


‘মেমেন্টো’, ‘দ্য ডার্ক নাইট’, ‘ইনসেপশন’, ‘ডানকার্ক’, ‘ওপেনহাইমার’ ছবিগুলোর জগৎবিখ্যাত পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান তাঁর লেখার টেবিলে। তিনি এমন একটি ছবি তৈরি করতে চান হোমারের ‘দ্য ওডিসি’ মহাকাব্য অবলম্বনে, যে-ছবি বদলে দেবে পৃথিবীজুড়ে নারী সৌন্দর্যের বস্তাপচা পুরনো ধারণা, তৈরি করবে নতুন কান্তিবোধ, প্রশ্ন তুলবে: ফরসা না-হলে সুন্দরী হয় না?
১০৫.
সুন্দরী হতে গেলে কি ফরসা হতেই হবে? কালো মেয়ে সুন্দরী হতে পারে না? পুরুষের দৃষ্টি কি শুধু টুকটুকে নারীর শরীরে? কোনও মেয়ের গায়ের রং যদি হয় মেঘলা আকাশের মতো, সেই রং পুরুষকে টানে না?

‘মেমেন্টো’, ‘দ্য ডার্ক নাইট’, ‘ইনসেপশন’, ‘ডানকার্ক’, ‘ওপেনহাইমার’ ছবিগুলোর জগৎবিখ্যাত পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান তাঁর লেখার টেবিলে। তিনি এমন একটি ছবি তৈরি করতে চান হোমারের ‘দ্য ওডিসি’ মহাকাব্য অবলম্বনে, যে-ছবি বদলে দেবে পৃথিবীজুড়ে নারী সৌন্দর্যের বস্তাপচা পুরনো ধারণা, তৈরি করবে নতুন কান্তিবোধ, প্রশ্ন তুলবে: ফরসা না-হলে সুন্দরী হয় না?
নোলানের সামনে খোলা নোটবই। তিনি সেই নোটবইয়ে লিখে চলেছেন নানাভাবে একই প্রশ্ন, কেন সারা পৃথিবী-জুড়ে মানুষের মনে এই বদ্ধমূল ধারণা, সুন্দরী হওয়ার একটা শর্ত গায়ের রং শুভ্র হওয়া? এ কেমন কথা! এবং যুগে যুগে কালো মেয়েদের প্রতি এই অবিচার কীভাবে মেনে নিল পৃথিবী? কাদের ষড়যন্ত্রে এমন অবিচার ঘটল?

নোলান চোখ রাখলেন তাঁর নোটবইয়ের পাতায়। তাঁর নিজের হাতের লেখায় জ্বলজ্বল করছে এই লাইনটা: ক’দিন আগেই রবীন্দ্রনাথ টেগোরের একটা কবিতার ইংরেজি অনুবাদে এক মেয়ের রূপের বর্ণনা পড়ে আমি মুগ্ধ। মেয়েটি দাঁড়িয়ে মেঘলা আকাশের নিচে, খোলা মাঠের মধ্যে। চারধারে কেউ নেই। তাই তার লজ্জা পাওয়ার খুব একটা প্রয়োজন নেই। তাছাড়া এখুনি বৃষ্টি আসছে, নয়তো ঝড় উঠবে, এমন একটা অবস্থার মধ্যে মেয়েটি যেন ছুটে বেরিয়ে এসেছে। তাড়াহুড়োর মধ্যে সেই মেয়ে লজ্জা পাওয়ার সময় পায়নি। তাই তার গায়ের অনেকটাই খোলা। তার গায়ের রং কালো। কিন্তু কবি লিখেছেন, তার গায়ের রং যতই কালো হোক, তার সুন্দর চোখ দুটোর আকর্ষণ তো ভোলা যায় না।
নোলান অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন তাঁর হাতে লেখা রবীন্দ্রনাথের কবিতার এই ভাবটির দিকে। তারপর লেখেন: এমন একটি কালো সুন্দরী কি আমি খুঁজে পাব না আমার ‘দ্য ওডিসি’ ছবির হেলেনের জন্য? আমার মনে পড়ছে, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের সনেটে ‘দ্য ডার্ক লেডি’র কথা। শেক্সপিয়রের চারপাশে কি সাদা মেয়েদের অভাব ঘটেছিল? লন্ডনের থিয়েটার পাড়ায় তো তখন গিজগিজ করছে সাদা বেশ্যারা। কিন্তু শেক্সপিয়রের চোখ আটকালো কালো মেয়েতে? এবং সেই মেয়ে কিন্তু ঘরোয়া বিচারে মোটেও সুন্দরী নয়। তবে তার চুলে, ঠোঁটে, চোখে থই থই সেক্স অ্যাপিল! এবং স্বয়ং শেক্সপিয়রকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়েছিল এই কালো সুন্দরী সাদা মেয়েদের ভিড় থেকে!
কেন? কোথায় তার আবেদন? জানাচ্ছেন শেক্সপিয়র: She has raven- black eyes, ‘dun’ (brown) skin, wiry dark hair, coral-red lips. এবং স্বয়ং বার্নার্ড শ শেক্সপিয়রের কালো মেয়েকে নিয়ে একটা ছোট্ট নাটক লেখার লোভ সামলাতে পারেননি। ডার্ক লেডিটি ছিল রানি প্রথম এলিজাবেথের দাসী। সেই কৃষ্ণকলি দাসীর প্রেমে উইলিয়াম শেক্সপিয়র!

কবি লুকিয়ে ঢুকলেন রাজপ্রাসাদে প্রাণের কৃষ্ণাকে আদর করতে। হঠাৎ সামনে তাঁর কালো পোশাকে সর্বাঙ্গ ঢেকে এক নারী। তাকেই পছন্দের কালো সুন্দরী ভেবে শেক্সপিয়রের প্রেম ও আদর নিবেদন। ততক্ষণে আসল কালো সুন্দরী সেখানে উপস্থিত। সে চিৎকার করে বলে উঠল, মহারানি, এই লোকটার নাম উইলিয়াম শেক্সপিয়র। ভয়ংকর লম্পট! আমার সঙ্গে প্রেম করে। আপনার সঙ্গে সেই একই আদরের কথা বলে সোহাগ করছে। রানি ততক্ষণে মুখের আবরণ সরিয়েছেন। এবং মোটেও রাগ করেননি শেক্সপিয়রের ওপর। এমনভাবেও শুধুমাত্র কথা দিয়ে আদর করা যায়! রানি যে নিজেই মুগ্ধ।
বার্নার্ড শ’র নাটকটা না-পড়লে বুঝতাম না, কোথায় পুরুষের কাছে কালো নারীর আকর্ষণ! লিখলেন ক্রিস্টোফার নোলান। চুপ করে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তাঁর মুখে ফুটে উঠল এক নতুন উদ্ভাস। যেন মেঘ কাটছে। তিনি লিখতে শুরু করলেন: কালো সুন্দরীর ঊরু, স্তন, বিভাজিকা, তার নিতম্ব ও নাভি, তার কোমর, কণ্ঠ, চোখ, ঠোঁট আর চুলের রূপে মজতে আমাদের পড়তেই হবে শার্ল বোদলেয়ারের কবিতা। এই ফরাসি কবি তো আজীবন নিজেকে সেঁকেছেন এক কৃষ্ণবর্ণ বেশ্যার আঁচে!

তাহলে কাদের ষড়যন্ত্রে পৃথিবীর সেরা সুন্দরীদের সব সময়ে হতে হল ফ্যাটফেটে সাদা? এমনকী মিশরের সুন্দরী ক্লিওপেট্রা, সে-ও হলিউডের ছবিতে সাদা সুন্দরী এলিজাবেথ টেলর! ক্লিওপেট্রার গায়ের রং তো অলিভ। জলপাই রঙের কুহক তো পাকড়ে ছিল সাদা সুন্দরীতে ক্লান্ত জুলিয়াস সিজার এবং মার্ক অ্যান্টনিকে! আমার মনে আর সন্দেহ নেই, হলিউডের ষড়যন্ত্রে সাদা মেয়েদের এই প্রসার ও প্রতিপত্তি!
হলিউড গান্ধীর চরিত্রেও একজন ইংরেজকে ভাবতে পারল, তাঁকে দিয়ে অভিনয় করাল! এই কালার প্রেজুডিস ভাঙতেই হবে। আমার হেলেন হবে এক কৃষ্ণাঙ্গ সুন্দরী। যার মুখের দিকে তাকিয়ে আজকের পৃথিবী বলবে, ‘This is the face that launched a thousand ships.’ হোমার কার মুখ ভেবে এই লাইন লিখেছিলেন জানি না। কিন্তু ক্রিস্টোফার মার্লো যখন এই অমর উচ্চারণটি করলেন ইংরেজিতে, তখন তাঁর মনে নিশ্চয় ছিল কোনও কালো সুন্দরীর মুখ!

এতটা লিখে গ্লাসে ট্যালিস্কার হুইস্কি ঢাললেন নোলান। উঠে গেলেন জানলার ধারে। গভীর রাতের তুষারে সাদা হয়ে আছে সারা শহর। তাকালেন আকাশের পানে। কালো কী সুন্দর! মনে হল তাঁর। ডার্ক চকোলেটের মতো কালো সুন্দরী কোথায় পাব, যাকে দেখলে কী পুরুষ, কী নারী, চোখ ফেরাতে পারবে না? আর শুধু গায়ের রঙের জোরে যে মেয়েদের রমরমা, তাদের আঁতে ঘা লাগবেই!
নিজের ভাবনাকে আরও ফোকাসে আনেন নোলান। টেবিলের দিকে তাকিয়ে গভীর রাতে কণ্ঠে আরও একবার ট্যালিস্কা ঢেলে নিজেকে প্রশ্ন করেন, লিখে ফেলতে পারো চেনা কান্তিবোধ চূর্ণ করতে ঠিক কেমন হেলেন চাইছ তুমি তোমার ‘ওডিসি’র জন্য?

টেবিলের ওপর খোলা নোটবুক। নব মননের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে তার খোলা পাতা। একমনে লিখতে থাকেন নোলান: She has to be dark, chocolate-dark, to break the traditional beauty-standards and to modernize Homer’s epic. Moreover, she has to bring profound emotional depths to the mythical dual roles of Helen and her identical twin sister Clytemnestra.
কিন্তু কোথায় পাব এই কালো মেয়ে, যে আলোর অধিক? আর তখুনি টেবিলের ওপর ভেসে ওঠে একটি নাম: লুপিটা নিয়ং’ও। যে কেনিয়ান-মেক্সিকান অভিনেত্রী অস্কার পেয়েছেন ‘Twelve Years A Slave’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য। এর পর আরও কত স্বীকৃতি ও পুরস্কার যে পেয়েছেন! কিন্তু সর্বাগ্রে নোলানের যা মনে পড়ল, সেটা ৪৩ বছরের জন্মদিনে নিজের অসুস্থতা নিয়ে লুপিটারের স্পষ্ট, সাহসী, ছকভাঙা উক্তি: আমি বহন করেছি জরায়ুতে ৭৭টা ফাইব্রয়েড। ২৫টা অস্ত্রোপচার। এখনও ৫০টার বেশি ফাইব্রয়েড বয়ে চলেছি। সবথেকে বড়টা কমলালেবুর মতো।

এই কালো মেয়েই পারবে একই সঙ্গে আমার হেলেন এবং ক্লিটেমনেস্ট্রা হওয়ার ভার বহন করতে। আর কেউ নয়। ‘She has the intense internal strength, poise and emotional depth!’ টেবিলটা যেন সেই মুহূর্তে চিৎকার করে ওঠে: This choice will certainly spark widespread public debate drawing criticism from public figures like Elon Musk!
‘Who cares?’ লাফিয়ে ওঠে নোলানের হৃদয়! তাঁর হৃদয়ে যে ততক্ষণে ভেসে উঠছে লুপিটার কালো শরীর। আর তার কালো হরিণ চোখ!
………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য লেখা
………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved