Robbar

মাধব গাডগিলই প্রথম কম্পিউটার সায়েন্সের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন জীববিদ্যাকে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 9, 2026 5:41 pm
  • Updated:January 9, 2026 5:41 pm  

পুনেতে থাকাকালীন আশপাশের অঞ্চলের ‘সেক্রেড গ্রোভ’-র ক্ষেত্রসমীক্ষা করার সময় প্রান্তিক, উপজাতীয় মানুষের অরণ্য ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণের পরম্পরা তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সারাজীবন ধরে উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে, সেই পরম্পরাকে মাধব নথিভুক্ত করেছেন এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ হিসাবে প্রয়োগ করতে চেয়েছেন। IISc-তে নিজের গবেষণার পাশাপাশি তিনি আধুনিক ইকোলজি-র বিভিন্ন বিভাগে বিশ্বমানের গবেষণা ও শিক্ষাদানের জন্য ‘সেন্টার ফর ইকোলজিক্যাল স্টাডিজ’ (CES) গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠার এক দশকের মধ্যেই, তাঁর নেতৃত্বে এই সেন্টার ভারতের সেরা ও বিশ্বের অন্যতম ইকোলজি, হিউম্যান ইকোলজি, অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ার ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ব্যবস্থা-সংক্রান্ত গবেষণা ও প্রয়োগের পীঠস্থান হয়ে ওঠে।

শীলাঞ্জন ভট্টাচার্য

মাধব ধনঞ্জয় গাডগিল ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, রাত ১১টায় স্বল্পকালীন অসুস্থতার পর, পুনের এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩। সংবাদমাধ্যমের দৌলতে ইদানীং দেশের সাধারণ পরিবেশ সচেতন মানুষ তাঁকে মূলত ‘Western Ghats Ecology Expert Panel’ (WGEEP)-র (যা ‘গাডগিল কমিটি’ নামে বেশি পরিচিত) চেয়ারম্যান হিসাবে চিনলেও, গত পাঁচ দশক ধরে ভারতের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে চিহ্নিত করা থেকে, সমাধানের পথ খোঁজা-র ক্ষেত্রে মাধব গাডগিল ছিলেন অগ্রগণ্য ও মানবিক মুখ!

মাধব ধনঞ্জয় গাডগিল

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ পিতা ধনঞ্জয় রামচন্দ্র গাডগিলের কনিষ্ঠ পুত্র মাধব, তাঁর বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন স্বাধীনভাবে ভাবার অভ্যাস ও মানুষকে ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সমান চোখে দেখার শিক্ষা। ইশকুল সিলেবাসের বাইরে পুনের পৈতৃক বাড়ির হাজার কয়েক বইয়ের লাইব্রেরি থেকে নিয়মিত নিজের খুশিমতো বই, পত্রপত্রিকা পড়া তাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডার ও নিজস্ব ধ্যানধারণা গড়ে তুলেছিল। আত্মীয়সমা প্রতিবেশী, বিখ্যাত অ্যান্থ্রোপোলজিস্ট ইরাবতী কার্বে মাধব গাডগিলকে ইশকুলে পড়াকালীনই ক্ষেত্রসমীক্ষায় নিয়ে যেতেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে পর্যবেক্ষণের যে ক্ষমতা পরবর্তীকালে তাঁকে ইকোলজি ও কম খরচে প্রকৃতি সংরক্ষণ-সংক্রান্ত সফল ক্ষেত্রসমীক্ষায়, যেমন বিশেষভাবে পারদর্শী করে তুলেছিল, তেমনই প্রান্তিক, উপজাতীয় মানুষরা তাঁর মরমি চিন্তাজগতের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যায়।

বাবার সঙ্গে ছোটবেলার থেকেই বন-পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো, পাখি দেখার মাধ্যমেই তাঁর চিত্তে প্রকৃতি-প্রেম গেঁথে গিয়েছিল; বাবার বন্ধু, বিখ্যাত পক্ষীবিদ সেলিম আলির উৎসাহ সেই প্রেমকে প্রায় নেশায় পরিণত করে। অতএব, ভালো রেজাল্ট করে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েও স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে মাধব বেছে নেন প্রাণীবিদ্যাকে। কিন্তু, জীববিদ্যার আদ্যিকালের সিলেবাস, তার বাইরে ছাত্রদের মুক্তচিন্তা আর অনুসন্ধিৎসার প্রতি অধ্যাপকদের অ্যালার্জি, তাদের ওপর প্রভুসুলভ গুরুগিরি, মাধবকে এ দেশে জীববিদ্যার প্রথাগত অধ্যয়নের উপর বিতৃষ্ণ করে তোলে। বম্বে ইউনিভার্সিটিতে স্নাতকোত্তর প্রজেক্টে একটি আমোদি মাছের জীবনচক্র নিয়ে নিজের উৎসাহে গভীরভাবে ক্ষেত্রসমীক্ষা করাকালীন ভাগ্যক্রমে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি-র এক মৎস্যবিজ্ঞানী প্রফেসরের সঙ্গে যোগাযোগ হয় এবং হার্ভার্ডে পিএইচডি করার সুযোগ জোটে। সেখানে যাওয়ার আগেই বিয়ে করেন কলেজ জীবনের বন্ধু সুলোচনা-কে। সুলোচনাও ততদিনে হার্ভাডে গণিত নিয়ে পিএইচডি করার জন্য সুযোগ পেয়ে গিয়েছেন।

পক্ষীবিশারদ সেলিম আলি

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন সেখানকার মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা, ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মাধব গাডগিলকে মুগ্ধ করেছিল, ভারতে ফিরে তিনি নিজের কর্মস্থলে ও অন্যত্র সেই মুক্ত শিক্ষা-পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সচেষ্ট ছিলেন। হার্ভার্ডে মেধা ও চিন্তাশক্তির স্বতঃস্ফূর্ততা মাধবকে জগদ্বিখ্যাত বিবর্তনবাদী জীববিদ এডওয়ার্ড উইলসনের প্রিয় ছাত্র করে তোলে। তাঁরই উৎসাহে মাধব গাডগিল হার্ভার্ডের কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টে উইলিয়াম বোসার্টের তত্ত্বাবধানে তাত্ত্বিক ইকোলজিকাল সমস্যা-র গাণিতিক মডেল তৈরির গবেষণা শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে মাধব আইবিএম-ফেলো হিসাবে গবেষণা শেষ করেন ও পিএইচডি ডিগ্রি পান। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম, যিনি কম্পিউটার সায়েন্স-এ জীববিদ্যার বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন। সারা পৃথিবীতেই তখন সেরকম গবেষকের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। তাঁর এই গবেষণা তাত্ত্বিক ইকোলজির নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করে। গবেষণাপত্রগুলি ‘ক্লাসিক’ বলে টেক্সট বইয়ে স্থান পেতে শুরু করে। পিএইচডি করার সঙ্গে সঙ্গেই হার্ভার্ডে জীববিদ্যা বিভাগে পূর্ণ-শিক্ষক হিসেবে মাধব যোগ দেন। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই তিনি স্বদেশে ফিরে কর্মজীবন শুরু করা মনস্থির করেন। স্বাজাত্যবোধ ও ভারতের অনন্য জীববৈচিত্রর প্রতি আত্মিক টান তাকে ভারতে ফিরিয়ে আনে।

দেশে ফিরে মাধব প্রথম পুনের আগারকর রিসার্চ ইন্সটিটিউটে এবং পরবর্তীকালে ব্যাঙ্গালোরের ‘ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স’-এ (IISc) গবেষক ও অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। পুনেতে থাকাকালীন আশপাশের অঞ্চলের ‘সেক্রেড গ্রোভ’-র ক্ষেত্রসমীক্ষা করার সময় প্রান্তিক, উপজাতীয় মানুষের অরণ্য ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণের পরম্পরা তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সারাজীবন ধরে উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে, সেই পরম্পরাকে মাধব নথিভুক্ত করেছেন এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ হিসাবে প্রয়োগ করতে চেয়েছেন। IISc-তে নিজের গবেষণার পাশাপাশি তিনি আধুনিক ইকোলজি-র বিভিন্ন বিভাগে বিশ্বমানের গবেষণা ও শিক্ষাদানের জন্য ‘সেন্টার ফর ইকোলজিক্যাল স্টাডিজ’ (CES) গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠার এক দশকের মধ্যেই, তাঁর নেতৃত্বে এই সেন্টার ভারতের সেরা ও বিশ্বের অন্যতম ইকোলজি, হিউম্যান ইকোলজি, অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ার ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ব্যবস্থা-সংক্রান্ত গবেষণা ও প্রয়োগের পীঠস্থান হয়ে ওঠে।

বক্তৃতারত মাধব গাডগিল

রাঘবেন্দ্র গাদাগকর, রামন সুকুমারের মতো বিশ্বখ্যাত জীববিজ্ঞানীদের গবেষণা জীবন শুরু হয়েছিল মাধব গাডগিলের উৎসাহ ও তত্ত্বাবধানে। ২০০৪ সালে অবসর নেওয়ার দিন পর্যন্ত মাধব গাডগিল CES-এ কাজ করে গিয়েছেন। এই পর্যায়ে তাঁর অজস্র কাজের মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য হল– নীলগিরি পার্বত্য অঞ্চলে দেশের প্রথম বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের পরিকল্পনা, সমগ্র পশ্চিমঘাট পার্বত্য অঞ্চলের অনন্য জীববৈচিত্রকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে ওই অঞ্চলে সংরক্ষণের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করা, প্রান্তিক মানুষের সেক্রেড গ্রোভ ও অন্যান্য জীববৈচিত্রের সংরক্ষণমূলক পরম্পরার বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক যুক্তিকে তথ্য ও তত্ত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা, রামচন্দ্র গুহ-র সঙ্গে ‘The Fissured Land’ বইটি লিখে ভারতীয় ইকোলজিক্যাল ইতিহাস চর্চার একটা বৈজ্ঞানিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা, হিউম্যান ইকোলজি গবেষণার ভিত্তিস্থাপন ইত্যাদি।

২০০২ সালে রিও-তে অনুষ্ঠিত আর্থ-সামিটে জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও তার সুস্থিত ব্যবহার এবং স্থানীয় মানুষের সহায়তায় জীববৈচিত্র-র নথিকরণ, সংরক্ষণ ও সুস্থিত ব্যবহার নিশ্চিত করার পদ্ধতি প্রণয়ন ইত্যাদি।

IISc থেকে অবসর নিয়ে মাধব গাডগিল পুনেতে ফিরে যান, কিন্তু তাঁর কর্মোদ্যম অব্যাহত ছিল। এ পর্যায়ে তাঁর কাজগুলির মধ্যে সবথেকে পরিচিত হল ‘গাডগিল কমিটি রিপোর্ট’। তাঁর এবং অন্যান্য বহু মানুষের লেখালেখি ও আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হয়, ‘বায়োডাইভার্সিটি হটস্পট’ হিসাবে চিহ্নিত পশ্চিমঘাট পার্বত্য অঞ্চলে উন্নয়নের নামে যথেচ্ছ বন, জীববৈচিত্র ও পরিবেশ ধ্বংসের ওপর কিছুটা রাশ টানার উদ্যোগ নিতে। অর্থকরী উৎপাদনের জন্য নেওয়া কোনও প্রকল্প যাতে পশ্চিমঘাটের অনন্য জীববৈচিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যাপক ধ্বংসের কারণ না হয়ে ওঠে, তার পথ বাতলাতে ২০১০ সালে মাধব গাডগিলকে চেয়ারম্যান করে গঠিত হয় ‘WGEEP’। ২০১১ সালের আগস্ট মাসে এই গাডগিল কমিটি যে রিপোর্ট দেন, তাতে সুস্পষ্টভাবে পশ্চিমঘাটে উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ওপর স্থানীয় অধিবাসী ও প্রান্তিক স্থানীয় মানুষের নিয়ন্ত্রণের যুক্তিযুক্ত অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়। পশ্চিমঘাট যে ক’টি রাজ্যের অন্তর্গত, সেখানকার তৎকালীন সরকার এবং বিভিন্ন বৃহৎ বাণিজ্যিক সংস্থাদের চাপে কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হয় গাডগিল রিপোর্ট বাতিল করে নতুন কমিটিকে দিয়ে প্রতিবাদীদের অনুকূল রিপোর্ট তৈরি করাতে।

তাঁর জীবৎকালের শেষদিন পর্যন্ত মাধব গাডগিল সোচ্চার ছিলেন ভারতের প্রতিটি অংশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র ও তার ওপর স্থানীয় প্রান্তিক মানুষের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে। দেশ ও বিশ্বের প্রায় প্রতিটি সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। কিন্তু, মনে করতেন ভারতের সর্বত্র প্রান্তিক, উপজাতীয় মানুষদের থেকে পাওয়া ভালোবাসা তাঁর সেরা পুরস্কার। মুনাফালোভীদের উন্মত্ত ধ্বংসলীলায় আজ বিপন্ন এ সময়ে যখন সমগ্র পৃথিবীর ও ভারতের পরিবেশ, জীববৈচিত্র ও প্রান্তিক মানুষ সবথেকে বিপদগ্রস্ত তখনই মাধব গাডগিলের নির্ভীক কণ্ঠ বয়সোচিত কারণে স্তব্ধ হল। এবার তাঁর পতাকা তুলে নেওয়ার দায়িত্ব বয়ঃকনিষ্ঠ অনুগামীদের।