a journey with Rabana Chhaya shadow puppetry of odisha | Robbar
Robbar
  • ২০ কার্তিক ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৭ নভেম্বর ২০২৬

ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে

প্রথাগত রাবণছায়ায় রাম ‘পরমব্রহ্ম’। তাই তিনি নিরাকার। তাঁর ছায়া নেই। তাই ‘রামছায়া’ শব্দটার ব্যবহার যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং কথিত আছে, পুষ্পকরথে চড়ে মা সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার সময়, সীতা সমুদ্রের জলে রাবণের যে ছায়া দেখেছিলেন– তা তিনি সখীদের এঁকে দেখান। এবং নিজের দুঃখের বর্ণনা করেন। সেই দুঃখের ছায়াই ‘রাবণছায়া’। আবার ছায়া যেহেতু আলোর বিপরীত; এবং রাবণ যেহেতু ন্যায়ের বিপরীত, দৈবের বিপরীত– তাই রাবণছায়া।

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৭, ২০২৬, ২০:৫৩   
Facebook WhatsApp Messenger

ছায়া। আলোর বিপরীত। সেটাই তার মজা। সেটাই তাকে আলো থেকে পৃথক করে। আলো তো আর দেখা যায় না। ছায়া দেখা যায়। কারণ ছায়া বস্তুকে চিনিয়ে দেয়। তাই ছায়াবাজিকে ব্যবহার করে অনেক সময়েই আমরা নানারকম শিল্প দেখি। ছেলেবেলায় আঙুলের ছায়া দেওয়ালে ফেলে কত গল্পই না তৈরি করেছি আমরা। সেই ছায়া খুলে দিয়েছে আমাদের মনের জানলাগুলো। আলো এসেছে। আলো। ছায়া আছে বলেই না আলোর এত কদর!

ছায়াকে ব্যবহার করে কত শিল্পই না রয়েছে পৃথিবী জুড়ে। আমাদের দেশে তামিলনাড়ুতে যেমন তোলু বোম্মালাটা, কর্ণাটকে থোলপাবাকুট্টু, বাংলায় ছায়াপুতুল নৃত্য। ওড়িশায় তেমনই রাবণছায়া। প্রত্যেকটার মূল পারফরম্যান্স মডেল এক হলেও, কিছু পার্থক্য রয়েছে– ছায়া ব্যবহারের পার্থক্য, পুতুলের গড়ন, প্রকৃতি, পুতুলের আকার, সংগীতের পার্থক্য। তবু সবক’টিই শেষ অবধি ছায়াবাজি– আলোর উৎসের সামনে পুতুল নাচিয়ে তার ছায়াকে পর্দায় ফেলে গল্প বলা। সে এক মজার ব্যাপার। আলোর উৎস থেকে পুতুলকে কাছে-দূরে সরিয়ে পারস্পেকটিভ তৈরি করা, যুদ্ধ দেখানো, প্রাচীন পৌরাণিক গল্পগুলোকে চোখের সামনে সত্যি করে তোলা– শুধুমাত্র হাত আর আলোছায়ার কারসাজিতে।

zoom
থোলপাবাকুট্টু, দক্ষিণের ছায়াপুতুলনাচ

আমি পুতুলনাচিয়ে নই। আমি মূলত গবেষক। ১৯৯২ সালে উড়িষ্যার পুতুলনাচের ওপর আমার গবেষণা শেষ হয়। সেই বছরই, দিল্লির ‘আইজিএনসিএ’-র অধিকর্তা কপিলা বাৎস্যায়ন আমায় একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে ওড়িশার প্রাচীনতম ছায়াপুতুল নৃত্য রাবণছায়ার আধুনিকীকরণ বিষয়ে কিছু কথা ছিল। কেবল গবেষণা নয়, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প-মাধ্যমটিকে সংরক্ষণের জন্য আমি যাতে হাতে-কলমে ধারাটির চর্চা করি, সে বিষয়ও তিনি জানিয়েছিলেন। তখন মনে হয়েছিল, সত্যিই তো! দশ বছর ধরে গবেষণা করছি। কখনও নিজে পারফর্ম করার চেষ্টাও করিনি! একটা উদ্যোগ জাগে। দু’ বছরের মধ্যে পরম্পরাগত রাবণছায়া শিল্পীদের থেকে খুঁটিনাটি কৌশল শিখে ফেলি। সেই সময়ে খুব সাহায্য করেছিলেন রাবণছায়া নাট্য সংসদের প্রধান কোলহাচরণ সাহু।

তখন থেকেই আমার পালা লেখা শুরু। মূলত কপিলাজির আগ্রহেই। সেই পালা রাবণছায়ার সাবেকি পালাগুলোর চেয়ে আলাদা। পৌরাণিক নয়, বরং একেবারেই আধুনিক কালের। কারণ এই বিষয়টায় জোর দিতেন কপিলাজি। একই প্রচলিত পালার থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু বানানোর চেষ্টা। বানালাম। মহাত্মা গান্ধীর জীবন নিয়ে ‘বাপুকথা’। সেটাই আমার প্রথম পারফরম্যান্স।

zoom
ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ

এরপর একটু একটু করে পুতুল তৈরি শিখেছি, হস্তচালনার সূক্ষ্ম কলাকৌশল রপ্ত করেছি। ‘বাপুকথা’র পর একে একে স্বাধীনতা আন্দোলন এবং জহরলাল নেহেরুর জীবন নিয়েও দু’টি পালা লিখেছি। আরও পরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘চণ্ডালিকা’কে রাবণছায়ার পালায় রূপ দিয়েছি। পাশাপাশি, প্রথাগত রাবণছায়ার চর্চাও চালিয়ে গিয়েছি, অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়েই। আমার সংগীতের কোনও প্রশিক্ষণ ছিল না। পুতুল বানানোরও না। আসলে আমি গবেষক– বহিরাগত। এখনও তা-ই মনে করি। তবে একটা মাধ্যম কখনও কখনও শিল্পীকে তৈরি করে নেয়। আমি ভাগ্যবান, রাবণছায়ার মতো অতি পুরাতন একটি শিল্প আমাকে তার প্রকাশ-মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে আলোকে ফুটিয়ে তোলার সুযোগ দিয়েছে।

রাবণছায়া নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই যেটা মনে হয়– নামখানা এমন অদ্ভুত কেন? এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। অনেকেই মনে করেন রাবণছায়ার উদ্ভব ভারতে। আবার অনেকে মনে করেন, তা চিন কিংবা গ্রিসে। সময়টা হয়তো খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর আশেপাশে। যদিও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ব্যাসের মহাভারত, পতঞ্জলির মহাভাষ্য, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, কামসূত্র, উত্তর রামচরিত, ভবভূতির মহাবীরচরিত– প্রায় সবেতেই রাবণছায়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। সমকালীন অন্তত এক ডজন সংস্কৃত নাটকে এ ধরনের ছায়াপুতুল নৃত্যের উল্লেখ রয়েছে। তাতে এর উদ্ভব বিষয়ে কোনও নিশ্চিত ধারণা না-পাওয়া গেলেও, অন্তত এটুকু বলা যায় যে, এ ধরনের শিল্পমাধ্যম ভারতে বেশ জনপ্রিয় ছিল।

zoom
চামড়ার পুতুল

ওড়িশার ছায়াপুতুল নৃত্য নিয়ে আরও বেশি রহস্য। তথ্যপ্রমাণাদি খুবই কম। দক্ষিণ কোশলের সীতাবেঙ্গা ফ্রেস্কো (বর্তমানে যার অবস্থান ছত্রিশগড়ে) কিংবা ওড়িশার কেওনঝড়ের সীতাবিঞ্জি ফ্রেস্কোতে রাবণছায়ার চাক্ষুষ প্রমাণ মেলে। এই সমস্ত শিল্পকর্ম চতুর্থ বা পঞ্চম খ্রিস্টাব্দের। গুপ্ত-উত্তর যুগের। মালয়েশিয়া, বালি, জাভা, সুমাত্রা– এ সমস্ত জায়গার বহু শিল্পমাধ্যমের সঙ্গেও রাবণছায়ার নিকট যোগসূত্র রয়েছে। ওয়ায়াং-কুলিত কিংবা কু-লুং শিল্প হিসেবে প্রায় সমগোত্রীয়। কিন্তু ওড়িশার কোনও ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক লিখিত নথিতে ‘রাবণছায়া’ শব্দটির উল্লেখ নেই। শব্দটি মুখে মুখে ছড়িয়েছে। ‌১৫ শতকে সরলা দাসের মহাভারত কিংবা ১৬ শতকে বলরাম দাসের রামায়ণ, আরও পরবর্তীকালে দীনকৃষ্ণ দাস, উপেন্দ্র ভঞ্জ বা অভিমন্যু সমন্তসিংহারের কাব্যে, বিভিন্ন লৌকিক চিত্রপটে রাবণছায়া শব্দটা প্রথম আত্মপ্রকাশ করে।

উদ্ভব বা বিস্তার যতই রহস্যময় হোক, রাবণছায়ার বিশেষত্ব হিসেবে যে কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, তা হল– এখানে রঘুকুলপতি রাম কেন্দ্রীয় চরিত্র নন, বরং কাহিনির কেন্দ্রে রাক্ষসদের অধিপতি রাবণ। পূর্বজন্মে রাবণ ছিলেন জয়া। বৈকুণ্ঠের দ্বারপালক। লক্ষীর অভিশাপে রাবণ-জন্ম লাভ করেছিলেন। বিষ্ণু নিজে রামজন্ম নিয়ে তাঁকে মুক্তি দেন। তাই রাবণকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় প্রথাগত রাবণছায়ার কাহিনি। নামটির ব্যাখ্যা হিসেবেও এই বিষয়টির গুরুত্ব রয়েছে।

zoom
রাবণের সীতাহরণ

প্রথাগত রাবণছায়ায় রাম ‘পরমব্রহ্ম’। তাই তিনি নিরাকার। অতএব তাঁর ছায়া নেই। তাই ‘রামছায়া’ শব্দটার ব্যবহার যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং কথিত আছে, পুষ্পকরথে চড়ে মা সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার সময়, সীতা সমুদ্রের জলে রাবণের যে ছায়া দেখেছিলেন– তা তিনি সখিদের এঁকে দেখান। এবং নিজের দুঃখের বর্ণনা করেন। সেই দুঃখের ছায়াই ‘রাবণছায়া’। আবার ছায়া যেহেতু আলোর বিপরীত, এবং রাবণ যেহেতু ন্যায়ের, দৈবের বিপরীত– তাই রাবণছায়া। এমন একটি মতও প্রচলিত রয়েছে।

আগে রাবণছায়া মূলত পরম্পরাগত ভাট-শিল্পীদের দ্বারাই অভিনীত হত। আধুনিক রাবণছায়ার কথা যদি বলা যায়, তাকে একরকম ঢেলে সাজিয়েছিলেন ভাটদের শেষ গুরু কাথিনন্দ দাস। প্রায় হারিয়ে যেতে বসা একটা শিল্পমাধ্যমকে তিনি মাটি খুঁড়ে টেনে বের করেছিলেন। তিনি চমৎকার গাইতে পারতেন, পুতুল চালনা করতে পারতেন। আলোর উৎস হিসেবে ক্যাস্টর অয়েলের ব্যবহার, পুতুল তৈরির জন্য হরিণের চামড়ার ব্যবহার তাঁরই শুরু করা। নবজাতকের জন্মোৎসব কিংবা বিবাহ উপলক্ষে বহু জায়গায় তিনি রাবণছায়া অভিনয় করতেন। আমার গুরু কোলহাচরণ সাহু বহু নতুন কাহিনিকে রাবণছায়ার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। হিমহরিণী, কাঞ্চি অভিযান, কর্ণবধ ইত্যাদি গল্পগুলোকে পালা আকারে উপস্থাপিত করার কৃতিত্ব তাঁর। সাহুজি ছিলেন প্রকৃত শিল্পী। বিভিন্ন চরিত্র এবং জন্তু-জানোয়ারের ফিগার, গাছপালা, জঙ্গল, রথ কিংবা রাজপ্রাসাদ, চমৎকারভাবে চামড়ার মধ্যে থেকে কেটে বের করতেন। কখনও কখনও পটচিত্রের আদলে তাদের রূপ দিতেন। যদিও এই নতুন ধারার রাবণছায়ায় একটি ছোট্ট সংযোজন আমার নিজের করা। তা হল– উড়িষ্যার প্রাচীন গীতিকাব্যের ঘরানা ‘ছান্দ’কে রাবণছায়ার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া।

zoom
গুরু কোলহাচরণ সাহু

রাবণছায়ায় ব্যবহৃত সবচেয়ে প্রচলিত টেক্সটটি হল বিশ্বনাথ খুন্তিয়ার ‘বিচিত্র রামায়ণ’। যেহেতু রাবণছায়ার সঙ্গে সংগীতের গূঢ় যোগাযোগ, তাই টোড়ি, ভৈরবী, বসন্তভৈরবী, নলিনীগৌড়, কেদার, পাহাড়িয়া কেদার, মালয়শ্রী, কামোদী ইত্যাদি বিভিন্ন রাগরাগিনীর আলাপে উপস্থাপিত হয় মূল কাহিনি। যদিও একাধিক রাগরাগিনীর সমাবেশ থাকলেও, রাবণছায়ার সংগীতের মূল ভাবটি লৌকিক।

রাবণছায়ার পুতুল একসময় তৈরি হত হরিণ কিংবা পাহাড়ি ছাগলের চামড়ায়। বর্তমানেও ছাগলের চামড়া দিয়েই তৈরি হয় এই পুতুলগুলো। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়– পুতুলগুলোর কোনও গাঁট বা জয়েন্ট নেই। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, অন্যান্য পুতুলনাচের ক্ষেত্রে গাঁটকে ব্যবহার করে যেভাবে পুতুলের হাত-পায়ের সঞ্চালন দেখানো যায়, এখানে সেই সুবিধে প্রায় নেই বললেই চলে। ছোট-ছোট বাঁশের কঞ্চির সঙ্গে পুতুল আটকে, আলোর উৎসের সামনে নাচানো হয়। গানের দল পর্দার সামনে, অথবা পাশে বসেন। খঞ্জনি, দশকাঠি, মৃদঙ্গম সহযোগে গীত-অভিনীত হয় কাহিনি। আট থেকে দশ ফুট লম্বা ঘনকাকৃতির মঞ্চ। বাঁশ বা লোহার শক্তপোক্ত খুঁটির সঙ্গে আটকানো পর্দা। আলোর উৎসটাকে এমনভাবে রাখা থাকে, যাতে পর্দার মধ্যে দিয়ে সরাসরি দর্শকের চোখে গিয়ে না পড়ে।

গানের তালে তালে পর্দার উপর নড়াচড়া করে পুতুলের ছায়া। দর্শক থাকেন অন্ধকারে। দর্শকের সামনে পৌরাণিক আলো ফুটে ওঠে, তাকে বাস্তব থেকে কাহিনির অন্দরে নিয়ে গিয়ে ফেলে ক্রমশ। এর চেয়ে চমৎকার ছায়াবাজি আর কাকে বলি!

………..আরও পড়ুন……….

International Kolkata Book Fair Kolhacharan Sahoo Lord Rama Mahabharata Puppetry Rabana Chhaya Ramayana Ravana Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar shadow puppetry

Share this article on