বাংলা ডায়াস্পোরার একজন সাহিত্যিক-গবেষকের জীবনের অন্দরমহলের ছবি কেতকী যদি এমনভাবে তুলে না ধরতেন, তবে আমাদের জানাই হত না হয়তো। তবে শুধু তো চ্যালেঞ্জে নয়, প্রাপ্তিও আছে, আত্মপ্রকাশের তৃপ্তি, এক ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে আর এক ভাষা ও সংস্কৃতির শরীরে মিশে যাওয়ার আনন্দ। কেতকী বলেন, ‘… মনে হয় আমি একটা জীবন্ত সেতু, দুটো কূল ছুঁয়ে আছি।’ জীবন্ত সেতু হওয়ার কিছু জ্বালাযন্ত্রণা আছে, কিন্তু একটা বিরল আনন্দও আছে। দূরকে নিকট করার, পরকে স্বজন করার অনাবিল আনন্দের কাছে বাকি সব অর্থহীন।
কেতকী কুশারী ডাইসনের জন্ম ১৯৪০-এ, কলকাতায়। তবে তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্যের শিকড়বাকড় পূর্ববঙ্গে এবং সেখানকার বাল্যস্মৃতি বহুদিন পর্যন্ত তাঁর মনে উজ্জ্বল ছিল। বাবা অবনীমোহন কুশারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন, কর্মজীবনে সরকারি আমলা। মায়ের বিবাহপূর্ব নাম ছিল অমিতা দাশগুপ্ত, সেই আমলের গ্র্যাজুয়েট এবং এঁদের বিবাহ ছিল অসবর্ণ, যা বেশ আলোড়ন তুলেছিল সমকালে। কেতকীর প্রথম যৌবন পর্যন্ত পড়াশোনা, বড় হয়ে ওঠা কলকাতায়। রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর পরবর্তী কবিগোষ্ঠী বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখের উত্তরাধিকার তখন থেকেই তাঁর চেতনায় দৃঢ়নিবদ্ধ। ১৯৫৮-তে ১৮ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বি.এ পাশ করার পর ১৯৬০-এ যখন উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি অক্সফোর্ডে যান, তার আগে থেকেই বাংলা সাহিত্যের একজন উদীয়মান কবি হিসেবে তিনি খ্যাতিলাভ করেছেন। অক্সফোর্ডে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে সামান্য কিছুদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনার পর বিবাহসূত্রে ইংল্যান্ডে ফিরে যান ১৯৬৪ সালে। ১৯৬৫ থেকে তিনি ব্রিটিশ নাগরিক। অক্সফোর্ড থেকেই ডক্টরেট করেছেন। স্বল্প সময়ের জন্য কখনও-কখনও অধ্যাপনা করলেও জীবনের অধিকাংশ সময়ে তিনি পূর্ণকালীন লেখক ও গবেষক।

কেতকী সেই বিরল ও ব্যতিক্রমী লেখকদের একজন যিনি ইংরেজি এবং বাংলা– দু’টি ভাষাতেই সমান দক্ষতার সঙ্গে লিখেছেন। উপন্যাস, কবিতা, নাটক, সমালোচনা, গবেষণাধর্মী রচনা, অনুবাদ প্রভৃতি সাহিত্যের বিভিন্ন জঁরে তাঁর অনায়াস পদচারণা। কবিতা-প্রবন্ধ-গবেষণাগ্রন্থ দু’টি ভাষাতেই তিনি লিখেছেন, অনুবাদের কাজ করেছেন দু’টি ভাষাতেই। তবে উপন্যাস, গল্প, নাটক শুধুমাত্র বাংলাতেই। কেতকী মনে করেন, প্রত্যেক ভাষাই পৃথিবীকে দেখার এক একটি জানলা, যার মধ্যে একটি জীবনদর্শন ধরিয়ে দেওয়া থাকে। আবার সেই ভাষা স্থিতিশীল নয়, নিয়ত সঞ্চরমাণ।

ফলত, কোনও একটি বিশেষ ভাষার আধারে যখন ভাবনাকে প্রকাশ করা হয়, তখন সেই ভাবনা মূর্ত হয়ে যে চরিত্রটি লাভ করে– অন্য কোনও ভাষায় লিখলে ঠিক তা সম্ভব ছিল না। এযাবৎকাল পর্যন্ত মৌলিক রচনা এবং অনুবাদ-সহ তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩৭। বাংলায় কবিতা লেখা শুরু অনেক অল্পবয়স থেকে। যখন অক্সফোর্ডে পড়তে গিয়েছেন, সেই সময়েই তাঁর কবিতা নিয়মিত এক জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি পত্রিকায় ছাপা হত। ইংরেজিতে কবিতা লেখা শুরু সেই দেশটিতে পাকাপাকিভাবে বাস করতে শুরু করার পর। তখন ইংরেজি তাঁর কাছে আর শুধুমাত্র সাহিত্যের ভাষা নয়, তাঁর ঘরে-বাইরের ভাষা, প্রাত্যহিক দিনযাপনের ভাষা। কেতকী বলেন, ‘A combination of circumstances gradually conspired to shape me as a bilingual poet. I was living my adult life amongst people who spoke English as a mother tongue; my children were growing up, and English was the language of my new home; I was interacting with the other young mothers whose children were going to the same school as mine. The natural poet in me felt the need to express myself at a deeper level in English.’ (‘The Practice of Bilingualism in Literary Writing: A Personal Perspective’ Indian Writing in English: Yesterday, Today and Tomorrow, Ed. Pranati Dutta Gupta and Sarmistha Dey, Published by Vivekananda College, Kolkata, January 2006)

কেন কবিতা এবং গবেষণাগ্রন্থ ইংরেজিতে, কেন উপন্যাস বা নাটক নয়, সেই প্রসঙ্গে এই প্রবন্ধেই জানান, ‘ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্য’ নামে যে বিশ্বব্যাপী সাহিত্যের ‘বাজার’– তিনি তার অংশ হতে চাননি। যে কোনও বাজারের মতো এক্ষেত্রেও চাহিদা এবং জোগানের নির্দিষ্ট হিসেব আছে। কবিতা এবং গল্প-উপন্যাসের পাঠক যে আলাদা হবে সেকথা হয়তো সকলেরই জানা, কিন্তু ডায়াস্পোরার অবস্থান থেকে লিখলে তার তাৎপর্য বদলে যায়, তখন আসে বিশ্ববাজারের পরিসর। বৃহৎ প্রকাশনা সংস্থার চাপ বা দাবির কাছে চুক্তিবদ্ধ লেখক মাথা নোয়াতে বাধ্য হন, কম্প্রোমাইজ করেন। আখেরে লক্ষ্মীলাভ হয়তো হয়, কিন্তু সেই লেখাটা আর কোনও দিনই লেখা হয় না, যে কারণে তাঁর লেখক হতে চাওয়া। প্রলোভনটা জয় করা কিন্তু খুব কঠিন।


তিনি সেই বাঙালিদের একজন নন যাঁরা উচ্চশিক্ষিত, পেশাদার, যাঁদের ইংল্যান্ড, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হওয়ার কারণ উচ্চ আয় এবং জীবনযাত্রার উন্নত মান, যাঁদের বাঙালিয়ানা বাৎসরিক বঙ্গসম্মেলন অথবা দুর্গাপুজোর আয়োজনে কিংবা রবীন্দ্রসংগীত ও বাঙালি রান্না সহযোগে সপ্তাহান্তিক গোষ্ঠীসুখ উপভোগে। তিনি সেই বাঙালিদের দলেও পড়েন না– যাঁরা প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী, লেখালিখি করেন প্রধানত ইংরেজিতে, বাংলা বোঝেন, বলতে বা পড়তেও হয়তো পারেন, কিন্তু সেই ভাষায় সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষমতা তাঁদের নেই, সম্ভবত সেই ইচ্ছেও নেই, যদিও বাঙালি জীবনের নানা প্রসঙ্গ অনুষঙ্গে ভরপুর তাঁদের লেখা।

সুতরাং, ডায়াস্পোরার বাঙালি হিসেবে এবং লেখক হিসেবে কেতকী কোনও গোষ্ঠীর মধ্যে পড়েন না। তিনি স্বভাবত স্বতন্ত্র। ব্রিটিশ জীবনের অন্দরে থাকা তাঁর বাঙালি সত্তাকে অবয়ব দিতে, মূর্ত করতে বাংলা ভাষারই প্রয়োজন। তাঁর উপন্যাসের চরিত্র নোটন, অনামিকা, তিসি বা নাটকের চরিত্র দেয়া, বিবি, ইলা বা লিপির মধ্যে তাঁর উপস্থিতি হয়তো অত্যন্ত স্পষ্ট, হয়তো লেখিকা এবং তাঁর চরিত্রের মাঝের ব্যবধানটি একটি অর্ধস্বচ্ছ পর্দার। যেটা ক্ষণে ক্ষণে সরে যায়। একে কেউ প্লট নির্মাণের দুর্বলতা বলে ভাবতে পারেন, কেতকী কিন্তু একাধিক জায়গায় জানিয়েছেন, নিটোল প্লট সাজানোয় তাঁর আগ্রহ নেই। তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি এবং দর্শনকে ব্যক্ত করতে, রূপ দিতেই তিনি লেখেন। জঁর যাই হোক, কবিতা থেকে গবেষণা– সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য একথা। তাই বোধহয় বিভিন্ন জঁরের মধ্যে মিশ্রণও ঘটাতে পারেন অনায়াসে, বা তিনি তা ঘটান না, স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা মিলে যায় পরস্পরের সঙ্গে। কেতকীর ডায়াস্পোরার জীবন ও সাহিত্য-গবেষণা পরস্পর পরিপূরক, একটি থেকে আরেকটির দিকে এগিয়েছেন তিনি। বাংলা ডায়াস্পোরার সাহিত্য সম্পর্কে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আলোচনা করেন তিনিই প্রথম। একুশ শতকের দুয়ের দশকে পৌঁছেও অনেকে যেখানে বাংলা ডায়াস্পোরার সাহিত্যের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান, কেতকী সেখানে ১৯৯৬-তে লেখা একটি প্রবন্ধে নিজের অভিবাসী কবিজীবন সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেন। স্পষ্টতই সেখানে লেখেন তিনি, ‘অভিবাসনের দরুন আমার জীবনের নকশায় যে জটিলতা, সেটা নিশ্চয়ই আমার লেখায় প্রতিফলিত হয়।’ (‘একজন অভিবাসী কবির জীবন: কিছু ব্যক্তিগত কথা’, একবিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রচর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ)

১৯৯৯-তে ব্যবহার করলেন ‘ডায়াস্পোরা’ শব্দটি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে আয়োজিত বাঙালিদের একটি সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতায়, যা পরে প্রবন্ধের আকারে প্রকাশিত হয় ‘জিজ্ঞাসা’, ২০:৩, ১৪০৬ (১৯৯৯-২০০০)-এ। এখানে তিনি সারা পৃথিবীতে বিকীর্ণ বাঙালিদের মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চার বিভিন্ন প্রয়াসের একটি সামগ্রিক ছবি তুলে ধরেছেন, উপনিবেশের কাল থেকে শুরু করে তাঁর সময় পর্যন্ত, দক্ষ আঁচড়ে আঁকা রেখাচিত্রের মাধ্যমে। কিন্তু তিনি ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ করেছেন, ভারতের ভেতরের বা বাইরের অ্যাকাডেমিক জগতে, গবেষকমহলে ডায়াস্পোরার সাহিত্য সম্পর্কে ইদানীং প্রচুর উৎসাহ দেখা গেলেও সে সবই ইংরেজি ভাষায় লেখা সাহিত্য সম্পর্কে, বাংলায় লেখা নিয়ে আগ্রহ প্রায় শূন্যের কোঠায়। কেতকী জানান, কেরিয়ার কিংবা অর্থ উপার্জনকে ‘ব্যাকসিটে’ রেখে ডায়াস্পোরিক অবস্থান থেকে মাতৃভাষায় লেখার আদর্শকে আঁকড়ে বাঁচতে গেলে বিলেত-আমেরিকার বাঙালি গোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়, কারণ তাদের জীবনধারার ছাঁদটাই আলাদা। অন্যদিকে, সুদূর একটি দেশের প্রকাশক, সম্পাদক, পাঠক, সমালোচকদের সঙ্গে আদানপ্রদান বা মোকাবিলা চালাতে হয় নিরন্তর, নিজের লেখালিখি, গৃহকর্ম এবং অন্যান্য সাংসারিক দায়দায়িত্বের পাশাপাশি। আর এই যোগাযোগ বা আদানপ্রদান মোটেই সহজ ছিল না বহুদিন পর্যন্ত, ছিল না ই-মেল কিংবা সস্তার টেলিফোন; একমাত্র অবলম্বন চিঠি, ছিল তার জন্য প্রতীক্ষা এবং অপ্রাপ্তি। কারণ, ক’জন পাঠকই বা উদ্যোগী হয়ে লেখকের বিদেশের ঠিকানা জোগাড় করে চিঠি লিখে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান! বাংলা ডায়াস্পোরার একজন সাহিত্যিক-গবেষকের জীবনের অন্দরমহলের এই ছবি কেতকী যদি এমনভাবে তুলে না ধরতেন, তবে আমাদের জানাই হত না হয়তো। তবে শুধু তো চ্যালেঞ্জে নয়, প্রাপ্তিও আছে, আত্মপ্রকাশের তৃপ্তি, এক ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে আর এক ভাষা ও সংস্কৃতির শরীরে মিশে যাওয়ার আনন্দ। কেতকী বলেন, ‘…মনে হয় আমি একটা জীবন্ত সেতু, দুটো কূল ছুঁয়ে আছি।’ জীবন্ত সেতু হওয়ার কিছু জ্বালাযন্ত্রণা আছে, কিন্তু একটা বিরল আনন্দও আছে। দূরকে নিকট করার, পরকে স্বজন করার অনাবিল আনন্দের কাছে বাকি সব অর্থহীন।

কেতকী কুশারী ডাইসনের সমগ্র সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়, আগ্রহী পাঠক চাইলে আমার ‘বৈশ্বিক বাঙালি এবং ডায়াস্পোরার বাংলা সাহিত্য’ বইটি দেখতে পারেন। কেবল ওঁর শেষ বড় কাজ, ২০০৮ সালে প্রকাশিত ‘তিসিডোর’ সম্পর্কে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলে শেষ করব।

২০০৮-এর গ্রীষ্মে ডায়াস্পোরার বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা ও ক্ষেত্রসমীক্ষার কাজে আমি যখন অক্সফোর্ডে যাই, ‘তিসিডোর’ তখন প্রেসে গিয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পরে খবর এল– আনন্দ পাবলিশার্স, আকাদেমি বানান বিধি অনুসারে বইয়ের বানান বদলে নিতে চায়। সঙ্গে সঙ্গে কেতকীর সপাট জবাব, কোনওভাবেই তাঁর কম্পোজ করা পাণ্ডুলিপি বদলানো চলবে না। ইমেলে পত্রযুদ্ধ চলল কিছুদিন, তারপর কেতকী জানালেন আনন্দ তাঁর বানান মেনে না-ছাপালে বই তিনি তুলে নেবেন। শেষ পর্যন্ত প্রকাশনার উঁচুমহলের হস্তক্ষেপে সমস্যা মেটে। আনন্দ একটি ডিসক্লেমার দিয়ে বানান অপরিবর্তিত রেখে বইটি প্রকাশ করে। ২০০৯ সালে ‘তিসিডোর’-এর জন্য ‘সেরা বাঙালি’ পুরস্কার পান কেতকী। পুরস্কারের মঞ্চে সঞ্চালক যখন হালকা চালে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, তাঁর নামের বানান যদি বদলে হ্রস-ই করে দেওয়া হয়, তবে তিনি কী করবেন? কেতকী তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলেন, তিনি তবে আবার ‘রণাঙ্গনে’ অবতীর্ণ হবেন। বাংলা ভাষাটিকে চোখের মণির মতো আগলে রেখেছিলেন যাঁরা, শত আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হয়েও যাকে নষ্ট হয়ে যেতে দেননি, বোধ করি তাঁদের শেষ প্রতিনিধি ছিলেন কেতকী কুশারী ডাইসন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved