


কালীকে নতুন করে সাজিয়ে তুলল তন্ত্রদর্শন। নাদব্রহ্মরূপী কালী হয়ে উঠলেন মহাবিশ্বের আদিমতম নিস্তব্ধতা ও শব্দ-বিজ্ঞানের পরম উৎস। যিনি মহাজাগতিক স্পন্দনকে নিজের অন্দরে ধারণ করে আছেন। তাঁর কণ্ঠের ৫০টি কাটা মুণ্ডর মুণ্ডমালা আসলে ভাষার আদিমতম ৫০টি (১৬টি স্বরবর্ণ ও ৩৪টি ব্যঞ্জনবর্ণ) মাতৃকাবর্ণ; সৃষ্টি, ভাষা ও চেতনার আদিম বীজের চৈতন্যময়ী।
৫৫.
বাংলায় কালীপুজো কেবল বাৎসরিক উৎসব নয়। বাঙালির অবচেতনে জুড়ে থাকা লোকায়ত ব্রাত্য-সংস্কৃতি, তার সহস্রাধিক বছরের তান্ত্রিক প্রজ্ঞা ও ঐতিহ্য, সংগীত-সাহিত্য, সর্বোপরি রাজনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষামূলক ক্ষাত্রতেজের উদ্দীপনে ‘কালী-কৈবল্যদায়িনী’ অনন্যা। বাঙালি ও কালী যেন অদ্বৈত বন্ধনে আবদ্ধ। বাঙালি জাতির আত্মিক-সত্তার সঙ্গে কালীতত্ত্বের পরম একাত্মতা– বিস্ময়কর!
বারোমাস জুড়ে তিনি পূজিত হচ্ছেন মূর্ত থেকে বিমূর্ত ভাবনায়। বৃক্ষ, পাথরের টুকরো বা মাটির ঢিপি, মূর্তি, যন্ত্র, পটচিত্র ইত্যাদি দেবীপূজার বর্ণময় মাধ্যম। পাথর-ধাতু-দারু-মাটির প্রতিমা। মাঠঘাট থেকে শুরু করে শ্মশান-মশানে, বন-বাদারে, তে-রাস্তার মোড়ে, অন্তঃপু্রে, মন্দিরে, গ্রামের ‘ভিন সীমানা’য় সর্বত্র শ্যামার আরাধনা ক্ষেত্র।

তোড়নতন্ত্র ও পুরাণ অনুসারে আট প্রকার কালী– দক্ষিণাকালী সিদ্ধকালী গুহ্যকালী শ্মশানকালী ভদ্রকালী চামুণ্ডাকালী ইত্যাদি। অভিনবগুপ্তের তন্ত্রালোক, তন্ত্রসারে বর্ণিত ১২ বা ১৩ প্রকার কালীর মধ্যে উল্লেখ্য: মার্তণ্ডকালী, মহাকালী, যমকালী, চণ্ডকালী ইত্যাদি। মহাকাল সংহিতা ও অন্যান্য তন্ত্রগ্রন্থে নয় প্রকার কালীর মধ্যে কয়েকটি হল ডাম্বরকালী, ইন্দিবরকালী, ধনদকালী, রমণীকালী, ঈশানকালী, কামকলাকালী ইত্যাদি। তালিকার প্রতিটি শাস্ত্রীয় কালীর ধ্যানমন্ত্র, আয়ুধ, বাহন এবং মূর্তি বিন্যাস একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং সুনির্দিষ্ট।
পুজোর স্থান, উদ্দেশ্য, সেবাইত এবং মূর্তিভেদে লৌকিক কালীর নাম অসংখ্য– মাঠকালী, গাছকালী, বামাকালী, দোষ-কাটানো-কালী, আনন্দকালী, রটন্তিকালী, সিদ্ধেশ্বরী, ফলহারিণীকালী, রাখালেকালী, ডাকাতকালী, রক্ষাকালী, তারাকালী ইত্যাদি।
লোকায়তকালী সবচেয়ে বৈচিত্রময়। যেমন ‘দোষ-কাটানো কালী’ হবে পটে আঁকা চিত্র। কালীচিত্র অঙ্কন করেন আচার্য ব্রাহ্মণ বা গণকরা। নদীর ধারে বা বাড়িতে অমাবস্যার ঘোর অন্ধকারে পূজিত হন। পুজোর অন্যতম উপচার শিবাভোগ। পুজোর পরই বিসর্জন। ‘তে-মাথার কালী’ও অনুরূপ আভিচারিক কালী। কুম্ভকার বা শিল্পীরা মূর্তি দিতে রাজি হন না। ঘটে পুজো করে শিবাভোগ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিসর্জন।
‘বিজয়া-কালী’ শারদীয়া দুর্গাপুজোর বিজয়ার দিনে দেবীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে নিমগাছতলায় ঘটস্থাপন করে পুজো করা হয়। সেই ঘট নিয়ে পরিক্রমা করার সময় তালপাতার ছাতা ধরেন সেবাইতরা। ‘আনন্দকালী’ মূলত রাঢ়ের বনেদি বংশের ভট্টাচার্য বা বন্দ্যোপাধ্যায়দের পারিবারিক আনন্দ উৎসবে– বিয়ে-থা অন্নপ্রাশনের প্রাক্কালে পূজিত হন। অন্যতম বৈশিষ্ট্য বসনপরা মূর্তি। বসন পরা যে সমস্ত মূর্তি দেখা যায় তার আদি উৎস হল পারিবারিক আনন্দময়ী কালী।

‘জয়কালী’ বা ‘রণকালী’র সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধ বা দাঙ্গাজয়ের স্মৃতি। ’৪৬-এর দাঙ্গার স্মৃতিতাড়িত এমন এক জয়কালী পূজিত হন নাসিগ্রামে। ‘সুড়ঙ্গ কালী’ নামেও এক বিচিত্র কালীর সন্ধান পাওয়া যায় কেতুগ্রামের আমগোড়িয়া গ্রামে। কোনও মূর্তি নেই। মাটির তলায় প্রাকৃতিক গর্ত বা সুড়ঙ্গকে উদ্দেশ্য করে বিমূর্ত ভাবনায় এই বিচিত্র কালী পূজিত হচ্ছেন।
গৃহদেবী হিসাবে আনন্দময়ী, ভবতারিণী, আদ্যা-মা, ইচ্ছাময়ী, বাঞ্ছাময়ী, শৃগালেশ্বরী, গণকেশ্বরী, বিদ্যামাতা, বড়মা, বটঠাকরুন, ছোট-ঠাকরুন ইত্যাদি কালীনামের শেষ নেই। বাংলায় কালীর এই বৈচিত্র ও বহুল ব্যাপ্তি সুপ্রাচীন ঐতিহ্য বলেই ব্রহ্মযামলের আদ্যাস্তোত্রে বলা হয়েছে–
কালিকা বঙ্গদেশে অযোধ্যায়াং মহেশ্বরী।
লৌকিক নামাঙ্কিত কালী মূর্তিগত বিচারে অধিকাংশ দক্ষিণাকালী। শায়িত শিবের বুকে ডানপদ সন্নিবেশ যুক্ত অপূর্ব যৌবনবতী করালবদনী কালী জিহ্বা বিস্তার করে দণ্ডায়মান। দেবীর বাম হাত দু’টিতে খড়্গ ও সদ্য ছিন্ন অসুরমুণ্ড। ডান হস্তদ্বয়ে অভয় ও বরদমুদ্রা। গলায় নরমুণ্ডমালা। কটিদেশে ছিন্ন হস্তমালার মেখলা। অসুর-রক্তে দেবীর শরীরের বিভিন্ন অংশ রঞ্জিত। মুক্তকেশী। দেবীর গাত্রবর্ণ প্রধানত কালো অথবা আকাশি। ভয়ংকর সৌন্দর্যের মাতৃপ্রতিমা।

দু’টি আঙ্গিকে দেবীমূর্তি প্রদর্শিত। উলম্ব ভঙ্গিমায় শিবের বুকে খাড়া হয়ে দেবী দাঁড়িয়ে আছেন। ত্রিনয়নীর দৃষ্টি শবরূপী শিবের দিকে। অন্যটি আড়াআড়ি সংস্থাপনে দেবীর প্রসন্ন মুখটি ভক্তের দিকে। আয়তকার কাঠামোতে কালীর পা শিবের বুকে লাগামাত্র লজ্জায় জিভ কাটার লৌকিক মনস্তত্ত্বটিও যেন যুক্ত। শিব শুধু নিষ্ক্রিয় ব্রহ্ম নন, তিনি কালীর পতি। দেবীর এই মানবিকীকরণ মুখটিকে ঘোরানোর ফলে বাস্তবায়িত হয়েছে।
…………………………
‘কালী’ নামটি প্রথম পাওয়া যায় মুণ্ডক উপনিষদে। পবিত্র যজ্ঞাগ্নির সপ্তজিহ্বার দু’টি নাম– ‘কালী’ ও ‘করালী’। ‘করালী’ শব্দের অর্থ ভয়ংকর দন্তপঙ্ক্তি। কালী উপনিষদের যুগ থেকে বৈদিক সাহিত্যে মার্জিত হয়ে পবিত্র যজ্ঞাগ্নি শিখায় পরিণত হয়েছেন। মহাভারতের আদিপর্বের ২৩২.৭ শ্লোকেও যজ্ঞাগ্নির সাত জিহ্বা হিসাবে নাম দু’টির পুনরুল্লেখ তাৎপর্যপূর্ণ। দেবীর অন্যতম দু’টি মূর্তিগত বৈশিষ্ট্য ‘লোল-জিহ্বা’ এবং ‘দন্তুরা’ এখানে আভাসিত।
কিন্তু কালী আদিতে ছিলেন ভয়ংকরী শিশুহন্তারক অপদেবী তথা মাতৃকাদেবী। কালী প্রথমে বৈদিক দেবী ছিলেন না, অবৈদিক সমাজের ব্রাত্য লোকায়ত অপদেবী। গৃহ্যসূত্রে তার প্রমাণ আছে। মূলত কালী বা ভদ্রকালী কিংবা ষষ্ঠী বালগ্রহের অর্থাৎ শিশুর জন্ম, রোগ, মহামারী, শ্মশান-মশানের সঙ্গে যুক্ত দৈবীসত্তা। বিশিষ্ট গবেষক পি অগ্রবাল তাঁর ‘গডেস ইন এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে কাঠক-গৃহ্যসূত্রকে অনুসরণ করে লিখেছেন, শিশুদের বাঁচাতে গৃহস্থদের আয়োজিত যজ্ঞে একইসঙ্গে কালী ভদ্রকালী এবং ষষ্ঠীর উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য প্রদান করা হত (পৃ. ১১০) । এইসব দেবীদের সঙ্গে শিশু ও বিড়ালের যোগ ছিল।
ষষ্ঠী পরবর্তীকালে শিশুরক্ষক মার্জারবাহনা দেবী হয়েছেন। কালীর আদিম রূপের চিহ্ন হিসাবে তাঁর দুই কানে আজও দু’টি শিশু-শবের অলংকরণ দেখা যায়। কালীর সঙ্গে পরবর্তীকালে চামুণ্ডার রূপভেদ চর্চিকাদেবী একীভূত হয়ে যান। কেশবস্বামী রচিত ‘নানারথার্ণবসংক্ষেপ’ গ্রন্থে চর্চিকাকে মার্জারমুখী বলা হয়েছে। উড়িষ্যার হীরাপুরে চৌষট্টি যোগিনীর মধ্যে বিড়ালমুখী যোগিনীও রয়েছে। কর্পূরাদি স্তোত্রে (দক্ষিণাকালিকা স্তোত্রম্) উল্লিখিত ‘সলোমাস্থি স্বৈরং পললমপি মার্জারমসিতে’ শ্লোকে বিড়ালের উল্লেখ কালীর প্রাচীন রূপান্তরের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মহাভারতের বনপর্বের স্কন্দ উপাখ্যানে বহু লৌকিক মাতৃকাদেবীর উল্লেখ রয়েছে, যাঁরা শিশুদের হরণ বা রক্ষা করতেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বৃদ্ধিকা বা বৃদ্ধিকাদেবী। বাণভট্টের ‘কাদম্বরী’ গ্রন্থে সূতিকাগৃহে বৃদ্ধিকাদেবীর চিত্র অঙ্কন ও পূজার কথা আছে। বৃদ্ধিকাদেবী ছিলেন মূলত প্রজনন ও শিশু সংশ্লিষ্ট মাতৃকাদেবী। আরও জানা যায়, বৃদ্ধিকাদেবী ছিলেন মার্জারমুখী।
মহাভারতের শিশু-সংশ্লিষ্ট বৃদ্ধিকাদেবী রাঢ় অঞ্চলের বীরভূম জেলার জাজিগ্রামে শাক্ত ধারায় বৃদ্ধমাতা বা বৃদ্ধামাতা কালী নামে আত্মপ্রকাশ করেছেন। দেবীর দুই কানে শিশুশবের অলংকার দেখা যায়। অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং জাগ্রতা এই দেবীপূজা উপলক্ষে মহিষবলি তথা পক্ষাধিককালব্যাপী মেলা বসে বীরভূম-মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী জাজিগ্রামে।

সাধারণত শাস্ত্রীয় পুরাণে দেবী কালিকা মুক্তকেশী কৃষ্ণবর্ণা চিরযুবতী হিসাবে বর্ণিত হয়েছেন। কিন্তু জাজিগ্রামের কালীর অন্যতম আইকনিক বৈশিষ্ট্য হল দেবীর মাথার চুল সাদা। রাঢ়ের কৌমসমাজ ব্যবস্থায় আদিমাতৃকার এই জরাগ্রস্থ বা বয়স্কা রূপটি খুবই জনপ্রিয়, যার অবশেষ এখনও দেখা যায় বলদাবুড়ি ঘাগরবুড়ি কিংবা বুড়ি-বনদুর্গার ফর্মে। ব্যতিক্রমী শ্বেতকেশী কালী আরও একটি পূজিত হন জাজিগ্রামে।
…………………………….
মহাভারতের সৌপ্তিকপর্বের অষ্টম অধ্যায়ে ‘শিখণ্ডীর প্রাণ সংহার’ শীর্ষক অংশে কালীর প্রথম রূপচিত্র স্পষ্ট হয়। তিনি কৃষ্ণবর্ণা, করাল ও রক্তবদনা, লোহিতনয়না, রক্তবস্ত্র পরিহিতা, রক্তমাল্যানুলেপনা এবং ভয়ংকর পাশহস্তা। কালীর প্রধান অস্ত্র ছিল পাশ। পরে খড়্গধারিনী হয়ে ওঠেন। মহাভারত থেকে কালী ও দুর্গা অভিন্ন হন। ভীষ্মপর্বের ২৩ অধ্যায় ও বিরাট পর্বের ৬ অধ্যায়ে দুর্গার প্রতিশব্দ হিসাবে কালী-সহ তাঁর কয়েকটি রূপভেদের উল্লেখ আছে যথা মহাকালী, কালরাত্রি ইত্যাদি।
কালিকার প্রত্নরূপের আভাস মেলে বৈদিক গৌণ নির্ঋতি দেবীর সঙ্গে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ থেকে নির্ঋতি দেবীর তিনটি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তিনি ‘কৃষ্ণা’ অর্থাৎ ঘন কালো, ‘ঘোরা’ (ভয়ংকরী) এবং পাশ-হস্তা (দড়ির ফাঁস)। মার্কণ্ডেয়-পুরাণে কালীর বৈপ্লবিক বিবর্তন দেখা যায়। দেবীমাহাত্ম্যম অংশে ৮৭ অধ্যায়ে কালীর জন্মকথা ও ৮৮ অধ্যায়ে কালীর লীলাকথা বর্ণিত হয়েছে। চণ্ডমুণ্ড-সহ রক্তবীজ অসুরবধ কালীর প্রধান কীর্তি।

শুম্ভ-নিশুম্ভের সেনাপতি চণ্ডমুণ্ডের সঙ্গে দেবী দুর্গার যুদ্ধকালে তাঁর ললাট থেকে জন্ম হয়েছিল দেবী কালিকার। পুরাণকার লিখেছেন, কালী করাল বদনা, খট্বাঙ্গ অর্থাৎ মানুষের হাড় দ্বারা নির্মিত যষ্টিধারিণী, নরমালা ভূষিতা, ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা, দেহের মাংস শুষ্ক, অতি ভয়ংকরী, বিস্তৃত মুখমণ্ডল, লকলকে জিভ, কোটরগত চক্ষু এবং ভয়ংকর গর্জনশীলা।
চণ্ডমুণ্ড অসুরনাশিনী কালীকে দেবীদুর্গা ‘চামুণ্ডা’ নামে অভিহিত করলেন। অগ্নিপুরাণের ৫০ অধ্যায়ের ২২-২৩ শ্লোক অনুসারে চামুণ্ডা ‘শুষ্কমাংসাতিভৈরবা’ কোটরাক্ষী, ত্রিলোচনা, চিতাবাঘের চামড়া পরিহিতা চতুর্ভুজা দেবী। বাম হস্তদ্বয়ে নরকপাল ও পট্টিশ। দক্ষিণ হস্তদ্বয়ে শূল ও কর্তারী। শবারূঢ়া। কানে অস্থি নির্মিত অলংকার। ‘চামুণ্ডা-কালী’র ভাস্কর্য গুপ্তযুগ থেকেই মিলেছে।
চামুণ্ডা-কালী শবাসনা। ক্ষুধার জ্বালায় তিনি সর্বগ্রাসী। এই কারণে চামুণ্ডার পেটে বিছের ছবি খোদাই করা থাকে। মূর্তি-ভাস্কর্যে প্রেত বা শবের উপর তিনি দণ্ডায়মান বা উপবিষ্ট। চার হাতে কর্তারী, কপাল, ত্রিশূল ও খড়্গ। দেবীর শুষ্ক মুখ থেকে জিভ বেরিয়ে আসছে। গলায় নরমুণ্ডমালা।
একইভাবে চামুণ্ডার মতো চর্চিকা বা চর্চাদেবীও কালীর সঙ্গে একীভূত হয়ে যান। চর্চিকাদেবীর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে স্কন্দপুরাণের কাশীখণ্ডের ৯৯ অধ্যায়ে। ড. সুকুমার সেনের মতে চর্চিকা বা চর্চা হল ক্ষুধিত হিংস্র এক ডাকিনি। নামটির অর্থ ভয় দেখানো বা ক্ষতিকর (বঙ্গভূমিকা, পৃ. ১৮৯)। বাংলাতেও যে চর্চিকার আরাধনা হত, তার প্রমাণ পাওয়া যায় দশম শতাব্দীর রাজা নয়পালের নামাঙ্কিত মূর্তিশিবের বাণগড় প্রশস্তিতে। প্রশস্তিটি শুরু হয়েছে ‘ওং নমশ্চর্চিকায়ৈ’ দিয়ে। চামুণ্ডা চর্চিকা আধুনিক কালীর মূর্তি বিনির্মাণে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করেছে।

চামুণ্ডা ও চর্চিকা মূলত প্রাগার্য কৌম সমাজের দুই জনপ্রিয় ভয়ংকরী লৌকিক মাতৃকাদেবী ছিলেন। পুরাণকার ও লেখকরা কালীর সঙ্গে দুই দেবীকে একীভূত করতে গিয়ে লোকনিরুক্তির সাহায্য নিয়েছেন। যেমন চর্চিকা প্রসঙ্গে সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থে সংকলিত কবি উমাপতিধর লিখেছেন, ‘অসুররুধির চর্চিতাঙ্গী সা দেবী চর্চিকা নাম।’ দেবীর গায়ে অসুর রক্ত চর্চিত হয়েছিল, সেই কারণে তাঁর নাম ‘চর্চিকা’।
মার্কণ্ডেয়পুরাণে বলা হয়েছে, কালী, চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করেছিলেন বলে তিনি ‘চামুণ্ডা’ নামে অভিহিত হন। গবেষক শশিভূষণ দাশগুপ্ত একে ‘পুরাণকারের গোঁজামিল’ বলেছেন (ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্ত-সাহিত্য, পৃ. ৬৮)। এর ফলে কালী অন্তরালে চলে যান। চামুণ্ডা-চর্চিকাই প্রধান হয়ে ওঠেন।
এই অন্তরালে চলে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল, কালী ক্রমশ ব্রাহ্মণ্যধারায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে বিশ্বজননীতে পরিণত হচ্ছিলেন পুরাণের যুগে। মহাজাগতিক নাদ ও শব্দব্রহ্মের পদে ধীরে ধীরে আসীন হন দেবী। এই কারণে তাঁর আদিম শিশুহন্তারক ও শ্মশান অনুষঙ্গের পরিত্যক্ত রূপটি নিয়ে এগিয়ে এলেন দুই লোকায়ত দেবী চামুণ্ডা ও চর্চিকা। তাঁরা কালীর ফেলে দেওয়া পোশাক পরে যেন অবতীর্ণ হলেন।

শুধু পৌরাণিক সাহিত্য নয়, কালীকে নতুন করে সাজিয়ে তুলল তন্ত্রদর্শন। নাদব্রহ্মরূপী কালী হয়ে উঠলেন মহাবিশ্বের আদিমতম নিস্তব্ধতা ও শব্দ-বিজ্ঞানের পরম উৎস। যিনি মহাজাগতিক স্পন্দনকে নিজের অন্দরে ধারণ করে আছেন। তাঁর কণ্ঠের ৫০টি কাটা মুণ্ডর মুণ্ডমালা আসলে ভাষার আদিমতম ৫০টি (১৬টি স্বরবর্ণ ও ৩৪টি ব্যঞ্জনবর্ণ) মাতৃকাবর্ণ; সৃষ্টি, ভাষা ও চেতনার আদিম বীজের চৈতন্যময়ী। এই তত্ত্বই কালীর চরিত্রকে অনন্য করে তুলল ক্রমশ। কৌমদেবী থেকে তাঁর উত্তরণ ঘটল শব্দ ও সৃজনের পরম বিজ্ঞান বা দর্শনের অতুলনীয় দেবীসত্তায়।
ফলত, কালীর মধ্যে সৃষ্টি-বিজ্ঞানের আধুনিক ভাষ্যটি যেন মূর্ত হয়ে উঠল। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে দৃশ্যমান মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে ছিল অনন্ত নিশ্ছিদ্র অন্ধকার কিংবা অপ্রমেয় শক্তিগর্ভ। আজও মহাবিশ্বের সিংহভাগ জুড়ে আছে বিস্তৃত ডার্কম্যাটার, ডার্ক-এনার্জি। দেবী কালীর ঘনকৃষ্ণবর্ণ বা নীল অবয়ব সৃষ্টির পূর্ববর্তী সেই মহাশূন্যের ইঙ্গিতবাহী। কালী দিগম্বরী। কোনও কৃত্রিম মায়ার পোশাক তাঁর থাকে না। নিজেই হলেন অনন্তগর্ভ নিশ্ছিদ্র মহাজাগতিক তিমির-গর্ভ যার থেকে সব কিছু সৃষ্টি হয়েছে। আবার প্রলয় শেষে সেই গহ্বরে সবকিছু এসে বিলীন হয়ে যাবে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved