
আপনাদের ঝুলিতে অসংখ্য গল্প আছে, আমি তার শুধু উসকানি দেব। গল্প আপনার। ধরুন, চাবির আটপৌরে পারিবারিক গল্প। কাকিমা-মাসিমারা অর্থাৎ বাড়ির বড়গিন্নি সমস্ত চাবির গোছা নিজেদের শাড়ির আঁচলের খুটে বেঁধে রেখে গৃহপ্রধানের মতো দেমাকে ঘুরে বেড়াতেন যেমন, তেমনই আবার হঠাৎ সবাইকে লুকিয়ে কেউ অব্যবহৃত ভারি তালাটি, পিতল-কাঁসা-অ্যালুমিনিয়াম হিসেবে বদলে সাজুগুজুর মনিহারি জিনিস কিনে বসলেন। নিদেনপক্ষে ভাঙাচোরা জিনিসের বদলে বিস্কুট কিংবা চানাচুরওলার খপ্পরে পড়লেন।
২৪.
চোর আর ডাকাত বলতে আমার নিজস্ব একটা ধারণা আছে। এদের মধ্যে মস্ত তফাত হল– ডাকাতরা সাহসী আর চোররা ভীষণ ভিতু আর অসভ্য। তাই তালা ভেঙে বা লুকিয়ে নকল চাবি তৈরি করে, লোককে না-বলে চুরি করাটা চোরের কাজ। ছোটবেলায় শুনেছিলাম, চোর নাকি চুলের কাঁটা কিংবা সেফটিপিন দিয়ে তালা খোলে। তা না-হলেও একটা ছোটখাটো লোহার হুকের মতো কিছু থাকে ওদের কাছে, সেইটা দিয়ে যে কোনও তালা খুলে ফেলতে পারে। চোরদের সঙ্গে কিন্তু একটা আদিম টেকনোলজি আছেই। ডাকাতরা আলাদা। সরাসরি এসে আমাদের বলবে, তুমিই দরজা খুলে দাও, তারপর যা করণীয় করে চলে যাবে। তবে চোরদের এই অসভ্যতা আর ডাকাতদের এই বেআইনি সাহসিকতায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি সবসময়।
আমার সঙ্গে আপনারাও হয়তো একমত হবেন, দরজায় একটা তালা ঝোলানো মানে আসলে একটা নোটিশ ঝোলানো। সেই নোটিশে তালা নিজেই যেন বলছে, ঘরের মধ্যে আপাতত কেউ নেই। মালিকের পারমিশন ছাড়া এই দরজা দিয়ে প্রবেশ নিষেধ। তুমি এইটা খুলে বা ভেঙে ঘরে ঢোকা মানে একটা অন্যায়, একটা বেআইনি কাজ করছ। মনে হয়– বেশিরভাগ মানুষই তালার এই ভাষাটা বোঝে। আর সবাই ন্যায়-অন্যায় বুঝতে পারলে তালার সাইজ, তার ক্ষমতা, তার টেকনোলজির উন্নতির কোনও দরকারই হত না।

টেকনোলজির কথা উঠতেই আমার এই কলামে বারবার একটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসে, আমার শুরুর দিকের দীর্ঘদিনের কর্মভূমি, ‘বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল মিউজিয়াম’। বিড়লা মিউজিয়ামের ছিল মস্ত বড় লাইব্রেরি। বিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ের প্রচুর সংগ্রহ। ‘লাইব্রেরি’ সম্পর্কে আমার নিজের অভিজ্ঞতা অদ্ভুত, একটা জ্ঞানের খনি, তথ্যভাণ্ডার। সেখান থেকে আমরা যেমন ইনগ্রিডিয়েন্টস পাই, আবার রেসিপিও পেতে পারি। সেটা নিয়ে আমাদের মতো করে যা কিছু প্রস্তুত করি, পরিবেশন করি।
মিউজিয়ামের লাইব্রেরির প্রসঙ্গটা কেন আনলাম? আর্ট কলেজের শিক্ষাদীক্ষার মধ্যে বেশিটা গায়ে-গতরে যে। তেমনভাবে আক্ষরিক পড়াশোনার কোনও বালাই ছিল না। মিউজিয়ামের বড়কর্তারা আমাকে মাঝে মাঝে বলছিলেন, তোমার উন্নতি করতে হলে কিছু কিছু জিনিস নতুনভাবে আয়ত্ত করতে হবে। একটু ঘন ঘন লাইব্রেরিতে যেতে হবে। পড়াশোনার ভয়ে তো আমি আর্ট কলেজে এসেছিলাম। বিজ্ঞান মিউজিয়ামে লাইব্রেরিতে নানা বিষয়ে অসংখ্য বই। আমি পড়ি না, বিজ্ঞানের মানুষ যারা কাজ করছে তারাও তেমন পড়ে না। একমাত্র কোনও কোনও জিনিসের তথ্য দরকার হলে সেটুকু আর কী। সরকারি অফিস, সরকারি টাকায় বাৎসরিক বাজেটে লাইব্রেরি ভরে তোলা হয়। সোজা কথা, বইটা নিয়ে জ্ঞানার্জন কিংবা বিনোদনের জন্যও কেউ পড়ে না। অনেক পড়ে-টড়ে চাকরি যখন জুটেছে আর অত পড়ার কী আছে!
অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়মিত লাইব্রেরিতে যাওয়া অভ্যাস করে নিলাম এবং একটা কায়দা বের করলাম। দুটো আলমারির মাঝখানে যে-পথ সেখানে আলমারি মুখোমুখি। সামনে বই, পিছনের বই। আমি সামনে তো দেখতে পাচ্ছি কিন্তু পিছনে দেখতে পাচ্ছি না। চোখ বুজে পিছনে হাত দিয়ে আলমারির দরজা খুলে আন্দাজে হাত বুলিয়ে যে-বইটা পেলাম, লটারির মতো সেটা নিলাম। দেখলামই না কী বই। কারণ, কী পড়ব– তাই তো জানি না। প্রায় সব বই ইংরেজিতে। বইটা নিয়ে সোজা এসে লাইব্রেরিয়ানের টেবিলে। বললাম, বইটা ইস্যু করুন আমার নামে। প্রথম লটারিতে যে-চটি বইটা পেয়েছিলাম সে বইটার ইংরেজি টাইটেল, ‘হিস্ট্রি অফ লক্স অ্যান্ড কিইজ’। বাংলায়, তালা ও চাবির ইতিহাস।

সেই গুহামানবদের গুহার মুখে বিশাল বড় পাথর চাপা দেওয়া থেকে আজ এই ডিজিটালের যুগ পর্যন্ত বিশাল পথ অতিক্রম করেছি আমরা। পাথর থেকে, কাঠ, ধাতু পর্যন্ত কত না কাণ্ড। বিশাল কাঠের তালা। তালা যেমন বিশাল বড় তার চাবিও বড়। সে চাবি অসংখ্য লোক মিলে বয়ে আনে। তারপরে দুর্গের তালা খুলবে অসংখ্য লোক দিয়ে। মানুষের এই একটা অদ্ভুত বাতিক। কোনও একটা জিনিস হাতে নিলে তার পুব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ না-দেখে কোনও শান্তি নেই। তালা, যেন প্রযুক্তির প্রতীক। একটি যান্ত্রিক জটিলতা। যেখানে দাঁত, পিন, স্প্রিং মিলেমিশে এক নিখুঁত প্রতিরোধ গড়া। কিন্তু সেই জটিলতার মাঝখানে থাকে এক নির্দিষ্ট বিন্যাস, এক সূক্ষ্ম ফাঁক, যেখানে সঠিক আকারের চাবি প্রবেশ করলেই সব প্রতিরোধ কেমন ভেঙে পড়ে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতায় শুরুতে ধাতুর তালা, ঘরবাড়িতে ব্যবহার। পরে ছোট ছোট তালা বাইরে যাতায়াতের সময় ব্যাগের গায়ে। তারও পরে এল কম্বিনেশন লক। এছাড়া হোটেলগুলোতে দেখলাম, দরজার গায়ে ছোট ক্যালকুলেটরের মতো একটা সংখ্যা লেখা কার্ড যেখানে নির্দিষ্ট নম্বর টিপলে দরজা খোলে। ঠিক যেমন আমাদের এখনকার মতো কয়েকটি সংখ্যার পাসকোড কিংবা পাসওয়ার্ড। আমাদের মুম্বইয়ের বাড়িতে ব্যক্তিগত ফ্ল্যাটের তালা চাবি আলাদা আলাদা। বিল্ডিংয়ের বন্ধ মেন গেটে ঢোকার পদ্ধতি এখন আধুনিক। ক’দিন আগে পর্যন্ত ছিল, ফিঙ্গার প্রিন্ট। অর্থাৎ, দরজার পাশের নির্দিষ্ট জায়গায় আঙুল ছোঁয়ালে দরজা খুলে যায়। এখন সেখানে রয়েছে ছোট্ট একটা ক্যামেরা সমেত মনিটার, যেখানে মুখ দেখালেই আমাদের ছবি দেখতে পাই এবং দরজা খুলে যায়। ফেস আইডেন্টিফিকেশন।
মিউজিয়ামে কাজ করার সময় দেখেছি, আমাদের বড়কর্তার কাছে একটা চাবি থাকত সেটাকে বলে ‘মাস্টার-কি’। সেই চাবিটা দিয়ে মিউজিয়ামের সমস্ত ঘরের তালা খোলা যেত। অথচ মিউজিয়ামের ঘরগুলোতে আলাদা আলাদা চাবি এবং আলাদা আলাদা তালা। পরে কর্মসূত্রে বিদেশের বড় মিউজিয়ামগুলোতেও দেখেছি, তাদের কর্তাব্যক্তির কাছে একটা মাস্টার-কি থাকে।

এই ‘মাস্টার-কি’ বিষয়ে আর একটা অন্যরকম গল্প আছে। ব্যাপারটা ইজরায়েলকে জড়িয়ে। ওরা এখন দাদাগিরি করছে খুব। যুদ্ধ মারামারি। এইখানে আমার কেন যেন একটা জিনিস মাঝে মাঝে মনে হয়, যারা যখন তখন অন্য মানুষকে মারে তারা কিন্তু আসলে ভেতরে ভেতরে ভিতু। মনে হয়, সাহসীরা মানুষকে মারে না, তারা মানুষকে বাঁচায়। যেটা বলছিলাম, সেবারে ইজরায়েলে যাওয়ার সময় দুটো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলো। আমাদের দেশের এয়ারপোর্টে প্রত্যেক যাত্রীকে ধরে ধরে অসংখ্য প্রশ্ন। তুমি কে? কোথায় যাচ্ছ? কেন যাচ্ছ? এটা কি প্রথম? আগে গেলে, কখন, কেন? সঙ্গে ক’জন, তারা কারা ইত্যাদি। বোর্ডিং পাস দেওয়ার আগে প্রশ্ন আর শেষ হয় না। দ্বিতীয়টা ‘তেল আভিভ’-এ পৌঁছে দেখলাম, নানা রকমের সাংকেতিক চিহ্নে চক দিয়ে আমার ব্যাগের গায়ে কীসব লেখা। আর ব্যাগের ভেতরে দেখা গেল, যেভাবে সাজিয়েছিলাম, সেটা ঘাঁটাঘাঁটি হয়ে গিয়েছে। ওদের কাছে নির্ঘাত সমস্ত রকম ব্যাগ খোলার একটা মাস্টার কি বা একাধিক চাবি থাকে, যেটা দিয়ে ওরা আমাকে না-বলেই ব্যাগগুলো খুলে দেখে নিতে পারে ভেতরটা। ব্যাপারটা আমার মোটেই পছন্দ হয়নি।
ইজরায়েলে রাস্তাঘাটে যত্রতত্র রাইফেলধারী সিকিউরিটির লোকজন। হোটেলে থাকাকালীন বিভিন্ন ফ্লোরে যাওয়ার জন্য সিকিউরিটির নানারকম সন্দেহ করা, সঙ্গে যাওয়া, চাবি দিয়ে দরজা খোলা, দেখা, কার ঘরে যাচ্ছি বিশেষভাবে তা লক্ষ করা ইত্যাদি। এছাড়া ইজরায়েলের নাগরিকদের আছে যুদ্ধকালীন লুকিয়ে থাকার জন্য, সুরক্ষিত থাকার নানা জায়গায় অদ্ভুত অদ্ভুত সব ‘বম্ব সেল্টার’-এর ব্যবস্থা। শত্রুদের ঠকিয়ে নিজেদের তালা বন্দি রাখার এক চমৎকার আয়োজন, নিজের চোখেই দেখে এসেছি সেসব।

ইজরায়েল বলতে চমৎকার জেরুজালেম শহরের কথা একটু বলি। প্রাচীর ঘেরা সমস্ত জেরুজালেমটাই পাথরের শহর মনে হয়। চারিদিকে অনেকগুলো সুদৃশ্য পাথরের গেট। দর্শনীয় স্থানগুলোতে সুরক্ষা চারিদিকে, সিকিউরিটি চেক সর্বত্র। তারই মধ্যে মাউন্ট অফ অলিভের দিকের গেটটা সম্পর্কে গল্প অন্যরকম। সুন্দর পাথরের এই গেটটায় আসলে কোন দরজা নেই। গেটের মতো দেখতে কিন্তু আসলে পাথরের দেওয়াল। এদের বিশ্বাস, তাঁর দলবল নিয়ে যিশু শিগগিরই ফিরে আসবেন জেরুজালেমে। তিনি যখন আসবেন তখন তাঁরই হাতের ছোঁয়ায় খুলে যাবে এই পাথরের দরজা। ঠিক যেন অদৃশ্য এক চাবির আবেগের গল্প।
চাবির খোশগল্প দু’-একটা হয়ে যাক এবার। প্রাচীন কালে মজবুত দড়ি দিয়ে মূল্যবান জিনিসপত্র বেঁধে রাখার ব্যবস্থাটাও তালাচাবির মতো। সেক্ষেত্রে বুদ্ধিমানেরা বিশেষ কৌশলে দড়ির গিঁট বাঁধত, যেটা খোলা, যে না-জানে তার পক্ষে সম্ভব হত না। সুরক্ষা-ব্যবস্থায় বজ্র আঁটুনি কিন্তু ফসকা গেরো নয়। ব্যাপারটা আপনারা যাঁরা স্কাউটস অ্যান্ড গাইডস, পর্বতারোহণ কিংবা এনসিসি করেছেন– তাঁরা জানেন, নট বা গিঁটের নানা রকমের চরিত্র। ‘আলেকজান্ডার নট’, এমন একটা নট বা গিঁট, যে ওটা বাঁধে শুধু সে জানে– এটা কী করে খুলতে হয়। এই নটটার নামকরণের পিছনের গল্পটা এরকম– গ্রেট আলেকজান্ডারকে বলা হয়েছিল এটা খুলতে। পারেননি এবং ওঁর আঁতে ঘা লাগে। তিনি যে পথটা বেছে নিলেন সেটা হল, তালা যদি খুলতেই না পারো তাহলে ভেঙে দাও। তাই তলোয়ার দিয়ে ওই নটটা উনি কেটে দিয়েছিলেন।
আমাদের দেশে পুরনো সময়ে রাজাবাদশারা তাঁদের প্রাসাদ বা দুর্গের চারপাশে তৈরি করতেন গভীর খাদের পরিখা, জলের সুরক্ষা বলয়। ধনরত্ন যা কিছু তা কাঠের বাক্সে রেখে সেই বাক্সের গায়ে মোম লাগিয়ে তার ফাটল ইত্যাদি পুরো বন্ধ করে দেওয়া হত। সেই বাক্সটি আরও একটা বাক্সের মধ্যে রেখে সেই বাক্সের ভিতরে যাতে জল না ঢোকে তারও ব্যবস্থা করে সেগুলোকে ডুবিয়ে রাখা হতো পরিখার জলে। প্রহরী তো ছিলই, বাড়তি আয়োজন, স্বাস্থ্যবান বেশ কিছু কুমির ওই জলে ছেড়ে দেওয়া। এরপর নিয়মিত তাদের খাইয়ে-দাইয়ে তাজা রাখার ব্যাপারে আদর-যত্ন।

পৃথিবীর বিখ্যাত বড় বড় মিউজিয়ামগুলো থেকে দুষ্প্রাপ্য শিল্প চুরির খবর মাঝেমধ্যে আমরা দেখি সংবাদপত্রে বা সংবাদমাধ্যমে। সত্যিকারের বড় মাপের মিউজিয়ামে দাঁড়িয়ে এবং চুরি-ডাকাতির হাত ঘুরে আবার ফিরে আসা শিল্প-কর্মের সামনাসামনি হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। সে গল্প শোনার এবং বলার শিহরণ আলাদা। ভিন্ন স্বাদের সে গল্পের পটভূমি রাশিয়ার, সেন্ট পিটার্সবার্গ। ওখানকার প্যালেস মিউজিয়াম এবং জগদ্বিখ্যাত হার্মিতাজ মিউজিয়ামের প্রদর্শনী দেখতে দেখতে এ গল্প দু’বার শুনেছি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের রাশিয়া আক্রমণের সময় রাশিয়ানদের দুটো ভয়। যুদ্ধ সংক্রান্ত প্রাণহানি, শহর ধ্বংস, সম্পত্তি নষ্ট– এসব তো আছেই, আর আছে হিটলারের নিজস্ব নেশা, শিল্পকর্ম লুঠপাটের ভয়। বার্লিন থেকে হিটলারের বাহিনী রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের দিকে আসার খবর পাওয়া মাত্র শুরু হয়ে গেল মিউজিয়ামের শিল্পকর্ম সুরক্ষার কাজ। যতটা সম্ভব শিল্পকর্ম উরাল পর্বতমালার দিকে, অর্থাৎ সাইবেরিয়ার দিকে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখা হলো মাটির নিচে। রাশিয়ার মিউজিয়ামের শিল্পকর্ম তখন মরুভূমির গুপ্তধন। তাছাড়া আরও জিনিস তড়িঘড়িতে শহরের বিভিন্ন অংশে অগোছালোভাবে লুকিয়ে রাখা হল।
মিউজিয়ামের শিল্পকর্ম সুরক্ষার সে গল্প অনেক লম্বা। তবুও বলে রাখি যুদ্ধ শেষে সমস্ত শিল্পকর্মকে খুঁজে পেতে আবার মিউজিয়ামে ফিরিয়ে আনার যথেষ্ট চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু পরিণতি খুব সুখের হয়নি। হার্মিতাজ মিউজিয়ামের শিল্পকর্মের আনুমানিক ১৬০০০ কাজ আজও নিখোঁজ।
…………………………………………………………………
দীর্ঘদিন মোল্লা নাসিরউদ্দিনের গল্প নিয়ে ইলাস্ট্রেটেড উইকলি-তে কাজকর্ম করতে গিয়ে বুঝেছি, গল্পগুলো বিনোদন ছাড়াও আমাদের মানসিক বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য একটা থেরাপির কাজ করে। সেসময়ে ওর যাবতীয় গল্পের ভাণ্ডার শেষ করেও একটা নতুন গল্প পেলাম। কারণ, সেটা মোল্লার মৃত্যুর পরের গল্প। শুনেছি, মৃত্যুর পরে কবর থেকে মোল্লার শরীরটাকে যাতে কেউ চুরি করে না-নিয়ে যায় তাই কবরের সামনে একটা বিশাল সুদৃশ্য দরজা ছিল, আর সেই দরজায় ছিল এক বিশাল তালা। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার, ওই দরজা তো ছিল কিন্তু কবরের অন্য তিনপাশে কোনও পাঁচিল ছিল না।
…………………………………………………………………
এখানে অল্প কিছু তালাচাবির গল্প শোনানো গেল আমার ঝুলি থেকে। তবে আপনাদের ঝুলিতে অসংখ্য গল্প আছে, আমি তার শুধু উসকানি দেব। গল্প আপনার। ধরুন, চাবির আটপৌরে পারিবারিক গল্প। কাকিমা-মাসিমারা অর্থাৎ বাড়ির বড়গিন্নি সমস্ত চাবির গোছা নিজেদের শাড়ির আঁচলের খুটে বেঁধে রেখে গৃহপ্রধানের মতো দেমাকে ঘুরে বেড়াতেন যেমন, তেমনই আবার হঠাৎ সবাইকে লুকিয়ে কেউ অব্যবহৃত ভারি তালাটি, পিতল-কাঁসা-অ্যালুমিনিয়াম হিসেবে বদলে সাজুগুজুর মনিহারি জিনিস কিনে বসলেন। নিদেনপক্ষে ভাঙাচোরা জিনিসের বদলে বিস্কুট কিংবা চানাচুরওলার খপ্পরে পড়লেন।

হস্টেলের সঙ্গে তালাচাবির সম্পর্ক আপনার জানা। গভীর রাতে রুমের সঙ্গী না-ফিরলে আপনি কী করে ঘরে ঢুকবেন, তার কৌশল আবিষ্কার করা যেমন, তেমনই রাগারাগি করে চারজন বা ছ’জনের রুমে ছ’টি আলাদা আলাদা তালা-চাবি করে নিয়ে সেগুলোকে একটি দরজাতে লাগানোর কৌশল আবিষ্কার করার গল্প আপনার মনে পড়ছে নিশ্চয়ই? আপনার আছে আরও অগুনতি গল্প।
আপনার একান্ত নিজের চাবি দিয়ে নিজের দরজার পুরনো অত্যন্ত চেনা তালা খুলতে হিমসিম খেয়েছেন কখনও? আপদে-বিপদে পাড়ার বিপত্তারণ চাবিওয়ালার গল্প আপনার ঝুলিতে আছেই আছে। আপনি যদি ভিন্ন ভিন্ন সাইটে আপনার সমস্ত পাসওয়ার্ড মনে রাখতে না-পারেন, সেখানে তো আপনার অনেক নিজস্ব গল্প। ধরুন, আপনার ডকুমেন্টসগুলো সব ক্লাউডে রেখে দিয়েছেন আর ই-লকার ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, তাহলে তো আপনার কাছে নতুন গল্প জমা হয়ে গিয়েছে। এখন আপনি যদি সেসব গোপন রাখেন, মানে মুখে তালা লাগিয়ে রাখেন তাহলে আলাদা ব্যাপার। যদি বিজ্ঞান নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন তাহলে জার্মান বিজ্ঞানী, ইমিল ফিশার-এর এনজাইমের ‘তালাচাবি মতবাদ’ বিষয়টা মনে করিয়ে দিলাম। রেনেসাঁ যুগে, ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড থেকে মূর্তি এবং ভাস্কর্য দিয়ে তালা আর চাবি সাজানোর চল ছিল। যার ফলে বিশ্বের সেরা কিছু তালা তৈরি হয়েছিল। ইউরোপ জুড়ে সুন্দরভাবে তৈরি তালা এবং চাবির জাদুঘর দেখার অভিজ্ঞতা আপনাদের কারও কারও নিশ্চয়ই হয়েছে! কিছু না-হলেও আপনার শহর জীবনে কারণে অকারণে আন্দোলন, প্রতিবাদ এবং তালাবন্ধ, তো আপনার কাছে জলভাত।
দীর্ঘদিন মোল্লা নাসিরউদ্দিনের গল্প নিয়ে ইলাস্ট্রেটেড উইকলি-তে কাজকর্ম করতে গিয়ে বুঝেছি, গল্পগুলো বিনোদন ছাড়াও আমাদের মানসিক বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য একটা থেরাপির কাজ করে। সেসময়ে ওর যাবতীয় গল্পের ভাণ্ডার শেষ করেও একটা নতুন গল্প পেলাম। কারণ, সেটা মোল্লার মৃত্যুর পরের গল্প। শুনেছি, মৃত্যুর পরে কবর থেকে মোল্লার শরীরটাকে যাতে কেউ চুরি করে না-নিয়ে যায় তাই কবরের সামনে একটা বিশাল সুদৃশ্য দরজা ছিল, আর সেই দরজায় ছিল এক বিশাল তালা। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার, ওই দরজা তো ছিল কিন্তু কবরের অন্য তিনপাশে কোনও পাঁচিল ছিল না।

এখন যদি একটু গভীর বোধের কথা বলতে হয় তাহলে বলি, জীবনের ব্যক্তিগত স্তরেও আসলে আমরা বহু তালা বয়ে বেড়াই। অভিমান, ভয়, অপরাধবোধ। এসব আমাদের ভিতরের কক্ষগুলো বন্ধ করে রাখে। বাইরে থেকে কেউ জোর করলে দরজা ভাঙতে পারে, কিন্তু ভাঙা দরজা নিরাপত্তা দেয় না। দরকার হয়, সমঝোতা, ক্ষমা, ভালোবাসার মতো একটি উপযুক্ত চাবি। তাই মনে হয়, তালা যত বড়ই হোক, সেখানে থাকে একটি সম্ভাব্য চাবি। তালা মানে এমন এক ব্যবস্থা, যা খোলার জন্যই তৈরি। চাবি তার অনিবার্য সঙ্গী। তালা স্থির, চাবি গতিশীল। তালা প্রতিরোধ, চাবি অনুসন্ধান। শেষ পর্যন্ত, তালার শক্তি তার বন্ধনে, চাবির শক্তি তার বোঝাপড়ায়।
…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…
পর্ব ২৩: বেঁধে থাকা বেঁধে রাখা
পর্ব ২২: এই দুনিয়া ঘোরে বনবন বনবন
পর্ব ২১: শরীরের ক্যানভাসে আঁকা শিল্প
পর্ব ২০: বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প
পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন
পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না
পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন
পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি
পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!
পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ
পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম
পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?
পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়
পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ
পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?
পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা
পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার
পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ
পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা
পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?
পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!
পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved