বাংলার মেয়েদের চিরাচরিত ঘরোয়া শিল্প– কাঁথা স্টিচ, সূচিশিল্প, আলপনা ইত্যাদি, সেটাকে ব্যবহার করে, তার সঙ্গে একটা ‘সাইকোলজিক্যাল ডাইমেনশন’, একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত মিশিয়ে যে শৈলীটা যোগেনদা তৈরি করেছিলেন, সেটা নিরুপম! লোকশিল্পের আলংকারিক দিকটাকে অক্ষুণ্ণ রেখে এককের অভিব্যক্তিকে, তার মনস্তত্ত্বকে ওই আঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলা– দেখে মনে হবে খুব সরল, কিন্তু সেই সরলতা নেই, বরং আরও এক্সপ্রেসিভ মেটাফরিকাল।
যোগেন চৌধুরী, ওঁর সমকালীন বাংলার শিল্পীদের মধ্যে ‘ওয়ান অফ দ্য ফাইনেস্ট’। ওঁর সমসাময়িক অনেকেই নাম করেছেন। খুব বিখ্যাত হয়েছেন। গণেশ পাইন, বিকাশ ভট্টাচার্য প্রমুখ। ওই সময়, বাংলার শিল্পীদের মধ্যে এখনও গণেশ হালুই রয়েছেন। কিন্তু যোগেনদা, আমি বলব, একটা তৃতীয় সত্তা। যোগেনদা-সহ এই তিনজন– বিশেষত আমার কাছে, ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এঁরা প্রত্যেকেই একটা নিজস্ব একটা রাস্তা তৈরি করতে পেরেছেন, যোগেনদাও।

কিন্তু যোগেনদার একটা বিশেষ দিক উপস্থিত। বাকি যাঁদের কথা বললাম, দেখা যাবে, তাঁদের প্রত্যেকেরই মূল ধারায় একটা পূর্ব আঙ্গিক রয়েছে, ‘প্রিডিসেসর’ যাকে বলে, অর্থাৎ একটা উপস্থিত শৈলী, সেখান থেকে ওঁরা তুলে নিচ্ছেন। সেটাকে ভেঙেচুরে খানিক নিজের মতো করে নিচ্ছেন। যেরকম বিকাশ ভট্টাচার্য একটা রিয়েলিজমকে নিজের মতো করে পালটে নিচ্ছেন। কিংবা গণেশ পাইন– বেঙ্গল স্কুলের একটা ধারাকে বেছে নিয়ে একেবারে নতুন একতা জায়গাতে নিয়ে যাচ্ছেন। এমনকী, গণেশ হালুইও এক ধরনের অ্যাবস্ট্রাকশনের মিশ্রণে নিজের শৈলী তৈরি করছেন। কিন্তু যোগেনদা আলাদা। ওঁর যে কাজ করার রীতি, যেটার জন্য উনি বিখ্যাত, যেটা ওঁর সিগনেচার, ওঁকে চেনা যায়– সেটা কিন্তু সম্পূর্ণভাবে একটা নিজস্ব তৈরি করা শৈলী।

সবচেয়ে মজার বিষয়, এই শৈলীটার উৎস বা মূল যদি খুঁজতে যাই– সেটা আমাকে কোনও মর্ডান আর্ট বা হাই আর্টের কাছে নিয়ে যায় না। বাংলার বাংলার মেয়েদের চিরাচরিত ঘরোয়া শিল্পের কাছে এনে ফেলে। কাঁথা স্টিচ, সূচিশিল্প, আলপনা ইত্যাদি। সেটা যে একটা উন্নততর শিল্পের অংশ হয়ে উঠতে পারে– তা কেউ ভাবেনি। একজন অ্যাকাডেমিক ঘরানার শিল্পী, এরকম একটা মাধ্যমকে একাত্ম করে নিচ্ছেন, ব্যক্তিক পর্যায়ে, সেটা খুব একটা চোখে পড়ে না। লোকশিল্পের একটা বৈশিষ্ট্য হল, তাতে ব্যক্তি থাকেই না, সমষ্টি থাকে। যোগেনদা ওরকম একটা লৌকিক শৈলীকে নিয়ে তার মধ্যে ব্যক্তিকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। দিতে পেরেছিলেন। আর একটা জিনিস যুক্ত করেছিলেন– একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত– ‘সাইকোলজিক্যাল ডাইমেনশন’। খুব স্বাভাবিকভাবে সেটা লোকশিল্পের আঙ্গিকে মেশানো কঠিন। লোকশিল্পের আলংকারিক দিকটা তাতে নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আলংকারিক দিকটা অক্ষুণ্ণ রেখে এককের অভিব্যক্তিকে, মনস্তত্ত্বকে ওই আঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলার মতো নিরুপম একটা কাজ যোগেনদা অবলীলায় করতে পেরেছিলেন। দেখে মনে হবে খুব সরল, কিন্তু সেই সারল্য নেই। সরল আঙ্গিক ব্যবহার করে, সরল রেখা ও ফর্ম ব্যবহার করে ছবিকে আরও এক্সপ্রেসিভ মেটাফরিকাল করে তোলা। ওঁর এই ক্ষমতাটা, আমার মনে হয়, ওঁর ছবিকে অসাধারণ করে তুলেছে।

যদি একটু পিছনের দিকে তাকাই, দেখতে পাব, বাংলায় এই ব্যাপারটাই কিন্তু করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শিল্পে, সাহিত্যে সর্বত্র। সীমিত স্কিল ব্যবহার করে, কল্পনাকে স্কিলের সঙ্গে মিশিয়ে কীভাবে ছবিকে আরও উচ্চতর একটা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, হাইলি ইন্ডিভিজুয়াল এক্সপ্রেশন নিয়ে আসা যায়– সেটা রবীন্দ্রনাথ দেখিয়ে গিয়েছেন। এবং সেটা যে উনি খুব সচেতনভাবে করেছেন তা নয়, আপনা থেকেই এসে গিয়েছে।

যোগেনদার ক্ষেত্রেও একইরকম ঘটেছে। যদিও এর অনেকগুলো স্তর রয়েছে। যদি যোগেন চৌধুরীর হয়ে ওঠার পর্যায়গুলো দেখে যায়– আর্ট কলেজ থেকে বেরিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন; একটা অ্যাকাডেমিক ঘরানা থেকে বেরিয়ে গিয়ে অন্য এক ধরনের শিল্প দেখছেন, যেটা কলকাতায় শেখা শিল্পের থেকে অনেকটা আলাদা; এই দুটো ঘরানাকেই উনি দেখছেন, কিছুটা আত্মস্থ করছেন, কিন্তু দুটোর কোনওটাতেই থাকছেন না; বরং ফিরে এসে যে কাজগুলো করছেন, তাতে সেই দু’-ধরনের দেখা থেকে, শেখা থেকে খানিক খানিক বিচ্ছুরণ ঘটছে, ছাপ রেখে যাচ্ছে। প্রথম দিকে খুবই ব্যক্তিগত। নিজের ভিতরের জগৎটা খুঁজে চলেছেন। এক ধরনের অন্বেষণ। তারপর দিল্লি চলে যাওয়ার পরে, যখন রাষ্ট্রপতি ভবনের কাজ করছেন– তখন বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছাকাছি আসছেন, তাঁদের কাছ থেকে দেখছেন। সেটাই পরে ওঁর ছবির সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকে নির্মাণ করেছে বলে আমার মনে হয়। শান্তিনিকেতন কিংবা কলকাতায় চলে আসার পরেও ওঁর মধ্যে এই চিন্তাটা ক্রিয়াশীল থেকেছে। ওঁর কাজের মধ্যে ছাপ ফেলেছে। আরও পরে, শেষের দিকের কাজগুলোয় ক্রমশ ব্যক্তি কম, আত্ম কম, জগৎ বেশি। অর্থাৎ নিজেকে অতিক্রম করে, এই মানুষগুলোকে ছাড়িয়ে গিয়ে, সিস্টেমটাকে বেশি ধরার চেষ্টা।

আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের দ্বারা যোগেনদা যথেষ্ট অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ওঁর অত বড় চাকরি ছেড়ে শান্তিনিকেতন চলে আসার নেপথ্যেও সেই অনুপ্রেরণা ছিল। কাজের মধ্যেও। স্টাইলগতভাবে বিপুল পার্থক্য থাকলেও, ওঁর আর রবীন্দ্রনাথের কাজের ধরনে একটা মিল আছে। নিজের সৃষ্টিশীল সত্তাকে ছাপিয়ে গিয়ে কিছু করা। নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে না থাকা। সীমার মধ্যে থেকেও অসীমের দিকে এই যাত্রাটা উনি রবীন্দ্রনাথের থেকে নিয়েছিলেন।
আরেকটা জিনিস নিয়েছিলেন। সেটা হল, প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। বাংলাকে, বাংলার শিল্পকে পৃথিবীর নানা প্রান্তের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া।

রিফিউজি জীবনের জন্যেই বোধহয়, যোগেনদার সমাজ, মানুষের সঙ্গে একটা সংযুক্তি ছিল। সোশাল এনগেজমেন্ট। সেটা ওঁর ছবিতে খুব বেশি করে না এলেও, অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে প্রকাশ পেত। আটের দশকের পরে, বাংলার শিল্পকে পুনরুদ্ধার এবং পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর একটা বিরাট অথচ নিঃশব্দ অবদান। এ ধরনের দায়িত্ব শিল্পীরা সচরাচর খুব একটা নেন না। কারণ সেটা তাঁদের সৃষ্টির যাপন থেকে বেশ খানিকটা দূরের একটা ব্যাপার, এবং এ ধরনের কাজগুলো একজন শিল্পীর নিভৃত একক যাপনের ক্ষতিও করে। যোগেনদা কিন্তু এই দায়িত্বটা নিয়েছিলেন; এবং অন্যদের সেটা নেওয়ার জন্য খুব উৎসাহও দিতেন। অন্তত ৩০-৩৫ বছর ধরে এই কাজটা উনি করে গিয়েছেন। হয়তো যোগ্য সহায়তা পাননি, বা ওঁর সঙ্গে যাঁরা ছিলেন– তাঁরা হয়তো ওঁর মতো করে ভাবতে পারেননি। ফলে উনি যে পর্যায়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, সেটা হয়নি। কিন্তু চেষ্টাটা করেছেন উনি। নিরলসভাবে।

এবং সেজন্যই বোধহয়, যোগেনদার একটা পরিচিত ভাবমূর্তি আছে, মানুষের কাছে একটা স্বীকৃতি রয়েছে। অনেক বড় শিল্পী ভালো কাজ করেও মানুষের কাছে পৌঁছতে পারেন না, খুব ছোট সীমিত একটা পরিসরের ভেতরেই কেবল তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা। কিন্তু সামাজিক কর্মকাণ্ডে যোগেনদার সক্রিয় অংশগ্রহণ, শিল্পকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার যে একটা সচেতন প্রচেষ্টা– সেটা অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ওঁকে। এই দিকটা ওঁকে অন্য অনেক শিল্পীদের থেকে আলাদা করে দেয়।

যোগেনদার সঙ্গে আলাপ হওয়ার অনেক আগে, আমি প্রথমে ওঁর কাজ দেখেছিলাম। তখন আমি ছাত্র। সাতের দশকের শেষ দিক হবে। দিল্লিতে ওঁর একটা এগজিবিশন চলছিল। গ্রুপ এগজিবিশন। ললিত কলা অ্যাকাডেমিতে। ওঁর ‘টাইগার ইন দ্য মুনলাইট’ ইত্যাদি ছবি ছিল। গ্রুপের মধ্যে থেকেও কাজ দেখে ওঁকে আলাদা মনে হয়েছিল তখনই। তিনি উপস্থিত ছিলেন সেখানে, দেখেছিলাম ওঁকে। কিন্তু আমার লাজুক প্রকৃতির জন্য কাছে গিয়ে ওঁর সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। আমার যাঁরা শিক্ষক ছিলেন, দেখছিলাম, ওঁরা গিয়ে যোগেনদার সঙ্গে কথা বলছেন, ছবি নিয়ে। কিন্তু আমি সেদিন শুধুই মুগ্ধ হয়ে ওঁর কাজ দেখেছিলাম।

দু’ বছর পরে, সম্ভবত ’৮১ সালে, যখন ভোপালে ভারত ভবনের উদ্বোধন হল, ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমি ছিলাম, যোগেনদাও ছিলেন। তখন আমাদের প্রথম কথা হয়। মনে আছে, উনি বলেছিলেন যে, আমাদের কিছু পাবলিকেশন শুরু করতে হবে, বাংলার শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলতে হবে ইত্যাদি। আজ থেকে প্রায় অর্ধ-শতাব্দী আগের কথা, তখনই এইসব কথা উনি বলেছিলেন। অর্থাৎ সেই সময় থেকেই এই স্বপ্নটা যোগেনদা দেখতে শুরু করেছিলেন। এখানে, অর্থাৎ শান্তিনিকেতনে আসার পর সেটা হয়তো আরও বেশি করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।
শান্তিনিকেতনে আসার পর আমাদের কথাবার্তা নিয়মিত হতে লাগল। নতুন কাজ করলে অনেক সময় আমাকে ডেকে দেখাতেন। ওঁর একটা-দুটো এগজিবিশনের ক্যাটালগও আমি লিখেছি। সেটা যদিও আমাদের ব্যক্তিগত আলাপের কথা। কিন্তু যেটা বলার, তা হল, শিল্প নিয়ে, শিক্ষা নিয়ে ওঁর যে ভাবনা– তা উনি বলেছিলেন বারবারই। প্রচুর আলোচনা হত। শিল্পকে কীভাবে সাধারণ ইশকুল স্তরের শিক্ষার অংশ করে তোলা যায়। অর্থাৎ স্কুল-সিলেবাসের মধ্যে আবার কীভাবে শিল্পকে নতুন করে যুক্ত করা যায়। এজন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু খুব একটা ফল হয়নি। তাছাড়া আধুনিক শিল্পের যে মিউজিয়াম, কলকাতায়, তা নিয়েও কথা হয়েছে। এ সমস্ত কথা যখন উনি বলতেন, ওঁর আবেগটা, ইনভলভমেন্টটা কথার মধ্যে টের পাওয়া যেত। আমিও সবসময় যে সমস্ত কাজে ওঁকে সঙ্গত করতে পেরেছি, তা নয়। কিন্তু মনে মনে শ্রদ্ধাটুকু রয়ে গিয়েছে। কারণ ‘হি ওয়াজ আ ম্যান হু হ্যাড আ মিশন’। সাধারণ ছবি আঁকা, নিজের শিল্পচর্চার থেকে বেরিয়ে গিয়ে, মানুষের জন্য যে শিল্প, তার প্রতি একটা নিবেদিত মন ছিল। সেটাই, অন্তত আমার কাছে, শিল্পী যোগেন চৌধুরীকে পৃথক করে দেয়। প্রণত হতে ইচ্ছে করে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved