Robbar

সত্যজিৎ রায়ের ছবি তোলা ছিল বাবার কাছে অক্সিজেন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 24, 2026 6:06 pm
  • Updated:March 24, 2026 7:34 pm  

যদিও ‘প্রফেশনাল’ বলতে যা বোঝায়, বাবা ঠিক সেই ‘সেলেব’ গোছের জীবনধারণে বিশ্বাসই করেননি কোনওদিন। আমাদের বাড়িতে একতলায় বড় ঘরে তাস খেলা হত। বাবা উপস্থিত না-থাকলেও। কারা আসতেন সেই আড্ডায়? রবি ঘোষ, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, নাটকের আরও কত যে তাবড় তাবড় মানুষ! প্রোডাকশনের ভানুজেঠু রোজ আসতেন। আমাদের সঙ্গেও দেখা করতেন।

সাত্যকী ঘোষ

বাবা আমাকে কখনও ছবি তোলা শেখাননি। কিন্তু হাতে-নাতে না-শেখালেও তিনিই আমার গুরু, পথপ্রদর্শক। বাবার ছবি তোলা দেখেই আমার ছবির শিক্ষা। সে অর্থে, বাবাই আমার সহজ পাঠ।

বাবা চিরকালই খুব গোছানো মানুষ। স্নান করতে যাওয়ার আগে দেখতাম, যা যা জিনিস নিয়ে তিনি বেরবেন, সবই গুছিয়ে-টুছিয়ে রাখতেন। স্নান করে প্রণাম করতেন শুধুমাত্র দাদুর ছবিতে। বাবা সে-অর্থে ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন না। আমি তখন দশম শ্রেণি। বাবা বেরিয়ে গিয়েছেন বাড়ি থেকে। যে-আলমারিতে রাখা থাকত বাবার ক্যামেরা, তার চাবি গচ্ছিত থাকত মায়ের কাছে। মাকে হাজার বললেও মা সেই চাবি আমাকে দিতেন না। কিন্তু আমি জানতাম, ঠাকুমা বললে ঠিকই সে চাবি হাতে পাব। অতএব সেই পন্থাই নিয়েছিলাম।

কিন্তু তখন অ্যানালগ ক্যামেরা। নিকন। শাটার ঘোরাতে পারব না। ঘোরালেই বাবা জানতে পেরে যাবেন। কিন্তু ক্যামেরার সঙ্গে যে-ছোট্ট সাইজের বই, তা পড়তাম। কী হয় সেই ক্যামেরায়, জেনেছিলাম বইখানা পড়েই। এমন করে করে হপ্তায় প্রায় পাঁচদিন বাবা বেরলেই ক্যামেরায় হাত দিতাম আমি। শিখে গিয়েছিলাম লেন্স কীভাবে বদলাতে হয়। একটা নয়, বাবার দুটো ক্যামেরার সঙ্গেই চুপিচুপি আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।

আরও পড়ুন, প্রথম যুগের মহিলা আলোকচিত্রীদের কথা
ও আলোকচিত্রের পথযাত্রিনী

ক্লাস টুয়েলভ পেরিয়ে কলেজে। বাবা একদিন আমাকে বললেন ছবি তুলতে। আসলে ক্যামেরার ফিল্ম শেষ করতে হবে। এদিকে দিনের আলো কমে এসেছে। বোনের ছেলে বসেছিল বারান্দায়। আমি গিয়ে বললাম, ‘কী রে ছবি তুলছি তো, হাস!’ ও ধমকানি খেয়ে হাসল। ছবি তুললাম। বাবার এদিকে বেরনোর তাড়া। বাবা এসেও একটা ছবি তুললেন। ক্যামেরা এক, আলো এক, বিষয় এক। কিন্তু কী চমৎকার বাবার তোলা সেই ছবি! আমার সঙ্গে আমার বাবার ছবি তোলার যে আকাশপাতাল তফাত, বুঝেছিলাম সেদিনই। একটু বড় হয়ে বুঝেছিলাম, যার ছবি তুলেছিলাম সেদিন, তার সঙ্গে সেই মুহূর্তে বন্ধুত্ব করিনি। বুঝতে চাইনি। শুধু শুধুই ছবি তুলতে চেয়েছি। বাবার ওই ছবিটাই আমাকে শিখিয়েছিল। বাবা কোনও কথাই বলেননি ছবি তোলার সময়। একটা মুহূর্ত, ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। বুঝেছিলাম, শাটার মারা আলাদা করে কোনও প্রতিভা নয়। প্রতিভা হল কী দেখছি। কতটুকু দেখছি।

আমি কখনও বাড়ির মেয়েদের ছবি তুলিনি। বাবা কখনও বলেননি। বন্ধুদের ছবি তুলেই প্র্যাকটিস করেছি ছবি তোলা। তখন বাবা একটু একটু করে আমাকে ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যাপারে ছাড় দিয়েছেন। কখনও বসন্ত কেবিনে, কখনও নির্বাচনের সময়– নানা জায়গায় দৌড়ে গিয়েছি। এমনকী, মাঝে মধ্যে বিয়েবাড়ির ছবিও তুলেছি। আমি তো ভাবতাম, যে করে হোক ছবি তুলতেই হবে আমাকে। সুযোগ খুঁজছি সারাক্ষণ। আগেকার দিনে বন্ধুবান্ধবরা বলতও তাদের আত্মীয়স্বজনদের বিয়ের ছবি তুলে দিতে। এখনও বলে অবশ্য, তবে ব্যাপারটা অনেকটাই ‘প্রফেশনাল’ হয়ে গিয়েছে। এই বিয়ের ছবি তোলা বাবার একেবারে পছন্দ ছিল না। তার কারণ বিয়ের ছবিতে ফ্ল্যাশ ব্যবহার করার চল ছিল। বাবা এই ফ্ল্যাশ ফোটোগ্রাফির তীব্র বিরুদ্ধে। বিয়ের দিন দুপুরবেলা, গায়ে হলুদের সময় বিনা ফ্ল্যাশে যে-ছবিগুলো তুলতাম, বাবা সেগুলো অবশ্য পছন্দ করতেন। কিন্তু রাতে তোলা ছবিগুলো পাত্তাই দিতেন না। কিন্তু এদিকে আমার কিছু করারও তো ছিল না। তখনকার দিনে এত আলোর ব্যবহার ভাবাই যেত না। ছবির পাশে ছায়াও তৈরি হত।

লেখকের শৈশব

একবার এক বন্ধুর আত্মীয়ের বিয়ের ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। বাবা তখন গিয়েছেন তোপচাঁচিতে। ততদিনে বাবার প্রশ্রয় পেয়েছি যে, ওঁর ক্যামেরায় হাত দিতে পারি। কলেজের শেষদিক তখন। বাবা খানিক কড়াকড়ি কমিয়েছেন বটে, কিন্তু বারেবারেই বলতেন, ‘গ্র্যাজুয়েট হও, তারপর প্রফেশনে আসবে।’ সেদিন বিয়েবাড়ি থেকে ফিরতে অনেকটা রাত্রি হয়ে যায়। আমাদের ভবানীপুরের চারতলা বাড়ি। এদিকে আমি ঘোর চিন্তায় বাবা জেগে আছেন কি না। সেদিন কড়া এমন আলগা করেই নেড়েছিলাম, যাতে বাবার ঘর পর্যন্ত না যায়। সেদিন বোন দরজা খুলেছিল। আমি চারতলায় থাকতাম। দাদা আর আমি। টুক করে পেরিয়ে গিয়েছিলাম বাবার তিনতলার ঘর। পরের দিন সকাল থেকেই আমি খানিক চিন্তায়। বাবার সামনে তো যেতে হবেই! বাবার ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলাম। বললাম, ‘কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছে, একটা নাটকের ছবি তুলতে যাব।’ বাবা তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, এই ছবিগুলো তোল! এগুলোই ছবি।’ বাবা একবারও সেদিন গতকালের বিয়েবাড়ির ছবি, ফ্ল্যাশ ফোটোগ্রাফির প্রসঙ্গই টানলেন না। কোনটা করা উচিত, এটুকু বলেই বুঝিয়ে দিলেন, কোনটা করা উচিত না!

বাবা গতানুগতিক ফোটোগ্রাফার যে ছিলেন না, এ তো আমার নতুন করে বলার কিছু নেই। বাবা ক্যামেরা পেয়েছিলেন কুড়িয়ে। বাবার মধ্যে কী এমন ছিল যে, বাবা এত নাম করলেন ছবি তুলে? হ্যাঁ, ফোটোগ্রাফি শেখারই বস্তু। কিন্তু বাবার কাছে এমন কী ‘এক্স ফ্যাক্টর’ ছিল? আমি দীর্ঘদিন বাবাকে, বাবার তোলা ছবি দেখতে দেখতেই বুঝেছি, বাবার মৌলিকতা হল কম্পোজিশনে। বাবা আসলে নাটক করতেন। নাটকের মঞ্চ থেকেই বাবার মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল কম্পোজিশনের বোধ। বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে যে ফোটোগ্রাফারের কাছে বাবা প্রথম ছবি প্রসেসিং করিয়ে অপেক্ষা করছিল, সেই ভদ্রলোক ছবি হাতে নিয়ে বাবার কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, ‘তুই চালিয়ে যা, তোর হবে’। সেই ভদ্রলোকের নাম ভূপেশ সান্যাল, সবাই চিনতেন ‘মেজদা’ বলে।

আরও পড়ুন, ধর্মতলার পুরাতন ক্যামেরা সারাইওলার সাক্ষাৎকার
সাহিত্য পড়ো, তবেই ছবি বেরবে হাত থেকে

সুচিত্রা সেন, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া দেবী ছেড়ে কেন ওই লম্বা লোকটার ছবি তুলে গিয়েছিলেন নিরন্তর? বাবা কিছু একটা তো দেখতে পেয়েছিলেন মানিকজেঠুর মধ্যে। আমার তো মনে হয় ভারতের অন্যতম একজন শ্রেষ্ঠ মডেল সত্যজিৎ রায়। ২৫ বছর ধরে সত্যজিৎ রায় আর বাবার যোগাযোগ, ছবি তোলা, বন্ধুত্ব। এই দীর্ঘ সময়ে কখনও বাবাকে বলতে শুনিনি, ‘মানিকদা ডেকেছেন, সেই এক ছবি তুলতে হবে!’ এই অনুভবের ধার-কাছ দিয়ে তো যাননি বটেই, উল্টে একটা প্রবল আন্তরিক উত্তেজনাবোধ! এটা আমার কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর! আজ বুঝতে পারি, মানিকজেঠুর ছবি তোলা ছিল বাবার কাছে অক্সিজেন।

বাবার ইচ্ছে ছিল আমি ছবি তোলার পরের কাজটা শিখি। অর্থাৎ, ছবির প্রসেসিংয়ের ব্যাপারটা। বাবা বলতেন, ‘দিলু, ভালো প্রিন্ট করতে হবে। প্রসেসটা শিখে নে।’ অতএব আমি শিখতে গেলাম ‘ইমেজ’-এ। ‘ইমেজ’– জ্যোতিষ চক্রবর্তীর দফতর। ভবানীপুরে পূর্ণ সিনেমার উল্টোদিকে সেই জায়গা। মর্নিং কলেজ করার পথে অনেক সময়ই ইমেজ থেকে ঘুরে আসতাম আমি। বাবা মাঝেমাঝে গিয়ে খোঁজ নিতেন। জানতে পারলে বাড়িতে রাগারাগিও করতেন, ওই যে, আগে গ্র্যাজুয়েট হতে হবেই। গ্র্যাজুয়েশন পরীক্ষা শেষ করে আমি অপেক্ষা করছিলাম বাবা কখন ফিরবে। এবং সত্যিই সেদিন সন্ধেবেলা বাবা আমাকে ইমেজে নিয়ে গিয়েছিলেন। এটা সেই ’৮০-’৮১ সালের ঘটনা ।

…………………………………………………

‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর ছবি তুলছেন যখন, তখনও তো কোনও ঠিকঠাক আধুনিক ক্যামেরা ছিল না বাবার কাছে। পরে মানিকজেঠু অরণ্যের দিনরাত্রির সময়ও বাবাকে নিয়ে যান। শর্মিলা ঠাকুর ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র সময় দেখেন ছবির কনট্যাক্ট শিট দেখে অভিভূত হয়ে যান। রবিজেঠুকে (রবি ঘোষ) বলেন, ‘ইনি কে?’ রবিজেঠুর খুবই বন্ধু ছিলেন বাবা। সাউথ সাবারবান কলেজে, বাবার চেয়ে দু’ক্লাস বড় ছিলেন রবিজেঠু। একই এলাকায় থাকতেন তো বটেই। লিটল থিয়েটার গ্রুপে যেতেন। রবিজেঠু বাবার পরিচয় দিয়েছিলেন শর্মিলা ঠাকুরকে। জানিয়েছিলেন বাবা আদৌ প্রফেশনাল ফোটোগ্রাফারই না। শর্মিলা ঠাকুর তখন আরও বিস্মিত! পরে, বোম্বেতে রবিজেঠু যখন গিয়েছিলেন, শর্মিলা ঠাকুর মনে করে তাঁর হাত দিয়ে বাবার জন্য নিকন ১৩৫ লেন্স পাঠিয়েছিলেন!

…………………………………………………

আমি সিগারেট খেতাম তখন। জ্যোতিষ চক্রবর্তী, আমার গুরু, ডার্করুমে ওঁর সঙ্গে পাশাপাশি কাজ করতে হবে, গন্ধ পাবেন– তাই কাজের মাঝে সিগারেট খেতাম না। কাজ শেষ করে রাতের বেলা পূর্ণ সিনেমার মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেলে আর ইমেজের দিকে ঘুরে তাকাতাম না। গল্প করতে করতে কত কী যে শিখেছি ওঁর কাছে। একদিন দুপুরে বসে আছি। গুরু পাঞ্জাবি, সাদা পাজামা। বাবা ‘রবি সোম’-এর ছবি তুলে এসেছে। ‘বন অ্যান্ড শেফার্ড’-এ মুনমুন সেনের একটা ফোটো সেশন আছে। ছবি তুলবেন বাবা-ই। বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন। ইমেজের দফতর থেকেই। মুনমুনদির ছবি তোলা হচ্ছে যখন তিনি বললেন, ‘নিমাইদা, এ কে?’ বাবা বললেন, ‘আমার ছেলে। ডাকনাম দিলু।’ সেই দিলু সম্বোধন আজও রয়েছে।

এই ঘটনার দু’-তিন দিনের মধ্যে বাবার সঙ্গে কোথাও একটা দেখা হয়েছিল মুনমুন সেনের। বাবাকে তিনি বলেন, ‘নিমাইদা, কাল একটু দিলুকে পাঠিয়ে দেবে বাড়িতে?’ বাবা আমাকে ক্যামেরা দিলেন। বলে দিলেন, এই লেন্সই নিয়ে যাবি, অন্য কোনও লেন্স না-নিতে। বলেছিলেন, চারখানা ছবি আমার ভালো চাই-ই চাই। মুনমুনদি জ্যোতিষ জেঠুকেও চিনতেন। তিনি তো প্রথম জীবনে মডেল ছিলেন। বিজ্ঞাপনে প্রচুর কাজ করতেন। আমিও তখন জ্যোতিষজেঠুর সঙ্গে বিজ্ঞাপনের জগতে কাজ করতে শুরু করেছি। আমি মনে করি, আমার তোলা মুনমুনদির সেই ছবি এখনও আমার অন্যতম সেরা কাজ।

লেখকের তোলা মুনমুন সেনের ছবি

যে-ক্যামেরা বাবা দিয়েছিলেন সেদিন, তা জাপান থেকে আনা। পরে সে ক্যামেরা আমাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। এখনও সে-ক্যামেরা অক্ষত আছে, কার্যক্ষমও। বাবা একসময় গাড়ি বিক্রি করে ক্যামেরা কিনেছিলেন। বাবা ছবি তুলতেন ফিক্সড লেন্সের ক্যাননের ক্যামেরায়। ক্যানন, কিউএল ৭০।

‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর ছবি তুলছেন যখন, তখনও তো কোনও ঠিকঠাক আধুনিক ক্যামেরা ছিল না বাবার কাছে। পরে মানিকজেঠু অরণ্যের দিনরাত্রির সময়ও বাবাকে নিয়ে যান। শর্মিলা ঠাকুর ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র সময় দেখেন ছবির কনট্যাক্ট শিট দেখে অভিভূত হয়ে যান। রবিজেঠুকে (রবি ঘোষ) বলেন, ‘ইনি কে?’ রবিজেঠুর খুবই বন্ধু ছিলেন বাবা। সাউথ সাবারবান কলেজে, বাবার চেয়ে দু’ক্লাস বড় ছিলেন রবিজেঠু। একই এলাকায় থাকতেন তো বটেই। লিটল থিয়েটার গ্রুপে যেতেন।

রবিজেঠু বাবার পরিচয় দিয়েছিলেন শর্মিলা ঠাকুরকে। জানিয়েছিলেন বাবা আদৌ প্রফেশনাল ফোটোগ্রাফারই না। শর্মিলা ঠাকুর তখন আরও বিস্মিত! পরে, বোম্বেতে রবিজেঠু যখন গিয়েছিলেন, শর্মিলা ঠাকুর মনে করে তাঁর হাত দিয়ে বাবার জন্য নিকন ১৩৫ লেন্স পাঠিয়েছিলেন!

দুই মেয়ের সঙ্গে মুনমুন সেন, আলোকচিত্র: লেখক

কিন্তু সেই লেন্স বাবাকে তো কাজে লাগাতে হবে। সেরকম ক্যামেরা কোথায়! বাবা অ্যাডভেঞ্চার করতে ভালোবাসতেন খুব। স্টেশন ওয়াগান জিপগাড়ি ছিল আমাদের। গাড়ি চালিয়ে বোলপুর পেরিয়ে এক জঙ্গলে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে হরিণ শিকার করেছেন এককালে। সে হরিণের মাংস আমরা খেয়েছিলাম। তখনও এত কড়াকড়ি, নিষেধাজ্ঞা ছিল না। কিন্তু কথা হল, বাবার খুব প্রিয় এই জিপগাড়ি বাবা বেচে দিয়ে কিনেছিলেন নিকন ক্যামেরা। একার্থে শর্মিলা ঠাকুরই কিন্তু বাবাকে প্রফেশনাল ফোটোগ্রাফার করে তুলেছিলেন।

যদিও ‘প্রফেশনাল’ বলতে যা বোঝায়, বাবা ঠিক সেই ‘সেলেব’ গোছের জীবনধারণে বিশ্বাসই করেননি কোনওদিন। আমাদের বাড়িতে একতলায় বড় ঘরে তাস খেলা হত। বাবা উপস্থিত না-থাকলেও। কারা আসতেন সেই আড্ডায়? রবি ঘোষ, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, নাটকের আরও কত যে তাবড় তাবড় মানুষ! প্রোডাকশনের ভানুজেঠু রোজ আসতেন। আমাদের সঙ্গেও দেখা করতেন। ভানুজেঠুর সঙ্গে থাকলে কেউ কিছু বলতেন না। বাবার শাসন বলতে এইটুকুই। এমনকী, মনে আছে, তখন আমি একটু-আধটু ছবি তুলছি, একদিন অনিল কাপুর এসেছিলেন পাড়ায়। রকে বসে আছেন। বাবা যেতে দেননি ছবি তুলতে। বলেছিলেন, ‘বারান্দা দিয়ে দেখো।’ তখনও অবশ্য বাবার কাছে গ্র্যাজুয়েশনের পাসপোর্ট দেখাতে পারিনি। পুরনো সময়ে লোকজন বোধহয় খানিক এইরকমই ছিলেন।

………………………………………..

একবার আনোয়ার শাহ রোডে, আমার স্টুডিওয় ছবি তুলছি। কলকাতায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ মডেলের ছবি। বাবা জানতেন না তখন আমি যে প্রেম করি। মডেলের ছবি তুলছিলাম, তাকে সম্বোধন করছিলাম ‘তুমি’ করে। বাবা বাইরে ডেকে বললেন, ‘শোন, মডেলদের তুমি করে বলবি না, হয় আপনি নয় তুই।’ আমি আজও চট করে ‘তুমি’ বলি না কাউকে।

………………………………………..

’৬৮ সালে ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ দেখতে গিয়েছি। বিজলী সিনেমার একতলায় ডানদিকের দরজা দিয়ে ঢুকে শেষে বাঁদিকের প্রথম তিনটে সিটে বসেছি দাদা, আমি আর বোন। আলাদা করে কোনও ট্রিটমেন্ট নেই। দেখতে পাচ্ছি, এই বাবার ভাগ্যি ভালো। তিনজনেই হলুদ চেক চেক। বোন ফ্রক, আমরা শার্ট। তখন প্রথম জানতে পারলাম বাবা কী করে! বাবা ছবি তোলে!

বাজার করতে খুবই ভালোবাসতেন বাবা। আমাকে প্রায়শই নিয়ে যেতেন। বাবার জন্মদিন ২৫ বৈশাখ। বড়ছেলের জন্য সেদিন অবশ্যই গলদা চিংড়ি আনাতেন ঠাকুমা! মাকে দিয়ে রান্না করাতেন। বাবার জন্মদিন মানেই একটা অন্যরকম সেলিব্রেশন। পরবর্তীকালে আমরাও সেই রেওয়াজ ধরে রেখেছিলাম। আমি মুম্বই থেকে ২৫ বৈশাখে ফিরে এসেছি, এমনও হয়েছে।

ঠাকুরে বিশ্বাস না-করা আমার বাবা, পাড়ার কালীপুজোর কমিটিতে অবশ্য ছিলেন। কালীপুজোর পরে, যে উৎসব-অনুষ্ঠান হত, বেশিরভাগ অতিথিই আসতেন বাবার যোগাযোগে। সেই সূত্রেই এসেছিলেন ফিরোজা বেগমও। এসেছিলেন আমাদের বাড়িতেও।

আরও পড়ুন, কলকাতায় আলোকচিত্রের গোড়ার কথা
কলকাতায় যখন ক্যামেরা এসেছিল শিল্পীরা তখনও সংকটে পড়েননি

মানিকজেঠুর একটা গপ্প বলি। ওঁর প্রিয় রেস্তরাঁর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘স্কাইরুম’। আমি দু’বার গিয়েছিলাম স্কাইরুমে। একবার বাবুদার (সন্দীপ রায়) বিয়ের পর, আরেকবারের গল্প আপনাদের এখন বলছি। বাবা কোনও একটা কারণে সেবার মানিকজেঠুকে খাওয়াচ্ছেন। আমাদের বাড়িতে রেস্তরাঁর কালচার ছিল না। এমনকী, বছরে একদিন কি দু’দিন চিকেন রান্না হত। রান্না করতেন আমার মা। খাওয়া হত কলাপাতায়। এবং কলাপাতা ফেলে আসতে হত বাড়ির বাইরে, আবর্জনায়। ঘোর বৈষ্ণব ছিলেন ঠাকুমা-দাদু, ফলে এইসব নিয়মকানুন ছিল। এহেন পরিবেশে তখন মাছ খেয়ে খেয়ে আমার মুখ মেরে গিয়েছে। চিকেনের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই দুর্বলতা বেশি। কিন্তু স্কাইরুমে খেতে যাওয়ার আগে বাবা পইপই করে বলে দিয়েছিলেন, ‘তুমি মাছ খাবে।’ কারণ রেস্তোরাঁর ‘এটিকেট’ আমি জানতাম না। তখন আজকের মতো এত ‘বোনলেস’ ওঠেনি। ফলে চিকেনে কাঁটা চামচ গাঁথতে গিয়ে ছিটকে যায় যদি! তখন একটা যাচ্ছেতাই হবে! বাবা জানতেন, খাবারের ব্যাপারে মানিকজেঠুই জিজ্ঞেস করবেন আমাকে। সেরকমই ঘটেছিল সেদিন স্কাইরুমে। ভাগ্যে জুটেছিল মানিকজেঠুর বেছে দেওয়া একরকমের মাছের পদ। নাম এখন আর মনে নেই। তবে গ্রেভি দেওয়া মাছের উপাদেয় প্রিপারেশন ছিল সেটা। বাবা কী পরিমাণ সচেতন ছিলেন মানিকজেঠুর খুঁটিনাটি ব্যাপারে, তা বোঝাতেই এই গপ্পখানা বললাম।

একবার আনোয়ার শাহ রোডে, আমার স্টুডিওয় ছবি তুলছি। কলকাতায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ মডেলের ছবি। বাবা জানতেন না তখন আমি যে প্রেম করি। মডেলের ছবি তুলছিলাম, তাকে সম্বোধন করছিলাম ‘তুমি’ করে। বাবা বাইরে ডেকে বললেন, ‘শোন, মডেলদের তুমি করে বলবি না, হয় আপনি নয় তুই।’ আমি আজও চট করে ‘তুমি’ বলি না কাউকে।

নিমাই ঘোষ ও শিবানী ঘোষ, লেখকের তোলা ছবি

এককালে বাড়ির কাজের মেয়েরা, ভালো বাংলায় ‘গৃহসহায়িকা’দের নিয়ে সমাজে একরকম ধারণা ছিল যে, তাঁরা দেখতে কোনওভাবেই ‘সুন্দর’ হতে পারেন না। এখন সে ধারণা কেটেছে। বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন তাঁদের ভেতরকার সৌন্দর্যকে ছবিতে কী করে দেখব, দেখাব। আয়নার সামনে তিনি নিজেকে তো সুন্দরই দেখছেন, তাহলে ক্যামেরার সামনেও সেই রূপটা আমরা তুলে ধরতে পারি– বিশ্বাস জুগিয়েছিলেন বাবা। পরে, ঋতুপর্ণ ঘোষের একটা বিজ্ঞাপনের ছবি করছিলাম। শুট হচ্ছিল আমার স্টুডিওতে। জুনের শেষদিক। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। স্টুডিওতে অনেকেই উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু কে মডেল আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না সেদিন। তিনি সুবর্ণা। গায়ের রং ময়লা। কালো পাড়ের শাড়ি পরেছিলেন। উনি যে মডেল হতে পারেন, কেউ বিশ্বাস করেননি প্রথমে। ওঁর ছবি তুলে যখন পোলারয়েডে দেখালাম, অশোক মেহতা তখন পিঠ চাপড়ে দিলেন। বাবা-ই তো এ সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তার আগে ভাবিনি যে মডেল এই রকমও হন। একার্থে ‘নন-গ্ল্যামারাস’ এক মহিলা! কিন্তু কী দুরন্ত হয়েছিল সেই বিজ্ঞাপনটা! পরবর্তীকালে অনেক বিজ্ঞাপনেই তিনি কাজ করেছিলেন।

আরেকবার কুকমির তিনদিনের অ্যাসাইনমেন্ট পেয়েছি। সন্ধেবেলায় হত শুটিং। প্রথম দিনে প্রোডাক্টের ছবি। দ্বিতীয় দিন রান্না করা খাবারের ছবি। তৃতীয় দিনে ছিল মডেলের ছবি। এই তিনদিনই বাবা এসেছিলেন আমার স্টুডিওতে। রাত সাড়ে ন’টার সময়। বাড়ি ফিরতাম কাজের শেষে, একসঙ্গে। প্রথম দিন যখন এসেছিলেন, ঘরভর্তি সিগারেটের ধোঁয়া। কিছু বলেননি। দ্বিতীয় দিন যখন এসেছিলেন, দেখেছিলেন আমাকে সিগারেট খেতে। মাথাতেই নেই যে, বাবা আসবেন! তখন বড় হওয়ার ইচ্ছে, বিজ্ঞাপনের দুনিয়াকে দেখার ইচ্ছে। ফলে ছবি তোলাতেই মেতে রয়েছি। বাবা সেদিনও কিছুই বলেননি। তৃতীয় দিন– এদিন মডেল শুট। দরজা খুলেছি মুখে সিগারেট নিয়ে, দেখি বাবা! বাবা সেই প্রথম বললেন, ‘আমি তো কই সিগারেট খাই না, সিগারেট না খেলে কি ক্রিয়েটিভ কাজ বেরয় না?’

নিমাই ঘোষ ও সত্যজিৎ রায়, লেখকের তোলা ছবি

বাবার তোলা মানিকজেঠুর ছবি আজও দেখলে মনে হয়, নতুনভাবে সত্যজিৎ রায়কে দেখছি। একটা ফ্রেশ দেখার চোখ আছে তাতে। অন্য অনেকেই তো সত্যজিতের ছবি তুলেছেন। কিন্তু এতটা জনপ্রিয় হয়েছে কি সেইসব? আগেই বলেছি, নিজস্ব একটা কম্পোজিশন ছিল বাবার। ‘সাইট অ্যান্ড সাইন্ড’-এ যখন প্রথম ছবি বেরিয়েছিল, কী প্রচণ্ড আনন্দ পেয়েছিলেন! মজার ব্যাপার, একটু ক্রিটিক্যালি যদি দেখি– বাবার তোলা মানিকজেঠুর ছবির মধ্যে যে বডি ল্যাংগুয়েজ, যে চার্ম ধরা আছে, তা বাবার তোলা উত্তমকুমারের ছবির মধ্যেও নেই। বাবা উত্তমকুমারের ছবি তুলেছেন অনেক দেরিতে। আর সত্যি বলতে, মানিকজেঠুর সঙ্গে যতদিন মিশেছেন, উত্তমকুমারের সঙ্গে অতদিন মেশেননি। ফলে বাবার ছবিতে যে আলো-ছায়া, তা সেভাবে ফোটেনি। কিন্তু নিঃসন্দেহে সে ছবি ভালো।

বাবার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বাবার মৃত্যুর আগেই। আমি তখন থাকি মুম্বইতে। পূর্ণেন্দু পত্রীর ছেলে পুণ্যব্রত পত্রী আমাকে ফোন করে বললেন, ‘তোমার বাবা চলে গিয়েছেন খবর পেলাম, আমার কনডোলেন্স রইল।’ আমি একটু চমকালাম। মা এখনও আমাকে জানালেন না! আমি ফোন করা শুরু করলাম বাবার নাম্বারে। পেলাম না। মাকে ফোন করলাম। মা বললেন, ‘বাবা তো পাশের ঘরে কথা বলছে।’ এরও আধঘণ্টা পরে আমি বাবাকে ফোনে পেলাম। প্রথম যে কথাটা বলেছিলাম, তা হল, ‘তুমি খুব লাকি।’

আরও পড়ুন, সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় মিষ্টান্ন ব্যবহার নিয়ে
সত্যজিতের ‘মিষ্টি’যোগ

কেন বলেছিলাম জানেন? কারণ পৃথিবীতে এমন মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়, যাঁরা নিজের মৃত্যুসংবাদ দেখে যেতে পারে। আমমানুষের যে উত্তেজনা, যে শ্রদ্ধা, বাবা দেখে গিয়েছেন ওঁর মৃত্যুর ২ বছর আগেই। আমাকে অনেকে বলেছেন সেই সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে কেস করতে। আমি করিনি। আমি মনে করেছি বাবা অসম্ভব ভাগ্যবান।

বাবা মারা যান কোভিডের সময়। আসতে পারিনি মুম্বই থেকে, চলাচল বন্ধ। বাবার অস্থি রেখে দিতে বলেছিলাম। বাবার অস্থি বিসর্জন দিয়েছিলাম বেনারসে, কেদার ঘাটে। পরে, মায়ের অস্থিও সেই ঘাটেই।

[এ লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত সমস্ত আলোকচিত্র লেখকের সূত্রে প্রাপ্ত]