Durga Puja Crowd Safety: Who Is Responsible? | Robbar
Robbar
  • ১৪ কার্তিক ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ১ নভেম্বর ২০২৬

ভিড়তন্ত্র

কলকাতার দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল শুধু শিল্পের প্রদর্শনী নয়, মানুষের সম্মিলিত উপস্থিতিতে গড়ে ওঠা এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর। চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষিতে তাই নাগরিক আচরণের পাশাপাশি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও আয়োজকদের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে থিমপুজোর জনপ্রিয়তা, ভিড়ের মনস্তত্ত্ব ও আগাম প্রবেশাধিকারের বৈষম্য।

প্রচ্ছদের ছবি: দীপঙ্কর ভৌমিক

শেষ আপডেট: নভেম্বর ১, ২০২৬, ২১:১৬   
Facebook WhatsApp Messenger

একটি শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়ালে আমরা সাধারণত নিজেদের দর্শক হিসেবেই কল্পনা করি। শিল্পী সৃষ্টি করেন, আর দর্শক সেই সৃষ্টির মুখোমুখি হন। মনে হয়, দর্শকের আগমনের আগেই শিল্পকর্মটি তার সমস্ত অর্থ নিয়ে সম্পূর্ণ হয়ে আছে। অথচ কিছু শিল্পের জীবন শুরু হয় মানুষের উপস্থিতিতে। পদচারণা, থমকে দাঁড়ানো, বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা, কিংবা পাশের মানুষটির সঙ্গে কোনও অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে শিল্পের আর একটি অর্থ তৈরি হয়। কলকাতার দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল এমনই এক শিল্পপরিসর। নির্মিত অবয়ব সেখানে মানুষের আগমনে এক সামাজিক ঘটনায় পরিণত হয়। দর্শক এখানে কেবল প্রস্তুত দৃশ্যের সামনে দাঁড়ান না; তাঁদের উপস্থিতির মধ্য দিয়েই সেই দৃশ্য জনজীবনে প্রবেশ করে।

zoom

চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার পর অনেকেই মানুষের নাগরিক বোধের অভাবকে বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। ভিড়ের মধ্যে ধৈর্য হারানো, অন্যের অসুবিধার কথা না-ভাবা কিংবা নিয়ম না-মানার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নাগরিক আচরণের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। তবু শোকের মুহূর্তে মানুষের আচরণকেই একমাত্র কাঠগড়ায় দাঁড় করালে, বিপর্যয়ের বৃহত্তর পরিস্থিতি দৃষ্টির বাইরে থেকে যেতে পারে। ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ তদন্তের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে। আয়োজক কমিটি ও প্রশাসনের দায়িত্ব সম্পর্কেও যে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলির যথাযথ উত্তর প্রয়োজন। এই পরিচিত প্রশ্নগুলির পাশাপাশি অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটিকে দেখতে চাই। যাঁদের আমরা একসঙ্গে ‘ভিড়’ বলে চিহ্নিত করছি, তাঁরা প্রত্যেকে কোনও প্রত্যাশা, আনন্দ কিংবা বিশ্বাস নিয়ে সেখানে এসেছিলেন। তাঁদের সমবেত উপস্থিতির অর্থ এবং সেই উপস্থিতির জন্য তৈরি পরিসরটির প্রতি আমাদের দায়িত্ব– দু’টিই নতুন করে ভাবা জরুরি।

দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে মানুষ আসেন নানা কারণে। কেউ দেবীকে প্রণাম করতে চান, কেউ শিল্পীর কল্পনার সঙ্গে পরিচিত হতে চান, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করেন, কেউ পরিবারের ছোটদের নিয়ে শহর ঘুরতে বের হন। থিম পুজোর জনপ্রিয়তা এই সমবেত আগ্রহকে আরও দৃশ্যমান করেছে। বাইরে থেকে আমরা কেবল জনসমাগম দেখি, অথচ তার ভিতরে রয়েছে অসংখ্য আলাদা জীবন। প্যান্ডেলের সামাজিক তাৎপর্য এই মিলনেই। শিল্পী একটি পরিসর নির্মাণ করেন, কিন্তু মানুষ সেখানে এসে নিজেদের উপস্থিতি ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তাকে জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঘটনার রূপ দেয়।

zoom

পারফরম্যান্স ও নন্দনতত্ত্বের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে– কোনও কোনও শিল্পের অভিজ্ঞতা তার নির্মিত রূপের মধ্যে সম্পূর্ণ হয় না, বরং শিল্পী ও দর্শকের পারস্পরিক উপস্থিতিতে গড়ে ওঠে। দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে দর্শক নিজের চলাচল ও উপস্থিতির মধ্য দিয়ে সেই পরিসরকে অনুভব করেন। নির্মাণের কাজ শেষ হলে প্যান্ডেলের কাঠামো দাঁড়িয়ে যায়, কিন্তু তার সামাজিক জীবন তখনও বাকি। দর্শকের আগমনেই সেই স্থাপত্য একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার রূপ পায়।

শিল্পকে আমরা প্রায়ই চোখ দিয়ে দেখার এবং বুদ্ধি দিয়ে বোঝার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু প্যান্ডেলের ভিতর হাঁটতে হাঁটতে শরীরও শিল্পের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। কোনও দৃশ্যের সামনে থেমে যাওয়া, অন্ধকার থেকে আলোয় এসে চোখ অভ্যস্ত হওয়া কিংবা চারপাশের মানুষের সঙ্গে একই গতিতে এগিয়ে চলা– আমাদের অভিজ্ঞতাকে গড়ে তোলে। অন্য দর্শকের বিস্ময় আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে; কারও থেমে যাওয়া আমাদেরও দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। আমরা নিজের মতো করে দেখি, অথচ সেই দেখার পরিস্থিতি তৈরি হয় বহু মানুষের মধ্যে দিয়ে।

এই সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দর্শককে শিল্পের অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে স্বীকার করা, আর বিপর্যয়ের জন্য তাঁদের সামগ্রিকভাবে দায়ী করা এক বিষয় নয়। প্যান্ডেলের সাফল্য নিয়ে কথা বলার সময় মানুষের আগমনকে ‘উৎসবের প্রাণ’ বলে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু কোনও বিপর্যয়ের পর সেই একই মানুষ কখনও এক অসংযত, নিয়ম না-মানা জনসমষ্টি হিসেবে আলোচনায় হাজির হন। যেন দর্শকরা শিল্পের সামাজিক জীবন গড়ে তোলার সময় স্বাগত, অথচ সংকটের মুহূর্তে কেবলই সমস্যার উৎস। এই বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিই প্রশ্নের দাবি রাখে। মানুষের আচরণ নিয়ে আলোচনা করা দরকার, কিন্তু সেই আচরণকে তার পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিচার করলে আমরা বুঝতে পারি না, মানুষ কীভাবে একে অন্যের প্রতিক্রিয়ায় সাড়া দেন।

একটি সমাবেশে মানুষের আচরণ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ অন্যদের চলাচল দেখে পথ বেছে নেন, চারপাশের প্রতিক্রিয়া থেকে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন এবং সেই অনুযায়ী নিজের সিদ্ধান্ত বদলান। ভিড়ের মধ্যে প্রত্যেকের কাছে সমান তথ্য থাকে না; সবাই পরিস্থিতিকে একইভাবে দেখতে বা বুঝতে পারেন না। কারও আচরণ বাইরে থেকে অধৈর্য বলে মনে হতে পারে, অথচ তার পিছনে থাকতে পারে বিভ্রান্তি, তাড়াহুড়ো কিংবা অন্যদের অনুসরণ করার প্রবণতা। এগুলি কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির আচরণের অজুহাত নয়। বরং মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের সিদ্ধান্ত বোঝার জন্য সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতিকেও বিবেচনা করা জরুরি।

zoom

দর্শকের সঙ্গে প্যান্ডেলের সম্পর্কের মধ্যে আর একটি বৈপরীত্য রয়েছে। সর্বজনীন পুজোর ঐতিহাসিক তাৎপর্য ছিল, পুজোর পরিসরকে বৃহত্তর জনসমাজের জন্য উন্মুক্ত করা। এই উন্মুক্ততার ধারণা পুজোকে পাড়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ করে তুলেছে। কিন্তু থিমপুজোর জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু প্যান্ডেলে সর্বসাধারণের জন্য দরজা খোলার আগেই, বিশেষ পাস বা অর্থের বিনিময়ে আগাম প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে একই প্যান্ডেল দেখার অভিজ্ঞতা সকলের কাছে একই সময়ে উপলব্ধ থাকে না। যাঁরা আগাম প্রবেশের সুযোগ পান, তাঁরা ভিড়ের আগেই শিল্পকর্মটি দেখার বিশেষ সুবিধা পান; অন্যদের অপেক্ষা করতে হয় সর্বসাধারণের জন্য প্যান্ডেল খোলা পর্যন্ত। ফলে যে সর্বজনীন আদর্শ পুজোকে বৃহত্তর জনসমাজের কাছে নিয়ে এসেছিল, তার মধ্যেই প্রবেশের নতুন স্তরবিন্যাস তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

এখানে প্রশ্নটি আগাম প্রবেশের ব্যবস্থাকে এক কথায় নিন্দা করার নয়। বরং দেখতে হয়, দর্শকের বিপুল উপস্থিতি যখন প্যান্ডেলের জনপ্রিয়তা ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রমাণ হয়ে ওঠে, তখন সেই দর্শকদের মধ্যেই কারা বিশেষ সুবিধা পান এবং কারা অপেক্ষমাণ জনতার অংশ হয়ে থাকেন। দর্শক প্যান্ডেলকে সামাজিক অর্থ দেন, অথচ সেই অভিজ্ঞতা পাওয়ার সুযোগও কখনও অর্থ ও বিশেষ প্রবেশাধিকারের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যায়। জনপরিসরের এই স্তরবিন্যাস দর্শকের ভূমিকা নিয়ে ভাবনাকে আরও জরুরি করে তোলে।

এখানেই ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের পার্থক্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন। দর্শকদের পারস্পরিক বিবেচনা ও নিয়ম মেনে চলার গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানগুলি বিপুল জনসমাগমের আয়োজন করে, তাদের পরিকল্পনা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতিতে মানুষের আচরণের বাস্তব জটিলতাকে বিবেচনা করতে হয়। নাগরিক বোধের কথা বলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে, একটি জটিল পরিস্থিতির ব্যাখ্যা কেবলমাত্র ব্যক্তির নৈতিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

zoom

চোরবাগানের ঘটনা নিয়ে ভাবতে গেলে ব্যক্তিগত আচরণ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং জনপরিসরে প্রবেশের অসম সুযোগকে একই আলোচনায় রাখা দরকার। কোনও বিপর্যয়ের পরে মানুষের চরিত্র সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সহজ, কঠিন কাজ হল, ঘটনাটি যে-সামাজিক পরিস্থিতিতে ঘটেছে, তার জটিলতা বুঝে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়া। প্যান্ডেল আমাদের একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানায়। সেই আহ্বানের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে মানুষের উপস্থিতিকে নিরাপদে ধারণ করার পাশাপাশি পুজোর অভিজ্ঞতাকে যথাসম্ভব উন্মুক্ত ও ন্যায়সংগত রাখার দায়িত্বও স্বীকার করতে হবে। দর্শক যখন দৃশ্যের অংশ হন, তখন তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও প্রবেশাধিকারের প্রশ্নও সেই দৃশ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন অমৃতা দাশগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

………………….

chorbagan stampede Durga Puja 2026 kolkata durga puja Pandal hopping Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar stampede

Share this article on