how asha bhosle created his own genre in golden era | Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

কিছু আশা রয়ে গেল

যখনই কোনও শিল্পীর কাজের পরিসর বাড়ে, তখন তাঁর পক্ষে যেমন সুবিধের হয়, শ্রোতা-দর্শকের পক্ষেও তাঁকে নানাভাবে মনে রাখার সুযোগ তৈরি হয়। এই যে আমাদের প্রিয় জুটির একটা গুলজার-রাহুল দেব বর্মন-আশা। বিখ্যাত ‘ইজাজত’ ছবি, ততোধিক বিখ্যাত ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়’ গানটা গুলজার নিয়ে এলে, রাহুল দেব বর্মন না কি বলেন– ‘এবার কি টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় সুর করতে বলবে!’

Published by: Robbar Digital

Posted:April 17, 2026 6:02 pm | Updated:April 17, 2026 6:02 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

একজন সার্থক জনপ্রিয় সেলিব্রিটি খ্যাতি আর আয়ুর সবটা উপভোগ করার পর চলে গেলে কাউকে সেভাবে দোষ দেওয়ার থাকে না। আক্ষেপোক্তির ‘ক্রাচ’-এ (যাকে হিন্দিতে বলে বৈশাখী) বিশেষত ভর দেওয়ার কিছু থাকে না। তাহলে কী থাকে? থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার…

zoom
আশা ভোঁসলে

আশা ভোঁসলে মারা যাওয়ার পর তেমন কিছু গান ভিড় করে আসছে, যেমন আসে প্রায়ই, উপলক্ষবিহীন। আজকে সেগুলোর অবলম্বন রয়েছে। আশার নাম করলেই, প্রথম কোন নায়িকার মুখ ভেসে আসে? ভাবতে গিয়ে দেখলাম, অনেকেরই মুখ মনে পড়ে। এটা যেমন এক অর্থে আনন্দের, অন্যভাবে দেখলে দুঃখেরও। মহম্মদ রফি যে-অর্থে শাম্মি কাপুরের সঙ্গে সমার্থক; মীনা কুমারী, নার্গিস যেভাবে লতার সঙ্গে সমার্থক– আশা সেভাবে কারওরই গলা হয়ে ওঠেননি। অথচ লতা-আশাই একটা গোটা সময় ধরে ‘আশালতা’ হিসাবে বেড়ে উঠেছেন ইন্ডাস্ট্রিতে। এরই মধ্যে একটা সুখের বিষয় যে, আশা তাঁর বেড়ে ওঠার সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নূরজাহান, গীতা দত্ত, শামশাদ বেগম এবং সব থেকে জরুরি নিজের সহোদরাকে পাচ্ছেন। এঁরা এমন সব প্রতিদ্বন্দ্বী যে, কিছু-না-কিছু প্রতিদিনই শেখা যায়। এরই মধ্যে আশা এবং ও পি নাইয়ার জুটিটা যে হিন্দি সিনেমা দেখল, এটা চোখে পড়ার মতো বদল। ‘মাঙ্গকে সাথ তুমহারা ম্যায়নে মাং লিয়া সংসার’– শুনতে শুনতে মনে হল, এ গানটার সুর করার যদি দায়িত্ব যদি শঙ্কর-জয়কিষন বা মদনমোহন পেতেন, সম্ভবত এ গানটা সবার আগে খুব সঙ্গত কারণেই লতা মঙ্গেশকরের কাছে যেত। শঙ্কর-জয়কিষন না কি বলেছিলেন, লতার হাঁচি হলে গোটা ইন্ডাস্ট্রির সর্দি লেগে যায়। কথাটা খুব সিরিয়াসলি নিলে, একজন শিল্পী সম্পর্কে একটা গোটা শিল্প-কারখানার মনোভঙ্গি বোঝা যায়। এ বিড়ম্বনারও বটে, নৌশাদ আশাকে গাইতে ডাকছেন লতার অসুস্থতার বিকল্প হিসেবে। মদনমোহন এমন সুর আশাকে দিয়ে গাইয়েছেন যেগুলো লতার পছন্দ হয়নি। এর মধ্যে থেকে একজন শিল্পী নিজের জায়গা করে নিলেন দাপটে– এ-ও কি কম ব্যাপার? ও পি নাইয়ার বলতেই প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মতো মনে পড়ে ‘কাশ্মীর কি কলি’। আশা ভোঁসলের গলার যে রেঞ্জ ওই জায়গাটায় দেখা যায়– একটা গাড়ি করে শাম্মি কাপুর আসছেন, শর্মিলা ঠাকুর একটা বাগানে– আশার গলায় একটা হামিং আছে। অসামান্য!

ও পি নাইয়ারের এটা একটা কৃতিত্ব যে, লতা মঙ্গেশকরের সামান্য অবদান ছাড়াও ওঁর জীবনে খ্যাতির কোথাও ঘাটতি হয়নি। যে সময়ের কথা এখন উঠে আসছে, সেই সময়ে লতা গাইছেন ‘তু জাঁহা জাঁহা চলেগা, মেরা সায়া সাথ হোগা’, একই সিনেমায় ‘ঝুমকা গিরা রে’ গাইছেন আশা। ‘বন্দিনী’-তে লতা গাইছেন ‘মোরা গোরা অঙ্গ লইলে’, আশা গাইছেন ‘অব কে বরস ভেজ ভাইয়াকো, বাবুল’। প্রথম গানটা সম্পর্কে ভালোবাসা অক্ষুণ্ণ রেখেও দ্বিতীয় গানটায় পক্ষপাত রাখতে হচ্ছে। 

এই যে আশা ভোঁসলে চলে গেলেন– আশা, আশার সমসাময়িকেরা কোন মন্ত্রে এতদিন সফলভাবে এত কাজ করলেন, কোন গুণে এঁরা আজকেও সমান চর্চিত– তার সমাজতাত্ত্বিক জরিপ হওয়া প্রয়োজন। ‘চ্যয়ন সে হমকো কভি আপনে জিনে না দিয়া’ যে সময়ের গান, ঠিক সেই সময়ের গান ‘চুরালিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো’। রুচিভেদে ব্যক্তিগত পছন্দের রকমফের থাকতেই পারে, কিন্তু নিরপেক্ষভাবে দেখলে দেখা যায়, দুটো গানই সমান দক্ষতায় গাওয়া। ৫০ বছর বয়সে পৌঁছে একজন গাইছেন ‘রোজ রোজ আখো তলে’। 

zoom
লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলে

শাম্মি কাপুর না কি ‘তিসরি মঞ্জিল’ সিনেমার সময় বলেছিলেন, রফি যদি না গান, বদলে যদি আশা গান, তাঁর লিপ দিতে আপত্তি নেই। কথাটা আপাত শাম্মি কাপুরোচিত ইয়ার্কি ভেবে ফেলে দিয়েও, আরেকবার তুলে দেখতে ইচ্ছে হয়– ঠিক কোন জোরের বশবর্তী হয়ে শাম্মি কাপুর কথাটা বলেছিলেন। 

‘রাত আকেলি হ্যায়, বুঝ গ্যয়ে দিয়ে’ গানটা শুনলে বোঝা যায় একজন মানুষের গলার ওপর কীরকম দখল থাকলে, ওইরকম একটা গান গাওয়া সম্ভব। এই জুয়েল থিফ, সবকটা গান লতার।

zoom
‘রাত আকেলি হ্যায়, বুঝ গ্যয়ে দিয়ে’ গানের দৃশ্যায়ন

যখনই কোনও শিল্পীর কাজের পরিসর বাড়ে, তখন তাঁর পক্ষে যেমন সুবিধের হয়, শ্রোতা-দর্শকের পক্ষেও তাঁকে নানাভাবে মনে রাখার সুযোগ তৈরি হয়। এই যে আমাদের প্রিয় জুটির একটা গুলজার-রাহুল দেব বর্মন-আশা। বিখ্যাত ‘ইজাজত’ ছবি, ততোধিক বিখ্যাত ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়’ গানটা গুলজার নিয়ে এলে, রাহুল দেব বর্মন না কি বলেন– ‘এবার কি টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় সুর করতে বলবে!’ সত্যিই তো, গান যে অর্থে সিনেমায় ব্যবহার হয়– অন্ত্যমিল, ফুল পাখি চাঁদ তারা, প্রয়োজন হলে একটু জ্ঞানের কথা, যাকে সুকুমার রায় বলবেন, ‘মন-বসনের ময়লা ধুতে তত্ত্বকথাই সাবান’– এ সবের বালাই-ই নেই! একটা গান, ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়’, শক্তি চট্টোপাধ্যায় থাকলে উত্তর দিতেন, ‘লিখিও উহা ফিরত চাহো কি না’। অথচ গোটা গানটা শুনতে শুনতে, আমাদের একটিবারও গান লেখার উপাদানের একটারও অভাব বোধ হল না। গুলজার এই কাণ্ড নতুন করলেন না; রাহুল দেবও যে এরকম ফ্যাসাদে নতুন পড়েননি, সেটা ‘কিনারা’ সিনেমার ভূপেন্দ্র সিংয়ের গানটা শুনলেই বোঝা যায়। সামগ্রিকভাবে গোটা ইন্ডাস্ট্রিটায় এত ট্যালেন্ট ছিল যে হিমশিম খেতে হয়। এঁদের নিজেদের শিক্ষা তো ছিলই, পাশাপাশি জীবনের প্রথম দিকে সি রামচন্দ্র কিংবা শচীন দেব বর্মনদের পাল্লায় পড়েছেন– এঁদের বড় শিল্পী না হয়ে উপায় ছিল না। 

zoom
সি রামচন্দ্র

একটা ইপি রেকর্ড ছিল, তাতে– ‘আমি খাতার পাতায় চেয়েছিলাম’, ‘আমায় তুমি যে ভালোবেসেছ’, ‘মনের নাম মধুমতী’ গানগুলো ছিল। ‘যে গান তোমায় আমি শোনাতে চেয়েছি বারেবার’, মান্না দে’র সুর, সেটাও ছিল। এত দরদ দিয়ে গাওয়া গানটা– ‘আলো মোর বারে বারে ছায়ার কাছে যে মানে হার’, কে বলবে এই ভদ্রমহিলাই ফিসফিস করে ‘রাত আকেলি হ্যায়’ বলতে বলতে আচমকা বাঘের কামড়ের মতো ‘চুপ কিউ রহিয়ে’-তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। মাইকেল হোল্ডিং-কে ‘হুইসপারিং ডেথ’ বলা হত, আশাকেও বোধহয় এক্ষেত্রে তাই বলা উচিত। এই গানগুলোর বেশ কয়েক বছর পরে আসছে ‘লক্ষ্মীটি দোহাই তোমার আঁচল টেনে ধোরো না’, ‘ফিরে এসো অনুরাধা’ এই গানগুলো। অদ্ভুত সমাপতন এই যে, পাঁচের দশকের শেষদিকে বোধহয় আশা গাইছেন শচীন দেব বর্মনের সুরে, ‘ছোড় দো আঁচল জমানা ক্যায়া কহেগা’, সাতের দশকে রাহুল দেব বর্মনের সুরে গাইছেন ‘লক্ষ্মীটি দোহাই তোমার আঁচল টেনে ধোরো না’।

zoom
আশা ভোঁসলে ও রাহুল দেব বর্মন

বাংলায় সুধীন দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষ, বিনোদ চট্টোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে’র মতো সুরকারদের আশা পেয়েছেন, সেই পাঁচের দশকের শেষ থেকে। মান্না দে’র মতো সুরকার– আশাকে, সুমন কল্যাণপুরকে দিয়ে তুলনাহীন কিছু বাংলা গান গাইয়েছেন। একটা অদ্ভুত পরিবেশ– একদিকে সলিল-লতা, আরেকদিকে সুধীন-আশা– এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায়। আজকে অনেক দূর থেকে দেখলে বোঝা যায়, যতই এঁরা সাফল্যের শিখরে উঠুন, উঠতে সব্বারই দম বেরিয়ে গিয়েছে। সমাজের খোলনলচে আজকেও বদলায়নি, সে বহু শতাব্দীর মনীষীর কাজ। সমাজ আজকেও পিতৃতান্ত্রিক। কিন্তু মেয়েদের লড়াই-কে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিসরও তৈরি। লতা মঙ্গেশকর ৬০ টাকা মাসমাইনেয় অভিনয় করতে এসেছিলেন, আশাও টাকার তাগিদেই গান গাইতে আসেন– ভালোবাসা বা গ্ল্যামারের মোহে না। অভাব, ব্যক্তিগত জীবনের সাত ঝামেলা, ধারের সুদের মতো চড়চড় করে বাড়া বিতর্ক সব ঠেলেঠুলে দিয়ে আশা ভোঁসলে অ্যাদ্দিন ধরে আমাদের ভেতরে রাজত্ব করছেন, মনে হয় না সভ্যতার শেষ অবধি এর থেকে নিষ্কৃতি আছে বলে। আশার এইসব ছলনেই তো ভুলি! 

asha bhosle c ramachandra Lata Mangeshkar O P naiyar Rahul Deb Barman sachin dev burman Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shammi Kapoor

Share this article on