

ফ্লোরিডাবাসী মারেন ডগলাস বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখলেন বাচ্চা মেয়েটিকে। স্কুলবাসের অপেক্ষায় বসে থাকে ঘাসের ওপর, রোজই। চাইলে কি মারেন কিছুই করতে পারবেন না খুদেটির জন্য? ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’ উপন্যাসের বাইরে, বাস্তবে কোথাও কি অবশিষ্ট নেই এমন ম্যাজিক? মারেনের গল্প জুড়ে সেই মায়ার খোঁজই চলে কেবল।
ওই বাড়িতে এক দৈত্য আছে! মেয়েটি সে-কথা শুনেছে কেবল। দেখতে পায়নি। যখন সে স্কুলফেরত, একা, বুক দুরুদুরু, দ্রুত পায়ে পেরিয়ে গিয়েছে দৈত্যের বাড়ি। কখনও ডাঁয়ে তাকায়নি; বাঁয়েও না! একদিন তাকিয়েছিল। সত্যিই তাকিয়েছিল? শিশুসুলভ অনুসন্ধিৎসায় কি চোখ আটকে যায়নি? মেয়েটি দেখেছিল, একটা ওকগাছের কোটর থেকে উঁকি দিচ্ছে টিনের ফয়েলের মোড়ক। মোড়কের ভিতর দু’খানা চুইংগাম। বিকেলের আহ্লাদি আলোয়, মেয়েটি আত্মহারা!

পরদিন আবার একটি উপহার। সেই ওকগাছের কোটরেই। এবারেও একটি টিন-ফয়েলের মোড়ক। ভিতরে ছোট্ট বাক্স। বাক্সের গায়ে জড়ানো মখমলি কাপড়, বেগুনি রঙের। বাক্স খুলে পাওয়া গেল, আদিমকালের দু’টি কয়েন। চকচকে। কে রেখে যায় এই উপহার? কখনও মেডেল, কখনও ভাঙা পকেটঘড়ি?
‘টু কিল আ মকিংবার্ড’ উপন্যাস শেষে, এ-প্রশ্নের স্পষ্ট কোনও উত্তর মেলেনি। গাছের কোটরটিতেও সিমেন্ট ভরেছে কবেই! তবু যেটুকু সহজেই অনুমেয়, উপহারের নেপথ্যে ছিল যে-দৈত্য, সে আদতে ভালোমানুষ। আর মেয়েটির ছিল আবিষ্কারের অমোঘ উচ্ছ্বাস। এমনতর উচ্ছ্বাসে কতবার ভেসে গিয়েছি! সেই যে একবার ক্যাম্বিস বল হারিয়েছিল… গলি-ক্রিকেটের টুর্নামেন্টে। তিন-চারদিন পরে, কিঞ্চিৎ মনখারাপ, ওই একই কাঁটাঝোপের ভিতরে যখন নতুন কেনা বলটা গিয়ে পড়ল, খুঁজে পেয়েছিলাম দুটো ক্যাম্বিস বল! পরপর! ওটুকুই জীবনের মায়া বলে জেনেছি। ধরা দিয়ে যায় কী অকপট!

উপন্যাসের এক অংশ বুঝি ঘটে চলেছে আজও। সদ্য একটা লোহার বেঞ্চ খুঁজে পেয়েছে মেয়েটা। রাস্তাঘাটে আচমকা মাংস কষানোর গন্ধ নাকে এলে যেভাবে আলোকিত হয় আপনার মুখ, সাধ হয় একটু ঝিনচ্যাক নেচে নিতে, মেয়েটিও ঠিক তেমনভাবেই লাফিয়ে উঠেছিল, অপাপবিদ্ধ উল্লাসে। যে উল্লাস ভাইরাল হলে, পৃথিবীটা বেঁচে যেত এইবেলা!
ফ্লোরিডার যে স্কুলে পড়াশোনা করে মেয়েটি, স্কুল-বাস আছে, কিন্তু পিক-আপ পয়েন্ট বাড়ি থেকে সামান্য দূরে। প্রতিদিন সকালবেলায় মেয়েটি হেঁটে আসে, স্কুলবাসের অপেক্ষা করে। ঘাসের ওপর বসে, একাই। মা-বাবা ব্যস্ত নিশ্চয়ই! কিন্তু এ যে মিরাকল! লোহার বেঞ্চ রেখে গেল কে? সযত্নে… মেয়েটির জন্য?
রেখেছিলেন মারেন ডগলাস। এক শিক্ষিকা। কিন্তু কেন? হঠাৎ একদিন ফোনে নোটিফিকেশন এসেছিল। মারেন সামান্য উদ্বিগ্ন। সিসিটিভি ক্যামেরা জানাচ্ছে, ‘দেয়ার ইজ আ মুভমেন্ট ইন ইয়োর ড্রাইভওয়ে’। মারেন ভেবেছিলেন, ‘হাইলি সাসপিশাস’ কিছু ঘটেছে নির্ঘাত! কিন্তু ফুটেজে দেখা দিল একটি মেয়ে। স্কুলড্রেস। কাঁধে ব্যাগ। গলায় ঝোলানো জলের বোতল। মারেনের ড্রাইভওয়ের ধারে বসে আছে। স্কুলবাস আসছে ওই!

মারেন ডগলাস আলবাত জেনেছেন, এই পৃথিবীতে একাধিক দৈত্য আছে! সে-কথা আমরা যারা মানুষ, কেবল শুনিনি, দেখেছি। দেখছি। দেখবও। সামান্য একটি লোহার বেঞ্চ, যদি মেয়েটির আপাত-নিরাপত্তার সঙ্গী হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতি কী? তাছাড়া ব্যস্ত রাস্তা। হাই-স্পিড গাড়ির দৌরাত্ম্য লেগেই আছে। আসলে ফোকাস করতে চাইছি মানবিকতাবোধে, একজন নাগরিকের দায়িত্বে, উদারতায়। অথচ একুশ শতকের এই দৈত্যপুরী, ব্যাকস্পেস দিয়ে প্রতিদিন মুছে দিচ্ছে সেই সমস্ত শব্দ। এ-মন সে-মনে ঘৃণা ছড়িয়ে রাখছে প্রভূত ও নিরলস। তারই মধ্যে কাঁচা হাতে লেখা একটা ভালোবাসার চিঠি যেন রাখা থাকে বেঞ্চের ওপর। ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’ উপন্যাসেও, বাচ্চা মেয়েটি ওকগাছের কোটরে একটি চিঠি রেখেছিল। কেউ তা খুঁজে পায়নি। মারেন পেয়েছেন। মেয়েটি লিখছে:
‘হ্যালো! আমিই সেই খুদে, যে প্রতিদিন স্কুলবাসের জন্য অপেক্ষা করে আপনাদের বাড়ির সামনে। বেঞ্চটার জন্য ধন্যবাদ। এখন থেকে আর কাদা-পোকামাকড়ের ভয় নেই! আরও একবার, ধন্যবাদ একটন!’
আশ্চর্য কোনও যোগাযোগ তৈরি হচ্ছিল দু’জনের ভিতর। মেয়েটি কখনও মারেনের মুখ দেখেনি, বাৎসল্য পেয়েছে। এদিকে মারেন, সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে দেখতে পায়, বেঞ্চে বসে বাচ্চা মেয়েটি সানন্দে বই পড়ছে। এক সপ্তাহ পর, স্কুলবাসের অপেক্ষা করতে এসে মেয়েটি দেখতে পেল, বেঞ্চের পাশে একখানা কাঠের বাক্স– লাইব্রেরি! গুটিকয়েক শিশুসাহিত্য। গায়ে লেখা– ‘ইউ ক্যান ফাইন্ড ম্যাজিক হোয়্যারএভার ইউ লুক!’ মারেনের ছোট্ট প্রচেষ্টা। এহেন ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে কতটুকু মুনাফা লাভ করতে পারে একজন মানুষ? উত্তর– এক ব্রহ্মাণ্ড!

বই পড়ার ফুরসত, বিশেষ করে শিশুদের, আর নেই। বিশ্ববাজার তেমনই নিদান দিচ্ছে। রিপ্লেস করছে কোডিং। অথচ মারেনের তৈরি লাইব্রেরি বক্সের আশেপাশে শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। কেউ স্কুলফেরত। কেউ অসময়ে। গল্পের বইয়ের টানে এক থেকে দুই, দুই থেকে চার…
রাষ্ট্র বা কোনও প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী না হয়েও নিরাপত্তার আগল কিংবা বই পড়ার আনন্দ– অনায়াসেই ছড়িয়ে দেওয়া যায় সমাজে। অতি সামান্য অন্ধকার হয়তো মুছে ফেলা যাবে। ছলেবলে আপনার সেই ইচ্ছেটাকে খুঁচিয়ে দেওয়ার অদম্য চেষ্টা করছি। কিন্তু আমরা তো মশাই ভয়ানক আত্মসর্বস্ব আর ‘আমায় দেখুন’ বলা প্রাণী হলাম যুগে যুগে, এ-লেখা কি আদৌ পড়বেন শেষতক? যদি পড়ে থাকেন, তবে জানবেন, আপনার আশেপাশেই একটা ম্যাজিক অপেক্ষা করছে। খুঁজতে হবে। সেই ক্যাম্বিস বলটা– যেভাবে খুঁজেছিলেন, সেভাবেই। সেভাবেই, মারেনের অজান্তেই গড়ে উঠেছে একটা রিডিং কমিউনিটি। ‘বইবাহিক’ যোগাযোগ। সব মিলিয়ে, এক ধরনের সামাজিক পরিকাঠামোই বটে!

আসলে এভাবেই একদিন অবাক করে দিয়েছিলেন, আব্বাস কিয়েরোস্তামি। ‘হোয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউস’ ছবির শেষ দৃশ্যটি মনে পড়ছে? আহমেদ যখন তার বন্ধুকে হোমওয়ার্কের খাতা ফেরত দিচ্ছে, বন্ধু হঠাৎ খুঁজে পেল একটা হলুদ বুনোফুল। ওটুকুই জীবনের মায়া… বাকিটা খিটখিটে। নিষ্প্রাণ। সেই মানুষগুলোর মতো, যারা বিকেলবেলায় মাঠ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। ফুটবল খেলার দোষে।
তাই আপনাদের জন্য লেখার শেষে পেতে রাখলাম একটা বেঞ্চ। খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিন। বই পড়ুন। চিঠি লিখুন ভালোবাসার।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved