


পূর্ববঙ্গ বা পশ্চিমবঙ্গের প্রতিন্যাসে ‘ঘটি-বাঙ্গাল’ ভেদ তখন না থাকলেও স্থানিক পরিসরটি মাছ বাছাই ও রান্না-পদ্ধতির প্রশ্নে বেশ গুরত্বপূর্ণ। উনিশ শতকে বাঙালির রান্নার বইয়ের দৌলতে মাছের ঝোল/কালিয়া-ভাতের ‘অথেনটিক বেঙ্গলি কুইজিন’ নামক এক সমরূপ পরিচিতিতে বাঙালিকে বেঁধে ফেলা সহজ হলেও প্রাক্-ঔপনিবেশিক আমলে চিত্রটা ভিন্ন। মাছ খাওয়ার সঙ্গে ভোক্তার সামাজিক অবস্থান, তার ভৌগোলিকতা, সামাজিক লিঙ্গরূপ ইত্যাদির পার্থক্য এক লহমায় উপনিবেশ পর্বে মুছে গিয়ে একটা ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ পরিচয়ে থিতু হতে চাইল। যা আদতে বাঙালির ‘এক্সক্লুসিভ’ পরিচিতিকেই বৈধ করে তুলল।
‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটা আমরা এমনভাবে বিশ্বাস করে ফেলেছি যে, আজ এই আপ্তবাক্য নিয়ে কোনও সংশয় নেই। এই আপ্তবাক্যের প্রতিপক্ষ যদি কেউ থেকেও থাকেন, তাহলে তিনি বা তাঁরাও বাঙালিকে খুশি করতে অথবা বাঙালি সাজতে মাছ নিয়ে বাজারে নেমে পড়েছেন! প্রতিদিনই নতুন নতুন দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে, আর ‘মাছে-ভাতে’ পরিচিতিটিই বাঙালিত্বের একমাত্র চিহ্ন হয়ে উঠছে। এসব কূট-তর্কে যাওয়ার আর সুযোগ নেই যে, সত্যিকারের বাঙালির মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ– জাপান, ডেনমার্ক বা পৃথিবীর অন্যান্য বহু দেশের গ্রহণ-অনুপাতের অনেক কম। প্রশ্ন উঠবে, এই যে একরকমের পরিচয় নিয়ে আমরা বাঁচছি, তার ভাবনার শেকড়বাকড়গুলো কোথায়? সে কি কেবলই উনিশ শতকের বাঙালির নতুন আত্মপরিচয়ের উত্তরাধিকার না কি অতিরিক্ত আরও কিছু?

মাংস ভক্ষণের নানারকম বিধিনিষেধ, সংস্কার, প্রথা-পদ্ধতি, ‘মোঘলাই খানার’ আত্মীকরণে দৈনন্দিন জীবনে অনেকখানি গ্রাহ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু উনিশ শতকের বাঙালির রন্ধন প্রণালীর বইয়ে সেসবের তুলনায় ঝোঁক পড়ল ‘মৎসপ্রকরণ’-এর দিকে। তুল্যমূল্যের বিচারে মাংসের রেসিপি সেখানে কমই, বলা যেতে পারে মাছেরই রাজত্ব আমিষের প্রশ্নে। মাছ-মাংস যে একটা বিরোধমূলক অবস্থানে আসতে পারে, সেটা খাদ্য রাজনীতির পরিচিতির প্রশ্নে সেভাবে আলোচনা হয়নি। মাছ খাওয়ার সঙ্গে যে আবশ্যিকভাবে একটি সেকুলার পরিচিতি গড়ে তোলা হচ্ছে, তারও পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।

নীহাররঞ্জন রায় ‘বাঙালির ইতিহাস’-এ লিখেছেন: ‘নদনদী-খালবিলবহুল প্রশান্ত-সভ্যতাপ্রভাবিত এবং আদি-অস্ট্রেলীয় মূল বাংলায় মৎস অন্যতম প্রধান খাদ্যবস্তু হিসাবে পরিগণিত হইবে, ইহা কিছু আশ্চর্য নয়। বাংলাদেশের এই মৎসপ্রীতি আর্যসভ্যতা কোনদিনই প্রীতির চক্ষে দেখিত না। মাংসের প্রতিও এই বিরাগ বাঙালির কোনদিনই ছিল না।… বাংলার অন্যতম প্রথম ও প্রধান স্মৃতিকার ভট্ট ভবদেব সুদীর্ঘ যুক্তি তর্ক উপস্থিত করিয়া বাঙালির এই অভ্যাস সমর্থন করিয়াছিলেন। বস্তুত মাংস বা মৎস্য আহার বাংলাদেশে এত সুপ্রচলিত ও গভীরাব্যস্ত যে, এই সমর্থন ছাড়া ভবদেবের কোন উপায় ছিল না।’

স্মৃতিকাররা মাছ-মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিশেষ তিথিপর্বে নিষেধ করলেও সার্বিকভাবে বারণ করেননি। ‘মনুসংহিতা’-র পঞ্চম অধ্যায়ের ১৫ নম্বর শ্লোকে মাছ খাওয়ার কিছু নির্দেশ রয়েছে। পরে ‘বৃহদ্ধর্মপুরাণ’-এর মতো গ্রন্থেও বিশেষ কিছু মাছ ছাড়া ব্রাহ্মণদেরও মাছ গ্রহণের কথা বলা আছে। আমাদের ভারতীয় ধর্ম এবং মঙ্গলাচরণে মাছের মোটিফ নানাভাবে ঘুরে ফিরে এসেছে, সে বিষ্ণুর মৎস অবতার হোক, কিংবা মহাভারতে অর্জুনের মাছের চোখের লক্ষ্যভেদের গল্প। বাঙালির ‘মঙ্গলচিহ্ন’ হিসেবে মাছ অনেকখানি জায়গা-জুড়ে রয়েছে। বিয়ের তত্ত্বে সিঁদুর মাখানো মাছ, গৃহস্থের আলপনার ভিতর মাছের প্রতীক আসলে সুখ, সমৃদ্ধি ও লক্ষ্মীশ্রীর চিহ্ন হয়ে উঠেছে। নীহাররঞ্জন খাবারের প্রেক্ষিত থেকে মাছের যাত্রাপথের কথা বললেও, মাছ আসলে বৃহত্তরভাবে বাঙালি জীবনের আনাচকানাচে এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, যার প্রভাব প্রশ্নাতীত। কিন্তু যা নজর করা দরকার, তা হল, এই মাছকেন্দ্রিক পরিসরের ক্ষেত্রটি আখেরে হিন্দু বাঙালির জীবনের বিশেষ এক রকমের ছবি।

ধর্ম সংস্কারের বাইরে বাংলার যে ভৌগোলিকতা, নদীনালা, খালবিল, পুকুরদিঘি সেখানে মাছের উপস্থিতি পরিবেশগতভাবেই স্বাভাবিক। বাংলার ভৌগোলিক পরিমণ্ডল যে মাছের বাস্তুতন্ত্রের জন্য বিশেষ সহনশীল, সেই ক্ষেত্রটি চিহ্নিত করা দরকার প্রচলিত ধর্মীয় প্রেক্ষিতের বাইরে থেকে। বাংলার লোকজীবন, মৌখিক সাহিত্য, ছড়া, গান, প্রবাদ প্রবচনে মাছের উপস্থিতি অভিযোজনকেন্দ্রিক।

জলজীবনের সঙ্গে মানুষের জীবনের যে সম্পর্ক সেখানে সংযোগ-সেতু মাছ। ‘যমুনাবতী সরস্বতী’র ছড়াতে ত্রিপুর্ণির ঘাটে মাছ ভেসে ওঠা কিংবা ক্ষীর নদীর কূলে খোকা মাছ ধরতে গেলে চিলে মাছ নিয়ে যাওয়া অথবা চাঁদমামাকে ডাকতে গিয়ে মাছ কাটলে মুড়ো দেওয়ার কথার মতো দৃষ্টান্ত অজস্র। সামূহিক প্রজ্ঞাসঞ্জাত প্রবাদ প্রবচনে ‘গভীর জলের মাছ’, ‘মাছের তেলে মাছ ভাজা’, ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’-র মতো প্রগাঢ় অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লব্জগুলি বাংলাভাষাকে অনেকখানি ধারণ করে আছে। চাইলে মাছের সঙ্গে বাঙালি জীবনকে নানা অক্ষে ভাগ করা যায়। সেখানে মাছের উপস্থিতি খাবার হিসেবে থাকতে পারে, হতে পারে হিন্দু বাঙালির জীবনে বিশেষ এক মঙ্গলপ্রতীক ইত্যাদি। কিন্তু যা বোঝা জরুরি, তা হল, বাঙালির যে বাস্তুতন্ত্র, যে খেতখামার, যে জলজ দুনিয়ার আধিক্য, সেখানে মাছের উপস্থিতি হিন্দু আচার বৃত্তের বাইরেই। বোঝা দরকার, মাছ এক বিশেষ জলজ জীবনের সদস্য, যেখানে শুধু মাছ নেই আছে ব্যাং, গেঁড়ি-গুগলি, শামুক– আরও কত কী! মাছের সঙ্গী হিসেবে এই অন্যান্য জীবনের কথা ভাবলে মাছকে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচিতির বৃত্তে আটকানো চলে না।

বাঙালির সামজিক জীবনবৃত্তে মাছের বহুমাত্রিক পরিচয়ের মধ্যে পাহাড়পুর এবং ময়নামতীর পোড়ামাটির ফলকে মাছ-কোটা, মাছভর্তি ঝুড়ি নিয়ে হাটে যাওয়ার দৃশ্যাবলি জীবন-জীবিকার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরকে ইঙ্গিত করে। পরিচিতি প্রসঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের সংস্কার ও সংস্কৃতির এমন পাথুরে প্রমাণের বিস্তার মধ্যযুগের সাহিত্যেও অজস্র। একেবারে গোড়ার দিকে ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’-এ ভাতের সঙ্গে অন্যবিধ উপকরণ এবং মৌরালা মাছ পরিবেশনের কথা আছে। পরিবেশনকারীর স্বামী এখানে ‘পুণ্যবান’ বলে বিবেচিত। পুণ্য অর্জনের সম্পর্কটি পারিবারিক সুখ ও সমৃদ্ধিবাচক। গার্হস্থ্য সন্দর্ভে রেঁধে-বেড়ে খেতে দেওয়ার সঙ্গে খাবারের তালিকাটিও কি কম গুরুত্বপূর্ণ? সামান্য হলেও মাছের উল্লেখ বাঙালির খাদ্যাভাসে একটি বিশেষ এবং অপরিহার্য আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিতবহ মনে করতে পারি না?

মুকুন্দ চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে নির্বাসিতা খুল্লনাকে ‘পঞ্চাশ ব্যঞ্জন’ রেঁধে লহনার আপ্যায়নে চিতল, রুই, কই, চিংড়ি, সরল-সফরী ইত্যাদি নানা মাছের সম্ভার। সতীন খুল্লনার মাছ রান্নায় অবশ্য এইসব মাছের কথা এলেও রন্ধন প্রণালী খানিক অন্যরকম। কাঁঠাল বিচি দিয়ে চিংড়ি, আদার রস মরিচ গুঁড়ো দিয়ে কই, আম দিয়ে শোল, কাতলা মাছের ঝোল, খোরশোলা মাছভাজা– কী নেই তাতে! রাঢ়-বঙ্গের কবি হিসেবে মুকুন্দর বর্ণনায় যেসব মাছ ও রন্ধনপ্রণালীর কথা আছে, সেসব আবার বরিশালের বিজয়গুপ্তের সঙ্গে মিলবে না। বিজয়গুপ্ত লিখছেন, ‘মৎস কাটিয়া থুইল ভাগ ভাগ।/ রহিত মৎস দিয়া রান্ধে কলতার আগ।।/ মাগুর মৎস দিয়া রান্ধে গিমা গাছ গাছ।/ ঝাঁঝ কটু তৈলে রান্ধে খরসুন মাছ।।/ ভিতরে মরিচ গুঁড়ো বাহিরে জড়ায়ে সুতা।/ তৈলে পাক করিয়া রান্ধে চিংড়ির মাথা।।/ ভাজিল রোহিতার চিতলের কোল।/ কৈ মৎস দিয়া রান্ধে মরিচের ঝোল।।’

ভারতচন্দ্র রায়ের অন্নদামঙ্গল কাব্যে ভনানন্দের স্ত্রী পদ্মমুখীর ব্রাহ্মণভোজনের আয়োজনে ২৩ রকমের নিরামিষ রান্নার সঙ্গে রুই, কাতলা, ভেটুক, চিতল, ফলুই, কই, মাগুর, চিংড়ি, সোল ইত্যাদি মাছের রন্ধনপ্রণালী-সহ অজস্র পদের বর্ণনা আছে। এমনকী, মাছের ডিমের বড়া এবং ‘তিতা’ সহযোগে ‘পচা মাছ’ রান্নার উল্লেখ মেলে। মোদ্দা কথা, মধ্যযুগে বিভিন্ন সময়পর্বে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে মাছ বিশেষ জনপ্রিয় এবং তা জাতপাত নির্বিশেষে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল, তা উল্লেখযোগ্য।

বিচিত্র মাছ বিবিধ রন্ধন-প্রণালীর মধ্যে স্থানিক পরিচয়ের অজস্র ইঙ্গিত আছে। পূর্ববঙ্গ বা পশ্চিমবঙ্গের প্রতিন্যাসে ‘ঘটি-বাঙ্গাল’ ভেদ তখন না থাকলেও স্থানিক পরিসরটি মাছ বাছাই ও রান্না-পদ্ধতির প্রশ্নে বেশ গুরত্বপূর্ণ। উনিশ শতকে বাঙালির রান্নার বইয়ের দৌলতে মাছের ঝোল/কালিয়া-ভাতের ‘অথেনটিক বেঙ্গলি কুইজিন’ নামক এক সমরূপ পরিচিতিতে বাঙালিকে বেঁধে ফেলা সহজ হলেও প্রাক্-ঔপনিবেশিক আমলে চিত্রটা ভিন্ন। মাছ খাওয়ার সঙ্গে ভোক্তার সামাজিক অবস্থান, তার ভৌগোলিকতা, সামাজিক লিঙ্গরূপ ইত্যাদির পার্থক্য এক লহমায় উপনিবেশ পর্বে মুছে গিয়ে একটা ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ পরিচয়ে থিতু হতে চাইল। যা আদতে বাঙালির ‘এক্সক্লুসিভ’ পরিচিতিকেই বৈধ করে তুলল।

মধ্যযুগের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোয় বাঙালি পরিচিতির মধ্যে জাত-বর্ণের বিভাজনটিও যে মাছ-ভোক্তা সম্পর্ক নির্ণয়ে ভূমিকা নিয়েছিল, তা বিষ্ণু পালের ‘মনসামঙ্গল’-এ বেশ স্পষ্ট। এখানে মনসা শুধুমাত্র সর্পদেবী নন, বরং জালু-মালুদের কাছে তাদের জেলে জীবনে জীবিকার ভরসা হয়ে পরিচয়ের খানিক বিস্তার ঘটিয়েছেন। দেবীর কৃপায় ৩৬ রকমের মাছ জালে বন্দি করার সুযোগ পেয়েছে তারা। মনসার আখ্যানকে আমরা যেভাবে পড়ি, বিষ্ণু পাল যেন সেখান থেকে বেরিয়ে ভিন্ন এক কাঠমো প্রস্তাব করেন। দেবীর উপস্থিতি এবং জেলে জীবনের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাচ্ছে মাছের প্রেক্ষিত থেকে। মাছই যে এই আখ্যানে একটি নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠছে, তা খেয়াল করা দরকার।

জাত-বর্ণ অনুযায়ী, এখানে মাছের ভাগ বাঁটোয়ারা করেছেন বিষ্ণু পাল। ছকটা অনেকটা এমন: ‘কালিবাউস ধরিলে জেতে তাম্বুলি বোলায়।/…চেং মাছ ধর্ল্যে জেতে আগুরি বোলায়।/…সোল মাছ ধরিলে যেতে গোআলা বোলায়।/…আড় মাছ ধর্ল্যে জেতে ছুতার বোলায়।/…’ ইত্যাদি। জাতবর্ণ ভেদে বিষ্ণু পাল কথিত মাছের এই বিভাজন কিছু গভীর সামাজিক প্রেক্ষিতের দিকে ইঙ্গিত করে। আসলে প্রশ্নটা শুধু জাতপাতের ব্যাপার নয়, বরং মাছ কেনা এবং খাওয়ার সঙ্গে ক্রেতা-ভোক্তার সামজিক বর্গটিও কীভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে, সেই ইঙ্গিত রয়েছে এই আখ্যানে।
মোদ্দা কথা, মাছ শুধু বাঙালির রসনার বিষয় নয়। নানাভাবেই আমাদের পরিচিতি রাজনীতিরও নির্ণায়ক।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved