

মাছের টুকরো থেকে খাবারের ভাগাভাগি– কোনও পরিবারে এই ঘটনাগুলো পারিবারিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার প্রতিফলন। বাড়ির মেয়ে-বউরা সব রান্না করে বাড়ির সব পুরুষ এবং ক্ষুদে সদস্যদের খেতে দিয়ে তারপর সবার শেষে খেতে বসবে। পাতে পড়বে মাছের ছোট টুকরো কিংবা ল্যাজার অংশের মাছ। মা-কাকিমাদের জিজ্ঞেস করলে বলেছেন, ওঁরা নাকি এমন ছোট টুকরোই ভালোবাসেন। অনেক দিন ধরেই এই নিয়ম, এমনটাই যেন স্বাভাবিক।
মধ্য কলকাতার ভবানীপুরে পুরনো একটা বাড়ি। উঁচু উঁচু সিঁড়ি দিয়ে উঠে বামদিকের ঘরে লম্বা একটা সেগুন কাঠের খাবার টেবিল। জনা পঁচিশের সংসার। এই বাড়িতেই বিয়ে করে আসেন আমার বড় মাসি সান্ত্বনা লাহিড়ী। কাঠ বাঙাল বাড়ি থেকে কলকাতার রক্ষণশীল শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তিনি অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছিলেন। বড় মাসি অত্যন্ত ডাকাবুকো এবং একজন অসম্ভব প্রতিবাদী চরিত্র ছিলেন। শ্বশুরবাড়িতে মাছের পেটি বা অপেক্ষাকৃত বড় অংশগুলো বাড়ির পুরুষদের জন্যই বরাদ্দ থাকত। বড় মাসি সেই সংসারে ঢুকে সেই নিয়মে ব্যাঘাত ঘটালেন। মাছ ভাজতে ভাজতেই রান্নাঘরে কড়া করে বলে দিতেন– ‘আজকে মাছের অমুক পিসটা আমি খাব। আমার জন্য তুলে রাখলাম, কেউ যেন না ধরে। কেমন?’
বড় মাসি এ-নিয়মের মুখে ছাই দিয়ে ছোটখাট একটা সাংসারিক বিপ্লব করেছিলেন বটে! তবে কতজন মহিলা মাসির মতো এই চিরাচরিত নিয়ম ভেস্তে দিতে পেরেছে? সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন।
আসলে বাঙালি পরিবারে সেই কোন কাল থেকে মাছ খাওয়া নিয়ে একটা অলিখিত নিয়ম রয়েছে। মাছের মুড়ো, মাছের ল্যাজা আর মাছের পেটি– এগুলো কাদের পাতে পড়বে? এই প্রসঙ্গে ছেলেবেলায় পড়া একটা ছড়া মনে পড়ছে–
‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা
চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা
মাছ কুটলে মুড়ো দেব
ধান ভানলে কুঁড়ো দেব…’
কারওর খাবার পাতে মাছের মুড়ো তুলে দেওয়ার অর্থ হল– তাকে সম্মান জানানো। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ যিনি, নিয়মমতো তাঁরই মাছের মুড়ো খাওয়ার কথা। বউভাতের দুপুরের অনুষ্ঠানে তো রীতিই আছে শ্বশুরের পাতে নতুন বউমা যত্ন করে মাছের মুড়ো বেড়ে দেবে। কাতল বা পাকা রুই মাছের পেটির টুকরো বা অপেক্ষাকৃত ভালো টুকরোগুলো বাড়ির পুরুষ বা ছোট সদস্যদের জন্যই তুলে রাখা হত। বাজার থেকে মাছ আসার পর মাছ কুটে, ধুয়ে, রেঁধে পুরো পরিবারকে যারা খাওয়াত, তারা নিজেরা মাছের ল্যাজা বা তার ওপরের ছোট অংশ কিংবা শুধুমাত্র মাছের তেল, ফোপড়া, বুকো দিয়ে চচ্চড়ি খেতেন।
আমার আরও এক মাসি স্বাতী সান্যালের মাছের ল্যাজা নিয়ে এক মজার অভিজ্ঞতা শুনেছিলাম। আগের পর্বে বোয়াল মাছ নিয়ে অনেক কথা লিখেছিলাম। স্বাতী সান্যালের বাপের বাড়িতে বোয়াল মাছ আসত না। ওঁর শ্বশুরবাড়িতে বোয়াল মাছ রান্না হয়েছে। মাসি মুড়োটার অর্ধেক শ্বশুর আর বাকি অর্ধেক বরকে দিয়ে নিজে ল্যাজাটা খেলেন। পরের দিন মাসির শাশুড়ি বললেন, ‘তুমি ল্যাজাটা নিজে খেলে? আমি ল্যাজাটা ছেলেকে দেব ভেবেছিলাম।’ মাসি খুব লজ্জা পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এ বাড়িতে ছেলেদের ল্যাজা দেওয়া হয় বুঝি?’ আসলে বোয়াল মাছের ক্ষেত্রে বিষয়টা উল্টো! বোয়াল মাছের মুড়ো খাওয়া হয় না। তেল থাকার কারণে ল্যাজার দিকের অংশটাই শ্রেষ্ঠ। বাপের বাড়িতে বোয়াল মাছ না আসায়, এই বিষয়টা মাসি জানতেন না। যাই হোক, সময় ল্যাজা-মুড়ো ভাগাভাগি– এই নিয়মের বেড়াজালকে ধীরে ধীরে আবছা করে দিলেও মৎস্যের আর্কাইভে সমাজতত্ত্বের এই সমীকরণ আজীবন থেকে যাবে।

মাছের অ্যানাটমি দেখতে গেলে প্রত্যেক মাছের অংশের আলাদা আলাদা গুরুত্ব আছে। একথা হাড়ে হাড়ে সত্যি যে, আমরা মৎস্য-প্রিয় বাঙালি জাতি মাছের কোনও অংশই ছাড়ি না। কথাতেই আছে, ‘বাঙালরা না কি মাছের আঁশটা পর্যন্ত ফেলে না।’ অতএব আমরা মুড়ো থেকে ল্যাজা সবটা চিবিয়ে-চুষে-ছিবড়ে করে খেয়ে ফেলি। আমার দাদু বলতেন, ‘মাছ খেতে হবে বিড়ালের মতো করে, পাতে কিচ্ছু পড়ে থাকবে না।’
মাছের মুড়ো দিয়ে যদি শুরু করি, তবে আগের কথায় ফিরে যাই। ‘সম্মান’ আর ‘মাছের মুড়ো’– এই তিন শব্দ একই সঙ্গে বলা যেতে পারে। আইবুড়ো ভাতে হবু কনে বা বরকে মাছের মুড়ো আলাদা করে ভেজে পাতে দেওয়া হয়। মাছের মুড়ো খাওয়ার উপকারিতা বা বিজ্ঞানসম্মত নানা কারণ তো আছেই। এই যেমন মাছের মাথার প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ চোখের জ্যোতি উজ্জ্বল রাখে কিংবা ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে।
মাছের ডিমের আলাদা গুরুত্ব আছে। বিশেষ করে ইলিশ মাছের ডিমের। রুই কাতল মাছের ডিমও অনেকেই ভালোবাসে আবার অনেকেই খান না। পেটিতে মাছের তেলের ভাগ অনেকটা বেশি থাকে আর গাদাতে মাছের ভাগ বেশি থাকে। ল্যাজা আর তার ওপরের দিকে মাছের টুকরোতে খুব কাঁটা হয়।

মাছের টুকরো থেকে খাবারের ভাগাভাগি– কোনও পরিবারে এই ঘটনাগুলো পারিবারিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার প্রতিফলন। বাড়ির মেয়ে-বউরা সব রান্না করে বাড়ির সব পুরুষ এবং খুদে সদস্যদের খেতে দিয়ে তারপর সবার শেষে খেতে বসবে। পাতে পড়বে মাছের ছোট টুকরো কিংবা ল্যাজার অংশের মাছ। মা-কাকিমাদের জিজ্ঞেস করলে বলেছেন, ওঁরা না কি এমন ছোট টুকরোই ভালোবাসেন। অনেক দিন ধরেই এই নিয়ম, এমনটাই যেন স্বাভাবিক।
বাড়ির কর্তা নিয়ম করে বাজারে যাবেন। পছন্দ মতো মাছ কিনে আনবেন। বাড়ির মেয়ে বা বউদের পছন্দ অনুযায়ী মাছ কখনও কি বাড়িতে এসেছে? বিয়ের পর মেয়েরা তাদের চেনা সংসার থেকে অন্য অচেনা সংসারে গিয়ে থাকতে শুরু করে। সমাজতাত্ত্বিক বা সোশিওলজিস্টের ভাষায় বিবাহ এক ধরনের ইনটিমেট মাইগ্রেশন। নতুন পরিবারে এসে সেই পরিবারের মতো করে নতুন বউকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। যেমন আমার বড় মাসিকেও নিতে হয়েছিল। সেই খাপ খাওয়ানোর তালিকায় খাদ্যাভাসের কথা প্রথমদিকেই থাকবে।
একটা পারিবারিক ব্যক্তিগত গল্প বলি। আমার ছোটকাকা একদিন বললেন, ‘বোয়াল মাছ, শুঁটকি– এসব তোর ঠাকুমা খেতেন। নোয়াখাইল্লা তো! আমাদের বাড়িতে কোনও দিন এসব আসত না।’ এক্ষেত্রে আমার ঠাকুমা শুঁটকি ভালোবাসলেও পরিবারের বাকি সদস্যদের শুঁটকির গন্ধে গা গুলিয়ে উঠত বা বমি পেত। সেই কারণে শুঁটকি কখনও রান্না হয়নি।
আগেকার দিনে খুব অল্পবয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত, জায়া ও পতির উভয়ের বয়সের অনেকটাই ফারাক থাকত। স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট মেয়েটির ওপর বৈধব্যের নিষ্ঠুর নিয়ম চাপানো হত। যখন মৈত্রেয়ী এক্সপ্রেসে বাংলাদেশ যাচ্ছি, তখন ঈশ্বরদীর পরে পাকসি নামে একটা ছোট্ট স্টেশন পেরিয়েছিলাম। পদ্মার পাড়ে ছোট্ট একটা গ্রাম। সেই সময় হঠাৎই মনটা ভীষণ বিষণ্ণ হয়ে উঠল। সুনন্দা সিকদারের ‘দয়াময়ীর কথা’ পড়া ওঁর পালিকা মা স্নেহলতার কথা মনে পড়ছিল। স্নেহলতা ছিল বাল্যবিধবা। বৈধব্যের পর বেশ কিছুদিন শ্বশুরবাড়িতেই ছিলেন। ইলিশের মরশুমে গোটা বাড়ি পদ্মার ইলিশের গন্ধে ম-ম করছে। বাড়ির পুরুষরা আয়েশ করে ইলিশ ভাপা খাচ্ছে অথচ কারওর খেয়াল নেই বারো বছরের মেয়েটির কথা!
ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চোখের বালি’ সিনেমার একটা দৃশ্যের কথা বলতে ইচ্ছে করছে। আশালতা আর অন্নপূর্ণা তখন কাশীতে। আশালতা সন্তানসম্ভবা, তার স্বাদের আয়োজন করছে বিধবারা। লবণ-হলুদ মাখানো মাছ কড়াইয়ের তেলে ছাড়তেই একজন অল্পবয়সি বিধবা মেয়ে ছলছলে চোখে এগিয়ে এসে কড়াইতে মাছের টুকরোর দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
বিধবা হলে মাছ ছোঁয়া বা খাওয়া যাবে না– শহুরে সমাজে এসব নিয়ম এখন অনেকটাই আলগা হয়ে গিয়েছে। তবে মৎস্যের জীবন্ত সংগ্রহশালায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই নির্মম ছবিগুলো রাখা থাকবে।

মাছ কোটা একটা শিল্প। বাড়ির মেয়ে বউরা জানতেন কোন মাছ কীভাবে কাটতে হয়। এ যেন তাদের জন্ম থেকেই অতি প্রাচীন এক সহজাত গুণ। বঙ্গের বিপুল মৎস্য সম্ভারের প্রতিটি মাছ কোটার নিয়ম আলাদা। ইলিশ মাছ কীভাবে কাটতে হয়, তা ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’-এর দ্বিতীয় খণ্ডে প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী লিখেছেন। লিঙ্গনির্বিশেষে নতুন প্রজন্মের রাঁধুনিরা সেই লেখা পড়ে অনায়াসে ইলিশ মাছ কেটে ফেলবেন।

উনি লিখেছেন ইলিশ মাছের রক্তেই মাছের তেল মিশে আছে। মাছের পিত্ত, ঘোড়ার খুর, পৈতা, টিকটিকির ল্যাজের মতো ‘অজীর্ণ কারক’ ইলিশ মাছের শরীর থেকে বাদ দিয়ে দিতে হবে। তবে না ইলিশ মাছের টুকরো হবে! আর তারপর তা রান্না করে স্বাদ আসবে! আঁশবটি দিয়ে বড় উঠোনে যাঁরা সারাদিন মাছ কোটেন, প্রজ্ঞাসুন্দরীর বই না-পড়েও তাঁদের এই জ্ঞান আছে, সেই বাল্যকাল থেকেই।
মাছের বাজারে বাবু দাসের সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম যে, একসময় বাজারে মাছ কাটানোর কোনও ব্যবস্থা ছিল না। বাড়ির কর্তারা মাছ কিনে যে-যার বাড়িতে নিয়ে যেতেন। জিওল মাছ এনে গামলায় জল দিয়ে জিইয়ে রাখা হত। তারপর বাড়ির মহিলারা ছাই দিয়ে কই মাছ কুটতে বসতেন। ট্যাংরা মাছ ও জলে জিয়ানো থাকত। তারা যেমন একেকজন বাঘা মাছ রাঁধিয়ে ছিল, তেমনই মাছ কুটতে ও খুবই দক্ষ ছিল। এখন অবশ্য বাজারেই মাছ কাটিয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। অধিকাংশ বাজারেই এই কাজটি মহিলারা করে থাকেন তবে অনেক বাজারে পুরুষরা ও খুব নৈপুণ্যের সঙ্গে মাছ কুটে দেয়। এই প্রসঙ্গে একটা কথা না-বললেই নয়, বর্তমান বাংলাদেশে বাজারে মাছ কাটানোর চল নেই। যেই কারণে, বড়-ছোট সব আকারের মাছই ওপার বাংলার এই প্রজন্মের মেয়ে বউরা ও খুব দক্ষতার সঙ্গে কাটতে জানে। এই জ্ঞান আমাদের প্রজন্মে বিরল।

মাছ নিয়ে মহিলাদের জ্ঞান শুধু কোটা বা রান্না করাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তার সংরক্ষণ করতে ও তারা ওস্তাদ ছিল। ফিরে যাই অবিভক্ত বাংলায় আমার ঠাকুমার ভিটে নোয়াখালিতে। বর্ষায় হাতে চার-পাঁচটা করে মেঘনার ইলিশ ঝুলিয়ে বাবা-কাকারা বাড়িতে আসতেন। তখন তো আর ইলিশ মাছ চালান হত না। দূর-দূরান্তে তখন বরফকলের কোনও ব্যবস্থা ও ছিল না। তার ওপর নোয়াখালি এমনিতেই জলা জায়গা, খাল-বিল-নদী-নালা মানুষের দেহের শিরা ধমনির মতো ছড়িয়ে আছে সেই অঞ্চলে। তাই প্রতি বাড়ির মা-ঠাকুমা-দিদিমারা নোনা ইলিশ তৈরি করার কৌশল জানতেন। ত্যারছা করে কাটা মাছ নুন-হলুদ মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতেন। ইলিশের ডিম ও সেইভাবে রাখা হত। ইলিশের মরশুম ফুরলে সেই ইলিশের ডিমের শুঁটকি আর নারকোল দিয়ে ভেজে ঝুরো কিংবা সবজি দিয়ে নোনা ইলিশের ঝোল।
সংরক্ষণের আরেকটি কৌশলও মহিলারা জানতেন। সেটা অবশ্য পশ্চিমবঙ্গে বেশি প্রযোজ্য। তা হল অম্বল বা টক করে রাখা। আমার সেজ মাসি বলেছেন বর্ধমানে ওঁর শ্বশুরবাড়িতে কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ধারা বজায় রেখেছে। বাড়ির পুকুরে ছোট-বড় নানা মাছ ধরা পড়ত। উঠোনে বসে সেই মাছ কেটে সঙ্গে সঙ্গে সপরিবার হাতে হাতে মাছভাজা খেয়ে ফেলত। বাকি মাছগুলো তেলে সরষে ফোড়ন দিয়ে তেঁতুল গোলা, সরষে বাটা আর আখের গুড় দিয়ে ফুটিয়ে বড় কালো পাথরের জাম বাটিতে করে আমিষ হেঁশেলে রেখে দিত। দিন ১৫ ধরে খাওয়ার শেষ পাতে তৃপ্তি করে সবাই সেই মাছের টক খেত। যত দিন যায়, মাছের টক তত মজে। বর্ধমান, বীরভূম কিংবা মেদিনীপুর যেখানে খুব গরম পড়ে সেখানে খাওয়ার শেষ পাতে টক লাগে বইকি!
…………………..

…………………..
একথা নতুন নয় যে, মাছের সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতির সম্পর্ক খুব গভীরে প্রথিত। মাছের বাজার আর রান্নাঘরের ঊর্ধ্বে গিয়ে মাছ পারিবারিক ভিতরের সম্পর্ককে ও সামাজিকভাবে ব্যাখ্যা করে। মাছের টুকরোয় সেসব পারিবারিক দায়িত্ব, ক্ষমতা কিংবা ত্যাগের গল্প লেখা থাকে। কোন মাছের টুকরো কার পাতে পড়বে, আপাতদৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্ত খুব স্বাভাবিক মনে হলেও এর মধ্যে বহুকালের অলিখিত নিয়মটা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। মাছের মুড়ো, পেটি, গাদা এই টুকরোগুলো পরিবারের পুরুষদের পাতে বেড়ে দিয়ে ফেলে দেওয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা ল্যাজা দিয়েই নিজেদের জন্য অতীব সুস্বাদু রান্না করতেন বাড়ির মহিলারা। একটা প্রশ্ন আসে যে, ছ্যাঁচড়ার মতো অতি উপাদেয় পদ কি মহিলারা সেইভাবেই আবিষ্কার করেছিলেন? এই সামাজিক অভ্যাস বাড়ির মেয়ে বউদের ওপর বহুকাল ধরে নিয়তির মতো জুড়ে গিয়েছে।

কোন ঋতুতে কোন মাছ খাওয়া উচিত, মাছ দিয়ে নানা রোগের টোটকা, মাছ রান্নার বিভিন্ন কৌশল এবং সংরক্ষণ– মাছকে কেন্দ্র করে রান্নাঘরের এইসব জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে নিয়ে চলেছে মেয়েরা। ল্যাজা, কাঁটা খাওয়া যে মানুষ, সে-ই কিন্তু পারিবারিক রন্ধন ঐতিহ্যের সংরক্ষক!
আজকের দিনে এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রতিটা পরিবারে খাদ্যাভ্যাস আর লিঙ্গ ভূমিকা অনেক বদলে গিয়েছে। বারান্দায় কিংবা উঠোনে বসে আঁশবটি দিয়ে মাছ কোটার দৃশ্যও এখন প্রায় অধিকাংশ বাড়িতেই বিরল। যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়েছে, তিন-চারজনের ছোট সংসার, সময়ের অভাব, আঁশবটি ব্যবহার না-জানা এসব নানা সামাজিক কারণ বাড়িতে মাছ কোটা শিল্পের অবক্ষয়ের জন্য দায়ী। মানুষের সচেতনতার সঙ্গে সঙ্গে মাছের টুকরোকে ঘিরে সম্পর্কের মানচিত্র বা রাজনীতি ও ম্লান হয়ে গিয়েছে। তবে এই কথাগুলো মা-মাসিদের স্মৃতিতে অপ্রকাশিত হয়ে থেকে গিয়েছে, যা মৎস্যের জীবন্ত জাদুঘরের দলিল।
…………………………
পড়ুন হিস্টোরিফিস্টোরি-র অন্যান্য পর্ব
পর্ব ১. ভদ্দরলোকের মাছ, ছোটলোকের মাছ
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved