাতে আর মোটে দু’দিন সময় আছে পট শেষ করার।

শুরুতেই বললাম পুজোর আগে শিল্পের পার্বণ বসে যায় এ গ্রামে। অন্তত সাত বাড়ির দুর্গাপট আঁকা শুরু হয় আগেই। সে পটের রকমসকম ভিন্ন। গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক চরণচিত্র থেকে অনুপ্রাণিত পটচিত্র। তাই পট মোটামুটি সরু ও লম্বা হয়। ভারত জুড়ে সাধারণত পট প্রদর্শিত হয় সুর করা-গল্পের সঙ্গে; উল্লম্ব গোটানো পট, সরু অনুভূমিক পট, এক কাগজের আয়তাকার পট। বাংলার দুর্গাপট এদের থেকে আলাদা। মল্লভূমের দুর্গাপট আয়তাকার, কিন্তু উপরের কোণদুটো কাটা, তাই দেখতে ছ’কোনা। সেখানে এর নাম পটেশ্বরী। হাটসেরান্দির পটের চালচিত্র সমেত গড়ন কাত করা ইংরাজির ‘ডি’ অক্ষরের মতো বা চাঁদার মতো। প্রথমে ওই আকারের কাঠের বা বাখারির ফ্রেম বানিয়ে তাতে টানটান করে এঁটেল মাটির গোলায় চোবানো মার্কিন কাপড় আটকানো হয়। অথবা ফ্রেমে ঘন বুননের দড়ি আড়াআড়ি ভাবে বেঁধে তাতে এঁটেল মাটি লাগানো হয়। এরপর কাপড় বা মাটি শুকিয়ে গেলে পুরু করে খড়িমাটির আস্তরণ দেওয়া হয়। তৈরি হয়ে ওঠে পটের মসৃণ ক্যনভাস। তাতে প্রথমে সপরিবারে দুর্গা এঁকে নিয়ে শুরু হয় গাঢ় রঙের খেলা। বহু আগে প্রাকৃতিক উপায়ে বানানো গুটিকয় রং দিয়ে ছবি আঁকা হত, তাই রঙের পুনরাবৃত্তি আটকানো যেত না। এখন সে সমস্যা নেই; বাজারে অনেক রকম রং পাওয়া যায়। তাও সাবেকিয়ানা বজায় রাখতে রঙের সংখ্যা বাড়ানো হয় না। বোলপুর বাজারে পাওয়া গুঁড়ো রঙের সঙ্গে তেঁতুল-দানার কাঁই আঠা মিশিয়ে এখন পটের রং প্রস্তুত হয়। প্রাকৃতিক রং থাকে না বললেই চলে। তুলিও এখন প্রচুর। তবে রং গোলা হয় নারকেল মালায় বা পোড়ামাটির প্রদীপে। পটে পোশাকের রঙের তারতম্য থাকলেও পরিপ্রেক্ষিতের ঘন আসমানি রং যেন অবিচল; সবক’টি পটে আছে।

মনে পড়ে যায় ভিনসেন্টের একটা চিঠির কথা। ‘দ্য পোয়েট’ ছবিতে উনি এক কবির পোর্ট্রেট এঁকে তার পরিপ্রেক্ষিতে রাতের তারা ভরা আকাশ এঁকেছিলেন; গাঢ় আলট্রামেরিন রাতের আকাশ। প্রচলিত হালকা রঙের ব্যবহার না করে, তিনি এমন করেছিলেন কবিপ্রতিভার ব্যাপ্তি বোঝানোর জন্য। এখানের পটে ওই নীল আকাশ বোঝায়, আর বোঝায় দেব-দেবীর ব্যাপ্তি। অস্ত্রগুলোও যথারীতি আঁকা হয় ঘন সাদা খড়ি মাটির রঙে। আজকাল কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রে ও অলংকারে রাংতা ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনও পটে চালচিত্র একসঙ্গেই আঁকা, আবার কোনওটায় আলাদা এঁকে বসানো। বেশিরভাগই মার্কিন চালি। অবশ্য রায়বাড়ি চালিটি সর্বসুন্দরী রকমের; যা এখন বিলুপ্তপ্রায়। আরও বাড়িতে আছে নিশ্চয়ই। এই চালির বৈশিষ্ট্য হল পটের গা থেকে কাঠের থাম সমেত একখানা ছাদযুক্ত চৌকো গাড়িবারান্দার মতো স্ট্রাকচার বেরিয়ে আসে। প্রতি বছর পট নতুন হয় কিন্তু চালিটা একই থাকে। তাকে সাজানো হয় ছবি এঁকে, চালচিত্র। প্রতিপদের দিনে তখনও সাজানো হয়নি, কিন্তু তাতে ভালোলাগায় কিছু কম পড়ে না। যথাবিধি পুজোর পরে পটগুলি বাড়িতেই পুজো পায় সারা বছর। নতুন পুজোর পরে পুরনো পট বিসর্জনে যায়।


রোদ এখন মাথায় চড়েছে। মানিকবাবু খালি পায়ে এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে ঘুরে পট আঁকছিলেন। খেতে যাওয়ার সময় আমার সঙ্গে দেখা। সবেমাত্র তুলি ধুয়ে তুলেছেন। আমার হিসেবি ছবির জন্য এখন তাকে আবার তুলি হাতে দাঁড়াতে আমি বলতে পারি না। যদিও উনি জানতে চাইলেন, ‘ছবি তুলবেন? দাঁড়াব?’ আমি বললাম, ‘গল্প বলুন’। পথে ঘুরে ঘুরে নিজের বংশের কথা, শিল্পের অবনতির কথা, শিল্পীর দারিদ্রের কথা বললেন। বাবা গুরুপদ সূত্রধর ও জ্যাঠামশাই কালিপদ সূত্রধরকে দেখে দেখেই মানিক সূত্রধর পট আঁকা শেখেন। এ গ্রামের নামকরা শিল্পী ছিলেন কালীপদ সূত্রধর। পূর্ণেন্দু পত্রী তাঁকে নিয়ে একখানা তথ্যচিত্রও বানিয়েছিলেন। সেটি আমার দেখার সৌভাগ্য হয়নি। মানিকবাবুর ভাইপো রামকৃষ্ণ সূত্রধর এ শিল্পের আরেকজন দক্ষ শিল্পী। তাঁর কাজে স্বকীয়তা স্পষ্ট। রায়বাড়ির পট তাঁর করা। রামকৃষ্ণের বাবা আদরগোপাল সূত্রধরও পট আঁকতেন। মানিকবাবু তাঁর বাবা-জ্যাঠার দেখানো পথেই এখনও পট আঁকেন। পট বা দেবদেবীর গড়নের বদল করেননি একটুও। এমনকী তাঁর বাবা-জ্যাঠাও পূর্বপুরুষের পথেই এঁকে গিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘দেখা হয় নাই’ বইতে লিখেছেন, ‘ড্রইং-পদ্ধতিও বংশানুক্রমিকভাবে বিধিবদ্ধ। ফলে এমন অনুমান অসঙ্গত নয় যে, এ গ্রামে ১৫০ বছর আগেও আজকের মতো দুর্গাপট অঙ্কিত হত। পুরনো ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার এ এক চমৎকার নিদর্শন’। মানিকবাবু কিছু বছর আগে কলকাতায় থিমের দুর্গাপুজোয় এসেছিলেন কাজ করতে, তাঁর পট নিয়ে। কলকাতাবাসী সাধুবাদ জানিয়েছিল উদ্যোক্তাদের। তারপরে শিল্পীকে ভুলে যাওয়া হল। সুধীর চক্রবর্তীর ‘চালচিত্র’ বইটিতেও এই শিল্পীদেরই নাম পাওয়া যায়। ওখানে অবশ্য রামকৃষ্ণের প্রতিবেশী শিল্পী বাচ্চু সূত্রধরের উল্লেখও আছে। গ্রামের বাইরে থেকেও শিল্পীরা আসেন এ গ্রামের কোনও বাড়িতে। পট আঁকার বাইরে মানিকবাবুরা টুকটাক কাঠের কাজ, ঘর ছাওয়ার কাজ, মাটির কাজ, চাষের কাজ, টোটো চালানোর কাজ করে থাকেন– না হলে পেট চলে না যে!

কিছু বাড়িতে প্রতিমায় পুজো হয়। পট হোক বা প্রতিমা, পুজোর নিয়ম একই। তবে সপ্তমীটা এ গ্রামে অন্যরকম। ছোট ছোট পালকি করে এরা সব পরিবার মিলে নবপত্রিকা স্নানে যায়। সে উৎসব দেখতেও পর্যটকরা আসে। আরও পর্যটক আসতে পারত এখানকার টেরাকোটা মন্দিরগুলো দেখতে। কিন্তু অপরিণত, গুণমানহীন সংস্কারের জন্য সেই সব টেরাকোটার কাজ আর তাতে নেই। শুধু রঙচঙা মন্দির আছে।

এ পটের বিশেষত্ব হল সংস্কৃত মন্ত্র পড়া হয় এর সঙ্গে। অন্য পটে সুর করা লোকজ বাংলা গল্প চলে। টিকে থাকার লড়াইয়ে এ এক বড় হাতিয়ার। পর্যটক আসা মানেই উন্নতি আর সেটাই কাঙ্ক্ষিত। তবে জনজীবনের মানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গেই অবনতি ঘটছে শিল্পের। নতুন প্রজন্ম ‘ক্যালেন্ডার’ স্টাইল বেছে নিচ্ছে পটের জন্য। সেখানে মানিকবাবুদের ঘোর আপত্তি এবং গভীর বিষাদ। যে শিল্পে এত বছরে শান্তিনিকেতনের ছাপ পড়তে দেওয়া হয়নি, সেখানে সস্তার ক্যালেন্ডারকে কী করে জায়গা দেওয়া যায়! শুনলাম তো এ পুজোতে ‘লোকবল তেমন লাগে না’। কিন্তু শিল্প বাঁচাতে যে লোকবল লাগে! গুটিকয় পুজো আর তার গুটিকয় শিল্পী কতদিন বাংলার দুর্গাপট আগলে রাখতে পারবে?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved