
প্রকৃতিতে আপনা হতেই গজিয়ে ওঠা গাছপালা, ফুলে ফলে ভরিয়ে দেওয়া, সে এক। অন্যদিকে তাকে নিজের হাতে সাজিয়ে গুছিয়ে নাইয়ে খাইয়ে পরম স্নেহে বড় করে তোলা, তার থেকে আদায় করে নেওয়া শরীরের ফসল, সে আর এক খেলা। শৈশবে পড়েছিলাম কৃষক, সমাজের বন্ধু। এখন তার আলাদা রূপ মনে হয় আমার। সে এখন সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা দাবি করে। আজকের কৃষি-কর্মী অনেক সতর্ক। কখনও প্রচণ্ড, কখনও কোমল। কখনও সে তপস্বী কিংবা বৈজ্ঞানিক।
১৮.
‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা’।
ধানের ওপর ঢেউ খেলানো বাতাস কিংবা রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি, আসলে এসবই আমাদের মনের ঢেউ, একটা আলোড়ন। এই যে সুস্থ ফসল ক্ষেতের মধ্যে দাঁড়ালে একটা আনন্দের অনুভূতি হয়, কী কারণে? ফসল মানে আমরা যদি শুধু খাদ্য ভাবি অর্থাৎ, আমাদের বেঁচে থাকার রসদ, তাহলে অর্থ বদলে যায়। শুধুই কি ক্ষুধা নিবৃত্তিই কারণ? নাকি প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে থেকে ফসলের প্রাণের স্পন্দন অনুভব করি আমরা। হতে পারে এটা প্রাকৃতিক দৃশ্যের স্পর্শকাতরতা।

প্রকৃতিতে আপনা হতেই গজিয়ে ওঠা গাছপালা, ফুলে ফলে ভরিয়ে দেওয়া, সে এক। অন্যদিকে তাকে নিজের হাতে সাজিয়ে গুছিয়ে নাইয়ে খাইয়ে পরম স্নেহে বড় করে তোলা, তার থেকে আদায় করে নেওয়া শরীরের ফসল, সে আর এক খেলা। শৈশবে পড়েছিলাম কৃষক, সমাজের বন্ধু। এখন তার আলাদা রূপ মনে হয় আমার। সে এখন সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা দাবি করে। আজকের কৃষি-কর্মী অনেক সতর্ক। কখনও প্রচণ্ড, কখনও কোমল। কখনও সে তপস্বী কিংবা বৈজ্ঞানিক। দারুণ তার আবেগ-প্রবণতা আর শৃঙ্খলা। তাই তো সে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারে, আমার কাজ– ফসল উৎপাদন। সেটাই তার অহংকার।

গ্রামেগঞ্জে চাষবাস তো দেখেছি ছোট আকারে। যা কিছু সব মানুষের গায়ে-গতরে। দেখেছি আদিম একট যন্ত্র। লাঙল বা হল। ভোরবেলা সুঠাম পেটানো শরীরের হলধর, কাঁধে ওই যন্ত্রটি নিয়ে সামনে বলদের পিছে পিছে চলেছে মাঠের দিকে। বড় আকাশের নিচে তাদের চলার সে দৃশ্য কখনও ভুলব না। পরে জোড়া বলদের কাঁধে জুড়ে দিল লাঙল, মাটি তৈরির কাজ। সে দৃশ্য আমাদের বাংলার আগেকার শিল্পীরা অনেকেই এঁকেছেন। অনেক ছবি দেখেছি মাস্টারমশাই, হরেন দাসের, যেখানে আছে চাষবাস, ছোট ছোট নদী-নালা, জলাভূমি, সবুজ ধানের ক্ষেত।

মনে পড়ছে ছোটবেলায়, কনকনে ঠান্ডায় শীতকালে খুব ভোরবেলা গ্রামের বড়সড় সবজি ক্ষেতে যেতাম। অনেকগুলো সবজিকে একসঙ্গে দেখা, সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তার সম্মিলিত টেক্সচার, একটা আলাদা ছবি তৈরি করে মনে। আমরা যেতাম ক্ষেতে ফুলকপি কাটার পরে তার পাতাগুলো কুড়িয়ে আনতে, বাড়িতে গরুর জন্য। হাতের আঙুলগুলো ওই ঠান্ডা শিশিরের জলে কুঁচকে একেবারেই অসাড় হয়ে যেত। তাজা নিখুঁত পাতার রং ছিল সবুজ, কিন্তু সে এক মনোরম ধূসর সবুজ। প্যাস্টেল শেডের নীলাভ ধূসর সবুজ। ভিতরে প্রায় একই সাইজের মাছের ডিমের মতো দানাদার, হালকা হলুদাভ সাদা ফুলকপিগুলো দেখে মনটা দারুণ খুশিতে ভরে যেত। মনে হত, চাষ তো নয়, যেন মেডিটেশন বা এক্সপেরিমেন্টেশন। লাঙল দিয়ে মাটি ভাগ করে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া আলো, বাতাস। সতেজ সবল রাখার জন্য চারা থেকেই প্রয়োজনমতো জলসেচের ব্যবস্থা। ভালো ভালো পুষ্টিকর খাদ্যের সার। শরীর স্বাস্থ্যের প্রতি সর্বদা নজর। এইভাবে আমরাও আস্তে আস্তে বড় হলাম। চোখের সামনে চাষিদের বিজ্ঞানমনস্ক হতে দেখলাম। শুনেছিলাম চাষি মানে গরিব শ্রেণির মানুষ। আস্তে আস্তে ধনী চাষিও দেখলাম। চাষ যে আরও বড় আকারে হতে পারে, সে-ব্যাপারে চোখ খুলল ধীরে ধীরে। ফসল ফলানো শুধু তার জীবিকা-নির্বাহের জন্য নয়, জীবনে বেঁচে থাকার জন্য নয়, আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। বেশি বণ্টন ব্যবস্থা, বেশি ফলানো, আয়-ব্যয়ের জ্ঞান এবং বিনিময়ের বিশাল গণিত।
বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে যখন বেরলাম তখন বড় আকারে চাষ দেখলাম। আমি চাষি পরিবারের মানুষ নই, তাই চাষবাস দেখে বেড়ানোটা আমার কাজ ছিল না বটে, কিন্তু জগতের যা কিছু, তা দেখে বেড়ানোর কাজটা আমার কাছে কোনও কারণে প্রধান হয়ে উঠল। চরিত্র আসলে ভবঘুরে কিংবা দর্শকমাত্র।
আর্ট কলেজের ছাত্রাবস্থা থেকেই যেতে হয়েছিল ভারতের উত্তরে। দেরাদুনের শালবন দেখে আমার কখনও ‘টিম্বার’ মানে কাষ্ঠ বা দারু বাণিজ্যের কথা মনে হয়নি। এমনকী চাষের কথাও মনে হয়নি। শুধু দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। অদ্ভুত ধরনের বড় পাতাওয়ালা গাছের মাথাগুলো ভরা, আর শরীরের পরিচ্ছন্ন অংশের নিচে অদ্ভুত খালি জায়গা। গাছের ফাঁকে ফাঁকে, দৌড়াদৌড়ি, লুকোচুরি খেলার বিস্তারিত পরিসর।
দিল্লিতে কাজের সুবাদে পাঞ্জাব বা হরিয়ানার দিকে চলে গিয়েছিলাম। দেখেছি গম আর ভুট্টার চাষ। আর দেখেছিলাম, শস্যক্ষেতের পাশাপাশি সৌন্দর্যের সঙ্গী, সঙ্গতকার হিসেবে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়াপাখি আর শত শত ময়ূর! শস্যক্ষেতের দিকে মন ঘোরানো, চোখ ফেরানোর সেটাই বোধ হয় ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

বিশাল বড় আকারে দারুণ সুন্দর ছবির মতো দেখেছি দার্জিলিঙের চা-বাগান আর অসমের চায়ের চাষ। ছবির মতো সূর্যমুখী ফুলের চাষ কিংবা একেবারে আমাদের বাংলায় সত্যিকারের পুজোর ফুলের চাষ, সে-ও দেখার মতো। মহারাষ্ট্রে দেখেছি আখের চাষ আর কার্পাস-তুলো। তুলোগুলো যখন শেষে ফুটে যায়, সে-একটা অদ্ভুত সাদা ফুলের বিশাল বাগান মনে হয়।
দেশের বাইরে অন্য দেশে প্রথম গিয়েছিলাম আটের দশকে। জার্মানি। আর সেখানে অফিসের কাজে ও দেশের মানুষের সঙ্গে ভাব হয়। জার্মানদের কাছে দেখতে চেয়েছিলাম চাষের জমি। দেখেছি নানারকম ওক গাছ। সত্যিকারের চাষের জমিতে জিন্সের প্যান্ট, কাউবয় টুপি পরা সাহেবদের মতো চেহারার অদ্ভুত সুন্দর মানুষগুলো চাষের জমিতে দেখেছি সবুজের মাঝে। দেখেছি অদ্ভুত সুন্দর স্বাস্থ্যের অনেক গরু। সেগুলো চাষ করা হয় দুধ এবং মাংসের জন্য। তারা লাঙল টানে না। একেবারে শুরুর দিনে ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্ট থেকে বন-এ যাওয়ার পথে দেখেছিলাম রাইন নদীর ধারে ধারে অসম্ভব সুন্দর আঙুর ক্ষেতের পাশাপাশি কখনও কখনও অসাধারণ সুন্দর পুরনো দুর্গ।
জার্মানির পাশাপাশি আর একটি বিখ্যাত দেশ ফ্রান্স। সেখানে প্যারিসে থেকেছি বহুদিন। তবে কখনও গ্রামাঞ্চলের চাষবাস দেখার সময় হয়নি। সত্যি কথা বলতে কী, সেখানে আমি প্রাণভরে পৃথিবীর সেরা শিল্পের চাষ দেখলাম, যতদিন ছিলাম। চিনের হলুদ নদীর ধারে ধারে বিশাল আকাশ পর্যন্ত একইরকম রঙের একই স্বাস্থ্যের ধানচাষ দেখেছি। দেখেছি ফলের চাষ। অবাক হয়েছি মানুষের কীর্তি দেখে। আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত একটানা সবুজ ক্ষেত, জীবনে সেই প্রথম দেখি।
ইন্দোনেশিয়ায় দেখেছি ধান চাষ। তাদের আবার ধান চাষের এমন বাতিক যে, বাড়ির আনাচে-কানাচে উঠোনে খানিকটা জমি পড়ে থাকলেই, সে যত ছোটই হোক, আমাদের মত দু’-চারটে লঙ্কা কিংবা কয়েকটা বেগুন গাছ লাগিয়ে দেওয়ার মতোই খানিকটা ধান চাষ করে নেয়। এমন দৃশ্য নানাদিকে। পাহাড়ের গায়ের যে জমি, সিঁড়ির মতো ছোট ছোট জমির স্তর, সেখানেও টেরাস ফার্মিং। হোটেলের আশপাশে গার্ডেন না-বানিয়ে সেখানেও চলছে ধান চাষ। এমনকী মিউজিয়ামের লাগোয়া জমিতে দেখলাম খানিকটা জলা জমি করে ধান চাষ। তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক ভাস্কর্য!

হাতের কাছে দুবাইয়ে দেখেছি মরুভূমিতে ফসল ফলানো। খেজুরের চাষ। আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপ মরিশাসে দেখেছিলাম বিশাল আকারে আখের চাষ। প্লেন থেকে নামার সময় উঁচু থেকে মনে হয়েছিল, পাহাড় বোধহয় ঘাসে ঢাকা। কিন্তু যত নিচে নামছি, তত দেখছি, ওই ঘাসগুলো আস্তে আস্তে বেশ বড় আকার ধারণ করছে এবং একেবারে মাটির কাছাকাছি এসে দেখলাম প্রায় পুরো দ্বীপটা জুড়েই আখের চাষ।

আফ্রিকা বলতে মনে পড়ল, না-চাষ করা বিশাল প্রাকৃতিক পরিবেশের দিগন্ত বিস্তৃত শুধুই ঘাস, সেটারই নাম আফ্রিকান জঙ্গল। ঘাস আছে, তাই ঘাস খাওয়ার জীবজন্তু আছে। আর সেই জীবজন্তুর থাকার জন্য আরও আছে হিংস্র বড় জানোয়ার। একের জন্য অন্যের যেন হাতে হাত ধরা। মিশরের কথাও মনে পড়ছে। মেডিটারেনিয়ান সি-র ধারে ধারের দেশগুলোতে, ইজরায়েল, মিশর, মরক্কো, এই সমস্ত জায়গাতে যখন গিয়েছি তখন চোখ জুড়নো পাহাড়ের পর পাহাড় ভরা অলিভ গাছের জঙ্গলের অনুভূতিপূর্ণ ব্যাপার, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেক পুরনো গল্প। অলিভ অয়েল এখন আমাদের স্বাস্থ্যসম্মত ফ্যাশনদুরস্ত একটা খাবারের তেল। সারা পৃথিবীর প্রায় সব তেলই আসে ওইসব অঞ্চল থেকে। পরে অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমদিকের অংশে খুবই সুন্দর অলিভ চাষ দেখেছি। সেখানকার অন্য চাষের গল্প বিস্ময়কর।
চাষবাসের আয়োজন দেখে তাক লেগে গেল। এই চাষি-জীবন, জীবনে দেখিনি, ভাবিওনি। এখন স্মৃতি-জ্বরে ভুগছি। এমন ঝকঝকে রোদ্দুর, প্রশস্ত নীল আকাশ কখনও দেখিনি। এই যে মরুভূমির ব্যাপকতা, বিশালত্ব, দূষণ ছাড়া একটা পবিত্র হাওয়া– এর একটা অনির্বচনীয় মাদকতা আছে। ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে সত্যজিৎবাবু বলেছিলেন, দুর্ভিক্ষ মানুষের তৈরি, প্রকৃতিতে নেই তার ছাপ। সম্প্রতি অতিমারিতে সেটা পুরোপুরি অনুধাবন করলাম।
অভিশপ্ত অতিমারিতে বেড়াতে গিয়ে বছর খানেকের মতো আটকে পড়েছিলাম অস্ট্রেলিয়ায়। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় মহাদেশটির আসল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো। পর্যটকদের যা কিছু দেখা, ক’দিনের মধ্যে সেটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত-বসন্ত সবরকম ঋতুই দেখা হল ওই লকডাউনে। মানুষের সংস্পর্শ এড়াতে তাই প্রকৃতির কোলে কোলে ঘুরে বেড়ানো প্রায় প্রতিদিন। তাই চাষবাসের দিকেও ঝুঁকে পড়া। সেই বড় মাপের ধনী চাষিদের, বলা ভালো অন্যরকম ধনী মানসিকতার এবং আন্তর্জাতিক, আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক চাষবাসের গল্প বেশ আলাদা।
সোয়ান ভ্যালি, মার্গারিট রিভার এবং ইয়র্ক। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার এই তিনটে জায়গা আমার সবচেয়ে প্রিয়। সোয়ান ভ্যালিতে আমাদের বসবাস। অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীনতম ওয়াইন অঞ্চল, বিভিন্ন ধরনের আঙুর দেখা এবং অজস্র সুস্বাদু খাবারের অভিজ্ঞতা যা হয়েছে আমার, জীবনে স্বপ্নের মতো। প্রায়শই সেগুলো পারথ-এর কাছাকাছি। ওয়াইনারি, ফলের বাগান আর সুস্বাদু খাবার-দাবারের কথা বলে শেষ করা যাবে না।
মার্গারিট রিভার, আর একরকম ওয়াইন অঞ্চল। চমৎকার ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু, যেখানে প্রবল সমুদ্রের বাতাস। জলবায়ু ও মাটি তাই উচ্চমানের আঙুর চাষের জন্য চমৎকার। প্রধান আঙুর বলতে বিশ্বমানের ক্যাবারনেট স্যাভিগনন, শার্ডোনে, স্যাভিগনন ব্ল্যাঙ্ক, সেমিলন, মেরলো এবং চেনিন ব্ল্যাঙ্ক। ওখানকার জটিল ওয়াইন নিঃসন্দেহে সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য চমৎকার, বিশেষ করে লাল ওয়াইন।
কয়েক হাজার একরের এক একটা ওয়াইনারি। আঙুর চাষিদের মেজাজ মর্জি এবং শিল্পপ্রেমের ধরন অসাধারণ। মরুভূমির হাইওয়েগুলো থেকে ওয়াইনারিতে যাওয়ার রাস্তা তৈরির কাজটা প্রথম। রাস্তার দু’ধারে গাছ, বিশেষ করে ইউক্যালিপটাস। তারপরে চাষের যোগ্য জমি তৈরি করে আঙুর চাষ ছাড়াও নামীদামি আর্কিটেক্ট দিয়ে শিল্পসুলভ ওয়াইনারির স্থাপত্য। সেই সুদৃশ্য স্থাপত্যের গা-ভর্তি গাছপালা, বাহারি ফুলবাগান।

ওয়াইনারিতে ওয়াইন টেস্টিং-এর ব্যবস্থা ছাড়াও সঙ্গে থাকে সুস্বাদু খাবারের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা। রেস্তোরাঁতে তাদের দেখনদারি সত্যিকারের দেখার মতো। তাছাড়া আছে লাইব্রেরি, ওয়াইন তৈরির ইতিহাস। অতীত ওয়াইনের বোতলের সংগ্রহশালা এবং আর্ট গ্যালারি। কখনও কখনও ওরা নামীদামি শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ওয়ার্কশপ করে, শিল্পকর্মের প্রদর্শনী করে। সেখান থেকে বাছাই করা ছবি নিয়ে গ্রাফিক ডিজাইনার দিয়ে তৈরি হয় দারুণ দারুণ সুদৃশ্য ওয়াইনের লেবেল।

ফসল ভালো হলে খুশির শেষ থাকে না। নানারকম নাচ গান বিনোদনের ব্যবস্থা। ওয়াইনারির আশেপাশে কারও ঢালু জমিতে ঘাস বিছানো ওপেন থিয়েটার। সেখানে হয়তো অন্য দেশ থেকে সাকিরা আসছেন নাচতে, গান গাইতে হুইটনি হিউস্টন অথবা আধুনিকা, বেয়োন্সে।
মার্গারেট রিভারের আঙুরক্ষেত থেকে শুরু করে সোয়ান ভ্যালির মনোরম গ্রামাঞ্চল এবং দক্ষিণ অঞ্চলের নয়নাভিরাম উপত্যকা পর্যন্ত ওয়াইনারিগুলোর চারপাশের পরিবেশ প্রায়শই ওয়াইনগুলোর মতোই মনোমুগ্ধকর। এই অঞ্চলগুলো দেখলে আপনি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন।

মরুভূমির মাঝেও মনোরম ঢেউ খেলানো গ্রামাঞ্চল ও চারণভূমি দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ায়, সহজেই বোঝা যায় কেন ইয়র্ক পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার আদি ঔপনিবেশিকদের জন্য প্রথম অভ্যন্তরীণ বসতি হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এর ঐতিহ্যবাহী আকর্ষণ ধরে রেখে, এটি এখনও পারথের মানুষের কাছে প্রকৃতি, ইতিহাস, শিল্পকলা, হস্তশিল্প এবং ঘোড়ায় চড়া থেকে শুরু করে স্কাইডাইভিং পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যকলাপে মেতে ওঠার জন্য প্রিয় একটি গ্রামীণ গন্তব্য হিসেবে রয়ে গিয়েছে। পুরনো নগরীর বাড়িঘর দেখার মতো। সুযোগ পেলে ফাঁকা দেওয়ালে আঁকা ছবি। সমগ্র পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় চোখ জুড়নো মন ভোলানো গ্রাফিতির আবরণে পুরো শহর প্রায় মোড়া।

চাষীদের নিজস্ব শহর এই ইয়র্ক। মূলত আমাদের দেশের সর্ষের মতো তেলের বীজ, ‘ক্যনোলা’ আর ‘গম’ চাষ। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার প্রধান শস্য উৎপাদন, পরিমাণে গোটা অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের গড় উৎপাদনের ৫০%-এরও বেশি। ভাবা যায়? বছরে প্রায় ১০ মিলিয়ন টন গম উৎপাদন হয়, যার সিংহভাগই রপ্তানি করা হয়, আর ৪ মিলিয়ন টনেরও বেশি ক্যনোলা।
ফসলভরা ক্ষেতগুলো দেখেছি মন প্রাণ ভরে বহুদিন ধরে। ক্যনোলার ক্ষেত্রে আমাদের সর্ষে ফুলের মতো আকাশ পর্যন্ত ঝকঝকে হলুদ, আর গম ক্ষেত কাঁচায় সবুজ আর পাকলে সোনালি। ফসল ফলানোর একেবারে বীজ থেকে শেষ পর্যন্ত ফসল-কাটার দৃশ্য দেখার একটা নেশায় পেয়ে বসেছিল। সবকিছু আয়তনে বিশাল। হাজার হাজার একরের যা কিছু, সব দিগন্ত বিস্তৃত। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ মানুষের শরীরে কুলোয় না। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন। উন্নত মানের হারভেস্টার এবং কম্বাইন হারভেস্টারগুলোর কাজের বহর দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়।

একবার ওই হারভেস্টারগুলোর মালিকদের পাড়ায় গিয়েছিলাম দেখতে। সেই গাড়িগুলো, যন্ত্রপাতিগুলো দেখেছি কাছ থেকে, ছুঁয়ে। এক একটা গাড়ির মতো চাকা লাগানো হারভেস্টার যেন এক একটা ছোটখাটো কারখানা। ফসল কাটা, ঝাড়াই বাছাই পরিষ্কার করা থেকে অন্যান্য ছোট গাড়িতে ভরা, এমন সমস্ত কাণ্ডকারখানা সবই তার কীর্তি। বিশাল কাচে ঘেরা ড্রাইভারের ঘরটা যেন কোন মহাকাশযানের কামরা! শুনলে অবাক হবেন, আজকাল অনেক হারভেস্টারের ড্রাইভার কেবিনে কোনও মানুষ থাকে না। ড্রাইভার-লেস, দূর থেকে কম্পিউটার কন্ট্রোল করছে সব!

এইখানে আমার গ্রামের ধানের গোলা বা মরাই-এর কথা মনে পড়ছে। ওদেরও আছে চাষের জমির ধারে বিশাল পরিমাণের এই শস্য-দানা সুরক্ষিত রাখার জন্য গোলা। ওরা বলে ‘সাইলো’। আকাশচুম্বী বিশাল বিশাল সাইলোগুলোর নিচে দাঁড়ালে ওটাকে পাহাড় বলে মনে হয়। শুধু তাই নয়, এই সাইলোর গা-টা খালি থাকবে সেটা চাষিদের সহ্য হয় না, তাই বাঘা বাঘা শিল্পীদের দিয়ে ছবি আঁকিয়ে অলংকরণ করা হয় ওই সাইলোর গায়ে। সে-ও আরেক অদ্ভুত ধরনের চাষিদের শিল্পপ্রীতি।

ফসল রপ্তানির জন্য সমুদ্রের বন্দর থেকে চাষের ক্ষেত পর্যন্ত বহুদূর বিস্তৃত রেললাইনের আয়োজন। শস্যের পরিবহন ব্যবস্থা।
এ সমস্তই নানা স্তরে, দিগন্তব্যাপী নানা চিত্রকলা। ছবির পটে সুচিন্তিত প্রাণীদের আয়োজনও কত। হাতের কাছে সোয়ান রিভার। জলে জলে কালো রাজহাঁস। ক্ষেতের সবুজ চারাগাছে আমাদের মনে ধানের ওপরে ঢেউ খেলানো দৃশ্য। ওয়াইনারির আশেপাশে গাছে গাছে কালো কাকাতুয়া দেখেছি অনেক। ফসলের ক্ষেতের ধারে, গাছপালায় ঝাঁকে ঝাঁকে গোলাপি কাকাতুয়া, আর আশেপাশে জঙ্গলে সকাল-সন্ধে নীরবে ঘুরে বেড়ায় ক্যাঙারুর দল।

আর একটা ঘটনা না বললেই নয়। রঙিন ফসলের ক্ষেত মানুষের হাতে তৈরি, কিন্তু তারই পাশাপাশি বুনোফুলের আর এক বিরাট রাজত্ব এই মরুভূমির বিশাল অংশ জুড়ে। প্রচণ্ড রঙিন, নানারকম বুনোফুলের অবস্থান দিগন্তব্যাপী। মরশুমে আপনা থেকেই ফুটে ওঠা বিশাল রঙের কার্পেট মরুভূমির পতিত জমি জুড়ে।

প্রাকৃতিক দৃশ্য দর্শনে ধনী-দরিদ্র বোধ ফিকে হয়ে যায়। মনে হয় ‘আকবর বাদশার সাথে হরিপদ কেরানির কোন তফাৎ নেই’। বারবার শিল্পী হরেন দাসের কথা মনে পড়ে। ওঁর মতো করে দেখেছিলেন ফসলের মাঠ। চিত্তপ্রসাদ, জয়নুল আবেদীন খুঁজেছিলেন ফসলের অন্য মানে। নিসর্গ মানে, গোপাল ঘোষ। পাকা ফসলের সোনার ক্ষেত যখন দেখতাম তখন মনে পড়ত, ভ্যান গঘের কথা। সবশেষে হারভেস্টারের চিরুনি চালানোর পর ফাঁকা ক্ষেত যখন দেখলাম কোন উঁচু পাহাড়ের মাথা থেকে, দেখলাম একেবারে আধুনিক সভ্যতার চিহ্ন, আঁচড় কাটা দৃশ্যপট যেন নতুন জ্যামিতিক বিমূর্ততা।
…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…
পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন
পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি
পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!
পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ
পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম
পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?
পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়
পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ
পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?
পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা
পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার
পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ
পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা
পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?
পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!
পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved