
আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণার অনুষ্ঠানে, আন্দামানে পতাকা উত্তোলন বা আইএনএ-র যুদ্ধযাত্রার অগণিত ছবিতে এই চরকা-আঁকা পতাকাটি পরিষ্কার দেখা যায়। অপরপক্ষে পূর্ব এশিয়ায় আজাদ হিন্দ আন্দোলনের কোনও ছবিতেই জার্মানি-পর্বের ‘ব্যাঘ্রকেতন’টি দেখা যায় না। তা সত্ত্বেও ভারতের মাটিতে উত্তোলিত প্রথম জাতীয় পতাকা সম্পর্কে যে ভালোরকম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় মইরাং, কলকাতা প্রভৃতি বিভিন্ন স্থানে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল পতাকা উত্তোলনের বার্ষিকী উপলক্ষে যে-অনুষ্ঠানগুলি হয়ে থাকে, তাতে বিভিন্ন সরকারি ও রাজনৈতিক পদাধিকারী ব্যক্তির উপস্থিতিতে নানা ধরনের বাঘমার্কা ভুল পতাকা টাঙানোর মধ্যে দিয়ে।
১৯৪১ সালের এপ্রিল মাস। প্রথম সপ্তাহেই ইতালিয়ান পাসপোর্ট নিয়ে ‘অরল্যান্ডো মজোটা’ নামধারী একজন মস্কো থেকে বিমানে বার্লিনে এসে নামলেন। পাসপোর্টে ওই নাম লেখা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এই ব্যক্তি ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু! গত এক বছর কেমন কেটেছে তাঁর? চেয়েছিলেন বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ নিতে। সুযোগ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারকে ভারত থেকে উৎখাত করতে। সেজন্য দরকার ছিল গণআন্দোলন। তা শুরু করার কথা বলতেই বাংলা সরকার ১৯৪০ সালে তাঁকে ভারতরক্ষা আইনে গ্রেফতার করে। জেলে থাকতে থাকতেই সুভাষ ফন্দি আঁটেন ব্রিটেনের শত্রুপক্ষীয় কোনও দেশের সাহায্য নেওয়ার, ভারতের বাইরে যাওয়ার। কাজেই সেই মুহূর্তে অনশন, ধর্মঘটের মাধ্যমে চাপ তৈরি করে সুভাষচন্দ্রকে সাময়িক কারামুক্তি আদায় করতে হয়েছিল। এরপর তিনি পরিকল্পনামতো ইংরেজ সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে, ছদ্মবেশে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

এই নিষ্ক্রমণের পর আফগানিস্তান থেকে রাশিয়া হয়ে বার্লিন পৌঁছে সুভাষচন্দ্রকে জার্মানিতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। এভাবেই শুরু হয়েছিল বিদেশের মাটিতে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। এই প্রচেষ্টায় নাৎসি জার্মানির কাছ থেকে তিনি যেসব সুবিধা আদায় করতে পেরেছিলেন, সেগুলি হচ্ছে ‘আজাদ হিন্দ রেডিও’ চালু করে ভারতবাসীদের উদ্দেশে বেতারভাষণ, ‘ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার’ নামে এক সংঘ তৈরি করে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার এবং জার্মানির হাতে যুদ্ধবন্দি ব্রিটিশ বাহিনীর ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে ‘ইন্ডিয়ান লিজিয়ন’ নামে একটি ছোট সেনাদল গঠন।
এ-সময় জার্মানিতে সুভাষচন্দ্রের কর্মকাণ্ডকে ভবিষ্যতের আজাদ হিন্দ আন্দোলনের একটি অঙ্কুরোদগম বা ‘ড্রেস রিহার্সাল’ বলা চলে। জার্মানির এই পর্বেই ভারতীয় সৈন্যদের সুভাষচন্দ্রকে ‘নেতাজি’ সম্বোধন, ‘আজাদ হিন্দ’ শব্দবন্ধ ও ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান। জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘জনগণমন’ গানটির অর্কেস্ট্রেশনের প্রবর্তন হয়েছিল।
এই সূত্রে, ‘ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার’ ও ‘ইন্ডিয়ান লিজিয়ন’-এর পতাকার কথাও বলতে হয়। হলুদ সাদা ও সবুজ এই তিন রঙের পতাকাটির মাঝের ছোট অংশে ছিল একটি লাফিয়ে পড়া বাঘের প্রতীক (যা প্রকৃতপক্ষে ছিল ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামী টিপু সুলতানের স্মৃতিবিজড়িত)। ওপরের ও নিচের অংশে রোমান হরফে লেখা ছিল ‘আজাদ হিন্দ’। জার্মানিতে প্রায় দু’-বছরের অবস্থানকালে সুভাষচন্দ্র নাৎসি জার্মানির কাজ থেকে এর বেশি কিছু সুবিধা আদায় করতে পারেননি।

জার্মানিতে প্রায় দেড় বছর কাটানোর পর হিটলারের সঙ্গে নেতাজির প্রথম সাক্ষাৎটি যখন হয় (মে, ১৯৪২), তার আগেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, ব্রিটিশকে ঘাঁটানো হিটলারের অভিপ্রেত ছিল না। হিটলারের সঙ্গে কথা বলেও তিনি নিশ্চিত হন যে, জার্মানিতে পড়ে থাকলে তাঁর ভারতবর্ষে সামরিক অভিযান চালানোর স্বপ্ন কোনও দিনই সফল হবে না। সেজন্যই তিনি হিটলারকে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁকে জাপানে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে। এই অনুরোধের অবশ্য একটা পটভূমি ছিল।
ইতিপূর্বেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্বাধীনতাপ্রয়াসী ভারতীয়রা অতীতে সুভাষচন্দ্রের মতোই ভারত থেকে ব্রিটিশ ফাঁদ এড়িয়ে বেরিয়ে এসে জাপানে বসবাসরত বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বে গঠন করেছিল ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ’ বা আইআইএল। এছাড়াও জাপানের হাতে যুদ্ধবন্দি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাদের নিয়ে জাপানি সহায়তায় গড়ে উঠেছিল ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ নামে এক সেনাদল। ভারতকে ব্রিটিশ কবলমুক্ত করার লড়াইয়ে এই বাহিনীকে ব্যবহার করা হবে বলে জাপান আশ্বাসও দিয়েছিল রাসবিহারীকে। ব্যাংককে ১৯৪২ সালে পূর্ব এশিয়ায় ওই লিগের প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন, সুভাষচন্দ্রকে জার্মানি থেকে আমন্ত্রণ করে এনে আজাদ হিন্দ আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানানো হোক।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক দুঃসাহসিক সাবমেরিন যাত্রায় একজন মাত্র ভারতীয় সঙ্গীকে (আবিদ হাসান) নিয়ে সুভাষচন্দ্র রওনা হন জাপানের উদ্দেশে। ৯০ দিনের এই বিপদসংকুল অভিযাত্রায় বিদেশের মাটিতে একটি অস্থায়ী সরকার ও মুক্তিফৌজ গঠন করে ভারত-অভিযানের স্বপ্ন সুভাষচন্দ্রকে একবারের জন্যও ছেড়ে যায়নি। জার্মান সাবমেরিনের সংকীর্ণ কুঠুরিতে ডিজেলের গন্ধ-ভরা এক দমবন্ধ পরিবেশে বসে এ-বিষয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মসূচির যাবতীয় খুঁটিনাটি তিনি ডিক্টেশন দিতেন এবং তাঁর সহকারী আবিদ সেগুলি লিখে নিতেন।

দু’-বছর আগে যে-এপ্রিল মাসে মুক্তিফৌজ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে তিনি জার্মানিতে পা দিয়েছিলেন, সেই এপ্রিলেরই এক ভোরবেলায় বিক্ষুব্ধ ভারত মহাসাগরে নেতাজি ও আবিদ স্থানান্তরিত হলেন এক জাপানি সাবমেরিনে (২৮ এপ্রিল, ১৯৪৩), যা ছিল বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। পরের মাসে পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছনোর পর বিমানে নেতাজি টোকিও এসে নামলেন ১৩ মে।

তাঁর এই আগমনে পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়দের মধ্যে অভূতপূর্ব উদ্দীপনা! জাপান সরকারের সঙ্গে নেতাজির আলোচনা ও সমঝোতার পর সেই বছরের পরবর্তী মাসগুলিতে দ্রুত যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে, সেগুলি হল– সিঙ্গাপুরে সুভাষচন্দ্রের হাতে রাসবিহারীর ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগের নেতৃত্বভার অর্পণ (৪ জুলাই), নেতাজি সুভাষচন্দ্রের আজাদ হিন্দ অস্থায়ী সরকার গঠনের ঘোষণা (২১ অক্টোবর), এই সরকারের রাষ্ট্রপ্রধানরূপে তাঁর ব্রিটেন ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা (২৩ অক্টোবর) এবং ব্রিটিশ দখলমুক্ত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কর্তৃত্ব জাপান আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার পর নেতাজির পোর্ট ব্লেয়ারে এসে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন (৩০ ডিসেম্বর)।

এই সব অনুষ্ঠানেই জাতীয় পতাকা হিসেবে তিনের দশক থেকে ভারতে কংগ্রেসে গৃহীত ও স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা অধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত চরকাশোভিত সেই তিন রঙা ঝান্ডা-ই ব্যবহৃত হয়েছিল।

দ্বীপপুঞ্জটির এই প্রতীকী হস্তান্তরে সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকার বা এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের প্রশাসনে মনোনিবেশ করার সময় অবশ্য নেতাজির ছিল না। তাঁর স্বপ্ন ভারতের মূল ভূখণ্ডে এই পতাকা উত্তোলন করা। তাঁর চোখে তখনও ভেসে উঠছে এক মুক্তিবাহিনীর ছবি, যারা অস্ত্র হাতে ওই তেরঙা ঝান্ডা কাঁধে নিয়ে কদম কদম এগিয়ে যাচ্ছে দিল্লির লালকেল্লার দিকে।

এশিয়াতে পদার্পণের পর থেকেই তাঁর নেতৃত্ব ও সংগঠন-কুশলতায় নতুন করে গড়ে উঠছিল ভেঙে-পড়া আজাদ হিন্দ ফৌজ বা আইএনএ। সেনাবাহিনীতে নতুন লোকনিয়োগ ও যুদ্ধপ্রস্তুতি চলছিল জোরকদমে। মুক্তিফৌজ গঠনের স্বপ্নে অবিচল সুভাষচন্দ্রের পরিকল্পনায় ‘ঝাঁসির রানি’ রেজিমেন্ট নামে একটি মহিলা শাখাও যুক্ত হয় এই বাহিনীতে। প্রবাসী ভারতীয়দের তিনি আহ্বান জানান– ‘KARO SAB NICHAWAR, BANO SAB FAKIR!’ নিজেদের সঞ্চিত সবরকম ধন-সম্পদ মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে দান করার জন্য সব শ্রেণির ভারতীয় নারীপুরুষের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় নেতাজির আহ্বানে।
পরের বছর নেতাজির স্বপ্ন প্রথম ধাপে উপস্থিত হল, যখন জাপানি-ফৌজ বার্মার ব্রিটিশ দখলমুক্ত এলাকার মধ্য দিয়ে ভারতের দিকে অভিযান শুরু করে। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন ইউ’। নেতাজি বার্মার জাপ কমান্ডার জে. কাওয়াবেকে বলেছিলেন, ভারতের মাটিতে প্রথম শহিদ হওয়ার সুযোগ অবশ্যই কোনও ভারতীয় সৈন্যকে দিতে হবে। জাপ সেনাপ্রধান জে. সুগিয়ামার থেকে তিনি এই প্রতিশ্রুতিও আদায় করেছিলেন যে, ইম্ফল আক্রমণে আইএনএ-কে সহযোগী বাহিনী হিসেবে গণ্য করা হবে। তাঁর এই ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে আইএনএ-র একটি ডিভিশনকে জাপানি বাহিনীর এই যুদ্ধযাত্রায় যুক্ত করা হয়েছিল।

১৯৪৪ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে, নেতাজির সৈন্যবাহিনীর প্রথম দলটি যখন আরাকান ফ্রন্টের উদ্দেশে রওনা হয়, রেল স্টেশনে তিনি স্বয়ং তাঁদের বিদায় জানাতে এসেছিলেন। গর্ব ও আনন্দে ভরা এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছবি ছাপা হয়েছিল স্থানীয় সংবাদপত্রে। ভারতভূমিকে ব্রিটিশ দখলমুক্ত করে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের স্বপ্ন তাদের চোখে এঁকে দিয়েছিলেন নেতাজি। তাই তাঁরা তাঁর ছবি মাথায় তুলে ও চরকা-আঁকা জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’ গাইতে গাইতে এবং ‘চলো দিল্লি’ ধ্বনি দিয়ে যাত্রা করেছিল কষ্টসংকুল এই দুর্গম পথে।

মার্চে বার্মায় ব্রিটিশদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য জাপানি পঞ্চদশ বাহিনী ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। পাহাড়-পরিবেষ্টিত সমভূমিতে অবস্থিত মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল ছিল এই অঞ্চলের প্রধান ব্রিটিশ-ঘাঁটি। জাপানিদের উদ্দেশ্য ছিল সেই ব্রিটিশ রসদ-ঘাঁটিগুলো দখল করা এবং কোহিমায় ডিমাপুর ও ইম্ফলের সংযোগকারী সড়কটি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। এই পরিকল্পনাটি করেছিলেন জাপানি সেনাপতি লে. জে. মুতাগুচি। তিনটি জাপানি ডিভিশন ও একটি আইএনএ ডিভিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনিই। প্রতিপক্ষ ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীর সার্বিক কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন চতুর্দশ বাহিনীর কমান্ডার লে. জে. স্লিম। আইএনএ-র এই প্রথম ডিভিশনের অন্তর্গত ছিল গান্ধী ব্রিগেড, আজাদ ব্রিগেড ও গোয়েন্দা-বাহিনী বাহাদুর গ্রুপ, পরে যোগ দিয়েছিল সুভাষ ব্রিগেড। আজাদ হিন্দ সদর-দফতর এগিয়ে আনা হয়েছিল রেঙ্গুনে।

জাপানিরা যুদ্ধের শুরুতেই দ্রুত পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত কোহিমা শহরটিকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং এপ্রিলের মাঝামাঝি নাগাদ কেন্দ্রীয় শৈলশিরাটি ছাড়া বাকি সবটুকু দখল করে নেয়। এনায়েত কিয়ানির নেতৃত্বে গান্ধী ব্রিগেড বা দ্বিতীয় গেরিলা রেজিমেন্ট ইম্ফল আক্রমণে অংশ নেয়। ২৮ এপ্রিল, তারা পালেল বিমানঘাঁটি আক্রমণ করে দখল নেয়।

১৫,০০০ জাপানি সৈন্যের মুখোমুখি হয়ে ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীকে কোহিমা-রক্ষা করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। সংশাকের যুদ্ধে তাদের প্যারাসুট বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় হয়েছিল জাপানি রেজিমেন্টের কাছে। সেখানকার প্রতিটি পাহাড়ের চূড়ায় প্রচণ্ড মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় দু’-পক্ষের, সেগুলি কতবার যে হাতবদল হয়েছে, তার ঠিকানা নেই! সে-সব চূড়া দখল করে চারমাস বসেছিল জাপানি ফৌজের সঙ্গে আইএনএ-র ফার্স্ট ডিভিশন। তাঁদের এই অসাধারণ প্রতিরোধের কথা ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরাও অস্বীকার করতে পারেননি। ইংরেজ সামরিক ইতিহাসবিদ রবার্ট লিমানের মতে, কোহিমা-ইম্ফলের লড়াই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চারটি কঠিনতম লড়াইয়ের মধ্যে একটি।

নেতাজির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ এই এপ্রিল মাসটির গোড়াতেই বাহাদুর গ্রুপের একটি দল কর্নেল শওকত আলি মালিকের নেতৃত্বে টিড্ডিম রোড ধরে এগিয়ে ইম্ফলের ৪৫ কিমি দক্ষিণে মইরাং-কাংলায় এসে পৌঁছয়। পরবর্তীকালে মণিপুরের দুই জননেতা ও মন্ত্রী নীলমণি সিং ও কৈরেন সিং ছিলেন এই মৈরাংয়েরই বাসিন্দা, দু’জনেই যোগ দিয়েছিলেন আজাদ হিন্দ বাহিনীতে। নীলমণির বাড়িতেই স্থাপিত হয়েছিল আইএনএ সদর-দফতর। কর্নেল মালিক এখানেই আনুষ্ঠানিকভাবে আজাদ হিন্দ সরকারের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এপ্রিলের ১৪ তারিখের এক বিকেলে। এই তারিখটি আজও ‘মইরাং দিবস’ বা ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হয়ে থাকে।

এতদিন ধরে ইম্ফল অবরোধ করে রেখেও শেষ পর্যন্ত আজাদ হিন্দ ও জাপানি বাহিনীর শহরটি দখল করা সম্ভব হয়নি। তবে এপ্রিল থেকে জুলাই এই কয়েক মাস একটানা মণিপুরের অনেকটা অঞ্চল সোজাসুজি আইএনএ-র শাসনাধীন ছিল। এই মুক্তাঞ্চলের প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন আজাদ হিন্দ মন্ত্রিসভার মেজর জেনারেল অনিলকুমার চ্যাটার্জী। তাঁর হয়ে কার্যক্ষেত্রে প্রশাসন পরিচালনা করতেন কর্নেল মালিক। এই সময়টাতে মে. জে. চ্যাটার্জি, আনন্দমোহন সহায় প্রমুখ আইএনএ অফিসারেরা ও নেতাজি স্বয়ং বহুবার কোহিমা ফ্রন্টে এসে সৈন্যদের সঙ্গে দেখা করেছেন ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। স্থানীয়রা ব্রিটিশ ও জাপানি সেনাদের পছন্দ না-করলেও আইএনএ-র সৈন্যদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে, তাঁদের খাবার, এমনকী নগদ অর্থ দিয়েও পাশে দাঁড়িয়েছে। চূড়াচাঁদপুরের সাইকট গ্রামের মোড়লের (গ্রামবাসীদের ভাষায় রাজা) বাড়ি এসে স্বয়ং নেতাজি এই সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন, এমন তথ্যও পাওয়া যায়।

ইম্ফল-যুদ্ধে জাপ বাহিনীর সবচেয়ে দুর্বল জায়গা ছিল বিমানবাহিনীর অভাব। ফলে যুদ্ধ শুরু করার একমাসের মধ্যেই তাঁদের রসদ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। এছাড়াও ছিল পরিকল্পনার নানা ত্রুটি, যা তাঁদের পরাজয়কে অনিবার্য করে তোলে। স্বভাবতই আজাদ হিন্দ বাহিনীকেও এর ভাগ নিতে হয়েছিল। ১ মে জাপানিদের সমস্ত আক্রমণ থেমে গিয়েছিল। পাহাড়ি বর্ষার সঙ্গে সৈন্যদের ওপর থাবা বসিয়েছিল ম্যালেরিয়া ও আমাশয়-সহ নানা রোগের আক্রমণ। জাপানি এবং ব্রিটিশ উভয়পক্ষ ব্যাপক হতাহতের শিকার হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত ৮ জুলাই আজাদ হিন্দ সদর-দফতর থেকে ইম্ফল রণাঙ্গণে এসে পৌঁছেছিল পশ্চাদপসরণের আদেশ। পায়ে হেঁটে অবর্ণনীয় নানা কষ্ট সহ্য করে হতাশ আজাদ সৈন্যদের এই রিট্রিটের একেবারে শেষ ধাপে নেতাজি এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন।

পরিসংখ্যান অনুসারে, ৮৫,০০০ সৈন্যের জাপানি পঞ্চদশ বাহিনী শেষ পর্যন্ত মৃত ও নিখোঁজ মিলিয়ে প্রায় ৫৩,০০০ সৈন্য হারায়। ইম্ফলে ব্রিটিশদের ১২,৫০০ জন হতাহত হয় এবং কোহিমার লড়াইয়ে তাঁদের আরও ৪,০০০ জন হতাহত হয়। নেতাজি তাঁর সৈন্যদের যেমনটা বলেছিলেন, ‘এই পথেই আমরা এগিয়ে যাব দিল্লির দিকে এবং ব্যর্থ হলে এই পথের ওপরেই শহিদের মৃত্যুবরণ করব’– সে-কথা এভাবেই সত্যি হয়েছিল।
মৃত সহযোদ্ধাদের দেহগুলিকে কোনও রকমে মাটিচাপা দিয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল এই বীরসৈন্যদের। বিষেণপুরের পাহাড়ে জঙ্গলে কয়েক বছর ছড়িয়ে ছিল দেহাবশেষ। ১৯৪৭ সালে মণিপুরের আজাদ হিন্দ সংঘের কিছু যুবক এসে সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছিল আজাদ-সেনাদের সেই দেহাবশেষ। একটি পাহাড়ের চূড়ায় একটি প্রস্তরখণ্ডের ওপর এই শহিদদের কাহিনি লিখে স্থাপিত হয়েছিল বিজয়স্তম্ভ। শহিদ সেনানিদের সেই অস্থিচিহ্ন এখন আর পাওয়া না-গেলেও, দেখতে পাওয়া যাবে সেই বিজয়স্তম্ভ। বীরের এই রক্তস্রোত ও আত্মবলিদানের কাহিনিই এক বছরের মধ্যে ভারতে সৃষ্টি করেছিল এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের, যা ব্রিটিশকে বুঝিয়ে দেয়, ভারত ছাড়ার সময় হয়ে গিয়েছে।
বিষেণপুর জেলা ও মৈরাং অঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে আজও নানাভাবে বেঁচে রয়েছে নেতাজির সৈন্যদলের সেই অবিস্মরণীয় সংগ্রামের নানা স্মৃতি। বাইরের লোকেরা সেখানে গেলে তারা হয়তো দেখিয়ে দেবে, কোন পাহাড়ের গায়ে ছিল আইএনএ সৈন্যদের ছাউনি কিংবা কোন গাছতলায় বসে জ্যোৎস্না-রাতে নেতাজি কথাবার্তা বলেছিলেন তাঁর সৈন্য ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে। অবশ্য এই স্থানীয়দের দাবিই যে প্রামাণ্য– এমন কথা বলা যায় না। উদাহরণস্বরূপ এক গ্রাম্য-মোড়ল বলেছেন, নেতাজি যখন তাঁর বাড়ি এসেছিলেন, তখন নাকি তাঁর কোমরে ছিল একটি রিভলবার ও একটি তলোয়ার। আবার নিজেকে ‘আইএনএ প্রাক্তনী’ বলে উল্লেখ করে উখরুলের শিশাক নামে এক ব্যক্তি দাবি করে যে, মইরাংয়ে যে-পতাকাটি কর্নেল মালিক উত্তোলন করেছিলেন, সেটি তাঁর সংগ্রহে রয়েছে।
বিভিন্ন যুদ্ধসামগ্রী ও স্মারক দিয়ে এই ব্যক্তি তাঁর বাড়িতে এক সংগ্রহশালা তৈরি করেছেন। সেখানে যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের সেই এই পতাকাটি তিনি দেখিয়েছেন। এটি আসলে তেরঙা জমিনের ওপর কাঁচা হাতে আঁকা একটি বাঘের ছবি। তার এই বিতর্কিত দাবি যাচাই না-করেই নানা সংবাদমাধ্যমের কলমলেখকরা বিভিন্ন পোর্টালে এটিই মইরাংয়ে উত্তোলিত সেই আজাদ হিন্দ পতাকা বলে প্রচার করে চলেছেন! কিন্তু জওহরলাল নেহেরুর পত্রসংগ্রহে সংকলিত ১৯৪৬ সালের ২ এপ্রিল কন্যা ইন্দিরাকে লেখা একটি চিঠি থেকে জানা যায় যে, সে-বছর মালয় সফরের সময় তিনি সেখান থেকে কোহিমায় প্রোথিত আইএনএ-র পতাকাটি নিয়ে এসেছিলেন।
এ-থেকে মনে হয় সেটিই মইরাংয়ের সেই পতাকা, যা উখরুলের ওই ব্যক্তির হেফাজতে কোনও ভাবেই থাকার কথা নয়। এদিক থেকেও শিশাকের প্রদর্শিত পতাকাটি ভুয়ো বলেই মনে হয়।

বিস্ময়ের কথা, সোশাল মিডিয়ায় কোনও সূত্রের উল্লেখ ছাড়াই লেখা হয়েছে যে, মইরাংয়ে যে-পতাকাটি উত্তোলিত হয়েছিল, সেটিতে নাকি ঝাঁপিয়ে পড়া বাঘের (Springing Tiger) নকশা ছিল! (যদিও শিশাকের সংরক্ষিত পতাকাটি ঝাঁপিয়ে পড়া বাঘের নয়, বসে থাকা কোনও একটি চতুষ্পদ প্রাণীর) তবে, লাফিয়ে পড়া বাঘের পতাকাটি শুধুমাত্র জার্মানিতেই ইন্ডিয়ান লিজিয়নের পতাকা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পূর্ব এশিয়ায় নেতাজির আগমনের সময় থেকেই আইআইএল ও আজাদ হিন্দ সরকারের সমস্ত অনুষ্ঠানে যে চরকা আঁকা তেরঙা পতাকা ব্যবহৃত হয়েছিল, সেটিই যে আইএনএ-র একমাত্র পতাকা ছিল, এতে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই!
আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণার অনুষ্ঠানে, আন্দামানে পতাকা উত্তোলন বা আইএনএ-র যুদ্ধযাত্রার অগণিত ছবিতে এই চরকা-আঁকা পতাকাটি পরিষ্কার দেখা যায়। অপরপক্ষে পূর্ব এশিয়ায় আজাদ হিন্দ আন্দোলনের কোনও ছবিতেই জার্মানি-পর্বের ব্যাঘ্রকেতনটি দেখা যায় না। তা সত্ত্বেও ভারতের মাটিতে উত্তোলিত প্রথম জাতীয় পতাকা সম্পর্কে যে ভালোরকম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় মইরাং, কলকাতা প্রভৃতি বিভিন্ন স্থানে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল পতাকা উত্তোলনের বার্ষিকী উপলক্ষে যে-অনুষ্ঠানগুলি হয়ে থাকে, তাতে বিভিন্ন সরকারি ও রাজনৈতিক পদাধিকারী ব্যক্তির উপস্থিতিতে নানা ধরনের বাঘমার্কা ভুল পতাকা টাঙানোর মধ্যে দিয়ে। দুর্ভাগ্যবশত, এই ইতিহাসবিরুদ্ধ ব্যাপারটি নিয়ে কেউ কখনও প্রশ্নও তোলেননি! আরও একটি আশ্চর্য ব্যাপার, মইরাংয়ে আজাদ হিন্দ সদর-দফতরের পুরনো বাড়িটিতে এখন যে নতুন সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে, তারও দু’পাশে দু’টি বাঘছাপ রয়েছে জার্মানির পতাকাটির অনুকরণে!
সবশেষে মইরাংয়ের আইএনএ স্মারক ভবনটির সম্পর্কে দু’-চার কথাও বলতে হয়।
স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী নেহরুর ইচ্ছেতে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনানিদের স্মৃতিরক্ষার উদ্দেশে মইরাংয়ে একটি স্মারক ভবনের ভিত্তিস্থাপন করা হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। ১৯৬৮ সালে এই স্মৃতিভবনে যুক্ত হয় নানা ছবি, দলিল ও বইপত্রে সমৃদ্ধ নেতাজি লাইব্রেরি। এ-বছরেই ১৯৪৪ সালে পতাকা উত্তোলনের স্থানটিতে ঐতিহ্যসম্মত মণিপুরী শৈলীতে পাথরের একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। এছাড়া এখানে রয়েছে কোহিমা যুদ্ধ ও আজাদ হিন্দ ফৌজের স্মৃতিবিজড়িত সামগ্রীতে সাজানো ‘আইএনএ সংগ্রহশালা’।

১৯৪৫ সালে সিঙ্গাপুরে নেতাজি আজাদ হিন্দ ফৌজের শহিদদের স্মরণে যে স্মৃতিস্তম্ভটি তৈরি করিয়েছিলেন (এবং কয়েকমাস পরেই ব্রিটিশ বাহিনী সিঙ্গাপুর দখল করার পর যেটিকে গুঁড়িয়ে দেয়), ১৯৬৯ সালে এখানে তারই একটি প্রতিরূপের উদ্বোধন করেন ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া নেতাজির একটি পূর্ণাবয়ব ব্রোঞ্জ প্রতিমূর্তি এই ভবনের প্রাঙ্গণে বসানো হয়েছিল। বর্তমানে ভবনটি মণিপুর রাজ্য সরকারের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে।

প্রতি বছর মইরাংয়ে নেতাজির জন্মদিন, আজাদ হিন্দ প্রতিষ্ঠাদিবস ও পতাকা উত্তোলন দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। এগুলি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই গৌরবময় ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার কথা। এ-ব্যাপারটিও আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় না যে, এই এপ্রিল মাসের বিভিন্ন তারিখে জার্মানি, ভারত মহাসাগর ও পূর্ব ভারতের রণাঙ্গণে বিভিন্ন বছরে ঘটেছিল নেতাজির বর্ণময় জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ঘটনা।
তথ্যসূত্র
ব্রাদার্স এগেনস্ট দ্য রাজ, লেনার্ড গর্ডন
আশা সান কী সুভাষ ডায়েরি, ভারতী চৌধুরী
কেউ ভোলে না কেউ ভোলে, কৃষ্ণা বসু
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved