Scams and AI: How Technology Is Shaping Behaviour | Robbar
Robbar
  • ২০ কার্তিক ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৭ নভেম্বর ২০২৬

ধাপ্পাবাজির পাঠশালা

চিহ্নিত করা গেলেও অনেক সময় ঠকবাজদের ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, সে বা তারা যদি অদৃশ্য হয়। জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ সমাজমাধ্যমের মতিগতি দেখলে তার একটু আন্দাজ পাওয়া যায়। পরস্পরের মুখের দিকে নয়, আমরা আসলে ঝিলমিল-লাগা ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে থাকছি স্ক্রিনের দিকে। সম্পূর্ণ অচেনা জীবদের তুলে ধরা ব্যক্তিগত বিলবোর্ড দেখে চলেছি প্রতি মুহূর্তে। দুনিয়ার বাজার জানতে চাইছে– ও বউদি, ও দাদা, কিছু লাগবে নাকি?

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৭, ২০২৬, ২১:১৯   
Facebook WhatsApp Messenger

ঘর আলো করে পুত্রসন্তান এসেছে। এবার স্বপ্ন দেখা শুরু। প্রথমে নামকরণ। যেহেতু সে বড় হবে, নিশ্চয়ই বিরাট কেউ, তাই মানানসই নাম চাই। বাবা-মায়েরা আদিখ্যেতা করে কিছু আদুরে নামে ডাকতে শুরু করেছেন, যেমন ভোঁদু,পটলা। এখন, পরে ভালো হয়ে যাওয়ার চল হয়েছে। আগেও ছিল। পরে ভালো নাম হত। একটু সিরিয়াস। ওজনদার। বাঙালি হলে হয়তো ‘বনবিহারী’, পাশের রাজ্যে ‘বানওয়ারিলাল’। ছানা পাইলট হবে সেই বিশ্বাসে ‘ইন্দ্রজিৎ’। ব্যাপারটা বোঝা যায়। আমাকে ঘামিয়ে তোলে এমন কিছু নাম, যা রাখার কারণ সম্পর্কে ভাবতে গেলে বেশ অসুবিধে হয়। যেমন, ‘মোহিনীমোহন’। যেটা বুঝতে পারি না– হয়তো বাঙালি অভ্যেসের জন্য– কোনও সদ্যোজাতের নাম ‘চতুরলাল’ রাখার কারণ কী? গুরুজনরা কি চান যে সেই ছেলে একদিন অমন হবে? ‘গঙ্গারাম’ নামের ধ্বনিতে একধরনের হাবাগোবা আবহ পাওয়া যায়। সুশিক্ষা, সুবুদ্ধির পরিচায়ক নামের বদলে, চতুরলাল বললে একটা ধান্দাবাজ, বজ্জাতের ছবি মাথায় আসে। অন্য অর্থে নতুন কোনও ব্যাখ্যা আছে কি? রাহুল সাংকৃত্যায়ন বা সুকুমার সেন হয়তো জানবেন।

বাংলার নবজাগরণের কুশীলবদের অনেকের নাম আমরা জানি। ওয়াকিবহাল সত্যজিৎ-অমর্ত্যের ব্যাপারেও। সর্বোচ্চ পর্যায়ের পজিটিভ ভাইব ছড়ানো আরও অনেকেই আমাদের চেনা। নেগেটিভদের কোনও তালিকা তৈরি হয় না। কিছু রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতক, ঠগবাজদের কথা ফিরে ফিরে আসে। অনেকের মতে তারা বদমাইশ নয়। ইতিহাসের মানদণ্ডে তার বিচার চলে। এদিকে ঠিক তথ্য লেখা হয়েছিল কি না সেটাই তো আজ প্রশ্নের মুখে পড়ছে। সত্যের অনুসদ্ধানজনিত ফলাফল প্রায় অসম্ভব। গান্ধী-হত্যা অন্যায় না অনিবার্য ছিল, সেই তর্ক কোনওদিন শেষ হবে না। আমাদের চেনা ইতিহাস যাঁরা লিখেছিলেন, ঠিক তেমনই অন্য কোনও গোষ্ঠী আজ ইতিহাসকে বদলাতে চাইছেন। সত্য একটিই। তার মানে ইতিহাসের প্রস্তুতকারকদের মধ্যেই রয়েছে মিরজাফরেরা। সুবৃহৎ কোনও তথ্যের নথি দীর্ঘদিন কায়েম থাকলে সেটিই সত্য হিসেবে পরিগণিত হয়। অথবা ভ্রম। সর্বক্ষেত্রে এটাই হল বিভ্রান্তির উৎস। চর্চা চলতে থাকে। আমরা মজে থাকি ভ্রান্তিবিলাসে। এই ডামাডোলের মধ্যে যে যতটা পারে গুছিয়ে নেয়। করে খায়। বাকিরা অকাল ফসিলে পরিণত হয়। মূল প্রতারক অধরা থেকে যায়।

zoom

 

কোনও ফেরেব্বাজের হাতে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কী করণীয়, তার উল্লেখ আছে সংস্কৃত বচনে। সারল্যং সরলে কুর্যাৎ। শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ। অর্থাৎ, পাল্টা দাও। অন্তত নিজের দুর্গ অটুট রাখো। একদম বোকামো করো না। ভুলেও কাউকে পাসওয়ার্ড দিও না। পারিবারিক সমীকরণের ক্ষেত্রে ‘লুজ টক’ থেকে সাবধান– সবাই এসব জানে। বিশ্বব্যাপী চিটিংবাজি যে চলতে থাকবে, সেটাও অজানা নয়।

যাক গে, মনখারাপের প্রসঙ্গ ছেড়ে একটু লঘু বিষয়ে ডুব দিয়ে দেখি ব্যাপারটা কেমন শোনায়। মিথ্যার ভিতের ওপর সম্পূর্ণ বিষয়টা দাঁড়িয়ে আছে জেনে বুঝে একে একটু আদর করে, খাতির করে পাশে বসিয়ে চা অফার করলে কেমন হয়? বাংলায় মিথ্যা রসকথাশিল্পের অন্যতম প্রধান স্রষ্টা ত্রৈলোক্যনাথকে স্মরণ করা যাক। তাঁর ডমরু নির্বিকারভাবে অতি উপাদেয়, অজস্র মিথ্যাকথন বিতরণ করে যেত। এখন মাথা খুঁড়ে মরলেও ওই উচ্চতার গুল-সংস্কৃতি আর কারও কাছে পাব না। শিল্প-সাহিত্যে, কমিকসে, ছবিতে, কল্পনাপ্রসূত জাতীয় দ্রব্যকে মিথ্যা বলে দাগিয়ে দেওয়া মূর্খামি। জনপ্রিয় রূপকথাকারদের দরজায় কড়া নেড়ে ওয়ারেন্ট ধরানো অনুচিত। ‘স্বপনকুমার’ থেকে সত্যজিৎ উকিল খুঁজছেন, এমন হয় নাকি? আমরা কিন্তু দেখতে পাচ্ছি ব্যাপারটা আজকাল যেন সেদিকেই এগচ্ছে।

zoom
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, অয়েল অন ক্যানভাস। ছবি সৌজন্য: ড্যাগ ওয়ার্ল্ড

প্রাগৈতিহাসিক কথাকার এবং তাদের সৃষ্ট চরিত্ররা একেবারে নিরাপদ। সাধারণ জৈবিক প্রবৃত্তির তাড়নায় রাবণ এসেছিল রামের পর্ণকুটিরে। কাজটা কি ভালো করেছিল? নাকি ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’ থিওরি দিয়ে কেস ডিসমিস করে দিতে হবে? রামায়ণ টানলে মহাভারত আসবেই। ধড়িবাজ কৌরবরা না-হয় পাণ্ডবদের ভাগিয়ে দিল। ক্রিমিনাল তার রাস্তাতেই চলে। শকুনি এপিসোডের সময় ধর্মপুত্র কী করছিল? সভাভর্তি লোকজন, কেউ বাধা দিল না? অবাক হওয়ার কিছু নেই। দুর্বল, সংখ্যালঘু মানুষদের ওপর অত্যাচারের সময় নিরাপদে থাকা আমরা, ফোনের স্ক্রিন স্ক্রোল করা ছাড়া আর কিছুই করি না। পরিস্থিতি কী আমাদের এমনভাবে নষ্ট করেছে? আপাতত যুগের ধর্ম, সময়টা খারাপ– এসব বলে আমাদের আলস্য ও অসহায়তাকে ন্যায্যতা দেওয়া যাক। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের কেসটা কী করে মেনে নিই?

অনেকটা লেখা হয়ে গিয়েছে। কন্ট্রোল জেড ছিল না সেকালে। যুদ্ধক্ষেত্র সেজেগুজে অপেক্ষা করছে অ্যাকশন সিকুয়েন্সগুলোর জন্য। ‘ডেভিলস অল্টারনেটিভে’র খেলায় কৃষ্ণের আর্টিলারি পেয়েছে কৌরবরা। অর্জুনের রথচালকের ভূমিকায় কৃষ্ণ স্বয়ং। বাই চয়েস। এদিকে অর্জুন গিয়েছে বিগড়ে। বেঁকে বসেছে। মানবিকতা জেগে উঠেছে। কিছুতেই সে যুদ্ধ করবে না! এই মহা-সিরিয়ালের স্ক্রিপ্টরাইটার গুপি গাইনের স্রষ্টা হলে, আকাশ থেকে মিষ্টি বর্ষণ করে একটা আস্ত ডিভিশনকে কোরাপ্ট করে দিতেন। সব ঘেঁটে গিয়ে যুদ্ধটাই নষ্ট হয়ে যেত। এদিকে, এত বড় ইন্টেলেকচুয়াল বিনিয়োগ– যুদ্ধ হতেই হবে! কৃষ্ণ অর্জুনকে ব্রেনওয়াশ করতে শুরু করলেন। কন্সাল্টেন্সির সাক্ষী আর কে ছিল, তার উল্লেখ নেই। শুনেছি, সেই কথামৃত এক জায়গায় জড়ো করে পরে ছাপা হয়েছিল গীতা প্রেসে। একে কি ভাবীকালের পাঠকের সঙ্গে তঞ্চকতা বলা যায়?

zoom
বেন হুর-এর ‘চ্যারিয়ট রেস’

যাই হোক, একেবারে হিট যুদ্ধ হল। খুব দেখাচ্ছিল অভিমন্যুর রথের চাকা ভাঙার সিনটা। বেন হুর-এর চ্যারিয়ট রেসের ব্যাপারটা কি ওখান থেকেই আত্মসাৎ করা? টাইমলাইন পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যুদ্ধে, অর্থাৎ ধান্দাবাজির মরণপণ প্রতিযোগিতায় ভুল বলে কিছু নেই, এটা দুনিয়ার সবাই কাজে লাগায়। অথচ পুলিশ কোনওদিন মানতে চায় না। বেন হুরে চোট্টামি করে লাগানো চাকার ব্লেডে পাশের রথের চাকা ফালাফালা হয়ে গেল। এমন বিপজ্জনক রেসের সময় রেফারি কাছে ছিল না। স্টেডিয়াম-ভর্তি দর্শক তো দেখল। তখন না-থাকায় ফেসবুক লাইভ করে দ্রুত বিরুদ্ধমত তৈরি করে, দিমাগিপনার উপায় ছিল না। সভ্যতার ইতিহাস মেনে ফেয়ারগ্রাউন্ড উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল আনফেয়ার, অসভ্য, ফাউল প্লে দেখে।

একটা সূক্ষ্ম প্রসঙ্গ তুলি। মুরগির লড়াইও বাজে ব্যাপার। সেই জন্যই দেখে সুখ। কিন্তু সেখানে লেলিয়ে দেওয়া দুই যোদ্ধা পাখিকে ধারালো মিনি তরোয়াল দেওয়া হয়। অর্থাৎ, সমান সমান। আমাদের মহাকাব্যে তা দেখানো হয়নি। ভূপতিত অভিমন্যুকে অর্জুন ‘টুকরে টুকরে’ করে দিয়েছিল তার ডিভাইন ড্রাইভারের মদতে। সুখের কথা, কোনও টেনশন নেই, এসব গল্পমাত্র। আসলে কারও ক্ষতি হয়নি। আমরা সিরিয়াসলি নিয়েছি বলে মনেও হয় না। ঘটনা হচ্ছে, ইচ্ছে হলে আমরা নিজেরা কিছু দু’নম্বরি কারবার করেই থাকি! এখন ব্যাপারটা অনেক সুবিধেজনক। একটা ক্রাইমের পরে দ্রুত এসে যায় নতুন কিছু। আগেরটা ভুলে যেতে দেরি হয় না। ইউক্রেন থেকে গাজা, ইরান– সর্বত্র একই ব্যাপার। এই কলকাতা বা আশপাশের অধিকাংশ বাঙালি, যাঁরা এইসব খোঁচানো ইঙ্গিতপূর্ণ লেখা পড়ছেন, তাঁদের দুশ্চিন্তায় পড়তে হবে না। আমাদের মাথায় বোমা পড়ার সম্ভাবনা নেই। সেই কবে, ’৪২ সালে পড়েছিল কিছু জাপানি বোমা। হাতিবাগান বাজারের সামনেরটা ফাটেনি। এখন পড়লেও ফাটবে না– এই আশায় আমরা নির্বিকার মোডে থাকতেই পারি!

zoom
শিল্পী রেমি কোঘের ভাবনায় ‘দ্য ককফাইট’, ১৮৮৯

ফোন রেকর্ডার, সিসিটিভির কল্যাণে ধাপ্পাবাজি, ফেরেব্বাজি প্রায় উঠে গিয়েছে। ঠকবাজি পাপকর্ম হলেও, যেগুলো হয়, সেগুলো প্রায় সবার মতে নেহাতই ছোট ঘটনা। ধরা যাক, কেউ খুব ছোট একটা জমি কিনল। দোতলার প্ল্যান জমা দিল। তারপর ঘুষ খাইয়ে দুইয়ের পাশে চার বসিয়ে বাড়ি তুলে দিল। মামলা হল। দরদস্তুর করে চারটি তলা বেআইনি ঘোষিত হল। ২০টা ফ্ল্যাট দিব্যি বিক্রি হয়ে গেল। এরকম আর কী। বড়গুলোর ক্ষেত্রে জনগণ জেগে উঠে কী তাণ্ডব করছে, সেটাও এখন চেনা খবর। কোর্ট থেকে হাসপাতাল, সংগঠিত জোচ্চুরি দেখে ভাবার অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে, অমন একটু-আধটু হতেই পারে।

মহারথীদের নিয়ে কেচ্ছাচর্চার দরকার নেই। ফুটপাথ লেভেলে নামি। বোঝাতে সুবিধে হবে। দেখবেন, দুর্মূল্য পেঁয়াজ কিনছেন, এক কেজি নেবেন। বেছে দিয়েছেন। নিখুঁতভাবে ওজন মেলানোর জন্য দোকানদার কয়েকটা ফেলে, আপনার চোখের সামনে নিজে আরও কয়েকটা লোড করল। বাড়ি ফিরে প্রায় নিশ্চিতভাবে দেখলেন, কয়েকটা পচা বেরিয়েছে। আমরাও কম যাই না। অন্যের কাছে কেস-খাওয়া ছেঁড়া নোট গুঁজে দিই ভালোর সঙ্গে। পাপ বললে পাপ। মোটামুটি একটা সমতা এসে গেলে অভিযোগ করার কিছু থাকে না। দুনিয়ার যাবতীয় বেতাল কার্যপ্রণালী বদলে গিয়েছে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। বোঝার আগেই ব্যাপারটা ‘পেঁয়াজ’ হয়ে যায়। চিনের তৈরি সস্তা বেনারসী শাড়ি কিনছি আমরা। অ্যাসিড দিয়ে কাটানো পনির, রং করা শাকসবজি, রাসায়নিক মেশানো আরও ঝাঁঝালো সরষের তেল, গুড় মেশানো পেট্রোল– তাও ব্যবহার করছি। ছোট-বড় শিল্পের মালিকদের অসৎ পথে মুনাফা করা দেখেও চোখ বুজে থাকছি। বুঝে, ঝামেলা না-করে, অনেকে বিকল্প রাস্তা খুঁজে বের করছেন। এটাও সত্যি।

zoom
‘হিটলার ইউথ’-এর সদস্যরা পুড়িয়ে দিচ্ছে বই, ১৯৩৮

একটু বড় পরিসরের উল্লেখ করি। সঠিক শিক্ষার আলো যাতে না পৌঁছয়– তার জন্য চেষ্টা আজ নয়, আগেও হয়েছে। বই পোড়ানোর ঘটনা। খ্রিস্টপূর্ব ২১৩-তে চিন, ১২৫৮ সালের বাগদাদ, ষোড়শ শতকের আমেরিকা, নাজি জার্মানি, সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা, যুগোস্লাভিয়াতে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বই। কারণ ঘুরেফিরে একই– অগ্নিসংযোগকারীরা বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল যে, পড়াশোনা করা পাপ। কয়েক দিন আগে কলকাতায় বই হাতে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে। হয়েছে তো!

তবে চিহ্নিত করা গেলেও অনেক সময় ঠকবাজদের ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, সে বা তারা যদি অদৃশ্য হয়। মানুষের বিরুদ্ধে আন্দোলন, প্রতিবাদ করা যায়। আধুনিক, অদৃশ্য ভূতের বিরুদ্ধে নয়। জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ সমাজমাধ্যমের মতিগতি দেখলে তার একটু আন্দাজ পাওয়া যায়। এই মুহূর্তে ব্যাপারটা শুধু যোগাযোগ, একটু দেখনাইপনা আর বিনোদন নয়। পরস্পরের মুখের দিকে নয়, আমরা আসলে ঝিলমিল-লাগা ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে থাকছি স্ক্রিনের দিকে। সম্পূর্ণ অচেনা জীবদের তুলে ধরা ব্যক্তিগত বিলবোর্ড দেখে চলেছি প্রতি মুহূর্তে। দুনিয়ার বাজার জানতে চাইছে– ও বউদি, ও দাদা, কিছু লাগবে নাকি? ভালোর চেয়ে নোংরার আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। আপন সত্তার প্রতি বিরাগ বাড়ছে। আত্মসম্মান লাটে উঠছে। বাড়ছে অপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের প্রতি লোভ। বাড়ছে ক্রোধ। অপ্রাপ্তি অনিবার্য। সমাজমাধ্যমের নিয়ন্ত্রকরা থাবা বসাতে পারছেন মানুষের মনের ওপর। সে কে, কী বা কেন– বুঝিয়ে ছাড়ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের শক্তিশালী অ্যালগরিদম। ভেবেচিন্তে দৃশ্যমান করা হচ্ছে কন্টেন্ট। অদৃশ্য ‘কেউ’কে কিন্তু নিশ্চিতভাবে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনেক কিছু চেপেও দেওয়া হচ্ছে। ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে সমস্ত রাজনৈতিক দল। ফুলেফেঁপে উঠছে আইটি সেলের ব্যবসা। ডিজিটাল কুবুদ্ধিচালিত অদৃশ্য যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে কমবুদ্ধির দল। শেষে, মরছে রাজনীতির মধ্যে না-থাকা সাধারণ মানুষ। এই মৃত্যুর একটা আশ্চর্য চরিত্র আছে– শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পেনলেস। সে যে আসছে, বোঝাই যায় না। বুঝতে দেওয়া হয় না। কয়েক বছর আগে সমাজমাধ্যমে একাধিক দোকান ছিল। এখন একজনেরই মোনোপলি। কোম্পানির মালিকানা বদলায়নি। নাম বদল হয়েছে। কুচুটেরা বলেছে, আজকের চর্চার মূল বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিগবস, একদা শেয়ার মার্কেটের মহাগুরু হর্ষদ মেহতার স্মৃতিতে এই নামকরণ।

zoom
‘নার্কো‌স’ সিরিজের দৃশ্য

এত কথা হচ্ছে যখন, আধুনিক ফেরেব্বাজির প্রধান চরিত্র এআই-কেও তাহলে কাঠগড়ায় তুলি। হুড়মুড়িয়ে চাকরি যাচ্ছে দুনিয়াজুড়ে। অঙ্ক করতে, লিখতে, গাইতে, আঁকতে, ছবি তুলতে পারেন না? শুধু ইচ্ছেটা জানাতে হবে লিখে। ডিজিটাল চিরকুট পড়ে এআই ফেরত দেবে যা চাওয়া হল। অনেক সময় তা নিখুঁত। অপছন্দ হলে ধমকে কাজ করানোর সুযোগ আছে দেদার। উদাহরণ দিই। হয়তো একটা ছবি চাই, যা নেই। এআইকে প্রম্পট করলে সে বানিয়ে দেবে প্রার্থিত ছবির বিরিয়ানি, নুডলস্‌ বা পাস্তা। কীভাবে? আন্তর্জালে ভাসমান কোটি কোটি ছবি তার নখদর্পণে। ডিজিটাল বুদ্ধি তাদের কাজে লাগিয়ে করে ফেলে ডিজিটাল রান্না। দাবিদাওয়া বেশি হলে লাগবে টাকা। কাজটা কিন্তু হয়ে যাবে। প্রশ্ন হল, উপকরণের মালিক তো অন্য কেউ। অর্থাৎ তাদের ধোঁকা দিচ্ছেন আপনি, কাজটা করছে ডিজিটাল ভৃত্য। কাউকে চোর বলা যাবে না। রান্নার পর সবজিওয়ালা প্রমাণ করবে কী করে যে– চুরি হয়েছে, কুমড়োটা আসলে তার ছিল!

আলালের ঘরের দুলালের চতুরলালে পৌঁছনোর দীর্ঘ যাত্রা নিয়ে আগ্রহ থাকলে নেহাতই নেটিভ প্রতিবেশীর বেডরুমে উঁকি মেরে লাভ নেই। নিজেই নিজের অতিথি হয়ে যুত করে বসুন টেলিভিশনের সামনে। নজর রাখুন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। বিশ্বের দরবার আলো করে রাখা কোনও ওয়েব সিরিজে সঁপে দিন নিজেকে। ইন্ডাস্ট্রির সিরিয়াল কিলারদের সুযোগ দিন আপনার মাথা খাওয়ার। ‘নার্কোস’ মনে আছে? মূলটির জন্য পরিবেশিত হয়েছিল ৩০টি এপিসোড। সব মিলিয়ে ২৬ ঘণ্টার কিছু বেশি সময় ধরে আমরা জ্ঞান অর্জন করেছিলাম কলম্বিয়ার নার্কোটিকস ব্যবসার প্রাণপুরুষ পাবলো এস্কোবার সম্পর্কে। খুব আমোদ পেয়েছিলাম। লাভের মধ্যে, মনের সমস্ত ঘোলাটে ব্যাপার সাফ হয়ে গিয়েছিল। ঘুচে গিয়েছিল পাপ-পুণ্যের দুর্বল বিভাজনরেখা। যাই হোক, সময় বদলেছে। ড্রাগ মাফিয়ার গাঁজাখুরি সত্যনির্ভর গল্প বাদ দিন, বরং সীমাহীন উত্তেজনায় ভরপুর প্রেমের আখ্যানে ডুবে থাকা যাক। প্রেমের গল্প মানে মূলত তঞ্চকতার নাটক। মানুষের ডিফল্ট নেশা। সত্যি বলতে কী, ইচ্ছে করে অনেক কিছুই। ভয়ে করা হয়ে ওঠে না। ‘কুকি জারিং’ বোঝেন? গুগলে নিন। সম্পর্কের বাজারে, আপন প্রাপ্তির আশায়, একটু চিটিংবাজির রংমশাল জ্বালানোর ইচ্ছেটাকে কি অস্বীকার করা যায়?

পাবলোকে নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলত। আমাদের কবি কবেই লিখে গিয়েছেন,

‘ন্যায় অন্যায় জানি নে, জানি নে, জানি নে,
…শুধু তোমারে জানি
ওগো সুন্দরী।
চাও কি প্রেমের চরম মূল্য– দেব আনি,
দেব আনি ওগো সুন্দরী।’

 ক্ল্যাসিক ফেয়ার প্লে। প্লিজ নোট ‘চরম’ শব্দটি।

AI Domru Chorit Geeta Mahabharata Pablo Escobar Petroleum Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Scam Swapankumar Trailokyonath Mukherjee

Share this article on