Dharani Ghosh: A Rebel Voice in Theatre Criticism। Robbar
Robbar
  • ১৬ কার্তিক ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ৩ নভেম্বর ২০২৬

নাট্য সমালোচনার ‘স্টোনম্যান’

ধরণী ঘোষ ছিলেন ‘দ্য স্টেটসম্যান’ সংবাদপত্রের ড্রামা-ক্রিটিক। তাঁর গায়ে একবার ‘ক্ষ্যাপাটে’ ও ‘প্যাঁচালো’– এই দুটি বিশেষণ দেগে দিয়েছিলেন বিভাস চক্রবর্তী। তাঁকে নিয়ে বিষোদগার করে উৎপল দত্ত লিখেছিলেন– ‘কলকাতার নাটক বাঁচল কি মরল কি জখম হল তাতে ওঁর কিছু এসে যায় না।’ বাগপটু বিভাসের দেওয়া অভিধাতে তিনি– ‘স্টেটসম্যানের স্টোনম্যান’! শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত থেকে শুরু করে বিভাস, অসিত, দ্বিজেন– কেউ তাঁকে পছন্দ করতেন না, তাঁকে জর্জর করতে কসুর করতেন না। অথচ নাট্য-সমালোচক ধরণীকে দমানো যেত না। তাঁকে এড়ানোও যেত না।

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ১৯:৫৫   
Facebook WhatsApp Messenger

সব ছাঁকনি চোখে দেখা যায় না, ইশারায় বয়ান হয়। যেমন ধরুন, সব জায়গায় সবার ঢুকতে নেই। সেকেলে কলকাতাতে এমন দস্তুর অনেক ছিল। এখনও কিছু কিছু আছে। মিডনাইটস চিলড্রেন যাঁরা, তাঁরা আসছে বছর আশিতে পা দেবেন। কিন্তু ধুতি-পাঞ্জাবি তো কোন ছাড়, জিন্সের ওপর লম্বা ঝুলের কুর্তা পরে টলি ক্লাবে খেতে যান, উর্দি-পরা দরোয়ান আপনাকে ড্রেস কোড বাতলে বেরনোর পথ দেখিয়ে দেবে!

পার্কস্ট্রিটের নাইট ক্লাবে ঢুকতে দিয়ে বাউন্সারের বাইসেপ্সের দিকে স-সমীহ নজর পড়েনি, এমন ফুর্তিবাজ মিলবে না। কিন্তু টিকিট কেটে ‘একাডেমি অফ ফাইন আর্টস’-এর মতো পাবলিক থিয়েটারে ঢুকতে কোনও প্রাপ্তবয়স্কের সমস্যা হয়েছে কোনওদিন?

হয়েছিল একবারই। দুই নাট্য সমালোচককে আটকাতে!

আজ থেকে ঠিক ৪৬ বছর আগে, ১৯৮০-র অক্টোবর-নভেম্বর মাসে, কলকাতার ‘টক অফ দ্য টাউন’ ছিল ‘গ্যালিলেওর জীবন’। বের্টল্ট ব্রেশ্ট্-এর নাটকের বাংলা রূপান্তর একাডেমিতে হবে, নামজাদা জার্মান নাট্যকার ফ্রিৎজ বেনেভিৎজের নির্দেশনায়।

zoom
ফ্রিৎজ বেনেভিৎজ

ফ্রিৎজকে খাতির করে নিয়ে এসেছেন কলকাতার ছ’টি নাটকের দল– ‘নান্দীকার’, ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’, ‘চার্বাক’, ‘চেতনা’, ‘থিয়েটার কমিউন’, ‘শূদ্রক’– যাদের গায়ে গ্রুপ থিয়েটারের মোহর সেঁটে আছে। কলকাতা নাট্যকেন্দ্র নামে এক সমবায় গড়ে উৎকর্ষের সাধনায় রত হয়েছে তারা।

এহ বাহ্য! জবর খবর হচ্ছে, রেনেসাঁসের পুরোধাপ্রতিম ওই ইতালীয় জ্যোতির্বিদের ভূমিকায় স্বেচ্ছাবসর ভেঙে মঞ্চে নেমে আসছেন শম্ভু মিত্র! মূলত তাঁরই নামমাহাত্ম্যে ঝড়ের বেগে উড়ে গিয়েছে ‘গ্যালিলেওর জীবন’-এর টিকিট। রিহার্সাল শুরু হওয়ার ঠিক আগে, ২৫ সেপ্টেম্বরের রাতে ফ্রিৎজ বেনেভিৎজের ডায়েরি এন্ট্রিতে লেখা থাকছে, প্রথম ৫০টা শো-র ৫০ হাজার টিকিট একদিনে উড়ে গিয়েছে! হাউসফুল!

zoom
শম্ভু মিত্র। ঋণ: পঞ্চম বৈদিক

এই পরিসংখ্যানে কিছু গরমিল আছে। মনে হয়, ফ্রিৎজের বুঝতে উনিশ-বিশ কিছু গলতি হয়ে থাকবে। কিন্তু ফ্রিৎজ যা জানতেন না, তা জানা ছিল টিকিট যাঁরা কেটেছিলেন তাঁদের। কারণ, টিকিটের নিচে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের মতো ছাপা হয়েছিল– ‘প্রবেশানুমতি নাট্যকেন্দ্র দ্বারা সংরক্ষিত।’

১৮৭২-র নভেম্বরে ঔপনিবেশিক কলকাতায় সাধারণ রঙ্গালয়ের পালা পড়েছে, চার-পাঁচটি প্রজন্ম কখনও আমোদের টানে, কখনও ভাবনার খোরাক পেতে থিয়েটারের দোরে পা ফেলেছে। কস্মিনকালে শোনা যায়নি, কে ঢুকতে পারবে, আর কে পারবে না– তাই নিয়ে বাছবিচার চলছে!

সেবারে চলেছিল। তাতে বাংলা থিয়েটারের বেশির ভাগ কেষ্টুবিষ্টুর সায় ছিল। যে দু’জনকে আটকাতে তাঁরা কোমর বেঁধেছিলেন, তাঁরা সামাজিক পরিচয়ে ফাটাকেষ্ট প্রজাতির কেউ ছিলেন না। ছিলেন নাট্য সমালোচক। তাঁদের একজন আজ এই ৮৬ বছরেও কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সম্মাননীয় ব্যক্তিত্ব, নাম শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়।

অপরজন ৫৩ বছর পেরতে না পেরতেই গত হয়েছিলেন, ১৯৯৭-র ১৩ জুন। তাঁর গায়ে একবার ‘ক্ষ্যাপাটে’ ও ‘প্যাঁচালো’– এই দুটি বিশেষণ দেগে দিয়েছিলেন বিভাস চক্রবর্তী। তাঁকে নিয়ে বিষোদগার করে উৎপল দত্ত লিখেছিলেন– ‘কলকাতার নাটক বাঁচল কি মরল কি জখম হল তাতে ওঁর কিছু এসে যায় না।’ ইনি ‘দ্য স্টেটসম্যান’ খবরের কাগজের ড্রামা-ক্রিটিক ছিলেন। নাম ধরণী ঘোষ। বাগপটু বিভাসের দেওয়া অভিধাতে– ‘স্টেটসম্যানের স্টোনম্যান’!

zoom
নাট্য সমালোচক ধরণী ঘোষের মৃত্যু সংবাদ

টিকাটিপ্পনি দিতে মন চাইছে না, শুধু দু’টি ফুট কাটতে ইচ্ছে করছে। আজকের কলকাতায় ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর কদর যতটা, কাগজের পাতায় বেরনো নাট্য সমালোচনার কদর তার চেয়েও কম। ড্রামা-ক্রিটিকের যে প্রভাব-প্রতিপত্তি ইংল্যান্ড-আমেরিকায় আজও আছে, তুলনায় ছিটেফোঁটা হলেও ১০০ বছর আগেকার কলকাতায় কিছু ছিল। এখন নেই। কার্টেন কলে এসে আজকালকার নাট্য-প্রযোজক তথা নির্দেশক তথা দলপ্রধান সাধারণত বলেন, ‘যদি ভালো লাগে আর পাঁচজনকে বলবেন, সোশাল মিডিয়াতে লিখবেন।’ ভুল করেও নাট্য সমালোচকের অনুগ্রহ যাচনা করেন না তাঁরা।

তবু বিধি মাত্রেই ব্যতিক্রম থাকে। ধরণীর পথে পথে ধূলি হয়ে রয়ে যাওয়ার বাসনা কারওর কারওর থেকেই যায়। ধরণী ঘোষেরও বুঝি ছিল। বিধি এমনই বাতলেছিলেন। ব্যতিক্রম ঘটল, যখন নাটকের দল ‘গণকৃষ্টি’ কী করে ধরণী ঘোষের নামে একটি স্মারক সম্মান প্রবর্তন করল। তাঁর প্রয়াণের ক’বছর পর থেকেই এই সম্মান দেওয়া শুরু হয়। কিঞ্চিৎ অনিয়মিতভাবে, কারণ অত বরণীয় নাট্য সমালোচক এ তল্লাটে কোথায়! এখন এই সোশাল মিডিয়ার বানের তোড়ের সামনে এই কাজ, ‘খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজা’র মতো!

তবু গুণবন্ত খুঁজে পেয়েছে ‘গণকৃষ্টি’। পবিত্র সরকার, নৃপেন্দ্র সাহা, সুব্রত ঘোষ, আনন্দ লাল প্রমুখ কৃতবিদ্য নাট্য-সমালোচক এই সম্মান পেয়েছেন। গেল বছর এটি গিয়েছে শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে।

বস্তুত, সম্মাননার এই আচমকা মরশুম না-এলে হয়তো ধরণী ঘোষকে বিশেষ কেউ মনে রাখতেন না! সেকালের ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর পাতায় তাঁর রিভিউ যাঁরা পড়তেন, পড়ে থিয়েটারে যেতেন বা যেতেন না, তাঁরা হয় ভবলীলা সাঙ্গ করেছেন, নয় জীবন্ত জীবাশ্মর দলে নাম লিখিয়েছেন! ধরণীর জীবৎকালে তাঁর লেখাপত্তর নিয়ে কোনও বই বেরয়নি। ২৯ বছর কাটল। আজও বেরয়নি। এবং কুদরতের কী আজব কেরামতি, যাঁর লেখায় জলজ্যান্ত ১৯৬৯ থেকে ১৯৯৭, অর্থাৎ ২৭ বছরের কলকাতা তথা ভারতীয় থিয়েটারের ছবি, তাঁর একটা ছবি খুঁজে পেতে কালঘাম ছুটে যাচ্ছে ‘গণকৃষ্টি’র উদ্যমী কর্তাব্যক্তিদের!

কতক বিবেকের তাড়নায়, ওঁর পুরনো রিভিউ নতুন করে পড়তে, নিজের মহাফেজখানায় তালাশ করে ধরণী ঘোষের বাইলাইন-দেওয়া ডজন-খানেক পেপার কাটিং পেলাম। মূলত ১৯৯০-র দশকের। তবু ভরিল না চিত্ত। আরও নিবিড়ভাবে ওঁকে জানতে ছুটে গেলাম, আমাদের শেষ পারানির কড়ি– ‘নাট্য শোধ’ সংস্থানে। গিয়ে দেখি, ওঁর নামে একটি ফাইল আছে– ‘৩১৭এ’। দেখে তো আহ্লাদে আটখানা হওয়ার জোগাড়! তাতে ওঁর আরও কিছু রিভিউয়ের কাটিং ছাড়াও আছে– ওঁর তিনটি ইন্টারভিউয়ের কাটিং, যার একটি ‘নাট্য শোধ’-এর সাবেক আস্তানা– লি রোডে নেওয়া, ১৯৮৪-র পয়লা ডিসেম্বরে, প্রতিভা অগ্রবাল ও শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় সহযোগে। আর ‘নাট্য শোধ’-এর দেওয়া একটি ফর্ম ওঁর নিজের হাতে ভরাট করা। তার থেকে মালুম হচ্ছে, ওঁর জন্মের তারিখ ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ. করেছেন। লিখেছেন একমাত্র ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ। বিদেশ সফর বলতে একটিই– ১৯৮১-তে ব্রেশট-কে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক আলোচনাসভায় বলতে গিয়েছিলেন হংকং-এ। আর? ‘My hobby is reading. Interests other than theatre include crime fiction, cricket and films, in that order.’ এর বাইরে আর প্রায় কিছু ফলাও করে লিখে রাখার দরকার মনে করেননি ধরণী।

zoom
‘নান্দীকার’-এর নাটক ‘গোত্রহীন’-এর সমালোচনায় ধরণী ঘোষ

প্রকৃত প্রস্তাবে, পড়ুয়া হিসেবে নামডাক ছিল পটলডাঙা-জাতক ধরণী ঘোষের। নাকের ডগায় পুরু ফ্রেমের চশমা লাগিয়ে ওঁকে পেল্লায় সব ইংরেজি বইয়ের পাতা ওলটাতে দেখেছেন কেউ কেউ। এই সূত্রে কলকাতার থিয়েটারের কারওর কারওর সঙ্গে বই লেনদেনের পাকা ‘রিশতা’ ছিল সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের এই প্রাক্তনীর। বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে আছে, চৌরঙ্গি স্কোয়ারের আলিশান ‘স্টেটসম্যান হাউস’-এর বাঁকানো সিঁড়ি দোতলায় উঠে বাঁ-দিকে নেমপ্লেট-লাগানো ঘরে ঢুকে সাদা ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত ধরণীর হাতে অশোক মুখোপাধ্যায়ের পাঠানো কোনও বই তুলে দেওয়ার রোমাঞ্চ। এমন নাটকীয় স্মৃতি আরও কারওর কারওর আছে। সত্তরোর্ধ্ব দেবাশিস মজুমদারের মনে পড়ে, এলাহি সুইং ডোর পেরিয়ে ক্রমান্বয়ে অবাক পৃথিবীর চাবি ঘুরিয়ে শেষমেশ ধরণীর সামনে গিয়ে দু’-চার কথা বলার স্মৃতি। পরের প্রজন্মের ব্রাত্য বসু একদা ওঁর দফতরে যাতায়াত করেছিলেন। নাটকীয় বিষয়ে নানা রকমের কৌতূহলের নিরসন করেছিলেন। সেসব নিয়ে লিখেছেনও ব্রাত্য।

নামী কলামনিস্ট রুচির যোশি ১৯৮০-র দশকের কলকাতায় শ্যামানন্দ জালানের কাছে নাড়া বেঁধে নাটক শিখতে চেয়েছিলেন। রুচিরের বাবা শিবকুমার, এককালে এই কলকাতাতেই গুজরাতিতে হিন্দি-নাটক করতেন। কলকাতায় গুজরাতি পাঞ্জাবি উর্দু, এমনকী তামিল থিয়েটারের উপযোগী একটি বাস্তুতন্ত্র এককালে ছিল, এসব আজকের দিনে আষাঢ়ে গপ্পো শোনাবে। কিন্তু এসব নাট্যক্রিয়ার রিভিউ বেরত ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ।

ইতিউতি খুঁজেপেতে নয়া নাটুয়া বের করতেন ধরণী। ওদিকে ভয়ার্ত হৃদয়ে কাগজের পাতা ওলটাতেন নাটুয়ার দল। অধিকাংশ শুকনো মুখে শেষমেশ হাসি ফুটত না, হাতেগোনা সৌভাগ্যবান সহসা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়তেন। রুচির লিখেছেন, ‘The famously erudite and acerbic Mr Ghosh patrolled what was still one of the most lively and varied theatre scenes in the country: you had the serious amateur English drama; you had the Hindi theatre groups; you had the small Gujarati and Tamil troupes; and, lording over all this, you had the vibrant Bangla natok in all its variety, with Calcutta in its last years as the cutting-edge city of Indian theatre.’

zoom
ধরণী ঘোষের কলমে ‘দায়বদ্ধ’ নাটকের সমালোচনা

এর বাইরে ধরণী সম্পর্কে যা রয়ে গিয়েছে, তার একদিকে তীব্র বিরাগ, অন্যদিকে নাতিশীতোষ্ণ সমীহ। আর কিছু লবেজান কিসসা কাহিনি। এর একটি মনে পড়ে যাচ্ছে।

‘পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি’ তৈরি হওয়ার পর শেক্সপিয়রের ‘আ মিডসামার নাইটস ড্রিম’-এর একটি বঙ্গীকরণ মঞ্চস্থ হয় উৎপল দত্ত-র নির্দেশনায়, ‘চৈতালী রাতের স্বপ্ন’ নিয়ে। ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর পাতায় এটির তুলো ধুনে দিয়েছিলেন ধরণী! সরকারি পয়সার আদ্যশ্রাদ্ধ নিয়ে খোঁটা দেওয়া ছাড়াও চরিত্রায়ণ ও অভিনয়ের খুঁটিনাটি নিয়ে কটুকাটব্য ছিল।

যেদিন লেখাটি বেরিয়েছে, সেদিন সন্ধ্যায় ‘চৈতালী রাতের স্বপ্ন’-র শো, রবীন্দ্র সদনে। উৎপল না কি তাঁর সহকারী সুমন মুখোপাধ্যায়কে জরুরি তাগাদা দিয়ে সব কলাকুশলীকে সাজঘরে জমায়েত হতে বলেছিলেন। বাকিটা সুমনের ভাষ্যে পড়ুন–

“সবাই বেশ বিস্মিত, উদ্বিগ্ন, কৌতূহলী। উৎপলবাবু তখন বাঘের মতো পায়চারি করছেন। সবাই এসে গেছে জানানোর পর পাঞ্জাবির হাতা গুটোতে গুটোতে বললেন– কমরেডস চলুন, ধর্মতলা যাব। সবাই তখন ধরাচুড়ো পরে ফেলেছেন, মুখে রং মেখে ফেলেছেন। সবার অভিব্যক্তিতে অবাক প্রশ্ন– হঠাৎ ধর্মতলা কেন? উৎপলবাবু হাতা গুটিয়েই চলেছেন– চলুন স্টেটসম্যান অফিসে যাব, ধরণীকে মারতে। সেইদিন সকালে ধরণীবাবুর একটা কঠোর এবং নৃশংস সমালোচনা বেরিয়েছিল ‘চৈতালী রাতের স্বপ্ন’ নাট্যের।”

কারা, কীভাবে মারমুখি উৎপল ও তাঁর কিংকর্তব্যবিমূঢ় কমরেডদের নিবৃত্ত করেছিলেন, জানি না, তবে চৌরঙ্গির রাস্তা ধরে ওবেরন, হার্মিয়া, পাক, পিটার কুইন্সের দল মুঠো পাকিয়ে স্লোগান দিতে দিতে ডোরিয়া ক্রসিং-এর দিকে এগিয়ে চলেছে, তাঁদের নিশানায় ধুতি-পাঞ্জাবি-পরা মোটা কাচের মধ্য দিয়ে চোখ মেলে সাব-এডিটরের কাজে মনোনিবেশ করতে বসা এক বাঙালি ভদ্রসন্তান– এই দৃশ্য এপিফ্যানির মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমার। মনে হয়, একাডেমির গেটের সেই অলৌকিক দৌবারিক আর চৌরঙ্গির এক অলীক শোভাযাত্রা– এরাই এ-দেশের নাট্য সমালোচকদের চরম স্বীকৃতি।

সেই সঙ্গে ঈর্ষা হয় ধরণীকে। প্রায় একার উদ্যোগে ১৯৬৯ থেকে ১৯৯৭ অবধি ‘কলোনিয়াল হ্যাংওভার’-এ ক্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে বাংলা তথা কলকাতার থিয়েটারের সঙ্গে জুড়েছিলেন বলে তাঁকে শ্রদ্ধার্হ মনে করি। নিয়মিত নাট্য-সমালোচনাকে জরুরি করে তুলেছিলেন বলে তাঁকে পুরোধা বলে মানি। শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত থেকে শুরু করে বিভাস, অসিত, দ্বিজেন– কেউ তাঁকে পছন্দ করতেন না, তাঁকে জর্জর করতে কসুর করতেন না।

তাঁকে মাটিতে পেড়ে ফেলতে ‘কৃষ্টি সংসদ’ (সোনারপুর) প্রকাশিত ‘থিয়েটার বার্তা’-র একটি বিশেষ সংখ্যায় উৎপল থেকে দ্বিজেন– যা বলেছেন, তাতে নেহাত ডাকাবুকো না-হলে কলমের ডগায় কালি শুকিয়ে যেত। অথচ ধরণী ঘোষকে দমানো যেত না। তাঁকে এড়ানোও যেত না। তাঁর বাইলাইন দেখে কারওর মনে শিহরন জাগত, কারওর আতঙ্ক।

অশোক মিত্র একবার এক বিক্ষোভ-সভায় বলেছিলেন, ‘ঘৃণার চেয়ে পবিত্র আবেগ আর হয় না।’ বারো আনা বাঙালি নাটুয়ার ঘৃণার পাত্র হয়েও আপসে বিরত ধরণীর এই উন্নতশির অস্মিতা– একে ঈর্ষা করবেন যে কোনও সমালোচক।

এমন অস্মিতা যেন ফিরে পায় তাঁর উত্তরোত্তর প্রজন্ম।

৪২ বছর আগে বন্ধু শমীকের সঙ্গে প্রাগুক্ত সংলাপে আক্ষেপের সুরে ধরণী বলেছিলেন–

‘বাংলা থিয়েটারের সবচেয়ে বড় দোষ কী জানেন? পৃথিবীর সমস্ত নাট্য সাহিত্যে, যেমন ধরুন ইংরেজি নাট্য সাহিত্যে লন্ডনের একটা ভূমিকা আছে, ফ্রেঞ্চ নাট্য সাহিত্যে প্যারিসের একটা ভূমিকা আছে, রাশিয়ান লিটারেচারে ড্রামাতে মস্কোর একটা ভূমিকা আছে, বার্লিনের তো আছেই জানি আমরা, বাংলা থিয়েটারে নেই। কলকাতা নিয়ে কোনও নাটক লেখা হয়নি। আমি যা দেখছি, যে রিয়ালিটি পাশে দেখছি, তাকে নিয়ে লিখি না। যাকে জীবনে দেখিনি তাই নিয়ে লিখব। এ কি চলতে পারে?’

ওই জিজ্ঞাসাচিহ্ন আজও ঝুলে আছে বাংলা থিয়েটারের আকাশে। উত্তর মেলেনি। ধরণীর পথে পথে চলাই বুঝি সারসত্য হল।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন অংশুমান ভৌমিক-এর অন্যান্য লেখা

……………………

A Midsummer Night's Dream bengali theatre Bertolt Brecht Dharani Ghosh Drama Drama Critic Fritz Bennewitz Life of Galileo Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shambhu Mitra Theatre Utpal Dutta William Shakespeare

Share this article on