gold and gold mines and world economy | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চেনাসোনা, জানাসোনা

গবেষকরা বলছেন, সোনার উৎস আমাদের কল্পনার বাইরে। পৃথিবীর সমস্ত সোনা না কি মৃত নক্ষত্রপুঞ্জের ধ্বংসাবশেষ থেকে এসেছে। পৃথিবী যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন লোহা ও সোনার মতো ভারী মৌলগুলো আমাদের গ্রহটির কেন্দ্রের দিকে তলিয়ে গিয়েছিল। প্রায় ৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী গ্রহাণুর আঘাতে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল। এই আঘাত গ্রহটির গভীরতর স্তরগুলোকে আলোড়িত করেছিল, এবং কিছু স্বর্ণকে জোরপূর্বক ভূত্বকের স্তরে ঠেলে দিয়েছিল। তা না-ঘটলে পৃথিবীর ভূত্বকে সোনার কোনও অস্তিত্বই থাকত না।

শেষ আপডেট: মে ২৪, ২০২৬, ১৪:১৭   
Facebook WhatsApp Messenger

৩২.

‘হিড়িক’ শব্দটার মধ্যে বেশ একটা অহেতুক উত্তেজনা আছে। যেমন পরের দিন পেট্রোলের দাম বাড়বে শুনলেই, আগের দিন খেয়ে-না-খেয়ে, রাতভর পেট্রোল পাম্পে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অসংখ্য গাড়িচালক। ছোটবেলায় দেখেছি– পরের দিন হরতাল হলে, আগের দিন দুধ আর পাঁউরুটি কেনার হিড়িক পড়ে যায়। দিনে দুটোর জায়গায় চারটে পাউরুটি কেনে।

শহরাঞ্চলে যদি পরের দিন জল থাকবে না বলে খবর হয়, তাহলে নিজেদের ঘরের মধ্যেকার জলাধার তো আছেই, তাছাড়াও কলসি-বালতি মায় ঘটিবাটি সমস্ত ভরে প্রায় পাঁচ দিনের মতো জল ধরে রাখার একটা হিড়িক পড়ে যায়। পরের দিন নর্মাল হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে সেই জমানো জল ফেলারও আর এক হিড়িক। 

লকডাউনে আটকে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থাকাকালীন নিজের চোখে দেখলাম, টয়লেট পেপার কেনার হিড়িক পড়ে যাচ্ছে। পারলে শত-শত প্যাকেট টয়লেট পেপারের রোল জমিয়ে রাখছে। সিডনির মতো শহরে আবার হিড়িক পড়ে গেল রেফ্রিজারেটর কেনার। ঘরের মধ্যে গোটা পাঁচেক রেফ্রিজারেটর কিনে যতটা সম্ভব খাবার ঠান্ডার মধ্যে জমিয়ে রাখা। যতদিন চলে।

দুবাই ফেস্টিভালে নানান দেশ থেকে লোক আসে নানান কিছু কেনাকাটার ছুতোয় কিংবা বেড়াতে। উৎসবমুখর হয়ে যায় শহর। সেখানে আর কিছু কেনাকাটা হোক আর না-হোক গোল্ড সুক-এ সোনা কেনার এবং গয়না কেনার ব্যাপক হিড়িক পড়ে যায়। আমিও গিয়েছি, প্রথমবার, দুবাই উৎসবের সময়, গোল্ড সুক-এর সোনার গয়না কেনার হিড়িক দেখতে। রাশি রাশি সোনার পাহাড়। চমক দিতে এক শো-রুমে রাখা আছে পৃথিবীর বৃহত্তম আংটিটা, যার ওজন ৬৪ কিলোগ্রাম।

zoom
৬৪ কিলোগ্রাম ওজনের পৃথিবীর বৃহত্তম সোনার আংটি

দ্বিতীয়বার গিয়েছিলাম সন্ধের আলো-আঁধারিতে, ফেরিবোটে করে দুবাই ক্রিকের জল পেরিয়ে। জলের ধারে ধারে ঝলমলে শহরের আলো, তার মাঝে অন্ধকারে জলের ওপর কালো কালো নানা আকারের জলযানের ভিড়। ভাবছিলাম, এইখানেই একসময় ছোট ছোট জাহাজে করে স্মাগলাররা সোনা নিয়ে পৌঁছে যেত আমাদের মুম্বই পর্যন্ত। আরও কল্পনা করছিলাম, সেইসব জাহাজ লক্ষ্য করে নিশ্চয়ই জলদস্যুদের লুটতরাজের জাহাজও থাকত।

সোনা নিয়ে একেবারে আজকালের একটা ঘটনার কথা বলি। এখন আমি যখন লিখছি, আমার সামনে টেবিলের উপর পড়ে আছে ক’দিন আগের ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র বুলেটিন, ‘মুম্বই মিরর’। কাগজের প্রথম পাতার বড় খবর– ‘ডিউটি ​​বাড়ানোর আগের দিন, কোচিতে সোনার হাট’। সরকার সোনা ও রূপোর ডিউটি ব্যাপক হারে বৃদ্ধির ঘোষণা করেছে, যা ১৩ মে থেকে কার্যকর করা হল। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য নাগরিকদের সোনা কেনা থেকে বিরত থাকতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান এবং পরে শুল্ক ৬% থেকে বেড়ে ১৫% হয়েছে। ডিউটি বাড়ানোর খবর শুনে ১১ আর ১২ তারিখে সোনা কেনা-বেচার হিড়িক পড়ে যায় কেরালার কোচিতে। 

কোচির এই বিশেষ সমাবেশটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতের। এর মূল ধারণাটি ছিল সহজ কিন্তু বিস্ময়কর। ভারত জুড়ে ১৮৮ জন সেরা অলংকার নির্মাতা, ১১ ও ১২ মে অ্যাডলাক্স আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তাদের পণ্য নিয়ে উপস্থিত। তাও আবার একজনই ক্রেতার কাছে। ড. জয় আলুক্কাস, চেয়ারম্যান এবং ‘জয়ালুক্কাস’ গ্রুপের পরিচালক। তিনি ১৫ বছর বয়সে ত্রিশূরের একটি ছোট দোকান থেকে ব্যবসা শুরু করেন এবং ১৯৮৭ সালে দুবাইতে তা প্রসারিত করেন। ‘জয়ালুক্কাস’-এর আনুমানিক বার্ষিক টার্নওভার ৩৮,০০০ কোটি টাকার মতো এবং ভল্টে রয়েছে প্রায় ১৬ টন সোনা।

বিশ্বের ৬০০ সদস্যের শক্তিশালী ক্রয় দল এবং প্রদর্শকদের থাকার ব্যবস্থা করতে আয়োজকরা ২৩টি বিলাসবহুল হোটেল বুক করেন; এবং ৩২টি বাস ছাড়াও অনেক ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবস্থা। একটি মস্ত লজিস্টিক দৌড়– যেখানে মুম্বইয়ের গয়না নির্মাতারা ১১ মে সকাল ১০টায় অনুষ্ঠান শুরুর ঠিক আগে রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে শত-শত কিলোগ্রাম সোনা নিয়ে হাজির হন। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে ড. আলুক্কাস ব্যাখ্যা করেন, ‘আমাদের শিল্পে এত বড় পরিসরে কোনও ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান আগে কখনও হয়নি’।

আদার ব্যাপারী যেমন জাহাজের খোঁজ রাখে না, তেমন অবস্থা আমার। আমি নিজে খুব একটা সোনা কিনতে পছন্দ করি না। তবে নানা বিষয়ে অকারণ কৌতূহল। এটা বুঝেছি যে, সোনার গয়না বানানোয় এবং সোনার গয়নার ডিজাইনের চাহিদার ব্যাপারে আমাদের দেশ খুবই এগিয়ে। এখানে আরও একটা কথা বলে রাখি– ভারতের সমকালীন উচ্চাঙ্গ শিল্পকলার চেয়ে হস্তকলা এবং কারুশিল্পের আদর-কদর সারা বিশ্বে কিন্তু সাংঘাতিক।

আরেকটা শব্দ বা শব্দবন্ধ হঠাৎই বলে ফেললাম। সেটা হচ্ছে, অকারণ কৌতূহল। ছোটবেলায় সোনার ছোট-ছোট দোকান দেখেছি। লোহার রেলিং দিয়ে সুরক্ষা। সোনা আমাদের হাতে না-এলেও, ছোটবেলায় গ্রামে কুঁচ নামক এক ধরনের বীজ অনেক এসেছে হাতে। সেই ব্যাপারে ধনী ছিলাম। উজ্জ্বল লাল-কালোর ওই দানা কুড়নোর যেমন একটা আনন্দ, সেটাকে দিয়ে মাটির পুতুলের চোখ বানানো, পাখির চোখ বানানো থেকে শুরু করে, মেয়েদের নারকেল তেলের শিশির তলায় শোভা বাড়াত ওই কুঁচ। সেটারই আবার ব্যবহার ছিল সোনা ওজন করার ইউনিট হিসেবে। রতি। 

zoom
সোনা মাপার রতি কিংবা কুঁচ

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে আমার ছেলের ছেলেমানুষী। বড় হয়ে পড়তে গিয়েছিল নিউজিল্যান্ডে। সেখানে একটি বড় শহর একসময় ধনীদের শহর ছিল সোনার কারণে। পরে সেই সোনা ফুরিয়ে যাওয়ার পরে ওই শহর অকেজো হয়ে যায়। আমার ছেলে তার বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিল ওই অঞ্চলে, পরিত্যক্ত শহরটাকে দেখতে। আর বড় বয়সেও ওরা পাথরের ধুলো ঘেঁটে তার মধ্যে যদি সোনা পাওয়া যায় সেটা খুঁজছিল। সোনা কুড়নোর খেলা। শুনে মনে হয়েছিল, আমিও কেন গেলাম না। পরে যখন দেশে ফিরেছিল, তখন কাচের হোমিওপ্যাথি ওষুধের শিশির মতন একটি শিশিতে কয়েক দানা সোনা সত্যিই এনেছিল। 

নিউজিল্যান্ডের ওয়াইউটা। সাউথ আইল্যান্ডের ওয়েস্ট কোস্টে অবস্থিত এখন একটি বিখ্যাত ‘ঘোস্ট টাউন’ বা ভূতুড়ে শহর। ১৯৫১ সালে খনির খাদ ধসে পড়ার পর সম্পূর্ণ শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এখনও সেখানে খনির অবশেষ ও পুরনো বসতির ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন রয়ে গিয়েছে। ভ্রমণকারীদের কাছে সেটা রহস্যময় নিঃসন্দেহে।

তবে সত্যিকারের সোনার খনির সঙ্গে আমার সম্পর্ক বিজ্ঞান মিউজিয়ামের কর্মজীবনে বেঙ্গালুরুতে থাকতে। দক্ষিণ ভারতের প্রধান সোনার খনির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। বর্তমানের বেঙ্গালুরুর ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কর্ণাটকের ‘কোলার গোল্ড ফিল্ডস’ সম্ভবত ভারতের প্রাচীনতম সোনার খনি৷ আপাতত বন্ধ। ঐতিহাসিক উল্লেখ অনুযায়ী, বহু শতাব্দী ধরে, KGF দক্ষিণ ভারতের শাসকদের বেশ ভালো পরিমাণে সম্পদ এনে দিয়েছিল। ভারতের এই অন্যতম গভীর খনিটিতে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সাল নাগাদ পৃষ্ঠতলের নিচে তিন কিলোমিটার গভীরে খনন করা সম্ভব হত৷

zoom
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কলগুর্লিতে অবস্থিত সোনার খনি ‘সুপার পিট’

ভাগ্যক্রমে আমি দেখেছি অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত একাধিক স্বর্ণখনি। তার মধ্যে আছে পৃথিবীর বিখ্যাত ও বৃহত্তম উন্মুক্ত খনি। অর্থাৎ পুকুরের মতো ওপর থেকে পাথর কেটে খনিজ সম্পদ সংগ্রহ। ‘সুপার পিট’। ‘কলগুর্লি’ শহরে অবস্থিত এই খনিটি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত স্বর্ণখনিগুলির একটি। এমন বিশাল যে এটি মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। প্রতি বছর প্রচুর সোনা উত্তোলন করা হয় এখানে। উন্মুক্ত খনি, তাই নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে সাধারণ দর্শকদের দেখতে দেওয়া হয়।

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কলগুর্লিতে এই সোনার খনি দেখতে গিয়ে সোনার কারবারিদের জীবনযাত্রা, তাদের নগরী, তাদের বিলাসিতা, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-আশাক এ সমস্ত কিছু দেখা হল। সেও এক দারুণ অভিজ্ঞতা। সেখানকার সিনেমাহল, শহরের স্থাপত্য, রাস্তাঘাটের চাকচিক্য, থিয়েটার হল এবং ছোট্ট ওই শহরে তাদের নিজেদের এয়ারপোর্ট। আর আছে খনি মিউজিয়াম। সেখান থেকে সোনার বিষয়ে কত যে গল্প আর তথ্য জানা হল। অন্তত একটা বলি এখানে।

zoom
কলগুর্লির ‘সুপার পিট’ খনিতে লেখক

পাথর থেকে সোনা বের করা বেশ জটিল এবং ব্যয়বহুল একটি পদ্ধতি। প্রথমে বড় পাথরগুলোকে মেশিনে দিয়ে গুঁড়ো করে পাউডার করা হয়। এই পাউডারের সাথে সায়ানাইড দ্রবণ বা পারদ মিশিয়ে সোনাকে আলাদা করা হয়। সবশেষে উচ্চ তাপে গলিয়ে খাঁটি সোনা। অনেক ক্ষেত্রে ১ টন পাথরে মাত্র ১ গ্রাম বা তারও কম সোনা থাকে। সেক্ষেত্রে ১ গ্রাম সোনার জন্য ১০০০ কেজি বা তার বেশি পাথরের প্রয়োজন। এক গ্রাম সোনার জন্য যদি ১০০০ কিলোগ্রামের পাথর গুঁড়ো করা হয়, তারপর সেই পাথরের গুঁড়ো আরেকটা জায়গায় রাখা, সে আর এক গল্প।

অল্প সোনা থেকে অনেক সোনার গল্পটা বলছি। তার আগে বলে নিই, সারা পৃথিবীর হিসেবে ২০২৩ সালে বিশ্বের বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশ ছিল চিন। এর পরেই ছিল রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া। পরিসংখ্যান অনুসারে ২০২০ সাল পর্যন্ত, ভূপৃষ্ঠের উপরে প্রায় ২০১,২৯৬ টন সোনা রয়েছে। যদি এই সমস্ত সোনাকে একত্রিত করে একটা সলিড কিউবের রূপ দেওয়া হয়, তবে এর প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য হবে ২১.৭ মিটার (৭১ ফুট)। মোটামুটি সাত তলা বাড়ির মতো লম্বা, চওড়া এবং উচ্চতা।

zoom
সোনার খনি

এখন প্রশ্ন, সোনা কেন মানুষের এত প্রিয়? সেটা কি শুধু তার রঙের জন্য? চকচক করলেই তো সোনা হয় না। তবে ইতিহাস জুড়ে সোনা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যের জন্য সমাদৃত হয়ে এসেছে। এই কারণে বহু সংস্কৃতিতেই সোনাকে সূর্যের প্রতীক হিসেবে কল্পনা করেছে। হলুদ সোনা এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় রঙ, কিন্তু বর্তমানে সোনা বিভিন্ন রঙেও পাওয়া যায়। এই ধাতুটির অনেকগুলো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে, যা একে অন্য ধাতুর থেকে আলাদা করেছে। 

‘সোনা’– শব্দটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে ঐশ্বর্য, সৌন্দর্য, আবেগ আর ক্ষমতার দীর্ঘ ইতিহাস। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ সোনাকে শুধু একটি ধাতু হিসেবে দেখেনি, বরং তা হয়ে উঠেছে মর্যাদা, সম্পদ ও ভালোবাসার প্রতীক। গয়না, মুদ্রা, রাজমুকুট, বিগ্রহ ও মন্দিরের অলংকার, শিল্পকলা কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি, সব ক্ষেত্রেই সোনার উপস্থিতি বিস্ময়কর। আরও বিস্ময়, সোনা কখনও কখনও সোনা নামক ধাতুর চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।

গ্রেট ব্রিটেনের অন্যতম বিখ্যাত এক শাসকের রাজত্বকালে তৈরি একটি মুদ্রা সম্প্রতি নিলামে রেকর্ড দামে বিক্রি হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত, প্রথম এলিজাবেথের আমলের ১৫ শিলিং মূল্যের স্বর্ণমুদ্রা– যা ‘শিপ রিয়াল’ (Ship Ryal) নামে পরিচিত এবং ১৫৮৪-১৫৮৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তৈরি– গত নভেম্বর মাসে ‘হেরিটেজ অকশন’-এর মাধ্যমে ৩,৭২,০০০ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে। এই বিক্রয়টি নিলামে বিক্রি হওয়া এলিজাবেথ আমলের ‘শিপ রিয়াল’ মুদ্রার ক্ষেত্রে একটি বিশ্ব রেকর্ড।

zoom
প্রথম এলিজাবেথের আমলের ‘শিপ রিয়াল’

বিজ্ঞান অনুযায়ী সোনা একটি ধাতু। এর রাসায়নিক প্রতীক ‘Au’, যা ল্যাটিন শব্দ ‘Aurum’ থেকে এসেছে। মানেটাও চমৎকার, ‘উজ্জ্বল ভোর’। সোনা প্রকৃতিতে বিশুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়, এবং এতে সহজে মরচে ধরে না বা ক্ষয়প্রাপ্তও হয় না। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই হাজার হাজার বছর ধরে সোনা তার উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে সক্ষম। পৃথিবীর গভীরে বিভিন্ন খনিজের সঙ্গে মিশে থাকে সোনা।

সোনার আছে বেশিরভাগ অ্যাসিডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ক্ষমতা। সোনা নাইট্রিক অ্যাসিডে অদ্রবণীয়, যা রূপো এবং অন্যান্য সাধারণ ধাতু দ্রবীভূত করে। এই বৈশিষ্ট্যটি দীর্ঘদিন ধরে সোনা পরিশোধন করতে এবং ধাতব পদার্থে সোনার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যা থেকে ‘অ্যাসিড টেস্ট’ পরিভাষাটির উদ্ভব। 

সোনা হল সবচেয়ে নমনীয় ধাতু। একে টেনে এমন সরু তারে পরিণত করা সম্ভব, যার প্রস্থ মাত্র একটি পরমাণুর সমান। অর্থাৎ ছিঁড়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এই তারকে যথেষ্ট পরিমাণে প্রসারিত করা সম্ভব। আমরা ছবিতে যে ভালো সোনালি রং ব্যবহার করি তার মূল উপাদান– সোনা। তাছাড়া ছবি এবং ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে যে সোনার তবক বা সোনার পাত ব্যবহার করি, সেগুলোও আসল সোনার। 

মাত্র এক গ্রাম সোনাকে পিটিয়ে সহজেই ১ বর্গমিটার আয়তনের একটি পাতে পরিণত করা সম্ভব। তাছাড়া বিশেষ পদ্ধতিতে স্বর্ণের পাতকে পিটিয়ে এতটাই পাতলা করা সম্ভব যে তা আধা-স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। এই আধা-স্বচ্ছ পাতগুলো ইনফ্রারেড রশ্মিকেও প্রবলভাবে প্রতিফলিত করতে পারে। যার ফলে তাপ-প্রতিরোধী পোশাকের, মানে মহাকাশচারীদের স্যুটের ইনফ্রারেডের ঢাল হিসেবে এগুলো অত্যন্ত কার্যকর। 

zoom
নিষ্কাশিত শিলাস্তরে থাকা সোনা

আধুনিক যুগে সোনার ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান, মহাকাশ প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, এমনকী মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার তৈরিতেও সোনা ব্যবহৃত হয়। কারণ সোনা বিদ্যুৎ পরিবহনে দক্ষ এবং সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। অর্থাৎ, সোনা শুধু অলংকারের ধাতু নয়, এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। 

গবেষকরা বলছেন, সোনার উৎস আমাদের কল্পনার বাইরে। পৃথিবীর সমস্ত সোনা না কি মৃত নক্ষত্রপুঞ্জের ধ্বংসাবশেষ থেকে এসেছে। পৃথিবী যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন লোহা ও সোনার মতো ভারী মৌলগুলো আমাদের গ্রহটির কেন্দ্রের দিকে তলিয়ে গিয়েছিল। প্রায় ৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী গ্রহাণুর আঘাতে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল। এই আঘাত গ্রহটির গভীরতর স্তরগুলোকে আলোড়িত করেছিল, এবং কিছু স্বর্ণকে জোরপূর্বক ভূত্বকের স্তরে ঠেলে দিয়েছিল। তা না-ঘটলে পৃথিবীর ভূত্বকে সোনার কোনও অস্তিত্বই থাকত না।

আজ সোনা– মুদ্রা ও সম্পদের মানদণ্ড। অর্থনৈতিক কারণেও সোনার গুরুত্ব অপরিসীম। অনেক দেশ তাদের অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে সোনার ভাণ্ডার সংরক্ষণ করে। আজও বিশ্ববাজারে সোনার দাম অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। অর্থনৈতিক সংকটের সময় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা অপরিহার্য। 

সোনা মানবসভ্যতার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তার উজ্জ্বল রং, বিরলতা ও স্থায়িত্বের জন্য যুগে যুগে মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাই সোনা শুধু মূল্যবান ধাতু নয়, সোনা মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…

পর্ব ৩১: ঠান্ডা আনন্দের ইতিহাস

পর্ব ৩০: সংস্কৃতির গুরুচণ্ডালী

পর্ব ২৯: চুরি হোক শিল্পসম্মত

পর্ব ২৮: মশা নিয়ে মশকরা

পর্ব ২৭: কাণ্ডজ্ঞানগম্যি

পর্ব ২৬: আয় ঘুম যায় ঘুম

পর্ব ২৫: ধুলোবালির পর বালিধুলো

পর্ব ২৪: তালাচাবির বন্ধুত্ব

পর্ব ২৩: বেঁধে থাকা বেঁধে রাখা

পর্ব ২২: এই দুনিয়া ঘোরে বনবন বনবন

পর্ব ২১: শরীরের ক্যানভাসে আঁকা শিল্প

পর্ব ২০: বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প

পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন

পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না

পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন

পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি

পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!

পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ

পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম

পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?

পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়

পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব‍্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ

পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?

পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা

পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার

পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ

পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা

পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?

পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!

পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন

পর্ব ১: বস্তু নাকি ভাবনা, শিল্পকলায় কী খোঁজেন?

Gold Gold mine Gold ornaments Goldleaf jwelery making Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar world economy

Share this article on