


আইসক্রিম তৈরির প্রথম এবং প্রধান উপকরণ হল বরফ। তাই বরফ সম্পর্কে কিছু তো বলতেই হয়, না-হলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে আজকের আলোচনা। আগেই বলেছি, আজ আমরা সহজেই ফ্রিজ খুলে বরফ বা আইসক্রিম পাই, কিন্তু একসময় বরফ ছিল অত্যন্ত মূল্যবান বস্তু। প্রাচীনকালে পারস্য, রোম কিংবা চিনে শীতকালে পাহাড় থেকে বরফ সংগ্রহ করে বিশেষ গর্ত বা ‘আইস হাউস’-এ জমিয়ে রাখা হত। গ্রীষ্মে সেই বরফ ব্যবহার করা হত রাজা-মহারাজাদের জন্য ঠান্ডা পানীয় বা ফলের শরবত বানাতে। এই বরফ সংগ্রহের কাজ অনেক সময় ক্রীতদাস বা নিম্নবর্গের শ্রমিকদের দিয়ে করানো হত। তাদের কঠোর পরিশ্রমের ফল একদিকে, অন্যদিকে সভ্যতার উচ্চস্তরে রাজকীয় বিলাসিতা।
৩১.
এই গ্রীষ্মের দাবদাহে মন নিতে চাইছে ঠান্ডা মিষ্টি খাবারের স্বাদ। গরমের দিনে এক স্কুপ আইসক্রিম হাতে পেলে যেন জগৎ ঠান্ডা! বরফ দিয়ে ঠান্ডা মিষ্টি বানানোর প্রচলন বিশ্বের প্রায় সব সংস্কৃতিতে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। এই ঠান্ডা আনন্দের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে বহু শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের শ্রম, আর বিস্ময়কর কৌশলের গল্প। ভারতের শঙ্কু-আকৃতির কুলফি থেকে শুরু করে তুরস্কের ‘সালেপ দনদুরমা’ পর্যন্ত।

১৫৯৫ সালের ফ্লোরেন্সের একটি ভোজসভার বিবরণ থেকে জানা যায়, সম্ভবত ইতালিতেই প্রথম আইসক্রিম, ‘জেলাতো’ তৈরি হয়েছিল। সেরা হাতে তৈরি জেলাতোতে কোনও বরফের কণা থাকে না, এবং এটা খুব বেশি মিষ্টি না-হয়ে, স্বাদ আর ক্রিমি ভাবের মধ্যে এক সুষম ভারসাম্য বজায় রাখে।

আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি, জর্জ ওয়াশিংটন, আইসক্রিম ভীষণ পছন্দ করতেন এবং এটা ছিল তাঁর প্রিয় ডেজার্ট। ১৭৮৪ সালে মাউন্ট ভার্ননে নিজের এস্টেটের জন্য তিনি একটি ‘ক্রিম মেশিন ফর আইস’ মানে আইসক্রিম তৈরির যন্ত্র কিনেছিলেন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন, তিনি ১৭৯০ সালের গ্রীষ্মে আইসক্রিমের জন্য ২০০ মার্কিন ডলার ব্যয় করেছিলেন, যা সেই সময়ে এক বিশাল অঙ্কের খরচ। ওয়াশিংটন আইসক্রিম এতটা ভালোবাসতেন যে, তিনি আইসক্রিম তৈরির এবং পরিবেশের আলাদা সরঞ্জাম, চামচ এবং ছাঁচ ইত্যাদি কিনেছিলেন। তাঁর পত্নী মার্থা ওয়াশিংটন, প্রায়শই তাঁদের সাপ্তাহিক সোশাল বা আড্ডায় আইসক্রিম এবং লেমোনেড পরিবেশন করতেন।

জর্জ ওয়াশিংটনের আইসক্রিমের উপকরণ হিসেবে পোটোম্যাক নদী থেকে বরফ সংগ্রহ করে তা মাউন্ট ভার্ননের বিশেষ ‘আইস হাউস’-এ সংরক্ষণ করা হত, এবং খামার থেকে সংগ্রহ করা হত দুধ ও ক্রিম। ওয়াশিংটনের সময়ে ডিমের কুসুম, ক্রিম এবং চিনি দিয়ে তৈরি চকোলেট আইসক্রিমের রেসিপিটি ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। প্রসঙ্গত, আইসক্রিম তৈরির সেই সময়ের সরঞ্জাম ও রেসিপি পরবর্তীতে আমেরিকায় আইসক্রিমের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছিল।

ভারতেও বরফের ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়। মুঘল আমলে হিমালয় থেকে বরফ আনা হত, আর তা দিয়ে ঠান্ডা শরবত বা মিষ্টান্ন তৈরি করা হত। পরবর্তীকালে ইংরেজ আমলে ‘আইস ট্রেড’ বা বরফ বাণিজ্য শুরু হয়। দূর দেশ থেকে জাহাজে করে বরফ আনা হত কলকাতা, মুম্বইয়ের মতো শহরে। তখন বরফ ছিল এক আশ্চর্য বস্তু, যা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালে আসে।

সাধারণ মানুষ, মানে, আপনার আমার নাগালের মধ্যে আইসক্রিম এসে গেল। আমার ব্যক্তিগতভাবে আইসক্রিমের সঙ্গে পরিচয় ৬০-৭০ বছর আগে অর্থাৎ, আমার গ্রাম্য জীবনের ছেলেবেলায়। সে আইসক্রিম ছিল চারকোনা, বাঁশের কাঠি লাগানো রঙিন আইসক্রিম। মিনিমাম আয়োজনে আসলে একটি মিষ্টি রঙিন বরফখণ্ড। সেগুলো থাকত একটা কাঠের বাক্সের মধ্যে। বাক্সের ভেতরের দেওয়ালে থার্মোকল বা ওই জাতীয় কিছু জিনিস লাগিয়ে ঠান্ডা সংরক্ষণের ব্যবস্থা। সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে বাঁধা। বাক্সের মধ্যে লাল-হলুদ-কমলা এমনকী, সবুজ রঙের আইসক্রিম। পরে অবশ্য সাদা রংয়ের আইসক্রিমও দেখেছিলাম সেগুলোকে বলা হত ‘দুধের আইসক্রিম’।

এই আইসক্রিম আমরা সচরাচর কিনে খেতে পারতাম না শৈশবে। কারণ দুটো। এক, আমাদের পকেটে কোনও পয়সা থাকত না, তাই রাস্তাঘাটে আইসক্রিমওয়ালা দেখলেই সেটাকে কিনে খাওয়ার কোনও উপায় ছিল না। আর দুই, দড়ি লাগানো যে প্যান্টগুলো পরতাম, সেই প্যান্টের পকেটই থাকত না। অপেক্ষাকৃত ধনী বাড়ির ছেলেমেয়েদের, অল্প হলেও পকেটে পয়সা থাকত। রাস্তায় আইসক্রিমওয়ালার কাছ থেকে আইসক্রিম কিনত। আমরা ওদের খাওয়াটা দেখতাম। সেটা দেখারও কিন্তু সুখ ছিল দারুণ।

রঙিন আইসক্রিম চুষলে মুহূর্তে খানিকটা জায়গার রং অনেকটা ফিকে হয়ে যেত। এইভাবে খেতে খেতে শেষের দিকে চলে আসলে প্রায় পুরোটাই ফ্যাকাসে হয়ে গিয়ে রংবিহীন হয়ে যেত। আর ভালো লাগত না। কাঠির নিচের দিকে গোড়ায় অল্প একটু-আধটু যখন লেগে আছে তখন আমার বন্ধু বলত, ‘খাবি?’ আমি অতি উৎসাহে সেটাকে সন্তর্পণে ধরতে যেতাম। ধরার আগে মনে হত এটা বোধহয় ভীষণ ঠান্ডা, তাই অতি সাবধানে কাঠিটা ওর আঙুল থেকে আমার আঙুলে নিয়ে আসার মধ্যে ছোট্ট করে জমে থাকা যে বরফের অংশটা কাঠির নিচের দিকে ছিল, সেটা টুক করে খসে পড়ে যেত নিচের মাটিতে, ধুলোয়। খাওয়া হল না সেবারের মতো আইসক্রিম। খাওয়া হল না বলে খুব দুঃখও হত না। আর এই ঘটনা আপনাদের প্রত্যেকেরই জীবনে একদিন-না-একদিন হয়েছে বলে আমার মনে হয়।
বড় রাস্তা, মেজ রাস্তা, এ সমস্ত জায়গায় আইসক্রিমওয়ালাদের যাতায়াত। কিন্তু ঘন গাছপালায় ঘেরা আমাদের উঠোনের পাশ দিয়ে যে সরু রাস্তাটা, সেইখান থেকে কখনও কখনও আইসক্রিমওয়ালা গেলে, মা-কে বলতাম কিনতে। মা কালে-ভদ্রে সেই আইসক্রিম আমাদের কিনে দিত। বাবা বাড়িতে থাকত না, সপ্তাহে একদিন-দু’দিন বাড়িতে আসত আর বাদবাকি দিনগুলোতে দূরে স্কুল মাস্টারি করার জন্য সেখানে থেকে যেত।
মনে আছে সেদিন রবিবার। বাবা বাড়িতে আছে আমরা উঠোনের ধারে বেড়ার মেরামত ইত্যাদির কাজ করছিলাম। এমন সময় আইসক্রিমওয়ালা আমাদের উঠোনের পাশের সরু রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আইসক্রিম!’ বাবা বলল, ‘ডাক।’ আমি আইসক্রিমওয়ালাকে উঠোনে নিয়ে এলাম। ও আমাদের উঠোনের একপাশে সাইকেলটাকে স্ট্যান্ডে দাঁড় করাল। বাবা বাড়িসুদ্ধু সবার জন্য আইসক্রিম কিনল, এমনকী, নিজের জন্যও। বাবাকে আইসক্রিম খেতে দেখে সেদিন কেন জানি না হাসি পাচ্ছিল।
হঠাৎ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। আইসক্রিমওয়ালা তার বাক্স থেকে আইসক্রিম সন্তর্পণে বের করে, কাঠিটা আমাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়াতে এত মনোযোগ দিচ্ছিল যে, আমাদের বাড়ির লোকজনের চেহারা বা মুখ তেমন দেখছিল না। আর একটা জিনিস লক্ষ করলাম, কখনও একটা কাঠি ধরে আইসক্রিম তুলতে গিয়ে দেখতাম তার গায়ে জুড়ে আছে আর একটা। ওর কাছে একটা ছোট্ট ছুরি থাকত বাক্সের মধ্যে, সেটার ডগা দিয়ে দুটো আইসক্রিমের মাঝখানে ঢুকিয়ে একটু চাপ দিতেই টুক করে দুটো আইসক্রিম আলাদা হয়ে যেত। কিছুক্ষণ পরে বাবার মুখের দিকে তাকাল ওই যুবক আইসক্রিমওয়ালা। তারপরে ঢিপ করে পায়ে হাত দিয়ে বাবাকে প্রণাম করল। বাবা বসেছিল উঠোনে খালি গায়ে। ‘স্যর, আমি গোবিন্দ, নিত্যানন্দকাটি স্কুলে আমি আপনার ছাত্র ছিলাম’, বলল ও। প্রাইমারি স্কুলের ছোট্ট শিশুটি থেকে এখনকার ওই ২৫-২৬ এর চেহারায় বাবা তাকে চিনতে পারেনি। ও বাবাকে চিনেছিল।

পড়াশোনা বেশি এগয়নি, তাই যা কাজ পায়, তা-ই করে। এখন আইসক্রিম বিক্রি। সেদিন ও আইসক্রিমের পয়সা নিতে চাইছিল না, বাবা জোর করে দিয়েছিল। বলেছিল, ওইটুকু তো তোমার রোজগার। আর একটা ব্যাপার ঘটল। বাবা ওকে বলল, ‘সামনের রবিবারে তুমি আমাদের বাড়িতে এসো, আর খেয়ে যেও দুপুরবেলা, সেদিন তোমার গল্প শুনব।’ ও মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেছিল।
পরের রবিবার গোবিন্দ ঠিক এসেছিল। সেদিন ওর পরনে ছিল পরিষ্কার সাদা পাজামা আর ফুলশার্ট। আর হাতে ছিল ছোট্ট একটা হলুদ রঙের কাঠের বাক্স তার উপরে লোহার ব্র্যাকেটের মতো হ্যান্ডেলে গোল কাঠের ধরার জায়গা– সেটা আবার ঘোরে। সেই বাক্সটার মধ্যে ছিল দশটা সুন্দর দুধের আইসক্রিম, রঙিন আইসক্রিমের চেয়ে যেগুলোর ডবল দাম! সেই আইসক্রিমগুলো ও এনেছে আমাদের জন্য, যেমন কারও বাড়িতে এলে কেউ হাতে কিছু নিয়ে আসে। বিধাতার কী ইচ্ছে, ওই আমাদের গ্রামের বাড়িতেই, লটারির মতো রাশি রাশি আইসক্রিম। এমন ভাগ্য আর ক’জনার হয় বলুন! এ একেবারে জর্জ ওয়াশিংটনের ভাগ্যের মতোই!
গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের সেই কাঠি আইসক্রিমের সময় থেকে শতাব্দীটাও পেরলাম। এই সময়ের মধ্যে কত না আইসক্রিম এবং ঠান্ডা পানীয় আর বরফের ব্যবহার দেখলাম। দেশে-বিদেশে কত রকম যে ঠান্ডা খাদ্য এবং পানীয় উপভোগ করেছি তা বলে শেষ করা যাবে না। এখন সবাই হাতেনাতে একেবারে বাড়িতেই তৈরি করছে বিভিন্ন স্বাদের বিভিন্ন চেহারার বিভিন্ন রকমের আইসক্রিম। মানুষের ঠান্ডাতে বোধহয় একঘেয়েমি এসে গিয়েছে। এখন তো ফ্রিজ খুললে সবই ঠান্ডা। মানুষের কোনও কিছুই বেশিক্ষণ পছন্দ হয় না। শান্তি নেই। শেষ পর্যন্ত আইসক্রিমকে উল্টে গরম করে খাওয়ার শখ হল।

জার্মানিতে দেখেছি একটা রেস্তোরাঁয় সেই শখ মেটাতে তারা তৈরি করছিল, ‘ফ্রায়েড আইসক্রিম’। সেই আইসক্রিম ভাজা আমিও খেলাম। অবিশ্বাস্য জিনিসটার তৈরির পদ্ধতিও জেনে নিলাম।
থার্মোডাইনামিক্স নীতি এবং চরম পরিস্থিতিতে পদার্থের আচরণের এ এক অদ্ভুত প্রমাণ, ওই আইসক্রিম ভাজা। রহস্যটি লুকিয়ে আছে আইসক্রিমটিকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ‘ফ্ল্যাশ-ফ্রিজ’ করার মধ্যে। এরপর এটাকে ব্যাটারের একটি সুরক্ষার আবরণে মুড়ে ফুটন্ত তেলে খুব অল্প সময়ের জন্য ডুবিয়ে ভাজা হয়। ফ্ল্যাশ-ফ্রিজিং প্রক্রিয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। আইসক্রিমটিকে দ্রুত ঠান্ডা করে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় নিয়ে আসার ফলে এর ভেতরের জলের অণুগুলো ছোট ছোট বরফের স্ফটিক বা দানা তৈরি করে। এই ক্ষুদ্র স্ফটিকগুলো আইসক্রিমের কাঠামোগত অখণ্ডতা বজায় রাখতে সাহায্য করে, বিশেষ করে ফুটন্ত তেলের তীব্র উত্তাপের সংস্পর্শে এসেও।

আইসক্রিম তৈরির প্রথম এবং প্রধান উপকরণ হল বরফ। তাই বরফ সম্পর্কে কিছু তো বলতেই হয়, না-হলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে আজকের আলোচনা। আগেই বলেছি, আজ আমরা সহজেই ফ্রিজ খুলে বরফ বা আইসক্রিম পাই, কিন্তু একসময় বরফ ছিল অত্যন্ত মূল্যবান বস্তু। প্রাচীনকালে পারস্য, রোম কিংবা চিনে শীতকালে পাহাড় থেকে বরফ সংগ্রহ করে বিশেষ গর্ত বা ‘আইস হাউস’-এ জমিয়ে রাখা হত। গ্রীষ্মে সেই বরফ ব্যবহার করা হত রাজা-মহারাজাদের জন্য ঠান্ডা পানীয় বা ফলের শরবত বানাতে। এই বরফ সংগ্রহের কাজ অনেক সময় ক্রীতদাস বা নিম্নবর্গের শ্রমিকদের দিয়ে করানো হত। তাদের কঠোর পরিশ্রমের ফল একদিকে, অন্যদিকে সভ্যতার উচ্চস্তরে রাজকীয় বিলাসিতা।
এই লেখার রসদ খুঁজতে ইউটিউবে বরফ নিয়ে বেশ কয়েকটা ভালো ডকুমেন্টারি ফিল্ম আছে দেখলাম। পৃথিবীর এক জায়গা থেকে বরফ কেটে নিয়ে অন্য জায়গায় কখনও ট্রেনে, কখনও বা জাহাজে বহু দূরে কীভাবে সেগুলোকে নিয়ে যাচ্ছে তার দারুণ ফিল্মিং। যাত্রাপথে বরফের গলন থেকে বাঁচার ব্যবস্থা আর বিশাল দূরত্ব অতিক্রম যেন পৃথিবীর নতুন মানচিত্র সৃষ্টি। যার তৈরি দেখে অবাক হতে হয়। ইউটিউব ঘাঁটলে আপনি বরফ সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো ফিল্ম পাবেন। তার মধ্যে একটা অন্তত দেখার অনুরোধ রইল, ‘আইস কিং’ অর্থাৎ ‘বরফ-সম্রাট’। কিন্তু কে এই বরফ-সম্রাট?

ফ্রেডরিক টিউডর (১৭৮৩–১৮৬৪) ছিলেন একজন আমেরিকান ব্যবসায়ী, বাস্তব জীবনের ‘বরফ-সম্রাট’, বোস্টনের এক উদ্যোক্তা এবং সত্যিকারের আন্তর্জাতিক বরফ বাণিজ্যের পথপ্রদর্শক। যিনি উনিশ শতকের শুরুর দিকে নিউ ইংল্যান্ডের লেকগুলো থেকে বরফ সংগ্রহ করে, তা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে রফতানি করার মাধ্যমে এই শিল্পে এক বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটালেন! শুরুর দিকে কিঞ্চিৎ উপহাস ও বিদ্রুপের শিকার হওয়া সত্ত্বেও, তিনি বরফের ব্যবসায় বিশ্বব্যাপী একচেটিয়া আধিপত্য গড়ে তুলেছিলেন। ঠান্ডা খাদ্য, পানীয়, খাদ্য সংরক্ষণ, ককটেল ও অন্যান্য বস্তুর ঠান্ডাকরণের কাজ, এমনকী, চিকিৎসার ক্ষেত্রে বরফকে একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি পণ্যে পরিণত করেছিলেন। শুরুতে কাজটা মোটেই সহজ হয়নি, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। ব্যাপক বরফ গলে যাওয়া, সংরক্ষণের অভাব এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে প্রথম দিকের প্রচেষ্টাগুলোর অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছিল। তিনি হাল ছাড়েননি। সেটাই তাকে একজন দুঃসাহসী হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়। উষ্ণ জলবায়ুতে বরফ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ বরফঘর তৈরি করেন টিউডর। হাভানা, ভারতের কলকাতা, বোম্বে এবং নিউ অরলিন্সের মতো জায়গায় এর চাহিদা তৈরি করেন। তিনি একটি বিলাসবহুল পণ্যকে অত্যাবশ্যকীয় বস্তুতে রূপান্তরিত করেন এবং অত্যন্ত ধনী হয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত যা আধুনিক রেফ্রিজারেশনের পথ প্রশস্ত করে।
১৮৩৩ সালের ১২ মে, ‘টাস্কানি’ নামক জাহাজটি ১৮০ টন বরফ নিয়ে বোস্টন থেকে কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা করে। ৬ সেপ্টেম্বর যখন জাহাজটি কলকাতায় নোঙর করে, তখনও এর ভেতরে ১০০ টন বরফ ছিল। জড়ো হওয়া লোকেরা বিশাল বরফের খণ্ডগুলো নামানোর সময় দেখে বিস্ময়ে হতবাক। কলকাতা এর আগে এমন বরফ দেখেনি। ‘শীতলতার স্ফটিক খণ্ড’। একজন স্থানীয় ব্যক্তি বরফ ছুঁয়ে দেখতে এগিয়ে গিয়ে ভেবেছিল যে, সে পুড়ে গেছে, যা অন্য দর্শকদের বেশ আতঙ্কিত করে তুলেছিল। আর একজন তো জাহাজের ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞাসাই করেছিল যে, আমেরিকায় গাছে বরফ জন্মায় কি না!

এরপর ভারতে আমেরিকান বরফের রপ্তানি ফুলেফেঁপে ওঠে। সেই সময়ে অন্যান্য জাতের বরফের তুলনায় এই ধরনের বরফকে বিশুদ্ধ বলে মনে করা হত। উদাহরণস্বরূপ, ওয়েনহ্যাম হ্রদ থেকে কাটা বরফের বিশুদ্ধতা, যা লন্ডনে পাঠানো হয়েছিল, মাইকেল ফ্যারাডের মতো সমসাময়িক বিজ্ঞানীকেও মুগ্ধ করেছিল। যিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, এই বরফ ধীরে ধীরে গলে যায় কারণ এতে লবণ এবং বায়ুর বুদ্বুদ থাকে না। পরবর্তী তিন দশকে কলকাতা এবং অন্যান্য শহরগুলো টিউডরের সবচেয়ে লাভজনক গন্তব্যে পরিণত হয়, যা তাকে বিপুল মুনাফা এনে দেয় এবং তিনি হয়ে ওঠেন বহু কোটিপতি।
ঠান্ডা খাদ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে উনিশ শতকের শেষভাগে, যখন যান্ত্রিক রেফ্রিজারেশন প্রযুক্তির আবিষ্কার হয়। এর ফলে কৃত্রিমভাবে বরফ তৈরি করা সম্ভব হয়, এবং আইসক্রিম উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। শিল্পায়নের ফলে আইসক্রিম আর অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চলে আসে সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায়। বিশ শতকে ফ্রিজ ও ফ্রিজার আবিষ্কারের মাধ্যমে ঠান্ডা খাদ্য সংরক্ষণ সহজ ও সুলভ হয়ে ওঠে।
অতএব ঠান্ডা খাদ্য ও আইসক্রিমের ইতিহাস শুধুমাত্র খাদ্যের বিবর্তনের ইতিহাস নয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় থেকে সংগৃহীত প্রাকৃতিক বরফ থেকে শুরু করে আধুনিক রেফ্রিজারেশন প্রযুক্তি। এই দীর্ঘ যাত্রা মানবসভ্যতার অগ্রগতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…
পর্ব ৩০: সংস্কৃতির গুরুচণ্ডালী
পর্ব ২৯: চুরি হোক শিল্পসম্মত
পর্ব ২৮: মশা নিয়ে মশকরা
পর্ব ২৭: কাণ্ডজ্ঞানগম্যি
পর্ব ২৬: আয় ঘুম যায় ঘুম
পর্ব ২৫: ধুলোবালির পর বালিধুলো
পর্ব ২৪: তালাচাবির বন্ধুত্ব
পর্ব ২৩: বেঁধে থাকা বেঁধে রাখা
পর্ব ২২: এই দুনিয়া ঘোরে বনবন বনবন
পর্ব ২১: শরীরের ক্যানভাসে আঁকা শিল্প
পর্ব ২০: বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প
পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন
পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না
পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন
পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি
পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!
পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ
পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম
পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?
পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়
পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ
পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?
পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা
পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার
পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ
পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা
পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?
পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!
পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved