Kadambini Ganguly Breaks Barrier in Medicine & Society। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘অসুস্থ’ কলকাতার অদ্বিতীয়া চিকিৎসক

কাদম্বিনী গাঙ্গুলি তাঁর পেশাগত জীবনে এমন এক সমাজের কাছ থেকে সমালোচনা ও বিরোধিতা পেয়েছিলেন, যে-সমাজ পেশাগত ক্ষেত্রে নারীদের গ্রহণ করার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। ১৮৯১ সালে ‘বঙ্গবাসী’ নামে একটি রক্ষণশীল হিন্দু পত্রিকা তাঁর পেশা এবং তাঁর রাতে রোগী দেখার বিষয়টিকে কটাক্ষ করে তাঁকে ‘বেশ্যা’ বলে বর্ণনা করেছিল। কাদম্বিনী ও তাঁর স্বামী দ্বারকানাথ ওই পত্রিকার সম্পাদক মহেশচন্দ্র পালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন এবং এই মামলায় ওঁদেরই জিত হয়েছিল।

শেষ আপডেট: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৩:৩৯   
Facebook WhatsApp Messenger

যে দুই বঙ্গনারী স্বীয়প্রতিভা এবং পরিশ্রমের দ্বারা ১৮৮৩-তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেথুন কলেজ থেকে প্রথম স্নাতক হয়েছিলেন, কাদম্বিনী বসু ছিলেন তাঁদের অন্যতম। অপরজন চন্দ্রমুখী বসু। পরে ১৮৮৬ সালে আধুনিক চিকিৎসা-শাস্ত্রে আমেরিকান ডিগ্রিপ্রাপ্ত আনন্দীবাই যোশির সমসাময়িক কলকাতাবাসী কাদম্বিনী বসু মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে হয়ে উঠেছিলেন ভারতের এক অগ্রগণ্য নারী চিকিৎসক। আনন্দীবাই অবশ্য আমেরিকার এক মেডিকেল কলেজ থেকে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তার অব্যবহিত পরে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে আনন্দীবাইয়ের মৃত্যু হলে কাদম্বিনী দক্ষিণ এশিয়ার অনুশীলনকারী প্রথম মহিলা চিকিৎসকের স্বীকৃতি লাভ করেন।

zoom
কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়

ব্রজকিশোর বসুর কন্যা কাদম্বিনীর জন্ম ১৮৬১ সালের ১৮ জুলাই, বিহারের ভাগলপুরে। ব্রজকিশোর বসুর জন্মস্থান ছিল পূর্ববঙ্গের গৈলা জেলায়। তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক, ব্রাহ্মসমাজের সমর্থক এবং শিক্ষাবিদ। ব্রজকিশোর সপরিবারে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলে গৈলা জেলার হিন্দুরা বসু-পরিবারকে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করে। প্রায় কপর্দকশূন্য ব্রজকিশোর তখন পরিবার-সহ বরিশালে চলে আসতে বাধ্য হন। কাদম্বিনী ছিলেন তাঁর তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠ এবং অত্যন্ত মেধাবী। ব্রজকিশোরও তাঁর কন্যার মেধা সম্বন্ধে যথেষ্ট অবহিত ছিলেন। পিতার উদ্যোগে কাদম্বিনী বরিশালের এক বালিকা বিদ্যালয়ে ভরতি হন। দুর্ভাগ্যবশত, কাদম্বিনী যখন চতুর্থ শ্রেণিতে পাঠরতা, সে-সময়ে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়! ইতিমধ্যে মাতৃহারা হন কাদম্বিনী! তবে পিতা ব্রজকিশোরের স্নেহচ্ছায়ায় তাঁর বিদ্যাভ্যাস ও সঠিক শিক্ষাগ্রহণ কিন্তু অব্যাহত থাকে।

উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ-কর্মচারী ড্রিংকওয়াটার বেথুন, রাজা দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে ১৮৪৯ সালে কলকাতায় ‘হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়’ বা ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ এবং বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। কাদম্বিনী তাঁর পিতার সহায়তায় এই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে ভরতি হন। পিতৃবন্ধু ও ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের আগ্রহে তাঁরই গৃহে প্রথম দুই বছর থেকে কাদম্বিনী পড়াশুনো করার সুযোগ পান। স্কুলে অধ্যয়নের অবশিষ্ট সময় অবশ্য তিনি ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনা করে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এই বিদ্যালয় ‘বেথুন বালিকা বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত হয়।

স্কুলে পড়ার সময়ে ১৮৭৮ সালে কাদম্বিনী প্রথম মহিলা হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। সম্ভবত এই ঘটনার দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে বেথুন কলেজ শুরু করে প্রথম এফএ এবং তারপরে অন্যান্য বিষয়ে স্নাতক পাঠক্রম। এভাবেই কাদম্বিনী এবং চন্দ্রমুখী বসু একইসঙ্গে দু’জনে ১৮৮৩ সালে বেথুন কলেজ থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নয়, ভারতবর্ষ এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম মহিলা স্নাতক হওয়ার সম্মান অর্জন করেছিলেন। এই উপলক্ষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক হিসেবে কাদম্বিনী বসু এবং চন্দ্রমুখী বসুকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে নারীদের উচ্চশিক্ষা লাভ ছিল প্রায় এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। দুই বঙ্গনারীর এই সাফল্য গোটা উপমহাদেশে নারীশিক্ষার এক যুগান্তকারী মাইলফলক সৃষ্টি করেছিল। এই অভূতপূর্ব ঘটনা চাক্ষুষ করতে সেই সমাবর্তনে এমন বিপুল জনসমাগম হয়, যা সামাল দিতে পুলিশকে না কি বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। সে-যুগের বিখ্যাত কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অশিক্ষিত, অবহেলিত বাঙালি মেয়েদের দেখে হতাশ হয়ে লিখেছিলেন, ‘হায়, হায়, ওই যায় বাঙালীর মেয়ে’। তিনি এবার কাদম্বিনী ও চন্দ্রমুখী বসুর সাফল্যে প্রীত হয়ে লিখলেন, “হরিণ-নয়না শুন চন্দ্রমুখী কৌমুদীর মালা,/ তোমাদের অগ্রপাঠী আমি একজন,/ ওই বেশ ও উপাধি করেছি ধারণ।/ যে ধিক্কারে লিখিয়াছি ‘বাঙালীর মেয়ে’/ তারি মত সুখ আজি তোমা দোঁহে পেয়ে।/ বেঁচে থাকো, সুখে থাকো, চিরসুখে আর/ কে বলে বাঙালীর জীবন অসার”।

zoom
চন্দ্রমুখী বসু

স্নাতক ডিগ্রি লাভের পরে কাদম্বিনী দেবী মেডিকেল কলেজে ভরতি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্য চিকিৎসা-বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনো করা এবং চিকিৎসকের পেশা গ্রহণ করে জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োগ করা। যদিও সেই যুগে একজন নারীর পক্ষে তা যে কত কঠিন কাজ ছিল, সে-সম্বন্ধে কাদম্বিনী অবশ্যই অবহিত ছিলেন। কলকাতার মেডিকেল কলেজে নারী ভরতির কোনও নিয়ম না থাকায়, কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ তাঁকে ভরতি নিতে চাননি। নানা বাধা এবং সামাজিক কুৎসা অগ্রাহ্য করে কাদম্বিনী কলকাতার মেডিকেল কলেজে ভরতি হয়েছিলেন এবং এক্ষেত্রে তাঁর সহায়ক ছিলেন তাঁর গুরু এবং শিক্ষক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়।

এর কিছুদিনের মধ্যেই কাদম্বিনী তাঁর সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ৩৯ বছরের বিপত্নীক, একাধিক সন্তানের পিতা, সমাজ-সংস্কারক এবং নারীশিক্ষার প্রবল সমর্থক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে ২১ বছরের কাদম্বিনীর বিয়ে সেই সময়ে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ তো বটেই, গোঁড়া ব্রাহ্মরাও মেনে নিতে পারেনি। দ্বারকানাথের ব্রাহ্ম-বন্ধুরা পর্যন্ত এই অসবর্ণ বিবাহের বিরুদ্ধাচারণ করেছিলেন। ওই সময়ে নববিবাহিত কাদম্বিনীকেও মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ, পুরুষ সহপাঠী এবং কিছু অধ্যাপকদের তীব্র সমালোচনা এবং সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল।

মেডিকেল কলেজে কাদম্বিনীর ছাত্রজীবন কিন্তু খুব স্বস্তিতে কাটেনি। কলেজের পরিবেশও তাঁর অনুকূলে ছিল না। এই পরিস্থিতিতে কিছু অধ্যাপকের অসহযোগিতা এবং একমাত্র ছাত্রী হিসেবে ওই কলেজে কাদম্বিনীকে নানা সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু নিষ্ঠা, একাগ্রতা এবং মনোবলে সমৃদ্ধ কাদম্বিনীকে দমিয়ে রাখা যায়নি।

কলকাতা মেডিকেল কলেজের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অন্য সব বিষয়ে উত্তীর্ণ হলেও, মেডিসিনের মৌখিক পরীক্ষায় এক নারী-বিদ্বেষী পরীক্ষক কাদম্বিনীকে এক নম্বর কম দিয়ে অকৃতকার্য করিয়ে দিয়েছিলেন। কাদম্বিনীর প্রতি এই অন্যায়, অধ্যক্ষ ডা. কোটসের অভিজ্ঞ চোখ এড়িয়ে যায়নি। তিনি তাঁর বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে আলোচনার মাধ্যমে কাদম্বিনীকে ‘লাইসেনসিয়েট ইন মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি’ ও পরে ‘গ্রাজুয়েট অফ বেঙ্গল’ ডিগ্রি প্রদান করেন। কাদম্বিনী ছিলেন প্রথম ভারতীয় মহিলা, যিনি ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিবিএমসি ডিগ্রি এবং পাশ্চাত্য চিকিৎসারীতিতে চিকিৎসা করার অনুমতি পেয়েছিলেন।

পাঁচ বছরের পাঠক্রম শেষে কাদম্বিনী কিছুদিন লেডি ডাফরিন মেডিকেল হাসপাতালে মাসিক ৩০০ টাকা বেতনে কাজ করেছিলেন। শুধু চিকিৎসা নয়, তার পাশাপাশি কাদম্বিনী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১৮৮৯ সালে বোম্বে শহরে কংগ্রেস দলের পঞ্চম অধিবেশনে যে ছ’জন নারী, প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, কাদম্বিনী ছিলেন তাঁদের অন্যতম। পরের বছর কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের ষষ্ঠ অধিবেশনেও তিনি যোগদান করেন এবং প্রথম মহিলা বক্তা হিসেবে ভাষণ দিয়েছিলেন। এভাবেই কাদম্বিনী গাঙ্গুলি চিকিৎসক হিসেবে তাঁর কর্তব্যপালনের পাশাপাশি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের সক্রিয় আন্দোলন এবং কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি গান্ধীজির একনিষ্ঠ অনুগামী ছিলেন এবং তাঁরই নির্দেশে কাদম্বিনী কংগ্রেস পরিচালিত নানা সভা-সমিতিতে সদস্যপদ অলংকৃত করেছেন।

সমাজ সংস্কারক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের শ্রমিকদের ওপর ব্রিটিশ মালিকদের শোষণের বিরুদ্ধে সংঘটিত এক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কাদম্বিনী এ-ব্যাপারে স্বামীকেই সমর্থন করতেন এবং মালিক কর্তৃক শ্রমিকদের প্রতি অন্যায়-অত্যাচারের তীব্র নিন্দা করেছিলেন। ১৯২২ সালে কবি কামিনী রায়ের সঙ্গে তিনিও বিহার এবং ওড়িশায় নারী-শ্রমিকদের দুরবস্থা তদন্তের জন্য সরকার দ্বারা নিযুক্ত হয়েছিলেন।

আমেরিকান ইতিহাসবিদ ডেভিড কফ লিখেছেন: গাঙ্গুলির স্ত্রী কাদম্বিনী ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে সফল এবং স্বাধীনচেতা ব্রাহ্ম-নারী। সে-যুগের বাঙালি শিক্ষিত মহিলাদের তুলনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চভাবনা-সম্পন্ন, শিক্ষিত, চিন্তাশীল এবং প্রতিবাদী মানুষ। সকল বাধার ঊর্ধ্বে উঠে সে-যুগের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে নরনারীর স্বাধীনতা নিয়ে সোচ্চার হতে কখনওই দ্বিধা বোধ করেননি কাদম্বিনী। তাঁর সাহস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা জনগোষ্ঠীর কাছে তাঁকে অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত করেছিল।

zoom
দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়

কাদম্বিনী যখন স্বামী ও শিশুসন্তানদের রেখে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেত যাবেন বলে স্থির করেন, তখন সারা দেশে নিন্দার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। সেই সব অগ্রাহ্য করে কাদম্বিনী যে স্বীয়-সংকল্পে স্থির থেকে বিদেশ যেতে পেরেছিলেন, তা তাঁর দৃঢ় মনোবলেরই পরিচায়ক। একদিন কাদম্বিনীকে নিজের দেশে এমবি পরীক্ষায় অন্যায়ভাবে অকৃতকার্য করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু হার মানানো যায়নি। সেই একই নারী বিলেতের ট্রিপল ডিপ্লোমা পরীক্ষায় সপ্তম স্থান অধিকার করে স্কটিশ কলেজের ট্রাইপস হওয়ার গর্ব অর্জন করে দেশে ফিরে এসেছিলেন। মনোসংযোগ করেছিলেন প্রধানত স্ত্রীরোগ উপশমে উন্নত মানের চিকিৎসা পদ্ধতি সম্বন্ধে। পরবর্তীকালে প্রসূতি ও নারীদের চিকিৎসা-ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট পারদর্শিতার ছাপ রেখেছিলেন।

১৮৮৮ সালে বিদেশে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মতো প্রবাদপ্রতিম সমাজ সংস্কারক এবং আধুনিক নার্সিং-এর অগ্রদূ্‌ত, তাঁর এক বন্ধুকে লেখা চিঠিতে ডা. কাদম্বিনী বসুর অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং চিকিৎসক হিসেবে বিরুদ্ধ-অবস্থার মধ্যে তাঁর অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। বিবাহিত কাদম্বিনী সন্তান জন্মের পরে মাত্র ১৩ দিনের বিরতি নিয়ে হাসপাতালের কাজে যোগ দিয়েছেন, সে-খবর তাঁকে বিস্মিত করেছিল। চিঠিতে তিনি লেডি ডাফরিনকে অনুরোধ করেছিলেন, যেন কলকাতার হাসপাতালের নারী-ওয়ার্ডে কাদম্বিনীকে কোনও উপযুক্ত পদে নিয়োগের কথা বিবেচনা করা হয়। চিকিৎসক হিসেবে কাদম্বিনী গাঙ্গুলির অধ্যবসায়, জীবিকার প্রতি তাঁর একনিষ্ঠতার কথা সুদূর বিদেশে ফ্লোরেন্সের কাছে কীভাবে পৌঁছেছিল জানা নেই, কিন্তু বাংলার এই তরুণী চিকিৎসকের কার্যাবলি যে তাঁকে মুগ্ধ করেছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সেই চিঠি তার প্রমাণ।

zoom
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল

পেশাগত কাজ ও গৃহকর্মে কাদম্বিনী যেমন নিপুণতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনই তিনি দক্ষ ছিলেন নানাবিধ শিল্পকর্মে। যে হাতে রোগীর শরীরে অস্ত্রোপচার করতেন, সেই হাতেই অবসর সময়ে নিপুণভাবে তিনি লেস বুনতেন। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কন্যা এবং সম্পর্কে কাদম্বিনী গাঙ্গুলির নাতনি, শিশু সাহিত্যিক পুণ্যলতা চক্রবর্তী তাঁর ‘ছেলেবেলার দিনগুলি’ গ্রন্থে দিদিমা সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। কাদম্বিনীর কর্ম-কুশলতা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন: দিদিমা ফিটনে করে রোগী দেখার জন্য যখন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতেন, সে যাতায়াতের সময়টুকু তিনি ব্যয় করতেন কুরুশ-কাঠি দিয়ে সেলাই করে।

সেই ছোটবেলায় পুণ্যলতাও না কি মুগ্ধ হতেন তাঁর হাতের নিপুণতা ও কুরুশ সুতো নিয়ে তাঁর সুন্দর আঙুলের কাজ দেখে। মাতৃভাষা বাংলার মতোই তিনি সাবলীলভাবে ইংরেজিতে কথা বলতে পারতেন। তখনকার যুগে কাদম্বিনী পরতেন আধুনিক ফ্যাশনের শাড়ি, জামা ও জুতো এবং তাঁর চালচলনে ছিল সম্ভ্রান্ত রুচির প্রকাশ।

কাদম্বিনী গাঙ্গুলি তাঁর পেশাগত জীবনে এমন এক সমাজের কাছ থেকে সমালোচনা ও বিরোধিতা পেয়েছিলেন, যে-সমাজ পেশাগত ক্ষেত্রে নারীদের গ্রহণ করার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। তাঁর পুরুষ সহকর্মী এবং বৃহত্তর সমাজ– উভয়ের কাছ থেকে আসা লিঙ্গবৈষম্য, সন্দেহ, চরিত্রহানি ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠা কাদম্বিনীর পক্ষেও খুব একটা সহজ হয়নি। ১৮৯১ সালে ‘বঙ্গবাসী’ নামে একটি রক্ষণশীল হিন্দু পত্রিকা তাঁর পেশা এবং তাঁর রাতে রোগী দেখার বিষয়টিকে কটাক্ষ করে তাঁকে ‘বেশ্যা’ বলে বর্ণনা করেছিল। কাদম্বিনী ও তাঁর স্বামী দ্বারকানাথ ওই পত্রিকার সম্পাদক মহেশচন্দ্র পালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন এবং এই মামলায় ওঁদেরই জিত হয়েছিল। শাস্তি হিসেবে সম্পাদক মহেশচন্দ্র পালকে ছ’মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত ও ১০০ টাকা জরিমানা দিতে হয়েছিল।

দীর্ঘকাল কাদম্বিনী ভারতীয় ইতিহাসে উপেক্ষিত থেকে গিয়েছেন, কারণ ঔপনিবেশিক ভারতীয় সমাজে ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে পুরুষদের প্রাধান্য ছিল বেশি। ফলে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও চিকিৎসক এবং সমাজ সংস্কারক হিসেবে তাঁর অসাধারণ অবদানের কথা প্রায় অনুল্লিখিত থেকে গিয়েছে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে আজকের নারী অর্জন করেছেন শিক্ষা, সামাজিক স্বাধীনতা এবং কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সমান অধিকার। এই পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক নারী কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে কাদম্বিনী গাঙ্গুলির মতো এক অদ্বিতীয়াকে, নারীমুক্তি আন্দোলনে যাঁর অবদান আজও চিরস্মরণীয় এবং অনুপ্রেরণাদায়ক।

………………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন আলপনা ঘোষ-এর অন্যান্য লেখা

………………………….

Doctor Dwarakanath ganguly Florence Nightingale Indian Medicine Kadambini Ganguly Lady-doctors Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on