fish of elite and fish of subalterns: A dynamic history | Robbar
Robbar
  • ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভদ্দরলোকের মাছ, ছোটলোকের মাছ

দিদিমা ল্যাটা আর পাঁকাল মাছকে পাঁকের মাছ বলত, পাঁকে থাকে বলে ওই মাছ বাড়িতে আনা যায় না। ওপারে ভিটেমাটি সর্বস্ব ছেড়ে আসা মানুষেরা যখন এপারের কলোনিগুলোতে এক চিলতে ছাদের আশায় রাত জেগে জমি পাহারা দিচ্ছে, সেই সময় তাদের স্বাদগ্রন্থির অনেক অভিযোজন ঘটেছিল। তেলাপিয়া, লইট্যা, গুলে, বেলে, পাঁকাল, চারাপোনা, ল্যাটা, ভেদা আরও অনেক মাছের নাম জুড়ে গিয়েছিল তাদের তালিকায়। একইভাবে অনেক পরিবারের মাছ খাওয়ার তালিকা থেকে এই নামগুলো বাদও পড়েছিল।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১৫:০২   
Facebook WhatsApp Messenger

আচ্ছা, মাছকে যদি আমাদের নদীমাতৃক অবিভক্ত বঙ্গ প্রদেশের মানুষের জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলি, তাহলে কি খুব ভুল বলা হবে? সে তো শুধু আমার কথা বা আজকের কথা নয়, সেই কোনকাল থেকেই একথা সত্যি। চর্যাপদের রাস্তা ধরে, মঙ্গলকাব্যের যাত্রাপথ বেয়ে সময়ের সঙ্গে বেড়ে চলা এই মৎস্যের আর্কাইভ যেন নদীর মতোই বহমান। 

zoom
কালীঘাটের পটচিত্র

আদি গঙ্গার পাড় ধরে ছোট ছোট জনপদগুলির নাম যথাক্রমে গড়িয়া, রথতলা, বৈষ্ণবঘাটা, নাকতলা, বাঁশদ্রোনি… শ্রীচৈতন্যদেবের বিশ্রামের তাঁবু পড়েছিল এই বৈষ্ণবঘাটায়, সেই থেকে জায়গার এমন নামকরণ। মধ্যযুগে মনসামঙ্গলের প্রেক্ষাপটে বেহুলা আর লখিন্দরের স্বর্গযাত্রাও এই আদিগঙ্গার জলপথে। জলজঙ্গলে ঘেরা, কম জনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চল দেশভাগের পরে দক্ষিণ কলকাতায় বহু উদ্বাস্তু মানুষের ঘর হয়ে উঠল। যুগ যুগ ধরে কত ইতিহাস আগলে রেখেছে আমার বড় হয়ে ওঠার দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চল। মেট্রোরেল, ঝাঁ-চকচকে ক্যাফে আর রেস্তোরাঁর আড়ালে আজও সেইসব ইতিহাসের গন্ধ বড়ই তীব্র। কালের নিয়মে সেই সব ইতিহাসরা জায়গা করে নিয়েছে এলাকার মানুষের মুখে মুখে। সেইসব ইতিহাস আর গল্পই আমি খুঁজে চলি। 

zoom
মৎস্য অবতার

মনসামঙ্গল আর বেহুলা-লখিন্দরের কথা বলতে বলতে মাছ নিয়ে এই মধ্যযুগীয় কাব্যের কতগুলো পঙ্‌ক্তি মনে পড়ল। 

‘মৎস্য মাংস কাটিয়া থুইল ভাগ ভাগ।
রোহিত মৎস্য দিয়া রান্ধে কলতার আগ।।
মাগুর মৎস্য দিয়া রান্ধে গিমা গাছ গাছ।
ঝাঁঝ কটু তৈলে রান্ধে খরসুল মাছ।।
ভিতরে মরিচ গুঁড়া বাহিরে জড়ায় সুতা।
তৈল পাক করি রান্ধে চিংড়ীর মাথা।।
ভাজিল রোহিত আর চিতলের কোল।
কৈ মৎস্য দিয়া রান্ধে মরিচের ঝোল।।
ডুম ডুম করিয়া ছেঁচিয়া দিল চৈ।
ছাল খসাইয়া রান্ধে বাইন মৎস্যের খৈ।।’

চাঁদ সওদাগরের বাড়িতে নববধূ হয়ে এসেছে বেহুলা। বিয়ের রান্না নিয়ে সে এক হুলস্থুল কাণ্ড। নদীকেন্দ্রিক বাংলায় প্রোটিনের উৎস হিসেবে মাছের কদর মাংসের থেকে খানিক বেশি বললেই চলে। তবে মাছেদের মধ্যে বরাবর উঁচু জাত আর নিচু জাতের ভাগাভাগি ছিল। সেকালেও ছিল, একালেও আছে। মঙ্গলকাব্যের এই পঙ্‌ক্তিগুলোর সব মাছই সেকালের উচ্চবিত্ত বাঙালির পরম প্রিয় ছিল। শুধু বাইন বা পাঁকাল মাছ সেই তালিকায় গণ্য হবে না। তবে কি বাইন মাছের সমগোত্রীয় মাছেদের তথাকথিত ‘ছোটলোকের মাছ’ বলা হত বা হয়? 

zoom
পাঁকাল মাছ

মৌখিক ইতিহাস নিয়ে কাজ করছি বেশ কিছু বছর হল। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা পরিবারগুলোর খাদ্যাভাস নিয়ে বিভিন্ন বয়সের মানুষের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের খাদ্যাভাসের প্রায় অর্ধেকের বেশি অংশ জুড়েই আছে মাছ। এইসব মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েই জেনেছি যে, প্রত্যেক পরিবার তাদের নিজেদের স্বাদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, বা বলা চলে স্বাদের অভিযোজন অনুযায়ী মাছ খাওয়ার একটা নির্দিষ্ট শ্রেণিবিন্যাস মেনে চলে। 

zoom
খরশুলা মাছ

রুই, কাতল, চিতল, ইলিশ– এগুলো সবসময়ই রাজকীয় মাছের মর্যাদা পেয়ে এসেছে। ‘ভদ্রলোকের মাছ’ বা ‘ভালো মাছ’ এই শব্দগুলো কিছু পরিবার এবং মানুষের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজ যেন অদ্ভুতভাবে বেঁধে দিয়েছে।

আমার মামাবাড়ি ফরিদপুরের বাঙাল। মৎস্যপ্রিয় একটি পরিবার। তবুও অনেক মাছকেই আমার দিদিমা অন্ত্যজ মাছ বলতেন। অর্থাৎ সেইসব মাছ নিচু কুলের মাছ, কখনওই বাড়িতে আসত না। তার মধ্যে পাঁকাল বা বাইন, ল্যাটা, লইট্যা মাছ তো অবশ্যই ছিল। 

zoom
বেলে মাছ

অন্ত্যজ মাছের কথা লিখতে গিয়ে আমার সেজমাসির সঙ্গে একটা সাক্ষাৎকার মনে পড়ছে। আমার সেজমাসির বিয়ে হয় এদেশীয় বা ঘটি বাড়িতে। মাছ নিয়ে মাসির শ্বশুরবাড়ির প্রবল বাছবিচার ছিল। বাপের বাড়িতে অনেক মাছের মধ্যে কইমাছ খুবই সমাদৃত মাছ ছিল। মাসির বিয়ের পর কইমাছ নিয়ে হল এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। একজন আত্মীয় ধানক্ষেতের কই মাসির শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে আসে। সেই কইমাছ কে কাটবে সেই নিয়ে বিষম বিপত্তি শুরু হয়। অবশেষে মাসির শাশুড়ি-মা জামাকাপড় পালটে গায়ে গামছা জড়িয়ে কইমাছ কুটতে বসেন। মাছ কুটতে কুটতে আমার মেসোমশাইকে কড়া করে বলে দেন যে, কেউ যদি এই মাছ বিনা পয়সাতেও দেয়, তাও যেন ছেলে বাড়িতে এই মাছ না আনে। মাসির ননদ অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাদের বাড়িতে অতিথি এলে তোমরা কইমাছ খাওয়াও বুঝি?’ 

zoom
তেল-কই

তেল-কই যে পুব বাংলার মানুষের ভীষণ প্রিয় রান্না। বাপের বাড়িতে অতিথি এলে তেল-কই দিয়ে দুটো ভাত খাওয়া ছিল অতিথি আপ্যায়নের মধুর স্মৃতি। বিয়ের পর সেই ঘটনাই হয়ে গেল লজ্জার! কথা বলে জেনেছি, অনেক এদেশীয় বাড়িতেই কইমাছ অন্ত্যজ। 

মৌখিক ইতিহাস নিয়ে কাজ করার সুবাদে প্রান্তিক সম্প্রদায়ের নানান মাছের নানান গল্প আমি শুনেছি। এই যেমন আমার দিদিমা ল্যাটা আর পাঁকাল মাছকে পাঁকের মাছ বলত, পাঁকে থাকে বলে ওই মাছ বাড়িতে আনা যায় না। ওপারে ভিটেমাটি সর্বস্ব ছেড়ে আসা মানুষেরা যখন এপারের কলোনিগুলোতে এক চিলতে ছাদের আশায় রাত জেগে জমি পাহারা দিচ্ছে, সেই সময় তাদের স্বাদগ্রন্থির অনেক অভিযোজন ঘটেছিল। আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে তখন সংসারের সব সদস্যের পেট ভরানোই দস্তুর, রান্নার স্বাদ বা খাবারের বিষয়বস্তু তখন প্রাধান্য পায়নি। সেই সূত্র ধরে বিচার করতে গেলে সস্তায় পুষ্টিকর এমন মাছ কিনে বাড়ির কর্তাকে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। শত নাক সিঁটকানো উপেক্ষা করে বাড়ির গিন্নি সেইসব মাছ ধুয়ে, বেছে, কেটে পরিষ্কার করে তা দিয়ে অতি উপাদেয় ঝোল বা চচ্চড়ি রেঁধেছে। সেইসব মাছের তালিকা শেষ হবার নয়: তেলাপিয়া, লইট্যা, গুলে, বেলে, পাঁকাল, চারাপোনা, ল্যাটা, ভেদা… পরিবার অনুযায়ী আরও অনেক মাছের নাম জুড়ে যাবে এই তালিকায়। একইভাবে অনেক পরিবারের মাছ খাওয়ার তালিকা থেকে এই নামগুলো বাদ পড়ে যাবে। 

zoom
কাচকি মাছ

বোয়ালমাছ যেমন– খুবই বিতর্কিত একটা মাছ বলে আমার মনে হয়। অনেক পরিবারের কাছে বোয়াল মাছ পরম তৃপ্তির খাওয়া, আবার অনেক পরিবারের মানুষ বোয়ালমাছ দেখলে সেদিন উপোস দেবে। 

সে গল্প বলতে গেলে ফিরে যেতে হবে দেশভাগ পূর্ববর্তী আমার দিদিমার বাড়ি ইলিশকোল গ্রামে। সেই বাড়িতে আড়, বোয়াল, শিঙি, ভোলা চিরকাল নিচু জাতের মাছ হিসেবে পরিচিত ছিল, তাই বোয়াল মাছের স্বাদের সঙ্গে কখনওই দিদিমার বাড়ির কারওর পরিচয় হয়নি। তার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে জেনেছিলাম আড়, বোয়াল– এগুলো আঁশবিহীন মাছ, আবার তার ওপর মাংসাশী। অনেকেই মনে করেন আঁশবিহীন মাছ খেলে শ্লেষ্মার কবলে পড়তে হতে পারে, তাই সেইসব মাছের থেকে দূরে থাকাই ভালো। বোয়ালমাছ খেলে শ্লেষ্মা হতে পারে, মানুষের মধ্যে অনেকদিন এই প্রচলিত ধারণা ছিল বা আছে। বিশেষ করে বামুনবাড়িতে বোয়ালমাছ এড়িয়ে চলার একটা প্রবণতা ছিল বা এখনও হয়তো আছে। বোয়াল মাছ নিয়ে নানা সংস্কারও মানুষের মধ্যে কাজ করে। শেফালি সাহা আমায় জানিয়েছিলেন, ‘আমরা মেয়েরা কোনওদিন বোয়ালমাছ খাইনি, তার কারণ বোয়ালমাছের হাঁ বড়। রাক্ষুসে মাছ!’ সেই হাঁ-এর সঙ্গে তিনি সন্তানদের গিলে খাওয়ার তুলনা করেছিলেন।

zoom
বোয়াল মাছ

বর্ধমানে সেজমাসির শ্বশুরবাড়িতে মস্ত একটা পুকুর ছিল। তাতে জেলেরা জাল ফেলে মাছ ধরত। কখনও বিশালাকার কাতলমাছ ধরা পড়ত, কখনও বা পুকুরের মিষ্টি চিংড়ি। যদি বা কখনও আড় কিংবা বোয়াল জালে উঠত– তখন সঙ্গে সঙ্গে তা গ্রামের হাঁড়ি বা বাগদি সম্প্রদায়ের মানুষদের দিয়ে দেওয়া হত। এদিকে আমার দিদিমা না খেলেও, শীতকাল হলে দাদা-বাবা বোয়াল মাছ আনতেন। মাছ রান্না হওয়ার পরের দিন তার নয় ছেলেমেয়ে বাসী বোয়ালের জমা তেল দিয়ে গরম ভাত খুব তৃপ্তি করেই খেত। শিঙি বা মাগুর রোগীর পথ্য হিসেবে ছাড় পেয়ে এসেছে অনেক বাড়িতেই। তবে অনেক বাড়িতে পেটের গোলমালের সুরাহা হিসেবে কাঁচকলা দিয়ে মাগুর মাছের ঝোলের সমাদর থাকলেও শিঙ্গি মাছ নৈব নৈব চ। 

zoom
মাগুর, চাপিলা

আমাদের কলোনি পাড়াগুলো উচ্চবিত্ত বা বলা চলে উঁচু জাতের বাঙালদের। সেখানে অনেক বাড়িতেই বলত: ‘পমফ্রেট কোনও ভদ্রলোকের মাছ হল?’ 

এখনকার কথা সম্পূর্ণ আলাদা। পমফ্রেটের কদর যথেষ্ট। মাসখানেক আগে মুম্বই গিয়েছিলাম। সাসুন ডকের বাজারে যেসব সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়, কলকাতার বাজারে তা দুর্লভ। ওখানকার পমফ্রেট দেখে তাজ্জব বনে যেতে হয়! পমফ্রেটকে ‘ছোটলোকের’ মাছ বলার আগে কারওর ধারণাও ছিল না যে, সেইদিন থেকে আর কিছু বছর পর দীঘা-মন্দারমনির সমুদ্রে বেড়াতে গিয়ে বাঙালি শ’ তিনেক টাকা দিয়ে পমফ্রেট ভাজা খাবে, আর পমফ্রেট মাছের বাজারদর হবে কেজি প্রতি হাজার টাকা! 

zoom
পমফ্রেট ভাজা

তবে যাই হোক, সেই সময় আমার জামাইবাবুর পরিবার জাতে উঁচু হয়েও অনেক ছোটলোকের মাছকেই আপন করে নিয়েছিল। তার মধ্যে এক নম্বরে অবশ্যই পমফ্রেট মাছ। মাথা-ল্যাজা আলাদা করে কেটে ঝোল, ডালের পাতে মচমচে ভাজা, সর্ষে বাটা কিংবা পেয়াঁজ রসুন দিয়ে কষিয়ে ঝাল– সব রান্নাই পরিবারের সব্বার বড় প্রিয়। তবে কি বলা যায়– খুলনা, যশোর থেকে আসা উদ্বাস্তু পরিবার পমফ্রেট মাছের স্বাদের সাথে বাধ্য হয়ে মানিয়ে নিয়েছিল? না কি এই ভালো লাগা তাদের সহজাত ছিল?

zoom
বাঁশপাতা বা কাজলি

শুঁটকি মাছ খাওয়া বা না-খাওয়া নিয়ে বহু পরিবারের বহু মতামত আছে। অনেক বাঙাল পরিবার খুব গর্ব করে নানান মাছের শুঁটকি অনেকভাবে রাঁধে আর গর্ব করে সে কথা বলে। অন্যদিকে অনেক বাঙাল পরিবার শুঁটকির নাম শুনলেই ভুরু কুচকে মুখ হাঁড়ি করে বসে থাকবে। একটা সময় অবধি, আমার পরিবার আর আমার মামাবাড়ির পরিবার দ্বিতীয় ভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোনও বাড়িতেই শুঁটকি খাওয়ার চল ছিল না। মামাবাড়িতে তৎকালীন যিনি রান্নার কাজ করতেন তিনি মামা-মাসিদের প্রথম শুঁটকি রেঁধে খাইয়েছিলেন। সেই থেকে ওদের শুঁটকি খাওয়ার অভ্যাসের পথ চলা। নিতান্তই ভালোবেসে। আমরা তৃতীয় প্রজন্মের বাঙালরাও শুঁটকিকে আপন করে নিয়েছি। আসলে শুঁটকির স্বাদ এবং গন্ধ সবটাই অর্জিত। আয়ত্ব করতে করতে স্বাদ ভালো লাগে, তাই একটা বয়সের পর আর নতুন করে শুঁটকি খাওয়া অনেকেরই হয় না, বা বলা ভালো খেতে পারেন না। আমার পরিবারের মতন অনেক পরিবারেরই একই অভিজ্ঞতা। 

zoom
লইট্যা শুঁটকি

তবে বিপরীত দিকের গল্পও আমার ঝুলিতে আছে। আমার বন্ধু মৌমিতা মুখার্জি উত্তর কলকাতার ঘটি। বাড়ির লোক দুঃস্বপ্নেও শুঁটকির কথা ভাবতে পারে না। সেই বন্ধুরই বিয়ে হয় চাটগাঁইয়া পরিবারে। ওদের ঝালে ঝোলে অম্বলে শুঁটকির স্বাদ বন্ধুর জিভে দারুণ বসে গেল। এখন সে শুঁটকি-প্রেমী তো বটেই, বাঘা শুঁটকি রাঁধিয়েও।

শুঁটকি নিয়ে আমার মৌখিক ইতিহাসের ফিল্ড ওয়ার্কের সম্ভার থেকে আরও একটা গল্প বলি। ১৯৭১ সালে তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। অমিতা দত্তের পরিবার চট্টগ্রামের মানুষ হলেও কোনওদিন শুঁটকি খেতেন না। যুদ্ধের পরিস্থিতি জটিল হলে তাঁরা স্বপরিবারে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে এক আত্মীয়ের বাড়িতে অনির্দিষ্টকালের জন্য আশ্রয় নেন। প্রায় ৩০-৪০ জন এক ছাদের তলায়, একসঙ্গে। তখন কিন্তু চিংড়ি শুঁটকিই তাদের অভাবের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। প্রায় রোজই ভাতের সঙ্গে চালকুমড়ো দিয়ে চিংড়ি শুঁটকির ঘণ্ট খেয়ে পরিবারের মানুষগুলো দিন কাটিয়েছেন। পারিবারিক শুঁটকি খাওয়ার অনভ্যাসের ঊর্ধ্বে গিয়ে শুঁটকি এখানে বাঁচার এক কৌশল বৈকি! 

zoom
শুঁটকি পরব

মাছের আর্কাইভ লিখতে গেলে সমাজতত্ত্ব বা নৃতত্ত্বের অনেক দিকই উঠে আসবে। মানুষের অভিজ্ঞতা আর মৌখিক ইতিহাসে সেই দিশাগুলো ধরা পড়ে। মাছের স্বাদ ভালো লাগাকে ঘিরেও আর্থসামাজিক নানান সমীকরণ নিত্যদিন তৈরি হয়। সময়ের নিয়মে সেইসব সমীকরণও বদলে যায় বা হারিয়েও যায়। তবে মাছের ভিতর লুকিয়ে আছে অনেক গল্প। সেই গল্পে বাঙালির মন জয় করতে মাছ নিয়ে রাজনৈতিক প্রচার যেমন আছে, তেমনই আছে বাঙালি পারিবারিক ক্ষমতার মানচিত্র।

Fish Fish story hilsa History of Fish Pomfret Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on