নিজের স্টারডম, ক্যামেরা, খবর, স্টেজ ছেড়ে নির্জনে অজ্ঞাতবাসে গেলেন লিওনার্ড কোহেন। ফ্যানদের ভিড় থেকে দূরে। এলেন ভারতে। বোম্বের রাস্তার ট্যাক্সিওয়ালা, রাস্তার হেঁটে বেড়ানো মানুষেরা, চারিদিকে নানান রঙে ভরা একটা বিরাট ক্যানভাসের মতো বোম্বে শহরকে দেখলেন, অনুভব করলেন তিনি। ফ্যান, ইন্টারভিউ এসব থেকে শতহস্ত দূরে এই শহর শেষ অবধি তাঁকে শান্তি দিয়েছিল?
নয়ের দশকে বোম্বের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক সাহেব। পরনে সাধারণ প্যান্ট-শার্ট, গলা থেকে ঝুলছে দড়ি-বাঁধা চশমা। তিনি ফিরছেন কেম্পস কর্নারের একটি সাধারণ হোটেলে। তাঁর জীবন চলছে একটি নির্দিষ্ট রুটিনে। নিজের হোটেল থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে তাঁর একটি অ্যাপার্টমেন্ট অবধি নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রা। সেখান থেকে ফেরার পথে রাস্তার দোকানে চা-পানের বিরতি। তারপর ব্রিচক্যান্ডি ক্লাবে কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে হোটেলে নিজের ঘরে ফেরা।

হোটেলের স্টাফরা এইটুকু জানেন যে, এই ষাটোর্ধ্ব শান্ত স্বভাবের সাহেবের নাম লিওনার্ড কোহেন। কবীর সুমন তাঁর ‘আলখাল্লা’ বইতে লিখেছেন– ‘ডিলান ও কোহেন একই যুগের দুই মেরু। ষাটের পর থেকে আজ পর্যন্ত পাশ্চাত্যের সিরিয়াস গীতিকাররা এই দুই মেরুর মধ্যেই চলাফেরা করছেন মোটামুটি।’ ১৯৯৯ সালে বোম্বের (মুম্বই) সাধারণ হোটেলে থাকা সেই লিওনার্ড কোহেন নামের শান্ত সাহেবটি আসলে কবীর সুমন উল্লিখিত সেই দুই মেরুর একজন! হ্যাঁ, ১৯৬৭ সালের নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভালে যাঁর গুরুত্বপূর্ণ আত্মপ্রকাশ, সেই লিওনার্ড কোহেন।

তখন ‘প্রোটেস্ট সং’-এর মসিহা বব ডিলান ইতিহাস সৃষ্টি করে ফেলেছেন। গোটা পৃথিবী জুড়ে ঘটে চলেছে সময়কে ধাক্কা দেবার মতো অনেক অনেক ঘটনা। তারপর ধীরে ধীরে কোহেন হয়ে উঠেছেন বিরাট তারকা। কিন্তু, ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় আক্রান্ত। নিজেকে খুঁজে চলেছেন। একসময় জেন সন্ন্যাসী হয়েছেন, তাঁর নাম হয়েছিল ‘জিকান’। দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন তাঁর গুরু সাসাকি রোশির কাছে, লস এঞ্জেলেসের মাউন্ট বালডিতে। সারাক্ষণ মৌনতা, ধ্যান, বৌদ্ধধর্মের চর্চা। বাইরের জগতের সঙ্গে প্রায় সম্পর্ক ছিন্ন। চেলসি হোটেল, বার্ড অন দ্য ওয়্যার, ফেমাস ব্লু রেনকোটের স্রষ্টার তখন মুণ্ডিত মস্তক। কিন্তু পাঁচ বছরেও নিজের ডিপ্রেশন থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাননি। নিজেকে খোঁজার যে রাস্তায় তিনি হাঁটছিলেন সেখানেও গন্তব্য খুঁজে পাননি। একটি ইন্টারভিউতে কোহেন মজা করে বলেছেন যে, উনি সন্ন্যাসী হতে গিয়েছিলেন, কিন্তু একজন ‘রাঁধুনি’ হয়ে ফিরে এসেছেন!

রোশির মনাস্ট্রিতে থাকাকালীন কোহেন পড়লেন রমেশ বালসেকরের লেখা ‘কনশাসনেস স্পিকস’ নামের একটি বই। এই পাঠ তাঁকে নিয়ে এল বোম্বে-নিবাসী রমেশ বালসেকরের সান্নিধ্যে। বিখ্যাত বডিবিল্ডার কে ভি আইয়ারের ছাত্র রমেশ বালসেকর একসময় বডিবিল্ডিং-এ নাম করেছিলেন। পরে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে পড়াশুনা করেন। চাকরি করেছেন ব্যাংকে। অবসর নেওয়ার পর অদ্বৈত দর্শনের শিক্ষা দেওয়া শুরু করেন।

কেম্পস কর্নারের হোটেল থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে রমেশ বালসেকরের সি-ফেসিং অ্যাপার্টমেন্টে সৎসঙ্গে যোগ দিতে যেতেন কোহেন। সেখানে প্রায় ৪০ জন বিদেশি রমেশের বালসেকরের কথা শুনতে আসতেন। এঁদের মধ্যে কোহেন ছাড়াও ডেনিস কুয়েড, মিগ রিয়ানের মতো সেলিব্রিটিরাও ছিলেন।
কোহেনের গান জটিল, ভাবনার শল্কপত্রে ভরপুর। কিন্তু রমেশ বালসেকরের অদ্বৈত দর্শনের শিক্ষাপদ্ধতি ছিল সহজ সরল। ‘তুমি কী করছ’– এই বিষয়ে প্রশ্ন করতে থাকো নিজেকে, যত গভীরে যাওয়া সম্ভব ততটাই যাও, যখন উত্তর পাওয়ার সময় হবে অবশ্যই পাবে। কোহেন প্রথমে অল্পদিনের জন্য এলেও থেকে যান দীর্ঘসময়। সঙ্গে গিটার নেই। হোটেলের ঘরে ফিরে ধ্যান, পড়াশোনা, লেখালিখি এইসব নিয়েই থাকেন। মিডিয়াতে তাঁকে নিয়ে হইচই নেই। দু’-একটা জায়গায় খবর প্রকাশিত হয়েছে তিনি বোম্বেতে আছেন, এইটুকুই।

কিন্তু ‘এইটুকুই’ যথেষ্ট ছিল এক কোহেন-পাগল ভারতীয় রত্নেশ মাথুরের জন্য। তিনি হোটেলে হোটেলে খোঁজ নিতে থাকলেন কোহেনের ব্যাপারে। ক্ষ্যাপা একসময় পেয়ে গেল পরশপাথর! কিন্তু কোহেন দেখা করবেন না– জানিয়ে দিলেন রিসেপশনে। তিনি অজ্ঞাতবাসে আছেন। ফ্যানদের ভিড় থেকে দূরে। বোম্বের রাস্তার ট্যাক্সিওয়ালা, রাস্তার হেঁটে বেড়ানো মানুষেরা, চারিদিকে নানান রঙে ভরা একটা বিরাট ক্যানভাসের মতো বোম্বে শহরকে দেখছেন, অনুভব করছেন তিনি। ফ্যান, ইন্টারভিউ এসব থেকে শতহস্ত দূরে থাকতে চান।

কিন্তু কোথাও হয়তো লেগে থাকে মায়া। রিসেপশনে জানিয়ে দিলেন– সেই ফ্যান যদি বই, ক্যাসেট ইত্যাদি রেখে যান, তাহলে পরে সেখানে অটোগ্রাফ দেবেন। কিন্ত রত্নেশ মাথুরের কপাল বোধহয় একটু বেশিই প্রসন্ন ছিল। কোহেন এসে দেখা করলেন। সামান্য সময় দেবেন ভেবেও রত্নেশ মাথুরের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বললেন নানান বিষয় নিয়ে। রত্নেশের সঙ্গে কোহেনের বন্ধুত্ব হল। রত্নেশ, কোহেনকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে দেখালেন বোম্বের বেশ কিছু জায়গা। কোহেন তাঁকে নিজের পারসোনাল ইমেল আইডি দিলেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ অবধি বেশ কয়েকবার বোম্বে আসাযাওয়া করেছেন কোহেন। তারপর আর আসেননি। কোহেনের ম্যানেজার তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অসৎ উপায়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেন। কোহেন বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হন। তারপর আবার শুরু করেন কনসার্ট, ট্যুর। কোহেন পরে বলেছেন বোম্বেতে রমেশ বালসেকরের সান্নিধ্য তাঁকে ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেতে অনেকটাই সাহায্য করেছে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাশিবিজ্ঞান বিভাগের অধুনা প্রয়াত বিখ্যাত অধ্যাপক শৌটির কিশোর চট্টোপাধ্যায় বলেছেন– ‘গবেষণায় সাফল্য পেতে হলে বেশ কিছুটা ডিটাচমেন্ট বা বিচ্ছন্নতা জরুরি’। গবেষণার অর্থ নতুন কিছু খোঁজা। কোহেন খুঁজছিলেন নিজের ভেতরে থাকা কোনও সত্য। রোশির আশ্রমের পাঁচটা বছর অথবা বোম্বেতে কাটানো অজ্ঞাতবাস তাঁকে হয়তো সেই ‘ডিটাচমেন্ট’ দিয়েছিল, যা তাঁকে সাহায্য করেছিল নিজেকে অন্বেষণ করতে। নিজেকে অন্বেষণ করে ফেললে পরোক্ষভাবে ডিপ্রেশনকে সারিয়ে ফেলা যায় হয়তো।

কবিতায় তিনি লিখেছেন, বোম্বেতে কত অসামান্য সুন্দরী নারীরা আছেন। কিন্তু কেউই তাঁকে চায় না। তাঁদের চোখ দেখে প্রতিদিন এই সত্য উপলব্ধি করেন। এই আক্ষেপ কি শুধুমাত্র কাব্যের তাড়নার না কি অন্য কিছু! কোহেন একবার মজা করে বলেছিলেন– ‘আমাকে একজন জিউ বউ খুঁজে দাও, এখানে সংসার পাতি’।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved